ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান আমার ভালোবেসেছে

১২তম পর্ব

লেখক: অহনিশা ব্যানার্জি

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ১২(প্রথম অংশ)

সকাল আট'টা তখন। সূর্য বিশালাকার আকাশে জ্বলজ্বল করছে। শীত পেরিয়ে গ্ৰীষ্মের আগমন হয়ে গেছে অনেক আগে। ফলে সকাল ছয়'টার মধ্যেই সুয্যি মামার দর্শন পাওয়া যায় সহজে। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং আজকে গরমের সহিত সূর্যের তেজ একটু বেশিই যেন।

প্রতিদিনের মতো আবারও কলরবে মূখরিত হয়ে উঠেছে কুল তলা। যানবাহন থেকে শুরু করে মানুষের আনাগোনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। রাস্তা-ঘাটে ট্র্যাফিকও পরিলক্ষিত। তবে থমথমে পরিবেশ রয়েছে নয়ন্তীক'দের বাড়িতে। বর্তমানে নয়ন্তীকা ডাইনিং বসে রয়েছে। সে চুপচাপ খাবার গলাধঃকরণ করতে ব্যস্ত। সামনেই নৈতিক মুখার্জি বসে আছেন। মিসেস আহানা চুপচাপ খাবার পরিবেশন করে চলেছেন।

নয়ন্তীকা একবার চোখ তুলে চাইলো নিজের মা-বাবা'র দিকে। ওমনি মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো তার। এটা নাকি তাদের সুস্থ-স্বাভাবিক বাড়ি। তবে নয়ন্তীকা'র তা মোটেই মনে হয় না। এই যে বর্তমানে, তার মনে হচ্ছে সে কোনো অফিস কিংবা প্রিন্সিপালের রুমে বসে রয়েছে। যেখানে ডিসিপ্লিন মেনটেইন করে চলতে হয় সব সময়। যেখানে মন খুলে হাসা বারণ, সাথে কাঁদাও বারণ। মা-বাবা'র সাথে একটু খুনশুটি ও করা যাবে না। হা হা!! এটা নাকি বাড়ি। তবে নয়ন্তীকা'র জেলখানার থেকে কম মনে হয় না।

“তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?”

আকস্মিক বাবার মুখে ইহ প্রশ্ন শুনে একপলক বাবার দিকে চাইলো নয়ন্তীকা। তার আর বুঝতে বাকি নেই তার বাবা খবর পেয়ে গেছে। অবশ্য জানা'টা খুব একটা কঠিনও নয়। তাই নয়ন্তীকা অবাক হলো না মোটেই। সে অনুভূতি শূন্য ভাবে খাওয়া'র মুখে পুরে বলে উঠলো —— “ভালো!!”

তৎক্ষণাৎ গর্জে উঠলেন নৈতিক মুখার্জি। নয়ন্তীকা খাওয়া ছেড়ে তাকিয়ে রইলো নীচের দিকে। নৈতিক মুখার্জি ডাইনিং টেবিলে দুহাত দিয়ে শব্দ করে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন——“ইয়ার্কি হচ্ছে??? পড়াশোনা ঠিকঠাক চললে সাপ্লি পাও কী করে?? নাকি ভেবেছো বাপের প্রচুর টাকা আছে বলে একই সেমে বসে থাকবে?”

নয়ন্তীকা তখনও চুপ করে রইলো। অপরদিকে স্বামী'র গর্জন দেখে মিসেস আহানা বিচলিত হয়ে উঠলেন মূহুর্তে। তিনি স্বামী'কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন —— “আহা নৈতিক, করছো'টা কী? এইসব কথা খাওয়ার পরে বললে হতো না?”

“না হতো না! তোমার মেয়ে উচ্ছন্নে গেছে একবারে। যার জন্য তুমিই দায়ী।”

একটু থামলেন নৈতিক মুখার্জি। তারপর নয়ন্তীকা'কে উদ্দেশ্য করে আবার বললেন—— “তোমার দ্বারা কিচ্ছুটি হবে না। বুঝলে??? তুমি বাপের হোটেলে খেয়ে শুধু বাপের টাকাই ওড়াতে পারবে। তাছাড়া আর কিছুর যোগ্যতা নেই তোমার।”

নৈতিক মুখার্জি আর এক মূহুর্তে দাঁড়ালেন না। হাত ধুয়ে দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ি থেকে তৎক্ষণাৎ। মিসেস আহানা ডেকে উঠলেন—— “নৈতিক কি শুরু করেছ তুমি?? বাচ্ছা মানুষ ও!! নৈতিক”....

নৈতিক মুখার্জি ততক্ষণে চোখের আড়াল হয়েছেন। নয়ন্তীকা ও নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ব্যস্ত পায়ে স্থান ত্যাগ করলো। তা দেখে মিসেস আহানা আবার বলে উঠলেন—— “নয়ন আমার কথা শুনে যা। নয়ন”...

নয়ন্তীকা'কে আর দেখা গেল না। মিসেস আহানা কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করে উঠলেন—— “আমার হয়েছে যত জ্বালা!!”

--------

নয়ন্তীকা উপরে গিয়েই বিছানায় গা এলিয়ে চোখ বুজলো। ওমনি চোখ হতে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো বালিশে। হ্যাঁ, তার বাবা ভুল তো কিছু বলেননি। আসলেই তার দ্বারা কিছুই হবে না। আসলেই সে বাবা'র টাকা গুলো শুধু নষ্টই করে যাচ্ছে। কলেজের এডমিশনের টাকা, টিউশনের মাইনে, নাচের মাইনে, তার যাবতীয় খরচ। সাথে এখন যোগ হয়েছে তার সাপ্লি খাওয়া সাবজেক্টে'র টাকা।

হ্যাঁ নয়ন্তীকা সেকেন্ড সেমিস্টারে সাপ্লি পেয়েছে। এটা নিয়ে একটু দুঃখ আছে নয়ন্তীকা'র মাঝে। কিন্তু তার বাবা এই ভাবে বলতে পারলো ?? তার কাছে টাকাটা বড়ো। মানুষটা একবার অন্তত জানতে চাইতো—কেন তার এইরকম রেজাল্ট হয়েছে। কেন নয়ন্তীকা ভালো নেই। কেন ???

হ্যাঁ, নয়ন্তীকা ভালো নেই। একটুও ভালো নেই। দায়ভার'টা কী অপ্রিয় রক্তিম দাশগুপ্তের উপর চাপানো যায়??? চাপানো না গেলেও, নয়ন্তীকা তাকেই দোষী মানে। হ্যাঁ, নয়ন্তীকা তার প্রতিবেশী,অপ্রিয়, শএুকে ভালোবাসে। যেমন তেমন ভালোবাসা নয়, পাগল হয়ে যাওয়ার মতো। এইটা জানার সত্ত্বেও যে রক্তিম কখনোই তার হবে না। রক্তিমের মনে অন্য কেউ আছে তা জানে সে। তার বাড়ির লোক কখনোই নয়ন্তীকা'র ভালোবাসা মেনে নেবে না তাও জানে সে। তবু সে নিরুপায়। কিছুতেই ওই অপ্রিয় শএুকে ভোলানো যাচ্ছে না। বরং দিনে দিনে ভালোবাসা'টা আরও বাড়ছে। এই তো সেদিন রক্তিম'কে অন্য কারো'র সাথে দেখলো গঞ্জের ঘাটের কাছে। সেই ঘটনার প্রায় তিনমাস পেরিয়েছে। তবু কি নয়ন্তীকা ভুলতে পেরেছে তাকে?? আদেও কখনো ভুলতে পারবে তাকে??

অবশ্য নয়ন্তীকা তাকে ভোলার চেষ্টা করে না।সময় পেলেই সে তাকে দেখার একটাও সুযোগ ছাড়ে না। তবে এই প্রেম নয়ন্তীকা'র জীবনে আশির্বাদ নয় অভিশাপ হয়ে এসেছে। প্রথম উদাহরণ'টা তার পড়াশোনা। যদিও পুরোপুরি ডোবেনি, তবে ডুবতে কতখন???

