#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা
#পর্ব_সংখ্যা ৭
সময় প্রবহমান, ইতিমধ্যে দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন। বলতে গেলে সপ্তাহ, সেই রবিবার ঘুরে এল আবার একটা রবিবার।
সময় তখন সাড়ে সাতটা হবে। নয়ন্তীকা নাচ থেকে বাড়ি ফিরছে। আজকে তার একটু দেড়ি হয়ে গেছে, যদিও মিস'ইএকটু দেড়িতে ছুটি দিয়েছেন। অবশ্য, এই কথা বাড়িতেও জানানো হয়েছে। সেইদিনের পর থেকে নয়ন্তীকা কখন-কোথায় যায় তার বাবা ঠিক ফোন করে জেনে নেন।
নয়ন্তীকার নাচ ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও মায়ের জন্য আর ছাড়া হয়নি। মা তার বাবাকে বুঝিয়ে, অনেক অনুরোধ করে,,, তারপর ,নয়ন্তীকা এখন আবার নাচ করতে আসছে। বাবার হ্যাঁ বলার সাথে অবশ্য অনেক গুলো শর্ত ও ছিল। যেমন; নয়ন্তীকা টিউশন যাক অথবা নাচ করতে,,,, মিসের বাড়ি ঢোকার সাথে সাথেই তার বাবার কাছে ফোন চলে যায়। আবার, সেই ঘটনার পর বাবা তাকে সাইকেল এনে দিয়েছেন। যেহেতু কলেজ বাদে সব কাছেই, তাই সাইকেল করে চলাচল করলে নাকি সুবিধা হবে; তার বাবার মতে।
এখন নয়ন্তীকার নিজেকে কেমন বন্দী পাখি মনে হয়, সবে তার কেমন দমবন্ধ লাগে। ভেবেই নয়ন্তীকা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। যেটা কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেল।
কুয়াশায় ঢাকা রাস্তায়, দন্ডায়মান ল্যাম্পপোস্ট গুলোর সৌন্দর্য একটু আলাদাই। নয়ন্তীকা মুগ্ধ নজরে চেয়ে চেয়ে দেখছে। তখন সে ধীর গতিতে সাইকেল নিয়ে হাঁটছে। আজকে রিহা'টাও আসিনি। সে কোন আত্মীয়র বাড়ি গেছে। তাই আজ নয়ন্তীকা একাই এসেছে নাচ করতে। তার ওপর,,,,বাবার এনে দেওয়া নতুন সাইকেলটার টায়ার পাংচার হয়ে গেছে, অবশ্য যাওয়ার সময় ঠিকই ছিল। মিসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই হাল হয়েছে।
যদিও নয়ন্তীকার বিরক্ত লাগছে না মোটেই। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাত, ল্যাম্পপোস্টের আলো, ফাঁকা রাস্তা, হেঁটে হেঁটে যাওয়া..সব মিলিয়ে নয়ন্তীকার বেশ ভালোই লাগছে।
—“যদি ভালোবাসিস আমারে তুই ময়না রে,,,,
তোরে কিইনা দিমু খাঁটি সোনার গয়না রে”....
আকস্মিক পুরুষালী বিভৎস কন্ঠস্বর শুনে চোখ পিটপিট করে তাকালো নয়ন্তীকা। ওমনি বিরক্তি আর ভয়ে মুখ কুঁচকে এল তার। কন্ঠের মালিক তখন বিশ্রী ভাবে দাঁত বার করতে ব্যস্ত। যা দেখে নয়ন্তীকা মুখ নামিয়ে চুপচাপ হাঁটা ধরলো। এতক্ষণ নির্জন রাস্তা ভালো লাগলেও, এখন ভয় হল মনে। এতক্ষণে বাড়ি যাওয়ার বড্ড তাড়া অনুভব করলো নয়ন্তীকা। ঠিক তখনই অন্য একটা পুরুষালী কন্ঠস্বর কানে এল....
— “ময়না ছলাৎ ছলাৎ চলে রে..
পিছন পানে চায় না রে”...
গানের পর সবাই উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। যা শুনে নয়ন্তীকার জান যায় যায় অবস্থা। সে মনে মনে উপরওয়ালাকে ডাকতে লাগলো। যেন, এই মূহুর্তে তার রক্ষা করে। পরের দিন দিয়ে সে ভুলেও এই রাস্তা দিয়ে আসবে না।
এখন নয়ন্তীকা কে.বি.সি ক্লাবের রাস্তা হয়ে নাচের মিসের বাড়ি আসছে না। অন্য একটা রাস্তা হয়ে আসে, যেটা একটু দূরে পড়ে। যেহেতু নয়ন্তীকার শনি-রবিবার নাচের ক্লাস থাকে, তাই নয়ন্তীকা কালকেও ঘুরে অন্য রাস্তা হয়ে এসেছিল। নাচ করতে যাওয়ার সময় অসুবিধা না হলেও, বাড়ি ফেরার সময় নয়ন্তীকা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। এই যেমন, সে এখন যে নতুন রাস্তা হয়ে আসা-যাওয়া করছে,,, সেখানে একদল বখাটে বসে। তবে প্রতিদিন কিনা নয়ন্তীকার জানা ছিল না। আগের দিনও নয়ন্তীকাকে দেখে সব গান গাইছিল। আবার আজকেও একই ঘটনা ঘটলো, যেটা নয়ন্তীকা মোটেই আশা করেনি।
“এই চম্পাকলী শুনে যাও আমাদের কথা,,,,
মনে দেবো নাকো একটুও ব্যাথা.....!!
