#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা_ব্যানার্জী
#পর্ব_সংখ্যা ১১
“বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে,
বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
দেওয়ানা বানাইছে,
কী যাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে”....
নয়ন্তীকা'দের থেকে কিছুটা দূরে একদল ছেলে মেয়ে গিটার নিয়ে বসেছে। সেখান হতেই এই গানের উৎপওি। যেন নয়ন্তীকা'কে উদ্দেশ্য করে,তারই জন্যে গানটা গাওয়া হচ্ছে। নয়ন্তীকা সেদিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল।
ঘড়িতে তখন সাতটা কিংবা সাড়ে সাতটা হবে। ততক্ষণে পুরো শহর অন্ধকারের কালো চাদরে ঢাকা পড়েছে। বিশালাকৃত আকাশের বুকে উঁকি দিচ্ছে বাঁকা চাঁদ। এতেই যেন গঞ্জের ঘাটের দৃশ্য মনোরম হয়ে উঠেছে। সময়ের সাথে সাথে মানুষের আনাগোনা বেড়েই চলেছে ক্রমে। প্রেমিক-প্রেমিকা থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধবদের আড্ডা ভালোই জমেছে। আবার ঘাটের আনাচে কানাচে অনেকে একাও বসে রয়েছে। তারা সম্ভবত একাকীত্ব ভালোবাসে।
নয়ন্তীকা'র কান্না ততক্ষণে থেমে গেছে। চোখমুখ লাল করে মেয়েটা চুপচাপ বসে রয়েছে। দৃষ্টি দূরে আকাশপানে। সুন্দর চোখ দুটির পাপড়ি গুলো তখনো ভেজা, অশ্রুর দাগ গুলো গালে শুকিয়ে আছে। প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর এই অবস্থা মোটেই সহ্য হচ্ছে না রিহা'র। তবু তার কিছুই করার নেই। রিহার হাতে কিছুই নেই। যদি রিহার সাধ্য হতো— তবে সে নয়ন্তীকার দুঃখ গুলো ঘুচিয়ে দিত। কিন্তু সে নিরুপায়। নয়ন্তীকার হঠাৎ কান্নাকাটি দেখে প্রথমে হকচকিয়ে গিয়েছিল রিহা। আবার যখন শুনলো রক্তিমের জন্য কাঁদছে, তখন রিহা যেন আকাশ থেকে পড়লো।মেয়েটা যখন হাউমাউ করে কেঁদে বলছিল—রক্তিম দাশগুপ্তকে অন্য মেয়ের সাথে দেখলাম। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব, আমার কেমন কেমন লাগছে। তখন রিহার যে কী কষ্ট লাগছিল নয়ন্তীকার জন্য তা বলে বোঝানো যাবে না।
মেয়েটা নিজের অজান্তেই রক্তিমকে ভালোবেসে ফেলেছে। যদিও রিহা এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কিছুই জিজ্ঞাসা করিনি নয়ন্তীকা'কে। তবু সে মনে মনে আন্দাজ করছে মেয়েটা প্রেম রোগে আক্রান্ত। প্রেম ভালোবাসা যেমন সুন্দর তেমন ভয়াবহ বটে। যারা নিজেদের অনুভূতি বুঝে যায় চট করে, তাদের জন্য একটু হলেও ভালো। আর যারা নিজেদের অনুভূতি বুঝতে পারে না, নিজের মনের কথা বুঝতে পারে না— তাদের যে কি কষ্ট একমাত্র তারাই জানে। তাদের যে হৃদ যন্ত্রণায় কতটা দগ্ধ হতে হয় একমাত্র তারাই জানে।
“ভালোবাসিস রক্তিম দা'কে?”—রিহা নিরবতা ভেঙে নরম স্বরে সুধালো।
রিহার ইহ প্রশ্নে নয়ন্তীকা একপল চাইলো রিহার মুখ পানে। তারপর দৃষ্টি নত করে দু দিকে মাথা নাড়িয়ে ধীর গলায় বলে উঠলো—“জানি না। আমি কিছুই জানি না।”
“রক্তিম দা'র পাশে অন্য মেয়েকে সহ্য করতে না পারা কি ভালোবাসা নয়?”
“আমি তাকে কীভাবে ভালোবাসতে পারি?”— নয়ন্তীকা কাতর কন্ঠে বলে উঠলো।
“আমি যদি ভুল না হই----এই কয়েক দিন ধরে তোর এই অবস্থা, নিজেকে ঘরবন্দী করা— সব রক্তিম দা'র জন্য। তাই না??”