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ১২(দ্বিতীয় অংশ)

রাত তখন ন'টা, কুল তলায় হইচই পড়ে গেছে ইতিমধ্যে। দাশগুপ্ত বাড়ির গিন্নি মিসেস রেবা'র সাথে একই পাড়ার হালদার বাড়ির মহিলা'র তুমুল ঝগড়া লেগেছে। শুধু যে হালদার বাড়ির ভদ্রমহিলা'র সাথে ঝগড়া হচ্ছে তা কিন্তু নয়। ভদ্রমহিলার স্বামীও উপস্থিত রয়েছেন। দুই বড়-বউ মিলে দাশগুপ্ত বাড়ির নীচে চিৎকার চেঁচামেচি করছেন।

গ্ৰীষ্মের রাত, পাড়ায় মোটামুটি ভিড় রয়েছেই তখন। কুল তলা ক্লাবের সামনে থেকে শুরু করে চায়ের দোকানে লোকজনের আড্ডা। পাড়ার গলি থেকে শুরু করে মাঠে বাচ্ছা'রা কক-ব্যাট খেলতে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ হালদার বাড়ির দম্পতিরা রক্তিমের বাড়ির সামনে চিৎকার করা শুরু করে। ওমনি মূহুর্তে'র মধ্যে লোকজন জড়ো হয়ে যায়।

হালদার বাড়ির কর্তার পায়েরা'র খুব সখ। তার ছাদ জুড়ে কালো-সাদা পায়রা'র বসবাস। বেশ কয়েক দিন ধরে তিনি লক্ষ্য করছিলেন একটা করে পায়রা কমে যাচ্ছে। ভদ্রলোক সকালে কাজে যাওয়ার আগে পায়রা'দের ছাড়েন , তারপর কাজ থেকে এসে তাদের খাঁচায় বন্ধ করেন। তাদের খাওয়ার সমস্যা হয় না, ছাদেই দানা ও জলের ব্যবস্থা আছে। তো এই কয়েকদিন যাবত দেখছিলেন একটা করে পায়রা কমে যাচ্ছে। সকালে ঠিকই ছেড়ে যেতেন, কিন্তু বন্ধ করার বেলায় দেখতেন একটা করে কম আসছে। ভদ্রলোক ভাবতেন পায়রা গুলো হয়তো পথ ভুলে হারিয়ে গেছে। পরের দিন হয়তো ঠিকই ফিরে আসবে, এই করে বেশ কয়েক দিন কাটছিল। তবে, কথায় আছে না—— দশদিনের চোর একদিন ধরা পড়ে। তো আজকেই তিনি পায়ড়া চোর'কে হাতে-নাতে ধরেন। আজকেই বিকেলে তিনি পায়রা'দের বন্ধ করতে গিয়ে দেখেন পাড়ার অতি পরিচিত ও বিচ্ছু বিড়াল তার লালু'কে মুখে করে নিয়ে পালাচ্ছে। তিনি তৎক্ষণাৎ বিল্লু'র পিছন করেন। শেয়ানা বিড়াল নিজের পাড়া ছেড়ে পাশের পাড়া পর্যন্ত দৌড় করিয়েছে তাকে। শেষ পর্যন্ত ওই বিড়াল'কে তিনি ধরতে পারেননি। দুঃখে-কষ্টে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। অবশ্য ঠিক করেন নালিশ করবেন অন্তত। পরে তিনি জানতে পারলেন তার ভুলু'কেও পাওয়া যাচ্ছে না। ভদ্রলোক একেবারে ভেঙে পড়লেন দুঃখে। লালু-ভুলু ওনার প্রথম বাচ্ছা, এই বাড়িতে ওরাই প্রথম এসেছিল। ভেবেই রাগে দুঃখে দুই বড়-বউ বেরিয়ে পড়লেন কোমর বেঁধে। আজ এর একটা বিহিত করতেই হবে।