বলেই আবার সবকটা হেসে উঠলো। এইদিকে,নয়ন্তীকা ভয়ে আর চাইলো না। পায়ের গতি বাড়িয়ে হাঁটতে লাগলো। যেহেতু, সাইকেলের অবস্থা খারাপ তাই সময় একটু বেশি লাগছে।
—বাহ!!তোরা দেখি বেশ ভালোই কবিতা বলতে পারিস। তা, রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা প্রতিটা মানুষের জন্যই বুঝি এই স্পেশাল কবিতা আর গান থাকে ?”
চেনা পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে নয়ন্তীকার পা জোড়া থেমে গেল আপনা-আপনি। সে এতক্ষণে মুখ তুলে পিছু ফিরে চাইলো। অমনি, পরিলক্ষিত হলো সবচেয়ে অপ্রিয়-অপছন্দের মানুষটা। আপার-লোয়ার পরিহিত, পিঠে ঝুলছে কালো রঙের স্পোর্টস ব্যাগ। হেয়ার ব্যান্ডের মতো টুপি দিয়ে কান দুটো ঢাকা, তবে চুল গুলো দৃশ্যমান। যার ফলে ঝাঁকড়া চুল গুলো আরও ঝাঁকড়া দেখাচ্ছে। হাতে জলন্ত সিগারেট, যার ধোঁয়া কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছে।
নয়ন্তীকা না চাইতেও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো রক্তিম দাশগুপ্তকে। তার চুপচাপ চলে যাওয়ার কথা থাকলেও, সে দাঁড়িয়ে রইলো। তবে কী রক্তিমের আশায়??,,,,সে জানে না। আর না এই খবর তার মন রাখে।
এইদিকে রক্তিমের কথায় সবার মুখের কথা হারিয়ে গেছে। সবকটা চুপচাপ তাকিয়ে রয়েছে রক্তিমের মুখপানে।
রক্তিম সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে আবার বলে উঠলো—“কীরে , বললি না তো!! আমার কানে আর একবার এসেছে ব্যাপারটা,,,,। সারাটাদিন সবকটা, পথিকদের গান শোনাস বসে??নাকি ও স্পেশাল?”
রক্তিম নয়ন্তীকাকে দেখিয়ে বললো। তার কন্ঠস্বর একদম শান্ত। যা শুনে উপস্থিত ছেলে-পুলেরা একটু ভয় পেল। এই রক্তিম দা কে ওরা ভালো মতোই চেনে। শুধু ওরা কেন, এলাকার সবাই চেনে। আর তার রাগ সম্পর্কেও জানা আছে ওদের। ভাই তাড়াতাড়ি রাগে না, আর রেগে গেলে তার হালত খারাপ করে ছাড়ে। এর আগেও তারা রক্তিম দাশগুপ্তের হাতে পড়েছে মেয়েদের বিরক্ত করার জন্য। সেই বার বুঝিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল, এই বার কী হতে পারে তাই ভাবছে সবাই।
“আর হবে না রক্তিম দা!! আর একটা সুযোগ দাও।”— উপস্থিত ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বলে উঠলো। সাথে সবাই তালে তাল মিলিয়ে একই কথা বলতে লাগলো।
ছেলেগুলোর কথায় রক্তিম ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। তারপর বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে সিগারেটে শেষ টান দিয়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিসে ফেললো। তারপর বেশ গম্ভীর কন্ঠে বললো—“বিষয় যখন রক্তিমের জিনিসের ওপর আসে, রক্তিম দাশগুপ্ত সুযোগ দেয় না। ডাইরেক্ট, শিক্ষা দেয়...।”
বলেই রক্তিম ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গেল। আর ছেলে গুলো হাঁ করে তাকিয়ে রইলো রক্তিমের যাওয়ার দিকে। তাদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে, রক্তিমের কথা তাদের ঘটে কিছুই ঢোকেনি। তবে, এই মুহূর্তে রক্তিম তাদের কিছু বললো না, তা দেখে সবাই মোটেই অবাক হয়নি। তারা সবাই চেনে রক্তিমকে, সে ছাড় দেওয়ার পাএ। একেবারেই ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নয়। যা করে ভেবেচিন্তে, বুদ্ধিমান আর ধৈর্য্যশীল একটা মানুষ। এই মুহূর্তেও নিশ্চয়ই তার মাথাতে কিছু চলছে। ছেলেগুলো ভালো মতোই বুঝতে পেরেছে।
--------
“তোমার কি আক্কেল জ্ঞান বলে কিছুই নেই? এই নির্জন রাস্তায়, তার ওপর এই অসময়ে একা একা ঘুড়ছো।”—রক্তিম নয়ন্তীকার কাছাকাছি এগিয়ে, চোখে চোখ রেখে বলে উঠলো।
তবে নয়ন্তীকার সেই দিকে কোনো হুস নেই। সে একধ্যানে রক্তিমের মুখপানে তাকিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি বাড়িতে থাকার পরেও, ঠিক একসপ্তাহ পর নয়ন্তীকা মানুষটাকে দেখছে। অবশ্য আগে নয়ন্তীকা সামনের অপ্রিয় মানুষটাকে নিয়ে অতো ভাবিনি। তবে ইদানিং ভাবছে। তার কেন যেন ভাবতে ভালো লাগছে। নয়ন্তীকা এই নতুন অনুভূতির সাথে পরিচিত নয়। যার জন্য সে রক্তিমের থেকে একপ্রকার পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যাতে তাকে দেখতে না হয়, তাই সে রাস্তাও বদলে ফেলেছে। তবু মানুষটার সাথে অবশেষে দেখা হয়েই গেল। আর নয়ন্তীকা সব ভুলে অপলক তাকিয়ে রইলো রক্তিমের মুখ পানে।
এই দিকে নয়ন্তীকার নিরবতা দেখে রক্তিমের মাথা বেশ গরম হলো।তার এই মূহুর্তে ইচ্ছা করলো মেয়েটার নরম গালে দুটো চড় বসাতে। যা রক্তিম করতে পারবে না। সে নিজের রাগ কমাতে নিজের চুলে হাত চালিয়ে, এদিক-ওদিক চাইলো। তারপর নয়ন্তীকার সাইকেল একহাতে ঝাঁকিয়ে ,বেশ গম্ভীর গলায় বললো—“তোমার বাপ যে এত বড়ো বড়ো কথা বলে, তার কমন সেন্স নেই? মেয়েকে একা ছেড়ে দিয়েছে এই রাতের বেলায়।”
রক্তিমের এই কাজে নয়ন্তীকা হুঁসে ফিরলো, তার কথায় সে একেবারে তেঁতে উঠলো। তারপর মুখ বেঁকিয়ে রক্তিমের দিকে এক আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে উঠলো— “এই!!একদম আমার বাবাকে নিয়ে উল্টো-পাল্টা বলবেন না। তাছাড়া , আমার বাবা কি করবে আর কি করবে না আপনাকে বলতে বাধ্য নয়।
রক্তিম চোখ ছোটো করে চাইলো একবার নয়ন্তীকার মুখপানে, আর একবার তার দিকে তাক করে রাখা নয়ন্তীকার আঙ্গুলের দিকে। রক্তিম ঠোঁট এলিয়ে হাসলো, তারপর কৌতুক করে বলে উঠলো—“যেখানে বলার সেখানে তো মুখ থেকে কথা বেরোয় না। আর আমার বেলায় চটাস চটাস করে বলতে লজ্জা করে না?”
“না করে না।”—নয়ন্তীকা মুখ বেঁকিয়ে বললো।
যা শুনে রক্তিম শুধু তাকিয়ে রইলো। তারপর কিছু না বলেই সামনের দিকে এগিয়ে গেল। আর নয়ন্তীকা হা করে রক্তিমের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো। বেশ কিছু দূর গিয়ে রক্তিম খেয়াল করলো নয়ন্তীকা এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সে আবার ফিরে এলো।
“তোমার এখনও গান শোনা বাকি রয়ে গেছে নাকি ?”
রক্তিম কখন তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে নয়ন্তীকা খেয়ালই করিনি। আর না রক্তিমের কথা তার কান পর্যন্ত গেছে। সে নিজের ভাবনা চিন্তায় ব্যস্ত। নয়ন্তীকা আনমোনা হয়েই বলে উঠলো—"উহু!!”
"এখনও দাঁড়িয়ে আছো কেন ডাফার?? ”—রক্তিম ধমকে উঠলো তৎক্ষণাৎ।
রক্তিমের ধমকে নয়ন্তীকা আকস্মিক হকচকিয়ে উঠলো। তারপর রক্তিমকে কিছু না বলে , এমনকি রক্তিমের পানে না তাকিয়েই সে সামনের দিকে হাঁটা ধরলো। এরপর রক্তিম ও নয়ন্তীকাকে অনুসরণ করে সেই দিকে হাঁটা ধরলো।
চলবে,,,,,,,