রিহার এই কথার পিঠে নয়ন্তীকা কিছুই বলতে পারলো না। সে নিঃশ্চুপ ভাবে মাথা নত করে নিল। চিবুক গিয়ে ঠেকলো বুকের কাছে। আর এতেই রিহা যা বোঝার বুঝে গেল। মনে মনে একটু অভিমান হল মেয়েটার প্রতি। সে কি এতটাই পর হয়ে গেছে এখন। তাকে একবার হলেও শেয়ার করা তো যেতই। তবে এইমুহুর্তে নিজের অভিমান প্রকাশ করলো না রিহা। মেয়েটার অবস্থা এমনিতেই ভালো না। তার উপর সে মেয়েটা'র সাথে আলাদা কোনো মান অভিমান চাইছে না এইমুহুর্তে। তাছাড়া, এই সময় প্রতিটা মানুষেরই বুদ্ধি লোপ পায়। তারা ঠিক ভুল বিবেচনা করতে সক্ষম হয় না। তাই তো তাদের কাউকে একটা প্রয়োজন হয়।
“তাকে কেন ভালোবাসতে পারবি না?? ভালোবাসা দোষের নাকি অন্যায় ?”
“সে আমার অপছন্দের মানুষ রিহা, তুই তো জানিস। তাকে আমি কী ভালোবাসতে পারি?? এটাও সম্ভব?”— নয়ন্তীকা দৃষ্টি নত রেখেই বললো।
নয়ন্তীকার এই কথায় রিহা হতবিহ্বল হয়ে তাকালো। বুদ্ধিমান মেয়েটার এই বোকা বোকা কথায় রিহা কিচ্ছুটি বলতে পারলো না। আচ্ছা, প্রেমে পড়লে মানুষ বুঝি বোকা হয়ে যায়। রিহার এখন বেশ মনে পড়ছে--তার রিলেশনে যেকোনো ঝামেলার সময় নয়ন্তীকা কি সুন্দর বুঝিয়ে তাকে সবটা সামলে নিত। আজ সেই মেয়ের নিজের বেলায় মাথা কাজ করছে না। অদ্ভুত!!! তবে শুধু যে নয়ন্তীকা'র এমন হচ্ছে তা কিন্তু না। আসলে মানুষ প্রেমে পড়লে বুদ্ধি লোপ পায়, এই মূহুর্তে রিহা হাতেনাতে প্রমাণ পেল। প্রেমের পোকা সব বুদ্ধি খেয়ে ফেলে বোধ হয়।
“প্রেম পছন্দ-অপছন্দ দেখে হয় নাকি।”— রিহা বিস্ময়কর কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো।
“আলবাত হয়!”---নয়ন্তীকা রিহা'র দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে উঠলো।
তবে এবারে রিহা আর কিছু বললো না। সে বুঝে গেছে এই মেয়েকে বুঝিয়ে লাভ নেই। একটা মানুষকে ততক্ষণ বোঝানো যায় যতক্ষণ সে না বোঝে। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছা করে না বুঝতে চায় -- তাকে এই জন্মে বোঝানো সম্ভব নয়। এই হাল হয়েছে নয়ন্তীকা'র ও। রিহা এবার হাল ছেড়ে দিয়েছে। সে দেখতে চায়--মেয়েটা কতদিন নিজের অনুভূতি থেকে পালাতে পারে।
হঠাৎ রিহা'র একটা ঘটনা মনে পড়লো। স্কুলে থাকাকালীন ক্লাসের অনেক মেয়েরই রিলেশন ছিল। এমনকি রিহা ও তখন মিঙ্গল,ব্যতিক্রম নয়ন্তীকা। তখন সবাই তার কাছে জানতে চাইতো, যে সে কেন প্রেম করছে না। এমন তো নয়---যে কেউ তোকে প্রেম নিবেদন করেনি। তবে কেন তুই এখনও সিঙ্গেল??--এর উওরের নয়ন্তীকা বলেছিল,,,,,
“প্রেম কোনো যুক্তি জানে না। আর না প্রেম কোনো চুক্তি মানে। বুঝলি!! প্রেম হল একটা এক্সিডেন্ট। যা হুট করে হয়ে যায় আমাদের অজান্তেই। কখন, কীভাবে, কোথায় হবে--তা আমাদের হাতে থাকে না মোটেই। আর সেই এক্সিডেন্টে আমরা বাঁচবো না মরবো তার কথাও আমাদের জানা থাকে না।”
সেই ডায়লগ দেওয়া মেয়েটাই নিজের এক্সিডেন্ট ওয়ালা প্রেম নিতে পারছে না। ভাবা যায়????
চলবে,,,,,,,