“শুনুন!! আপনার খচ্চর বিড়াল'কে এই পাড়া থেকে বহিঃস্কার করা হোক। এত অত্যাচার আমরা সহ্য করতে পারবো না। পাড়ায় নয় এই বিড়াল থাকবে আর নয় আমরা।”—— ভদ্রলোক জোরে বলে উঠলেন। সাথে ওনার স্ত্রী ও তালে তাল মেলালেন।

“দেখুন যা ভালো বোঝেন তাই করুন। আপনাদের ভালো লাগলে আপনি পাড়া ছাড়তেই পারেন আমরা বলার কে?”—— মিসেস রেবা শান্ত গলায় বলে উঠলেন। পাশেই দাঁড়ানো রূপক মায়ের কথায় ফিক করে হেসে ফেললো। তার এই এক স্বভাব আছে, কোনো কিছুই তে কন্ট্রোল নেই।

অপরদিকে মিসেস রেবা'র হেয়ালি পূর্ণ কথায় খ্যাঁক করে উঠলেন ভদ্রলোক। তিনি রেগে চিৎকার করে উঠলেন——“হ্যাঁ, ইয়ার্কি হচ্ছে??? আমাকে পাগল মনে হয় আপনার? না আমি ভাট বকছি?? জানেন, আপনার আদরের বিড়াল আমার পাঁচটা পায়রা গাপ করে দিয়েছে, তার মধ্যে আমার লালু-ভুলু ও ছিল।”

“দেখুন দাদা, আমি আপনার লুলু-ভুলু কে”....

“লালু-ভুলু।”—— ভদ্রমহিলা আবার মিসেস রেবা'র কথা সুধরে দিয়ে বললেন।

রূপক আবার ঠোঁট চেপে হাসলো। এরা ঝগড়া করছে নাকি কমিডি বোঝা দায়। তার দাদাভাই আর বাবা বাড়ি নেই বিধায় এত ড্রামা। তবে এক দিক দিয়ে ভালোই হল তার দাদাভাই নেই। ফ্রিতে ভালোই বিনোদন পাচ্ছে। ভেবেই রূপক মনে মনে আবার হাসলো।

“ওই একই হলো। তো, ওই বিড়ালের ব্যাপারে আমার ছেলের সাথে কথা বলবেন । আমি ওইসব কিছু জানি না।”

মিসেস রেবা'র কথায় ভদ্রলোক কিছু বলবেন তার আগেই একটা প্রাইভেট কার এসে দাঁড়ালো দোরগোড়ায়। দরজা খুলে নেমে এল ক্লান্ত রক্তিম সাথে অনিমেষ দাশগুপ্ত। ততক্ষণে গেটের কাছ থেকে পাড়ার লোকজন'কে বিদায় করা হয়েছে। রক্তিম আলগোছে মায়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল ভিতরে, আর অনিমেষ দাশগুপ্ত ভদ্রলোকের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মূহুর্তের মধ্যে কুল তলা'র কলোরব থেমে গেল।

--------

“মা তোমার কী আক্কেল জ্ঞান নেই বলোতো? এই ভাবে কেউ ঝগড়া করে?”

“হ্যাঁ! এখন যত দোষ তো আমার। আমিই তো পাড়ায় ঘুরে ঘুরে সবার বাড়ি গিয়ে ঝগড়া করে আসি। তাই না?”—— মিসেস রেবা রান্না ঘরের বাসনপত্র আওয়াজ করতে করতে বলে উঠলেন।

“মা আমি ওটা বলিনি। তুমি আমাদের রাগ বাসনের উপর দেখাচ্ছো কেন?”—— বলেই রক্তিম মায়ের হাত ধরে বসার ঘরে নিয়ে এল।

“তো তুই বলতে কী চাইছিস?? আমি ঝগড়া শুরু করেছি?”

“না মা!! এই ভাবে ঝগড়া করা ভালো দেখায়?? তুমিই বলো।”

“আহা হা ! বাড়ির কুকুর-বিড়াল আর ওই ছাগল'টা যা করবে ওমনি লোকজন আমার সাথে ঝগড়া করবে। তারা যা না তাই বলে যাবে , আমি চুপচাপ শুনবো?”

এতক্ষণ রূপক কোল্ডড্রিংকসের সাথে বেশ ঝগড়া উপভোগ করছিল। যেই না মিসেস রেবা তাকে ছাগল সম্বোধন করলেন, ওমনি সে একটু নড়েচড়ে বসলো। আসলে মা যখনই রেগে থাকে, শেষমেষ রাগটা তার উপরই পরে। তাই রূপক চুপচাপ কেটে পড়লো। যেতে যেতে তার মায়ের একটা কথা কানে এল——“ওই বিড়াল'কে হাতের কাছে পাই একবার। তার একদিন কি আমার একদিন!”

---------

ঝগড়া শেষ হতে না হতেই নয়ন্তীকা হাই তুলতে তুলতে ঘরে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। পাশেই তার রক্তিমের আদরের কাজু ঘুমিয়ে। বড্ড সুখের ঘুম যাকে বলে। যার জন্য এত কোন্দল হল, সে নিশ্চিত ঝগড়া লাগিয়ে ঘুমাচ্ছে। বাহ!!! ব্যাটা বোধ হয় জানে ও বাড়িতে ক্যালানি আছে কপালে। তাই আগে ভাগেই কেটে পড়েছে। নাহলে রক্তিমের সব থেকে বড়ো পঙ্ক্ষা তাকে ছেড়ে এখানে কেন?? ভাববার বিষয় নয় কী ?? তবে নয়ন্তীকা ভাবিনি। বিচ্ছু টা বিকেলবেলা যখন বেলকনি টপকে এল নয়ন্তীকা আর বকাবকি করিনি। অনেকদিন পর এল বিধায়। কিন্তু কে জানতো বিচ্ছু'টা কান্ড ঘটিয়ে এখানে গা ঢাকা দিতে এসেছে।

“ও কাকিমা!!! পাড়ার বড়ো কাকিমা গো!!! কাকিমা”....

আকস্মিক রূপকের উদ্ভট ডাক শুনে উঠে বসলো নয়ন্তীকা। এই রাত দুপুরে ছোটা প্যাকেট'টা কোন জন্মের কাকিমা'কে ডাকছে?? নয়ন্তীকা'র জানা মতে তার তো কোনো কাকি মা নেই। যাইহোক, তার কী?? যাকে খুশি ডাকুক—— ভেবেই নয়ন্তীকা আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল। ওমনি বেলকনি থেকে একটা ইটের টুকরো ঘরের মেঝেতে এসে পড়লো। সাথে আবার রূপকের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল,,,,,

“ও অতি ভদ্র কাকিমা!! কাকিমা গো”....

নয়ন্তীকা এবার বসে থাকতে পারলো না, সে বেলকনিতে গেল। ওমনি দেখা হল সামনের বাড়ির ল্যাজ ছাড়া বাঁদরের সাথে। তার বেলকনির সামনের বেলকনিটাই রক্তিমের, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে রূপক। তাকে দেখা মাএই নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো—— “আহ্!! আপনার দর্শন পেয়ে ধন্য হলাম আমি। আপনার চরণ যদি একটু এগিয়ে দিতেন, পেরণাম করতাম শ্রদ্ধেয় কাকিমাআআ.....!!”

নয়ন্তীকা মনে মনে চোখ-মুখ বেঁকালো। রাত-দুপুরেও এই অসভ্য'টার শান্তি নেই। এক ভাই তো তার জীবন ত্যানা ত্যানা করেই দিয়েছে। অপর ভাই বোধ হয় শান্তিতে ঘুমাতেও দেবে না। নয়ন্তীকা মনের রাগকে মনেই রেখে রূপকের মতো নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো—— "শ্রদ্ধেয় খচ্চর দাদু!! আপনার যদি এতই আমার চরণের ধুলো নিতে ইচ্ছে হইতেছে, দয়া করিয়া আমার বাড়ি আসিয়া লইয়া যান।”

“আমার বয়ে গেছে।”

“তোর যদি বয়েই গেছে তো রাতদুপুরে এত ঘটা করে ডাকা কেন??”

“কাজু তোর বাড়িতে?”

“তোর ?? আমি তোর পাড়াতো বান্ধবী?”

“কাজু কী আপনার বাড়িতে?”

ওহ এবার বুঝলো ঘটনা। এই লেজ ছাড়া বাঁদর আর একটা লেজ ওয়ালা বাঁদরকে খুঁজছে‌। নয়ন্তীকা হাসলো একপাশে। তারপর দুহাত বুকে গুজে রেলিং ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ ভাব নিয়ে বললো——“কে কাজু?”

“দেখ মঞ্জ..আ নয়ন, কাজুকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমি যতদূর জানি ও আমাদের ছাড়া তোদের বাড়ি যায়”..

“তুই ভুল জানিস। তোর কাজু-কিশমিশ পুরো পাড়া চোষে বেড়ায়!”

“দেখ নয়ন, আমি ঝগড়া করতে চাইছি না। মা রেগে আছে, কাজুকে তাড়িয়ে দিলে তোর কাছে রাখিস একটু।”

“এ্যাহ!!! মামার বাড়ির আবদার। যা ভাগ, আমি রাখতে পারবো না। এলেই ঝাঁটা নিয়ে বিদায় করবো।—— বলেই নয়ন্তীকা রুমের দিকে হাঁটা দিল। আর রূপক কটমট করে চেয়ে রইলো নয়ন্তীকা'র যাওয়ার পানে।

---------

নয়ন্তীকা রুমে এসেছে অনেকক্ষন হলো, বিছানায় গড়াগড়ি করেও ঘুম ধরা দিচ্ছে না চোখে। পাশেই কাজু তখন মরার মতো ঘুমাচ্ছে।

এই তিন মাসে নয়ন্তীকা “দেবদাসের” ফিমেল ভার্সন হয়ে গেছে বলাই চলে। আর কিছুদিন পর হয়তো “তেরে নাম” মুভির সালমান খান হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে। ওই দিন বোধ হয় বেশি দূরে নেই। এখন তার একটা অভ্যাস হয়েছে, যতক্ষন না সে কবির সিং আর ওই গানটা —— “লুট গয়ে!! হাঁ লুট গায়ে হাম তেরি মোহবাত মেইন!” না শুনলে ঘুম আসছে না।

এই সব প্রেম ভালোবাসা মোটেই ভালো নয়, নয়ন্তীকা যা বুঝলো। প্রেম-ভালোবাসা মৃত্যুর আর একটা রূপ। এই যেমন নয়ন্তীকা'র পড়াশোনা গেছে সাথে তার মাথা'টা ও গেছে। আর কিছু মাস পর ডিপ্রেশনে মৃত্যু নিশ্চিত।

নয়ন্তীকা কখনোই ভাবিনি সে রক্তিমের প্রেমে পড়বে। তবে সে একবারেই মানুষটা'কে ভালোবাসিনি। ধীরে ধীরে প্রেম তারপর ভালোবাসা, আর যখন সে জানলো তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।

গঞ্জের ঘাটে নয়ন্তীকা যখন রক্তিম'কে অন্য কারো'র সাথে দেখলো। তখনও সে নিজের অনুভূতি সম্পর্কে জানতো না। তারপর সে রক্তিমের কথা ভাবতে লাগলো আনমনে। তারপরই তার পরীক্ষা শুরু হল, খুব একটা ভালো পরীক্ষা দিতে পারলো না নয়ন্তীকা। তখন মনে সারাক্ষণ চলতো তার অপ্রিয় রক্তিম দাশগুপ্ত অন্য কারোর। তা রক্তিম নিজেই স্বীকার করেছিল।

লাস্ট পরীক্ষার দিনের ঘটনা; সেই দিন তার পরীক্ষা তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু এম.সি.কিউ কোয়েশ্চেন ছিল, তার উপর চল্লিশ মার্কসের। তাই অতো ঝামেলা হয়নি। নয়ন্তীকা'র মন মেজাজ ভালো না থাকায় সে বাড়ি যাওয়ারই সিধান্ত নেয়। কিন্তু কলেজ থেকে বেরোনোর আগেই তার বন্ধু পামেলা'র সাথে দেখা হয়ে যায়। সে নাকি তার লং ডিসটেন্স বয়েফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে যাবে। তাই পামেলা অনেক জোড়াজুড়ি করতে লাগলো তাকেও যাওয়ার জন্য। নয়ন্তীকা'র রিহা বাদে কলেজের পামেলাই ভালো বন্ধু, তাই ওকে না করতে পারলো না নয়ন্তীকা। তবে বাবা'র চিন্তা'টাও প্রকাশ করলো সে। পামেলা তাকে আশ্বস্ত করলো যে কোনো ঝামেলা হবে না, যাবো আর আসবো!!

নয়ন্তীকাও বন্ধুর কথা রাখতে সাথে গেল। ট্রেনের রাস্তা, নয়ন্তীকা পামেলা'র কথা শোনার চক্করে স্টেশন খেয়ালই করলো না। হাস্যকর মনে হলেও, এটা সত্যি নয়ন্তীকা ট্রেনে একা যাওয়া-আসা করতে পারে না। যেহেতু তার বাড়ি থেকে কোথাও বেড়োনো হয় না। অবশ্য ফোন থাকলে সে পারে আসা যাওয়া করতে। দুর্ভাগ্যবশত সেই দিন বেখেয়ালিতে নয়ন্তীকা ফোন বাড়িতে রেখে এসেছিল।

তারা অবশেষে ** স্টেশনে পৌঁছালো, নয়ন্তীকা'র একেবারে অচেনা জায়গা। পামেলা'র দেখা হল তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে। অবশ্য নয়ন্তীকা কথা বলিনি, সে এক্সোভার্ট হলেও যার তার সাথে কথা বলে না। তো নয়ন্তীকা তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখেই চলছিল, প্রাইভেসি বলেও তো একটা কথা আছে। তা নয়ন্তীকা বেশ বোঝে। এর মধ্যেই পামেলা তার দিকে এগিয়ে এল, এবং সে তাকে ** এই স্টেশনে বসতে বললো। সে জানালো কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আসছে।

পামেলা চলে গেল। নয়ন্তীকা জানে সে কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে আসবে। তারপর বেশ সময় গড়ালো, স্টেশনের ঘড়ি অনুযায়ী পাঁচ ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। অথচ পামেলা তখনো আসেনি। তখন নয়ন্তীকা'র ভয় বাড়লো। সে বসে নিরবে অশ্র বিসর্জন দিতে লাগলো। মানুষ, বিশেষ করে বন্ধুরাও যে স্বার্থপর হয় তা জানা ছিল না নয়ন্তীকা'র। সেই মুহূর্তে নয়ন্তীকা'র তার বাবার কথা মনে পড়লো, যদি কোনো ভাবে এই ঘটনা জানতে পারে। তাহলে বাড়িতে তার বোধহয় আজকেই শেষ দিন। তার উপর, নয়ন্তীকার কাছে ফোন নেই। সে বর্তমানের জায়গাটা চেনে না, কীভাবে বাড়ি যাবে তাও জানা নেই। নয়ন্তীকা'র কান্নার বেগ বাড়লো। তার বুদ্ধি গুলো ও লোপ পেল সেই সময়। কাউকে জিজ্ঞাসা করা কিংবা পুলিশকে জানানোর কথা মাথাতেই আসিনি। নয়ন্তীকা যখন মন-প্রাণ দিয়ে কাঁদতে ব্যস্ত। সেই মূহূর্তে কেউ তার পাশে বসলো ধপ করে। তবে নয়ন্তীকা'র সেই দিকে খেয়ালই নেই।

“নৈতিক মুখার্জি জানে যে তার মেয়ে কলেজের নাম করে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়?”

চলবে,,,,,,

( রিচেক করা হয়নি, ভুল-এুটি ক্ষমা'র চোখে দেখবেন। ধন্যবাদ 💜।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন