#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা_ব্যানার্জী
#পর্ব_সংখ্যা ১০
ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ তখন। শীত তখনো একেবারে চলে যায় নি। ওই ঠান্ডা-গরম চলছে আর কি। ঘড়ি'তে তখন বেলা দশটা কি সাড়ে দশটা হবে। নয়ন্তীকা'র জানা নেই। আর না তার মধ্যে সময় জানার কোনো তাড়া দেখা যাচ্ছে। সে আনমনা হয়ে ছাদে বসে রয়েছে চুপচাপ। কোলের উপর একখানি একাডেমিক বই পড়ে রয়েছে। তবে সেটা কোন বই সে খবরও তার নেই। অবশ্য বইটি সে ছাদে নিয়ে আসতো না। একটু সময় একাকী থাকার কোনো কারণ তো প্রয়োজন। তাই নয়ন্তীকা নিজের জননীকে বলে এসেছে—তাকে যাতে ডাকা না হয়। সে পড়বে, সামনেই তার পরীক্ষা কিনা।
নয়ন্তীকা'র ইদানিং কিছু একটা হয়েছে। সে জানে না। জানে না বললে ভুল হবে; তার মন জানতে চাইছে না। তার মন জানতে চাইলেও ভাবতে চাইছে না, আর ভাবতে চাইলেও,,, বুঝতে চাইছে না। বড্ড জটিল না ব্যাপারটা?? এই মূহুর্তে নয়ন্তীকা'র ও বড্ড জটিল লাগছে নিজেকে। জটিল প্যাঁচ যুক্ত লাগছে নিজের মনকে। কেমন অগোছালো হয়ে গেছে নয়ন্তীকা'র জীবনটা। সব দিকে ঠিক সামলে উঠতে পারছে না। তার ইচ্ছা করছে—সব ছেড়ে দূরে কোথাও যেতে। যেখানে কেউ এবং কারোর চিন্তা ভাবনাও তাকে বিরক্ত করবে না।
দু সপ্তাহ মতো হচ্ছে নয়ন্তীকা ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। এই কয়েকদিন নাচ, কলেজ, টিউশন কোথাও যাওয়া হয়নি তার। সব কিছু বিরক্তিকর ঠেকছে তার কাছে। ভেবেই নয়ন্তীকা ঠোঁট উল্টালো। ততক্ষণে তার চোখে অশ্রুকণা এসে ভিড় করলো। মেয়েটা ছল ছল চোখে বিড়বিড় করে উঠলো—“তুমি আমাকে বিরক্ত করছো রক্তিম দাশগুপ্ত। ভীষন বিরক্ত করছো।”
আসলেই সে বিরক্ত করছে??
নাহ!—নয়ন্তীকা'র মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো। কিন্তু মন তো অন্য কথা বলছে। মন তার মানসিক অশান্তির সমস্ত দায় রক্তিম'কে করছে। কিন্তু আসলেই মানুষ'টার কোনো দোষ নেই। সব দোষ তার একার। এবং তার বিকৃত মস্তিষ্কের। মাএ কিছুক্ষণের স্বপ্ন তার কি অবস্থা করেছে—ভেবেই মলিন হাসলো নয়ন্তীকা। তার নিজেকে পাগল-পাগল লাগছে। সারাক্ষণ মাথাতে শুধু রক্তিমের কথাই চলছে নয়ন্তীকা'র। দু সপ্তাহ কি কম?? রাত-দিন তার কথা ভাবা কি স্বাভাবিক???—নয়ন্তীকা'র মাথাতেই ঢুকছে না ব্যাপারটা।
“এ্যাই!!! মঞ্জুলিকা”.....
আকস্মিক পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে তাকালো নয়ন্তীকা। পাশের ছাদেই রূপক উঠেছে। হাতে জামা কাপড়ের বালতি। এবার একটু পড়েই মিসেস রেবা উঠে ভেজা জামাকাপড় মেলে দিয়ে যাবেন, তা নয়ন্তীকা আন্দাজ করে নিল। এটা প্রতিদিনকার ব্যাপার। রূপক তার মায়ের হেল্পিং হ্যান্ড। এটা বেশ প্রসংশনীয়। সে ছেলে হয়েও মাকে বাড়ির কাজে যথেষ্ট সাহায্য করে । এখনকার দিনে কয় জনই বা করে।
“বাবাহ!! মঞ্জুলিকা আজ আমাদের পাশের বাড়ির ছাদে। ওমা, আমি কি ঠিক দেখছি ?”
রূপক নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো। তারপর নয়ন্তীকার কাছাকাছি নিজেদের ছাদের রেলিং ধরে ঝুলে দাঁত বার করলো। যা নয়ন্তীকা শান্ত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো। তবু মুখ থেকে টু শব্দটি করলো না। তার আজকে আর ঝামেলা করতে ভালো লাগছে না। তাই সে রূপকে কিছু বললো না, চুপচাপ দৃষ্টি ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকালো।
“মঞ্জুলিকা দেখি বোবা। নাকি সে”..
“বান্টি”...
“তেরা সাবুন শ্লো হেয় কেয়া??”—নয়ন্তীকা'কে তার কথা পুরো না করতে দিয়েই রূপক বলে উঠলো। মুখে তখন তার শয়তানি হাসি লেগে রয়েছে।
রূপকের কান্ডে নয়ন্তীকা এবার বিরক্ত বোধ করলো। সে এই মূহুর্তে কোনো ঝামেলা চাইছে না, তবু এই ছেলে তাকে না পচিয়ে ছাড়বে না। নয়ন্তীকা তা বেশ বুঝলো।সে এবার রাগত স্বরে রূপক'কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,,,,,
“আমি আসবো??”
নয়ন্তীকা'র এই কথায় রূপক নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো—ওহ বাবা!! আমি ভয় পেয়েছি ভীষন!!
“ভূতে আমি ভয় পাই নাকি?? মঞ্জুলিকা”...
রূপক নয়ন্তীকা'র দিকে তাকিয়ে দাঁত বার করলো। যা দেখে নয়ন্তীকা হতাশার নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। এই দুই ভাই তাকে শান্তিতে বাঁচতে দেবে না দেখছি। নয়ন্তীকা এই মুহূর্তে এই বান্টি'র সাথে তর্ক করতে মোটেই মন চাইছে না। তবু এই বদ'টাকে একেবারে ছেড়েও দেয়া যায় না।
“পড়াশোনার কথা না হয় বাদই দিলাম। বড়োদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তাও জানা নেই তোর? কী শিখতে স্কুলে যাস তুই?? যেখানে ভদ্রতার ভ' টুকু নেই তোর মধ্যে। বড়োদের যে দিদি বলতে হয় সে জ্ঞান ও নেই দেখছি”...
বলেই নয়ন্তীকা সামান্য নিঃশ্বাস নিল। এবার এ অপমান-লজ্জায় কেটে পড়বে নিশ্চয়ই। দেখ কেমন লাগে,,, ভেবেই নয়ন্তীকা পৈশাচিক আনন্দ পেল।
“এ বাবা ! আপনাকে আমি অসম্মান করে কথা বলতে পারি মাননীয়া কাকিমা। আপনি কততত বড়ো আমার থেকে। এমনকি আমাদের পুরো পাড়ায় আপনি একজন বয়স্ক অভদ্র মহিলা বলে কথা।”— বলেই রূপক মিটিমিটি হাসতে লাগলো। আর নয়ন্তীকা গোল গোল চোখে অনুভূতিহীন ভাবে তাকিয়ে রইলো রূপকের পানে। এই বদ ছেলে আজকে ভেবেই রেখেছে, যে নয়ন্তীকা'কে সে নাকানিচুবানি খাইয়ে ছাড়বে।
“আপনাকে এবার থেকে আন্টি বলবো,,,,কেমন?? আমি আবার খুউউব ভদ্র ছেলে তো,,,,।
“আজ্ঞে হ্যাঁ দাদু!!! আপনি যা ভালো মনে করেন।”—নয়ন্তীকা একটা টেডি স্মাইল দিয়ে বললো। অপর দিকে নয়ন্তীকার কথায় রূপক একেবারে ভেবাচেকা খেয়ে গেল। কিছুক্ষণ নয়ন্তীকার দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে হনহন করে নিচে নেমে গেল। যা দেখে নয়ন্তীকা শব্দ করে হেসে উঠলো। তার সাথে এই চুনোপুটি কিনা লাগতে আসে। সাহস কত!!!
-----------
বিকেলের শেষভাগ, সূর্য তখনো অস্ত যায়নি। গঞ্জের ঘাটে মানুষের আনাগোনা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে ক্রমে, গঞ্জের মোড়ে একটা বিশাল গঙ্গার ঘাট রয়েছে, নাম গঞ্জের ঘাট। এই ঘাটের বিষেশত্ব হল—ঘাটের পাশেই ফুলের বাজার আছে। এই গঞ্জের বাজার থেকে ফুল শহরের বিভিন্ন জায়গায় সাপ্লাই করা হয়। তাছাড়া এই ঘাটে সবসময়ই মানুষ জনের আনাগোনা থাকে। প্রেমিক-প্রেমিকা থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা জমে হেথায়। ঘাটের বাইরের দিকে বিভিন্ন খাবারের স্টলও দেখা যায়।
ঘাটের সিঁড়ি এককোনায় বসে রয়েছে নয়ন্তীকা। পাশেই প্রিয় বান্ধবী রিহা। দুইজনের হাতেই ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের ভাঁড়। যেটা কিনা নয়ন্তীকার খুব প্রিয়। বাড়িতে সে চা খায় না বললেই চলে, তবে বাইরের ভাঁড়ের চা তার ভীষন ভালো লাগে।
নয়ন্তীকা চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে রিহার পানে তাকালো। মেয়েটা তাকে জ্ঞান দিয়ে চলেছে। যদিও এখনো পর্যন্ত তাকে মনের দ্বন্দ্বের কথা জানাইনি নয়ন্তীকা। আর সেই কথাই শোনার জন্য মেয়েটা লেগে আছে একাবারে। এই দুই সপ্তাহ নয়ন্তীকা কারোর সাথেই যোগাযোগ করিনি। এমনকি রিহার সাথেও না। যেহেতু রিহা তার বাল্যকালের সই, তাই সে সব কথাই আগেভাগেই বুঝে যায় না বলার পরেও।
এই যেমন আজকেও নয়ন্তীকার কোথাও বেরোনোর কথা ছিল না। মেয়েটা হঠাৎ ই তার বাড়ি এসে, মাকে একপ্রকার জোর করে মানিয়ে আর তাকে ধরে বেঁধে এনেছে। তার পর থেকেই জিজ্ঞাসা করে চলেছে মেয়েটা নয়ন্তীকার মনের খবর। যা নয়ন্তীকা নিজেও জানে না।
“দেখ মনা!! মনে কষ্ট চেপে রাখলে তা বাড়ে বইকি কমে না। এবার চুপচাপ ভালো মেয়ের মতো বলে ফেলো কি হয়েছে”...
“আরে ভাই কিছুই হয়নি সত্যি বলছি”...
“ওহ!! তোর কথা আমাকে বিশ্বাস করতে বলছিস?”
রিহার হাবভাব দেখে নয়ন্তীকা মলিন হাসলো। তারপর শান্ত গলায় বললো—সত্যিই কিছু হয়নি রে। কিছু হবে আর তুই জানতে পারবি না তা কখনো হয়েছে বল???
“হুঁ!!! তা তো আছেই।”
এবার রিহা চনমনে ভাবে নিজের জীবনের গল্প করতে লাগলো। আর নয়ন্তীকা মনোযোগী শ্রোতা'র মতো শুনতে লাগলো। দুজনের কথার এক ফাঁকে নয়ন্তীকা'র ঘাট দেখতে দেখতে নিজের ডান দিকে তাকালো। ওমনি থমকে গেল কিছুক্ষণের জন্য। বুকের ধ্রিম ধ্রিম শব্দটা দ্বিগুণ হারে বাড়তে লাগলো। নয়ন্তীকা তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। তার চোখ জ্বালা করতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। রিহা এইসব তখনো খেয়াল করিনি, ও আপন মনে বকেই চলেছে। যা নয়ন্তীকার কানে মোটেই ঢুকছে না। এই মূহুর্তে তার মন অন্য কথা ভাবছে, চোখের সামনে একটা ছবিই বার বার ভেসে উঠছে।
এই মাএ নয়ন্তীকা রক্তিমকে দেখেলো, তাও আবার একটা মেয়ের সাথে। যা দেখে নয়ন্তীকা'র কান্না পাচ্ছে। ভীষন কান্না পাচ্ছে। নিজের চোখের জলে এই গঞ্জের ঘাট সহ কূল তলা ভাসিয়ে দেওয়ার মত কাঁদতে মন চাইছে তার। তবে কেন??? তার কেন খারাপ লাগছে??? নয়ন্তীকা দুহাতে নিজের মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো তৎক্ষণাৎ....
চলবে,,,,,,