ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান আমার ভালোবেসেছে

৯ম পর্ব

লেখক: অহনিশা ব্যানার্জি

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ৯

নৈতিক মুখার্জি জানে—তার মেয়ে জানলা দিয়ে পর পুরুষেকে চোখ দিয়ে গিলে খায় ?”

আকস্মিক পুরুষালী কন্ঠস্বরে হকচকিয়ে উঠলো নয়ন্তীকা। সে চোখ পিটপিট করে রক্তিমের পানে তাকালো। এই বদলোক কখন এল?? নয়ন্তীকা জানেই না। কিজানি সে কোন দুনিয়ায় ছিল। যে জানতেই পারলো না।

মানুষটা ব্যঙ্গাত্মক চাহনিতে তার পানেই চেয়ে রয়েছে। যা দেখে নয়ন্তীকা'র রাগে নিজের চুল টানতে মন চাইলো। সে অসহায় চোখে রক্তিমের পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো—সর্বনাশ!! এই লোকটার সামনে আবার তার অস্বস্তিতে পড়তে হল। উফ!! তার সাথেই কেন হয়??? হ্যাঁ! যা হয় ভালোর জন্য। তবে এত ভালো তার সাথেই কেন হয় ?? কেন.....

নয়ন্তীকা কাচুমাচু ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো রক্তিমের পানে। ভাবটা এমন,যেন কোনো বিড়াল মাছ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। অথচ, চাহনি'টা নিষ্পাপ ও অসহায়। যা খুব একটা তোয়াক্কা করলো না রক্তিম। সে ভ্রু কুঁচকে একই ভাবে তার পানেই তাকিয়ে রয়েছে। হয়তো বা উওরের আশায়।

নয়ন্তীকা এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো। এইদিকে বগলদাবা করা দুষ্টু চিনি-মিনি সমানে হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করে চলেছে। যেন তারা হাত-পা শূন্যে মেলে দিয়ে আনন্দ বাতাসে পাখির মতো ভাসছে। ওহ!! পাখি বললে ভুল হবে, বর্তমানে তারা নিজেকে জলপরি ভাবছে হয়তো। দুটোতে বিনা জলে সাঁতার কাটার মতো ভঙ্গি করছে। হাত-পা ছোঁড়া'র গতি এতই বেশি যে, নয়ন্তীকার হাতেও আঁচর লেগেছে অল্প।

চিনি-মিনির দিকে বিরক্তি ভরা চোখে তাকালো নয়ন্তীকা। কথায় আছে না—কারো'র পৌষ মাস আর কারোর সর্বনাশ। ওই ব্যাপারটাই হয়েছে আর কি।

নয়ন্তীকা দুটো'কে মেঝেতে নামিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চিনি-মিনি ছুটে ঘরের ভিতর চলে গেল। তাদের দৌড় দেখে নয়ন্তীকা'র ও পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করলো। কিন্তু নয়ন্তীকা পালাবে না। এই মূহুর্তে পালালেই ‘ভাবের দোকানের’ কথা'টা সত্য প্রমাণিত হবে। যদিও বা রক্তিমের কথাটা মোটেই মিথ্যে নয়।

নয়ন্তীকা'র আকাশকুসুম চিন্তার মাঝেই নীচ থেকে হট্টগোলের শব্দ কানে এলো। নয়ন্তীকা তড়িৎ বেগে মাথা তুলে চাইলো সামনের বেলকনিতে, রক্তিম ও ভ্রু কুঁচকে নীচের দিকে চেয়ে রয়েছে।

নয়ন্তীকা'ও সামান্য মাথা হেলিয়ে উঁকি দিল নীচে। রক্তিমের মা ও পাড়ার একটা মহিলার তুমুল ঝগড়া লেগেছে। তুমুল বলতে শুধু চুলোচুলি'টাই আরকি বাকি রয়েছে। নয়ন্তীকা নীচ হতে নজর ফিরিয়ে আবার সামনের দিকে চাইলো,ততক্ষণে রক্তিম স্থান ত্যাগ করেছে। যা দেখে নয়ন্তীকা'র ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো। সে খুশি মনে বিড়বিড় করে উঠলো— যাক! এ যাএায় বাঁচা গেছে।

নয়ন্তীকা আবার ঝগড়া দেখায় মন দিল। সে বিজ্ঞদের মতো বোঝার চেষ্টা করলো—আসলে দুই ভদ্রমহিলার বিশ্বযুদ্ধ লেগেছে কেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে নয়ন্তীকা আসল ঘটনা বুঝলো।

রক্তিমের সখের বিল্লু 'কাজু’ ঝগড়ুটে কাকীমার মাছ সাবার করে দিয়েছে। যার জন্য ভদ্রমহিলা রক্তিমের মায়ের কাছে নালিশ জানাতে এসেছিলেন। তারপর বাকিটা ইতিহাস।

নয়ন্তীকার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ তার নজর গিয়ে পড়লো কাজুর উপর। দুষ্টু বিল্লু রক্তিমদের জানলার কার্নিশে বসে ঝগড়া দেখতে ব্যস্ত। যেন সুন্দর একটা সিনেমা চলছে। মুখটা এমন করে রেখেছে, যেন ভাজা মাছ উলটে খেতে পারে না। নয়ন্তীকা মুখ বেঁকালো— এ্যাহ! ঢং দেখলে বাঁচি না। বলেই নয়ন্তীকা জিভ কাটলো তৎক্ষণাৎ। আজকে এই বিল্লু'র জন্যই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে বেঁচে গেছে নয়ন্তীকা। তাই সে মনে মনে কাজু'কে একটা ধন্যবাদ জানালো। সে বিড়বিড় করে বলে উঠলো—এই প্রথমবার কাজের কাজ করেছে বিল্লু'টা। বাড়িতে এলে নিশ্চয়ই কিশমিশ খাওয়াবো..।

--------------

লিভিং রুমের সোফায় বসে রাগে ফসফস করছেন মিসেস রেবা। তার মাথা এখনো ঠান্ডা হয়নি। বেয়াদব মহিলাকে আরও দু-চারটে কথা শোনাতে পারলে শান্তি হতো। তিনি অবশ্য কাউকে ছাড়ার পাত্রী নন। সে তো রক্তিম এসে বেয়াদব মহিলাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে তারপর তাকে ঘরে এনে বসিয়েছে। না হলে এতক্ষনে কুচুটে মহিলাকে শায়েস্তা করে ছাড়তেন তিনি। তার সাহস কত—তার বাড়িতে এসে তাদের কাজুর নামে নালিশ করে। নালিশ করলেও ঠিক ছিল, মারা'র হুমকি দেয়। এর পরেও মানুষ কীভাবে চুপ থাকতে পারে...

হ্যাঁ! মিসেস রেবাও কাজুকে খুব একটা পছন্দ করেননা। অবশ্য তার বাঁদরামির জন্য। এমন নয় যে তাকে খেতে দেওয়া হয় না। তবু সে বদমাইশি করবেই। রান্না ঘরে গিয়ে দুধে মুখ দেয়া থেকে শুরু করে কাঁচা-পাকা মাছেও মুখ দেয়। তারপর পায়ে পায়ে ঘুরে শাড়ি টানাটুনিও থাকে। কাজুর এই কাজে তিনি বিরক্ত হন। তা বলে সবসময় নয়। মাঝে মাঝে তার সঙ্গ আবার ভালোও লাগে। ছেলে দুটো'র পরে কাজু রান্না ঘরে উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে যায়। যাইহোক, এতকিছুর পরেও তিনি শুধুই বকেন। কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে বাড়িটাকে মাথায় তোলেন পারলে, তবু কাজুকে মারা'র কথা কখনোই ভাবেননি তিনি।

আর সেই মহিলা মারা'র হুমকি দেয়। মিসেস রেবা মুখ বেঁকালেন—অসভ্য, বেয়াদব, কুচুটে মহিলা কোথাকার!

কাজু পাড়ার ওই কুচুটে মহিলার মাছের ঝালে মুখ দিয়েছে। যা স্বচোখে দেখেছিলেন মহিলা'টি। কাজু তাদের সব মাছের ঝাল অবশ্য খেয়ে নেয়নি, তবু তারা ওই তরকারি খেতে পারতো না স্বাভাবিক। তিনি কাজুর নামে নালিশ জানাতে আসায়, মিসেস রেবা যথেষ্ট বিনীয় ভাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন। এবং তিনি ক্ষতিপূরণ ও দিতে রাজি ছিলেন। কিন্তু মিসেস রেবার ভালো যুক্তি তার পছন্দ হয়নি। তিনি বললেন, দ্বিতীয়বার তাদের বাড়িতে কাজু গেলে তাকে আর দেখা যাবে কিনা সন্দেহ। এই কথার অর্থ বুঝতে খুব একটা সময় লাগিনি মিসেস রেবার। তৎক্ষণাৎ তিনি ক্ষেপে উঠলেন। আর বেঁকে বসলেন। তিনি ক্ষতিপূরণ দেওয়ায় নাকোচ করায় কথা কাটাকাটি শুরু হলো। যা এক পর্যায় তুমুল ঝগড়ার রূপ নিল।

“এই নাও জল খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করো।— রক্তিম একটা কাঁচের গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে মায়ের উদ্দেশ্য বললো।”

মিসেস রেবা একবার চোখ তুলে অগ্নি চোখে ছেলের পানে চাইলেন। তারপর হাত বাড়িয়ে গ্লাস নিতে নিতে আবার গজগজ করতে লাগলেন—“হ্যাঁ! নিজে তো কিছু বললি না, আর আমাকেও বলতে দিলি না।”

রক্তিম মিসেস রেবার সামনের সিঙ্গেল সোফায় বসতে বসতে বললো।—“মা! কাজুর দোষ ছিল।”

“অসভ্য মহিলার কথায় কাজুর দোষ খুঁজে পাচ্ছিস। আর আমি বকলেই সে নির্দোষ হয়ে যায়?? তাই না?”

“আমাদের বাড়ি আর বাইরের লোক আলাদা। আমরা সব সহ্য করলেও, বাইরের কেউ সহ্য করতে বাধ্য নয়।”

নিজের ছেলেকে অন্যের গান গাইতে দেখে বেশ অভিমান হল মিসেস রেবার। তিনি অভিমানী কন্ঠে বলে উঠলেন—“আচ্ছা! এখন সব দোষ আমার হয়েছে। ওই মহিলাই ভালো, তাই তো?”

মায়ের বাচ্চাদের মতো ব্যবহারে রক্তিম মাথা চুলকালো। তার মা একটু বেশিই বোঝে। ওই আম বললে কাঁঠাল। রক্তিম ঠোঁট গোল করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। তারপর বোঝানোর সুরে বলে উঠল —বাদ দাও না মা। এখন তো সব মিটে গেছে।

মিসেস রেবা হাঁ করলেন কিছু বলার জন্য। কিন্তু তার আগেই প্রবেশ ঘটলো রূপকের। তাই তিনি মুখটা বন্ধ করে বাঁকা নজরে ছোটো ছেলের পানে চাইলেন।

বান্টি তখন এক হাত বুকে রেখে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ছুটে এসেছে হয়তো। অপর হাতে তার ক্রিকেট ব্যাট। মিসেস রেবা সেইদিকে চেয়ে আবার ছেলের মুখের দিকে চাইলেন। দৃষ্টি একদম শান্ত। অপর দিকে রক্তিম মা আর ভাইকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে জহুরি নজরে। পরিবেশ একেবারেই ঠান্ডা, ঠিক ঝড় আসার পূর্বাভাস যেন।

“মা জানো, সুজল বলছিল— তুমি নাকি দারুন ঝগড়া পারো। একেবারে ঝগড়ুটে মহিলাদের মতো। ওই”...

“এতক্ষণ কোথায় ছিলিস?”

মায়ের ঠান্ডা আওয়াজে ঢোক গিললো রূপক। সে একবার হাতে ধরে রাখা ব্যাটের দিকে চাইলো আর একবার অগ্নিমূর্তি মায়ের দিকে। তারপর মাথা নীচু করে ধীর গলায় বললো— মাঠে খেলতে গিয়েছিলাম।

“কেন? তোর পড়াশোনা নেই?”

“স্কুল তো ছুটি। তাছাড়া বিকেলে পড়তে বসবো।”

“হ্যাঁ! তারপর তোর বিকেল গড়িয়ে সকাল হবে তারপর আবার দুপুর। তাই তো? বেয়াদব! তোকে ভরদুপুরে খেলতে যেতে বারন করিনি?? দাঁড়া, তোর একদিন কী আমার একদিন— বলেই মিসেস রেবা হুরমুরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।”

মাকে উঠতে দেখেই রূপক ব্যাট সমেত উপর ঘরের দিকে ছুট লাগালো। তার মায়ের কোনো ঠিক নেই, তার প্রিয় ব্যাট ফেলে দিতেও দুবার ভাববে না। তাই আর কোনো রিস্ক নিতে চাইলো না সে। তার মাথাতেই ছিল না, যে সে ব্যাট হাতে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। মা জননী ভর দুপুরে রোদের মধ্যে তার খেলাধুলা একেবারেই পছন্দ করেন না। তবু সে রোজ লুকিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, আবার মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়িতেও ঢুকে পড়ে। এতদিন সে ধরা পড়িনি। তবে আজকে ওই সুজলের জন্য সব ঘেঁটে গেল। সে না বলতো তার মায়ের ঝগড়া'র কথা। আর না সে ছুটে আসতো আর না এত কিছু হতো।

অপর দিকে, মা-ছেলের কান্ড দেখে রক্তিম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। কেউ কারোর থেকে কম যায় না।

---------------

সূর্য অস্ত যাওয়ার শেষ মূহূর্ত। নির্জন সমুদ্রের ধার, থেকে থেকে সমুদ্রের ঢেউয়ের প্রবল গর্জন শোনা যাচ্ছে। সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলের। সেই দিকে তাদের হুঁস যেন নেই। তারা গানের তালে তালে নাচতে ব্যস্ত। বাতাসে গুনগুন করে গান বাজছে—

“দিল মেরা হার বার ইয়েহ শুননে কো বেকরার হেয়,

কহো না পেয়ার হেয়”....

মেয়েটি সাদা রঙের ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরিহিত এবং সুঠামদেহি পুরুষটি সাদা শার্ট-প্যান্ট পড়িহিত, হুবহু ওই গানের নায়ক-নাইকার মতো। দুজনে খুব কাছে একে অপরের। এক পর্যায় ছেলেটির অধর ছুঁয়ে দিল মেয়েটির উষ্ণ ঠোঁট....।

ধরফরিয়ে উঠে বসলো নয়ন্তীকা। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে চোখ তুলে আশেপাশে চাইলো সে। নিজেকে নিজের বরাদ্দকৃত ঘরে নিজেকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলেও, পরক্ষণে স্বপ্নের কথা ভেবে চোখ আপনা আপনি বড়ো হয়ে গেল। হৃদযন্ত্রের সঞ্চালন হঠাৎ করেই বেড়ে গেল।

নয়ন্তীকা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিল। জামাকাপড় সহ ঘাড়-গলা ঘামে ভিজে একাকার অবস্থা হয়ে আছে। সে হাত বাড়িয়ে জল নিয়ে খেল। তারপর ঘড়ির দিকে চাইলো, সকাল সাড়ে চারটে বাজে। এবার নয়ন্তীকা'র অস্থিরতা বাড়লো বইকি কমলো না।

সকালের স্বপ্ন সত্যি হয়। নয়ন্তীকা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, এবং তার সকালের স্বপ্ন সত্যিও হয়েছে অনেকবার। তবে তার চিন্তা সকাল নিয়ে নয়, আর না স্বপ্ন নিয়ে। তার চিন্তা স্বপ্নের মানুষটাকে নিয়ে। পৃথিবীর এত মানুষকে ছেড়ে সেই কেন ??? মানুষ শএুদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে বুঝি ?? আসলেই কী ওইরকম কোনো সম্ভাবনা আছে আমাদের মাঝে???—নয়ন্তীকা চিন্তায় পড়লো...

চলবে,,,,,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন