ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান আমার ভালোবেসেছে

১৩তম পর্ব

লেখক: অহনিশা ব্যানার্জি

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ১৩(প্রথম অংশ)

“নৈতিক মুখার্জি জানে যে তার মেয়ে কলেজের নাম করে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়?”

হঠাৎ অতি পরিচিত মানুষ'টার কথা শুনে তড়িৎ বেগে চাইলো নয়ন্তীকা। রক্তিম তার পাশে বসে তারই দিকে তাকাতে দেখে সে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার প্রশস্ত বুকে। দুহাতে প্যাঁচিয়ে ধরলো রক্তিমের কোমোর। হু হু করে কেঁদে উঠলো নয়ন্তীকা। জীবনে প্রথম বারের মতো তার অপ্রিয় শএুর বুকে কেঁদে গড়াগড়ি খেল সে। রক্তিম বরাবরের মতোই শান্ত। না সে নয়ন্তীকা'কে ধরলো আর না সে তাকে নিজের থেকে দূরে সরালো। শুধু তাকিয়ে দেখলো বোকা প্রতিবেশী মেয়েটা'কে।

সময় পাঁচ দশমিনিট বোধহয় গড়ালো। যখন নয়ন্তীকার বোধগম্য হলো তার অবস্থান সম্পর্কে, সে ছিটকে দূরে গিয়ে বসলো। সেই মুহূর্তে নয়ন্তীকা বাকি চিন্তা ভাবনা ভুলে লজ্জায় ডুবে গেল। চোখ তুলে রক্তিমের পানে তাকাতে পর্যন্ত পারলো না। রাগে-দুঃখে আবার ফুঁপিয়ে উঠলো নয়ন্তীকা। তার দিনটাই খারাপ। নাহ!! তার কপাল'টাই খারাপ। তা নাহলে একের পর এক অঘটন তার সাথেই কেন ঘটছে??

নয়ন্তীকা নীচের দিকে দৃষ্টি রেখেই অশ্রু বিসর্জন দিতে। লাগলো। অপরদিকে, রক্তিম এতক্ষণ শান্ত চোখে নয়ন্তীকা'র দিকেই তাকিয়ে ছিল। নয়ন্তীকা'কে কান্নাকাটি করতে দেখে শান্ত অথচ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো—— “তুমি এখানে কী করছো?”

রক্তিমের ইহ প্রশ্নের উত্তর দিলো না নয়ন্তীকা। বরং সে না শোনার ভান করে চুপচাপ নীচের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বসে রইলো। অপরদিকে রক্তিমের চোয়াল শক্ত হলো রাগে। মেয়েটা ভাঙবে তবু মচকাবে না। নয়ন্তীকা'র ত্যাড়ামি দেখে রক্তিম ও ত্যাড়া গলায় বললো——“নৈতিক মুখার্জি'কে একটা ফোন দেবো নাকি?? বলবো নাকি যে, তার মেয়ে কোথায় টোটো কম্পানির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে?”

বাবা'র নাম শুনে নয়ন্তীকা তড়িৎ বেগে চাইলো রক্তিমের পানে। চোখে তার তখনো ভাদ্রমাসের বৃষ্টি। সে রক্তিমের পানে চেয়ে ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো—— “বাবা জানলে আমার বাড়ি দিয়ে বেরোনো বন্ধ করে দেবে। আর বাড়িতে খুব অশান্তি ও করবে।”

রক্তিম শীতল চোখে তাকিয়ে রইলো নয়ন্তীকার মুখশ্রীর দিকে। এই মেয়েটাই সুযোগ পেলে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শোনায় তাকে। আর এখন ভীতুর ডিম সেজে বসে আছে। রক্তিম বিড়বিড় করে বলে উঠলো—— “ডাফার একটা।”

“আচ্ছা কাউকে বলছি না। তোহ তুমি এখানে কীভাবে?”

“পামেলা'র সাথে এসেছিলাম।”—নয়ন্তীকা মিনমিন করে বললো।

“কে পামেলা?”

“আমার ডিপার্টমেন্টের বান্ধবী। ও বলেছিল বেশিক্ষণ লাগবে না। কিন্তু ও এখনও আসিনি।”

নয়ন্তীকা বলতে বলতে চোখ মুছলো। রক্তিম নয়ন্তীকার পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো—— “অতি চালাক বাপের বোকা মেয়ে।”

“বাপের থেকে একটু বুদ্ধি ধার নিলেই পারো।”

রক্তিমের ফিসফিসানি কথা শুনতে পেল না নয়ন্তীকা। তাই সে রক্তিমের পানে চেয়ে জিজ্ঞাসা করে উঠলো——“হ্যাঁ?”

“কিছু না। তুমি বসো, আমি দেখি ট্রেন কটায় আছে। বাড়ি তো যেতে হবে নাকি...।”

বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে নয়ন্তীকার ভালো লাগলো। আবার পর মুহূর্তে গঞ্জের ঘাটের কথা মনে পড়লো। রক্তিম আর সেই মেয়েটির হাসাহাসি'র দৃশ্য মনে পড়ে গেল। ওমনি নয়ন্তীকা বেঁকে বসলো। সে তৎক্ষণাৎ দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলো—— “আমি যাব না আপনার সাথে!”

রক্তিম ফোনে থাকা ট্রেনের এ্যাপে ট্রেনের টাইম দেখছিল। আকস্মিক নয়ন্তীকার ত্যাড়া কথা শুনে সে মুখ তুলে চাইলো নয়ন্তীকার পানে। তারপর সে ফোন

পকেটে পুরতে পুরতে বলে উঠলো —— “নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। যাইহোক, আমি এই মূহুর্তে ভীষন ক্লান্ত। তোমার সাথে অযথা বকবক করতে পারছি না। তুমি আমার সাথে চুপচাপ বাড়ি ফিরলে ভালো। নতুবা তোমার বাপ'কে জানাতে আমি বাধ্য হবো। প্রতিবেশী হিসাবে আমার তো একটা দায়িত্ব আছে। তাই না?”

রক্তিমের কথা গুলো শুনে রাগে জ্বলে উঠলো নয়ন্তীকা। তবে, রক্তিম ক্লান্ত আছে শুনে মিহিয়ে গেল সে। রক্তিমের পানে সে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো রক্তিমের পানে, তার পরনে ট্রাউজার-জার্সি। কাঁধে স্পোর্টস ব্যাগ, সম্ভবত তার কোথাও ম্যাচ ছিল। নয়ন্তীকা তাই আন্দাজ করে নিল। তারপর সে এও ভাবলো যে, তার বাবা ব্যাপারটা জানলে ভালো হবে না। তাই সে রক্তিমের সাথে যাওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেল।

তার কিছুক্ষণ পরেই ট্রেন এল। তারা দুজনেই জেনারেল কম্পার্টমেন্টে উঠলো, যেহেতু নয়ন্তীকা একা ট্রেনে যাতায়াত পারে না। তো সেইদিন ট্রেনে ভালোই ভিড়, কোথাও বসার জায়গা নেই। তাই নয়ন্তীকা আর রক্তিম দরজার কাছে দাঁড়ালো। সেখান থেকে নয়ন্তীকা'র প্রেম ভালোবাসা'টা আরও প্রখর হলো। যেহেতু ট্রেনে ভিড়, একটু ধাক্কা-ধুক্বি লাগছিল আশপাশ হতে। তা দেখে রক্তিম তাকে আগলে নিল। তখন নয়ন্তীকার চোখে একেরপর এক দৃশ্য ভেসে উঠলো। রক্তিম এতদিন যাই বলুক না কেন, দিনশেষে সে তাকে আগলেই রেখেছে। নয়ন্তীকা ভাসা ভাসা চোখে চেয়ে রইলো রক্তিমের পানে। ট্রেনের হাওয়ায় তার চুল গুলো উড়ছে। মানুষটা ফোনে তান ব্যস্ত। নয়ন্তীকা আবেগে ভেসে গেল, সে আবেগের বশে বলে উঠলো —— “সেই দিন গঞ্জের ঘাটে আপনার সাথে মেয়েটি কে ছিল?”

“কোন দিন?”— রক্তিম ফোনে দৃষ্টি রেখেই বললো।

“আগের শুক্রবার, বিকেল ছ'টা-সাড়ে ছ'টা নাগাদ। গঞ্জের ঘাটে। মনে পড়লো কিছু?”

রক্তিম ফোন থেকে মাথা তুলে চাইলো নয়ন্তীকার মুখ পানে। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো—— তুমি পেছন করছিলে আমার??? তাছাড়া, তোমাকে বলবো কেন?

“আমি জিজ্ঞাসা করেছি তাই!”—— নয়ন্তীকা'র গলায় অধিকারবোধ স্পষ্ট।

রক্তিম পর পর চোখ ফিরিয়ে নিল। তারপর ফোন টিপতে টিপতে শান্ত গলায় বলে উঠলো —— “বন্ধু।”

রক্তিমের বন্ধু বলার সত্ত্বেও অন্য সেইদিনের তাদের একসাথের দৃশ্য ভেসে উঠলো নয়ন্তীকার মানসপটে। ওমনি মেয়েটা'র বুক কেঁপে উঠলো তৎক্ষণাৎ। সে দুর্বল গলায় সুধালো—— “কাছের বন্ধু?”

“উহু!! খুব প্রিয় বন্ধু।”—— রক্তিম ফোনে ব্যস্ত থেকেই বললো।

অপরদিকে, রক্তিমের ইহ উওর শুনে মলিন হাসলো নয়ন্তীকা। যা বোঝার সে বুঝে গেল রক্তিমের স্বীকারোক্তি শুনে। সে কষ্ট পেল ঠিকই, তবে এখানে তারই বা কী করা'র আছে। কাউকে তো আর জোর করা যায় না নিজেকে বেছে নিতে। নয়ন্তীকাও জোর করতে পারে না। তাছাড়া— “ভালোবাসা ভালো থাকলে, নিজেও ভালো থাকা যায়!!”

তারপর?? তারপর থেকে কেটেছে এক একটা যুগ সম দিন-মাস। নয়ন্তীকা শুধু মনে মনে ভালোবেসেই গেছে। আর বোধহয় ভালোবেসেই যাবে। ভেবেই নয়ন্তীকা'র চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। পর পর সে চোখ বুজে নিল। এইসব চিন্তা ভাবনা তার রোজের।

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ১৩(দ্বিতীয় অংশ)

রাত তখন সাড়ে এগারোটা প্রায়। রক্তিম বেলকনির রেলিং এ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাশেই টুইটার বসে তাকেই দেখছে। রক্তিম টুইটারের দিকে চেয়ে হাসলো সামান্য। আজকে টুইটারের মন খারাপ। অবশ্য কাজু'র জন্য। আজকে সে বাড়ি ফেরেনি। এই নিয়ে টুইটার একেবারেই শান্ত হয়ে গেছে। দুজনে একসাথে থাকলে হুড়োহুড়ি করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রাখে। আজ কাজু না থাকায় বেচারা টুইটার দুঃখে বদমাইশি করতে ভুলে গেছে।

শুধুমাত্র যে টুইটার দুঃখ পেয়েছে তা কিন্তু নয়। সে ব্যতীত এই বাড়ির সবাই দুঃখ পেয়েছে। রক্তিমের মা-বাবা আর রূপক তো মারাত্মক চিন্তায় আছে। তার মা মিসেস রেবেকা বেশ কয়েকবার খবর নিয়ে গেছেন। তিনি উপরে যতই রাগ দেখাক না কেন, তবে তিনি নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসেন কাজু'কে। প্রয়োজনে শাসনও করেন আবার দু-চার ঘা ও দিতে ভুলেন না। আবার, তার বাবা অনিমেষ দাশগুপ্ত এই মধ্য রাতে কাজুকে খুঁজতে বেরিয়েছেন পাড়ায়। যদি কারোর ছাদে বা বাড়ির উঠানে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় সেই আশায়। অপরদিকে, রূপকও তার কাছে এসেছিল কাজু'র ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশ করতে। সাথে নয়ন্তীকার নামে অভিযোগ করে গেছে একগাদা। ছেলেটা ঠোঁট ফুলিয়ে বলেছে তার কাছে—— “তুমি ওই নয়ন'কে একটু বকে দিও দাদাভাই। আমি শুধু বলেছি কাজু'কে আজকের জন্য তার বাড়িতে রাখতে। সে কী বলেছে জানো?”

ছেলেটার মুখে প্রকাশ পাচ্ছে তখন নয়ন্তীকার ব্যাপারে অভিযোগ জানানো'র অতিরিক্ত তাড়া। রক্তিম ও ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কৌতুহলের ভান ধরে জিজ্ঞাসা করলো——“ কী”

“কাজু ওর বাড়ি গেলে নাকি সে ঝাঁটা মেরে বিদায় করবে। ভাবো একবার কী পাষাণ আর বদ মেয়ে!”

ভাইয়ের কথায় ঠোঁট কামড়ে হাসলো রক্তিম। দুটো'তে শুধু পারে না চুলোচুলি করতে এই যা। নাহলে তাদের কিছু না কিছু নিয়ে লেগেই থাকে সবসময়।

রক্তিম ভাইয়ের কথায় ভাইয়ের চুল এলোমেলো করে ঘুমাতে পাঠায়। এবং এও জানায় তাদের প্রতিবেশীর পাষানী আর বদ মেয়েটাকে সে খুব করে বকে দেবে। এই কথা শোনা মাএই রূপক খুশির সহিত বিদায় নিয়েছে। যা দেখে রক্তিমের আর এক দফা হাসা হয়ে গেছে। দুজনে একে অপরকে মাইনকার চিপায় দেখতে খুব পছন্দ করে।

-----

রক্তিমের কাজু'কে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে না মোটেই। নিশ্চয়ই নয়ন্তীকার বাড়িতে আছে সে। তা শতভাগ নিশ্চিত রক্তিম। কেননা তার কাজু আর তার প্রতিবেশী মেয়েটা'কে বেশ চেনা আছে রক্তিমের। ভেবেই রক্তিম সামান্য ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। তারপর চোখ তুলে তাকালো অন্ধকার বারান্দার দিকে। অন্ধকার বেলকনি,ঘরের দরজার পর্দা থেকে থেকে উড়ছে। যা দেখে রক্তিম বুঝলো মেয়েটা ঘুমের রাজ্যে এখন।

ইদানিং নয়ন্তীকার আচার আচরণ বেশ ভাবায় রক্তিম'কে। কথায় কথায় ঝগড়া করা মেয়েটা হুট করেই শান্ত হয়ে গেছে কেমন। তাকে খোঁচা দিয়ে কথা বললেও সে আর পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করে না। শুধু চুপচাপ চেয়ে থাকে তার পানে, রক্তিম তাকালেই এদিকে সেদিক তাকাতে লাগে। যেন সে রক্তিম'কে দেখছিলই না। সত্যি বলতে মেয়েটা'র বোকামো মিস করে রক্তিম। তবে মেয়েটা'র হুট করে কী হল জানে না সে। রক্তিম আনমনে এইসব ভাবতে ভাবতেই নীচের দিকে তাকালো। ওমনি রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এল তার। সে শান্ত চোখে একভাবে চেয়েই রইলো।

আজ বহুদিন পর নৈতিক মুখার্জি ও অনিমেষ দাশগুপ্ত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাশাপাশি বাড়ি থাকার পরেও এটা তাদের বহুদিন পর দেখা। অনিমেষ দাশগুপ্ত কাজু'র খোঁজ করে ফিরলেন মাএ, পাশ হতে গেট খোলার শব্দে দেখলেন নৈতিক। সে হয়তো কাজ থেকে ফিরছে মাএ। দুজনেই কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে চেয়ে রইলেন। একজনের চোখে বন্ধুত্ব হারানোর বেদনা আর একজনের চোখে শুধু'ই হিংসা। অনিমেষ দাশগুপ্ত মুখ ফিরিয়ে নিলেন। দ্রুত হাঁটা ধরলেন বাড়ির দিকে, আর ভুল করেও পিছনে ফিরে চাইলেন না। রক্তিম উপর থেকে সবই দেখলো। ততক্ষণে নৈতিক মুখার্জি প্রস্থান করেছে সেখান হতে। তা দেখে রক্তিম বিড়বিড় করে বলে উঠলো—— “পাপ বাপ'কেও ছাড়ে না! শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।”

-------

ঘরে ফেরা মাএই অনিমেষ দাশগুপ্ত বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন। স্ত্রী রেবা খাওয়ার জন্য ডেকে গেছেন কয়েক বার, তিনি সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন যে তিনি কিছুক্ষণ একা থাকতে চান। মিসেস রেবা ও আর কথা বাড়ালেন না। এতবছরের বিবাহিত জীবনে এটা নতুন কিছু নয়। অনিমেষ দাশগুপ্ত কিছু নিয়ে চিন্তিত বা দুঃখিত থাকলে তিনি কিছুক্ষণ একা থাকতে পছন্দ করেন। তারপর অবশ্য মিসেস রেবা'কে মনের খবর জানান। মিসেস রেবা'ও অনিমেষ দাশগুপ্তের সাথে সহমত। নিজের সাথে একাকী বোঝাপড়া'টা আসলেই জরুরি।

অনিমেষ দাশগুপ্ত হঠাৎ উঠে বসলেন। তারপর আলমারি খুলে তার ব্যক্তিগত লোকাপ থেকে একটা অ্যালবাম বার করলেন। তা খোলা মাএই প্রথম পাতায় ভেসে উঠলো তার আর নৈতিকের ছবি। দুজনে একে অপরের গলা জড়িয়ে ক্যামেরা'র পানে চেয়ে তাকিয়ে রয়েছে হাস্যরত মুখে। ছবি'টা তাদের স্কুল জীবনের। তা দেখা মাএই হু হু করে কেঁদে উঠলেন অনিমেষ দাশগুপ্ত। পুরুষদের নাকি কাঁদতে নেই। কিন্তু অনিমেষ দাশগুপ্তের যে কাঁদা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।

তিনি পর পর তাদের পুরোনো দিনের ছবি দেখতে লাগলেন। তার চোখ থেকে তখনো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। তিনি ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বিড়বিড় করে উঠলেন ——“প্রেমের বিচ্ছেদে একসময় মানিয়ে নেওয়া যায়, এমনকি মেনে নেওয়াও যায়। কিন্তু বন্ধুত্বের বিচ্ছেদের যন্ত্রণা চিরকাল বয়ে বেড়াতে হয়।”

নৈতিক আর অনিমেষ সেই স্কুল জীবনের বন্ধু। ক্লাস ফাইভ থেকে তাদের বন্ধুত্ব হয়। তারপর কলেজ, বিজনেস পর্যন্ত তারা একে অপরের সঙ্গে ছিল। তাদের বন্ধুত্বের চর্চা খুব বিখ্যাত। তারা একে অপরের জান ছিল বলতে গেলে। সুখ,দুঃখ,কষ্ট, এমনকি সাফল্য পর্যন্ত তারা একে অপরের ছায়া হয়ে থেকেছে। স্কুল কলেজ জীবনে তাদের সবাই জয়-বিরুর উপাধিও দিয়েছিল। অনিমেষ ভেবেই নিয়েছিল— নানান অজুহাতে ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর মধ্যে নৈতিক স্থির। ও সদা স্থির!

কিন্তু কথায় আছে না — আমাদের আঘাত'টা আমাদের কাছের মানুষই করে। যার থেকে কোনো আশাই থাকে না। ওইরকমই কিছু ঘটে অনিমেষের সঙ্গে। তার জীবনের পাওয়া সবচেয়ে বড়ো আঘাত'টা নৈতিকই করে। যা অনিমেষের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল।

কলেজ জীবন শেষ করে তারা একটা বিজনেস শুরু করেছিল একএে। জুয়েলারির বিজনেস। একেবারে জিরো থেকে শুরু করেছিল তারা, তখন কিছুই ছিল না তাদের। দুজনেরই বাড়ির লোক অবশ্য পাশে ছিল। তারপর কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের ছোট্ট বিজনেস বড়ো রূপ নেয়। তাদের নিজস্ব একটা সো রুম হয়, নাম—— “মুখার্জি অ্যান্ড দাশগুপ্ত জুয়েলার্স”। ক্রমে তা বেশ খ্যাতি অর্জন করে। দেশ বিদেশ থেকে তাদের কাছে অর্ডার আসতো শুরু করে। এমনকি বিভিন্ন অভিনেত্রীরাও তাদের শো রুমে আসা শুরু করে দেয়। এই ভাবে ধীরে ধীরে তাদের বিজনেস অনেক বড়ো আকার ধারণ করে। এরপর তারা অনেক সখ করে নিজস্ব বাড়ি করে পাশপাশি, তারপর বিয়ে-বাচ্ছা। সব ঠিকঠাকই চলছিল। কখনো তাদের মধ্যে টাকা-পয়সা নিয়ে ঝুট ঝামেলা হয়নি। দুজনেই সমান পরিশ্রম করতো শো রুমের জন্য। দুজনেরই বাড়ির লোকের সাথে তাদের খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের দেখে কেউ বলতোই না যে তারা আপনজন নয়।

কিন্তু তার কিছুদিনের মধ্যেই সব মাটি হয়ে যায়, ভাঙন ঘটে অনিমেষ আর নৈতিকের বন্ধুত্বের মধ্যে। ভেঙে যায় তাদের দুই পরিবারে গড়ে ওঠা সু সম্পর্ক। কথায় আছে না —— “টাকা মানুষকে অন্ধ বানিয়ে দেয়। যে তারা পাপ করতেও দুবার ভাবে না।”

এই টাকার লোভে পড়েই নৈতিক তাদের পুরোনো বন্ধুত্বের কথা ভাবিনি। একদিন সকালে অনিমেষ অফিস গিয়ে জানতে পারে তাদের বিজনেসের ৮৫ শতাংশ শেয়ার নৈতিক নিজের নামে করে নিয়েছে। যেখানে তাদের ৫০ শতাংশ করে নেওয়ার কথা।কোনো ছলবলে নৈতিক অনিমেষ থেকে ওই পেপারে সই করিয়ে নেয়। তা অনিমেষ টেরও পায় না। ওই যে— অতিরিক্ত বিশ্বাস কাউকে করতে নেই। নিজের ছায়া'কেও নয়। এই কথা জানতো অনিমেষ, তবু সে নৈতিককে অন্ধবিশ্বাস করতো। যার ফল সে পেল।

প্রাণ প্রিয় বন্ধুর কাছ থেকে এমন বিশ্বাস ঘাতকতা সহ্য করতে পারে না অনিমেষ। সেই মুহূর্তেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার হার্ট অ্যাটাক হয়, যার জন্য সে হসপিটালে ভর্তি থাকে বেশ কয়েক দিন। বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। সেই সময় পাশে দাঁড়ায় রক্তিম। কলেজ পড়ুয়া রক্তিম, যেই বয়সে আনন্দ করার কথা সে বাবার ব্যবসা দাঁড় করাতে লেগে পড়ে। বাবার সেভিংস দিয়ে রক্তিম আবার নতুন করে সব শুরু করে।এই পথ মোটেই সহজ ছিল না। তবে রক্তিম আর অনিমেষের চেষ্টায় সব সম্ভব হয়েছে। তাদের এখন একটা জুয়েলারি সপ, এবং একটা টেক্সটাইল ও রয়েছে— দাশগুপ্ত নাম দিয়ে। তাদের বিজনেস ভালোই সফলতা পেয়েছে।

তো কথা হচ্ছে অনিমেষ তো এখন ভালো পজিশনে রয়েছে। এমন করে নৈতিকের লাভ কী হলো? সেই তো এখন সে সফল একজন বিজনেসম্যান। কথায় আছে না —— “কোনো কিছু গড়তে প্রচুর সময় লাগে। এমনকি যুগও লেগে যেতে পারে। কিন্তু তা ভাঙ্গতে এক সেকেন্ড ও লাগে না।”

তাদের সম্পর্ক'টাও এই রকমই। যেখানে নিঃস্বার্থ দিয়ে গিয়েছিল অনিমেষ একাই। নৈতিক তো শুধু স্বার্থের কথাই ভাবলো। তা নাহলে তাদের সম্পর্ক'টা এইরকম হতো না। যেহেতু অনিমেষের দিক থেকে সত্যি কারের বন্ধুত্ব ছিল বিধায় সে আজও কষ্ট পায়। নৈতিক'কে দেখলে তার আজও কান্না পায়। সে হাজার'টা ভুল করার পরও অনিমেষ তাকে বন্ধু মানে। আরে নৈতিকের জন্য যেখানে সে জান দিতেও রাজি ছিল, সেখান সম্পত্তি-টাকা কি জিনিস। বন্ধুত্ব তো তার থেকেও মূল্যবান। যদি নৈতিক একটু বুঝতো, তাহলে আজ সবকিছুই অন্যরকম হতো। তাদের পরিবারের মধ্যে এত তিক্ততা আসতো না। কিন্তু আফসোস!!! লোভে নৈতিক অন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

চলবে,,,,,,

( রিচেক করা হয়নি, সবাই ভুল-এুটি ক্ষমা'র চোখে দেখবেন। ধন্যবাদ 💜।)

আগের পর্ব:

https://www.facebook.com/share/p/1Atu8Z9wea/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন