#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা_ব্যানার্জী
#পর্ব_সংখ্যা ১৪
মেঘলা একটা দিন, চারিদিক কালো হয়ে আছে। তেমন ঝড়-জল নেই। তবে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। রোমান্টিক একটা ওয়েদার। বইপ্রেমীদের প্রিয় একটা ওয়েদার। নয়ন্তীকাও বইটই নিয়ে বেশ আয়োজন করে উঠলো, তার আবার সব জিনিসে প্ল্যানিং ভালোলাগে।
নয়ন্তীকা ঘরের লাইট নিভিয়ে, দরজা জানালা খুলে বেলকনির নীচে মেঝেতে হুমায়ূন আহমেদের “বৃষ্টিবিলাস” বইটি নিয়ে গায়ে একটা পাতলা চাদর চাপিয়ে বসলো। পাশেই ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপ, সে খুব সখ করে নীচে গিয়ে করে এনেছে তৎক্ষণাৎ। চারিদিক থেকে ঠান্ডা বাতাস বইছে, কয়েকটা পাখির দল কিচিরমিচির শব্দ তুলে উড়ে যাচ্ছে। মৃদু হাওয়ায় গাছের ভেজা পাতা গুলো নড়ে উঠছে।
নয়ন্তীকা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সব অবকলন করে বইটা হাতে তুলে নিল। তবে বইটা আর খোলা হলো না। সেই মুহূর্তে তার ফোন'টা ভিপ্ ভিপ্ শব্দে বেজে উঠলো। নয়ন্তীকা'র বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে এল তৎক্ষণাৎ। তার উপন্যাস পড়ার সময় কারোর নাক গলানো পছন্দ নয় একেবারেই। নয়ন্তীকা'র ভাবনা-চিন্তার মধ্যেই ফোন ততক্ষণে বেজে বেজে কেটে গেছে। নয়ন্তীকা ভাবলো আর দেখার দরকার নেই, ঠিক তখনই আবার ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠলো। নয়ন্তীকা বিরক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর এগিয়ে বিছানা থেকে ফোনটা তুলে ধরলো। ফোনের স্ক্রিনে গোটা গোটা অক্ষরে ভাসছে রিহা'র নাম। ওমনি নয়ন্তীকা'র বিরক্তি ভাবটা উবে গেল। সে ফোন রিসিভ করে কানে ধরলো——“হ্যাঁ বল!!”
“এই বেরোবি?”
--------------
নয়ন্তীকা'র তেমন বন্ধুবান্ধব নেই। স্কুলেও তার বন্ধুদের সংখ্যা বেশি ছিল না। আর কলেজে দরকারেই কয়েকজনের সাথে কথা হয় এই যা। তার দলবল বন্ধু না থাকলেও একটি বন্ধু ছিল। বরং এখনো আছে। তার বাচ্ছা বেলার সখী রিহা।
অনেকে বলে মেয়েরা নাকি কখনো ভালো বন্ধু হতে পারে না। তাদের মধ্যে হিংসা থাকে, রেষারেষি থাকে। কিন্তু নয়ন্তীকা আর রিহার মধ্যে তেমন কোনো ব্যাপার নেই। তারা একে অপরের দুঃখে দুঃখী আর সুখে খুশি হয়। তারা একে অপরের সাফল্যে আনন্দ করতেও জানে। এই তো নাচের লাস্ট এক্সামে নয়ন্তীকা সেকেন্ড হয়েছিল। মেয়েটা কি খুশিই না হয়েছিল। তার মুখে কোনো দুঃখই দেখা যাচ্ছিল না যে সে কোনো প্রাইজ পাইনি। বরং সে নয়ন্তীকা'র কাঁধ জড়িয়ে আনন্দ করেছে। আসলে, থাকতে আর কথা রাখতে জানলে বন্ধত্ব সুন্দর। তাছাড়া, নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব গুলো সুন্দরই হয়!!! ভীষন সুন্দর।
রিহা থাকলে তার বুঝি কাউকে প্রয়োজন পড়ে না। সে এই মেয়েটা'র সাথে জাহান্নামেও যেতে রাজি। তবে, আজকে তারা জাহান্নামে যাচ্ছে না। যাচ্ছে কলকাতা'য়। ভেজা কলকাতার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতে। একটু বৃষ্টি গায়ে মাখতে। অবশ্য এর জন্য নয়ন্তীকাকে কেঁদে-গেয়ে মায়ের কাছে অনুমতি নিতে হয়েছে। তার মা জননী অনেক কান্নাকাটির পর রাজি হয়েছেন তাকে কলকাতায় আসতে দিতে। অবশ্য তার বাবা'র বাড়ি ফেরার আগে তাকে ফিরে যেতে হবে। নয়তো কপালে দুঃখ থাকবে।
তারা দুজনে একটু এমনই—— তার ছেঁড়া প্রকৃতির। নয়ন্তীকার সব আগেভাগে প্ল্যানিং ভালো লাগলেও, রিহা আর তার কখনো কোনো প্ল্যানিং থাকে না। আর থাকলেও তা সাকসেসফুল হয় না। তারা ’উঠলো বাই চলো কটক যাই’— ওয়ালা মানুষ!! তারা—— “এই বেরোবি?? চল যাই” ওয়ালা মানুষ!! হ্যাঁ, বাড়িতে একটু ম্যানেজ করতে হয়। তারপর গঞ্জের ঘাট থেকে শুরু করে কুল তলা'র অলি গলির ফুচকা-চাউমিন-চায়ের দোকানের খাবার ট্রাই করে তারা। খেতে খেতে তাদের সুখ-দুঃখের গল্প চলে দীর্ঘক্ষণ। অবশ্য তারা রোজ ঘুরতে বেরোয় না। ওই আলে-কালে এক-দু বার।
------
আজ রিহা আর নয়ন্তীকা শাড়ি পড়েছে দুজনে। হাতে ছাতা থাকার পরেও দুজনে একে অপরের হাতে হাত গলিয়ে হেঁটে চলেছে কলকাতার ব্যস্ত সড়কে। তাদের বাড়ি থেকে ট্রেনে আসার পর একবার বাস ও চেঞ্জ করতে হয়েছে। তারপর থেকে তারা হাঁটছে তো হেঁটেই চলেছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে দুজনেই ভিজে গেছে ততক্ষনে। সেই দিকে হুশ নেই কারোরই।
“ভাই, আমি ছেলে আর তুই মেয়ে থাকলে ভালো হতো। দুজনে একসাথে খুউব ভালো থাকতাম। আমি তোকে বুঝি, তুই আমাকে বুঝিস। দুজনের বেশ চলে যেত। ওই বলদ সুধীর'টাকে পাওা দিতাম না তবে।”
রিহা'র কন্ঠে আপসোস স্পষ্ট। যা দেখে না হেসে পারলো না মেয়েটা। সে হেসে ফেললো তৎক্ষণাৎ। তারপর হাস্যরত গলায় বলে উঠলো—— “অন্যের সামনে বলিস না আবার। লোকে উল্টো পাল্টা ভাববে!”
নয়ন্তীকার কথায় রিহা মুখ ব্যাঁকালো, তারপর নয়ন্তীকার উদ্দেশ্যে বললো—“উহু!! ভাবুক গে। তাতে আমার বয়েই গেছে!!”
——“এই ভিক্টোরিয়া যাবি?? কাছেই আছে। কিছুটা হাঁটতে হবে।”
“হুম যাওয়াই যায়!!”
”চলোওও!!”
বলেই রিয়া নয়ন্তীকার হাত আরো শক্ত করে চেপে ধরলো। তারপর নয়ন্তীকার পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা গান ধরলো সে,,,,
“Bin kuch kahe bin kuch sune
haathon mein haath liye”...
প্রিয় বন্ধুর এই আবেগী কন্ঠে গান শুনে, আবেগে ভেসে গেল নয়ন্তীকাও। স্থান, সময় ভুলে সেও রিহার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে গেয়ে উঠলো,,,,
“Chaar qadam bas chaar qadam
chal do naa saath mere”....
দুজনে উচ্চ স্বরে গেয়ে চলেছে মন খুলে। যেন বৃষ্টিস্নাত কলকাতার ব্যস্ত সড়কে তারা ব্যতীত কেউ নেই। আশেপাশের মানুষজন ভ্রু কুঁচকে চেয়ে দেখছে তাদের পাগলামি। তবু, তারা সেসব উপেক্ষা করে মেতে রইলো নিজের আনন্দে।
--------------
“ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল” হল কলকাতার অন্যতম সেরা ঐতিহাসিক স্থান। যা মধ্য কলকাতার ময়দানে অবস্থিত। “ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল” রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। এটি পুরোটাই সাদা মার্বেল পাথরে গঠিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এখানে দূর দূরান্ত হতে মানুষ ভ্রমণে আসে।
অনান্য দিনে সোনালী রোদে ভিক্টোরিয়া নিঃসন্দেহে সুন্দর লাগে। কিন্তু এই বাদলা দিনের ভিক্টোরিয়া একটু বেশিই আকর্ষণীয়। নয়ন্তীকা আর রিহা এগিয়ে গেল হাস্যরত মুখে। ইতিমধ্যে তাদের টিকিট কাটা হয়ে গেছে।
ভিতরে যাওয়া মাএই রিহা নয়ন্তীকার ছবি তুলে দিতে লাগলো বিভিন্ন পোজে। ভিক্টোরিয়া'র ঠিক সামনে জলে জুবুথুবু নয়ন্তীকা'কে একটু বেশিই সুন্দর দেখাচ্ছে। রিহা প্রশংসা করতে করতে ছবি তুললো বেশ কয়েকটা। হঠাৎ নয়ন্তীকার দৃষ্টি তাদের থেকে একটু দূরে থাকা কাপলদের উপর পড়লো। তারা দুজনেই মিলিয়ে একই রঙের শাড়ি পাঞ্জাবি পড়েছে। তাদের ফটোশুট চলছে সম্ভবত। দুজনে কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাদের মাঝ থেকে ভিক্টোরিয়া দেখা যাবে এমন ফটো তোলার চেষ্টা চলছে বোধহয়। নয়ন্তীকা আর রিহা হাস্যরত মুখে তাদের পানে তাকিয়ে রইলো। কী সুন্দর নাহ?? বাদলার দিনে প্রিয় মানুষের সাথে কলকাতা...!! আহা, একটা আলাদাই অনুভূতি। প্রশান্তিময় !! সবার কপালে জোটে না এই সুখময় অনুভূতি।
নয়ন্তীকা মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো তাদের দিকে। একফাঁকে মেয়েটার মুখ দেখতে পেল নয়ন্তীকা। চিনতে একটু সময় লাগলো তার। কিন্তু যখন চিনতে পারলো মেয়েটা'কে তার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো—— “রিহা, সেই মেয়েটা!”
রিহা তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিল, নয়ন্তীকার কথায় আবার একপলক তাদের পানে চেয়ে নয়ন্তীকাকে জিজ্ঞাসা করলো—— “মেয়েটা'কে চিনিস নাকি?”
“হু!! গঞ্জের ঘাটে রক্তিম দাশগুপ্তের সাথে দেখেছিলাম।”
নয়ন্তীকা'র কথায় রিহা ভ্রু কুঁচকে তাকালো তাদের থেকে দূরে দাঁড়ানো কাপলের পানে। তাদেরকে দেখে প্রেমিক-প্রেমিকা মনে হচ্ছে। যদি মেয়েটার রক্তিম দা'র সাথে সম্পর্ক থেকেই থাকে, তবে এই ছেলেটার সাথে কী করছে এখানে। রিহার ভাবনা চিন্তার মাঝেই নয়ন্তীকাকে তাদের পানে যেতে দেখা গেল। ওমনি রিহা চেঁচিয়ে উঠলো——“কোনো গন্ডগোল করিস না ভাই । যাদের ব্যাপার তাদেরকে বুঝে নিতে দে।”
কে শোনে কার কথা? নয়ন্তীকা ঝড়ের বেগে হাঁটছে তখন। রিহা দেখলো এই মেয়ে কথা শোনার নয়। তাই সেও ছুটলো নয়ন্তীকার পিছনে।
---------
“রক্তিম দাশগুপ্ত আপনার কে হয়?”
আকস্মিক তেজী মেয়েলি কন্ঠস্বর শুনে তাকালো উপস্থিত সবাই। তাদের ফটোশুট তখন বন্ধ ছিল বিধায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। দিশা অপিরিচিত কন্ঠে অযাচিত প্রশ্ন শুনে ফিরে তাকালো তার পানে। তারপর পরিচিত মুখ দেখে হেসে এগিয়ে এল তৎক্ষণাৎ। এসে নয়ন্তীকার গাল টেনে দিয়ে বলে উঠলো ——“আরে নয়ন্তীকা যে! কেমন আছো?”
ভরকে গেল নয়ন্তীকা। সামনে হাস্যরত মেয়েটার কথা আর কাজে সে অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার পানে। অপরদিকে, রিহাও চমকালো সামান্য। তবে সে কিছু বললো না। বন্ধুর পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো ।
“ আপনি চেনেন আমাকে?”
নয়ন্তীকার কথায় দিশা শব্দ করে হাসলো। তারপর বললো—— “শুধু আমিই কেন, আমাদের বন্ধু মহলের সবাই চেনে তোমাকে।”
—— “গাইজ , ও নয়ন! মনে আছে??”
দিশা'র কথায় তাদের মধ্যে উপস্থিত একটা ছেলে বলে উঠলো —— “আমাদের রক্তিমের ন”...
ছেলেটা কথা সম্পূর্ণ করতে পারলো না। তার আগেই দিশা তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো —— “হ্যাঁ হ্যাঁ!! ওই।”
"ওহ বাবাহ!! উপস্থিত সবাই একসাথে বলে উঠলো।
—“ছোট্ট বোনু দেখি বেশ বড়ো হয়ে গেছে। তা কেমন আছো বোনু?”
নয়ন্তীকা উওর দেওয়ার পরিবর্তে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। আর রিহা চোখ ছোটো ছোটো করে সামনের মানুষগুলোর কথা বোঝার চেষ্টা চালালো। অপরদিকে, দিশা নয়ন্তীকার অবস্থা বুঝতে পারলো। সে নয়ন্তীকা'কে সহজ করার জন্য উপস্থিত সবার সাথে নয়ন্তীকা আর রিহা'র পরিচয় করিয়ে দিল। উপস্থিত দাদা-দিদিগুলোও খুব বিনয়ী ভাবে তাদের সাথে কথা বললো, বিশেষ করে নয়ন্তীকার সাথে। যেন তারা কতকাল ধরে তাকে চেনে।
“আমরা সবাই রক্তিমের বন্ধু। তুমি রক্তিমের পাশের বাড়িতে থাকো আমরা জানি। অনেকবার তোমাকে দেখেছি।”
দিশার কথায় সামান্য হাসার চেষ্টা করলো নয়ন্তীকা। তারপর যে কাজের জন্য সে এসেছিল তা মনে পড়ে গেল। ওমনি সে তড়িৎ বেগে দিশার পাশে দাঁড়ানো পাঞ্জাবি পরিহিত ছেলেটির পানে তাকালো। নয়ন্তীকা'র দৃষ্টি অনুসরণ করে দিশাও তাকালো। তারপর মৃদু হেসে বলে উঠলো —— “ও আমার হবু বর। এই সপ্তাহে বিয়ে। তাই বিয়ের আগে একটু সময় কাটাচ্ছিলাম সবাই।”
“বলো প্রেম করতে এসেছি মনা! এরপর তো বিয়ে।”—— পাশ থেকে দেবাশীষ নামের দাদা'টা বলেই উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো।
সেই কথায় দিশা লাল-নীল হয়ে উঠলো। ছেলেটিকে চোখ রাঙিয়ে সে নয়ন্তীকা আর রিহাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো—— “তোমাদের দুজনের কিন্তু নেমন্তন্ন রইলো। এসো অবশ্যই , আমার ভালো লাগবে। আমি রক্তিমের হাতে কার্ড পাঠিয়ে দেবো!”
দিশার শেষের কথা গুলো ঠিক শুনতে পেল না নয়ন্তীকা, সে নিজের ভাবনায় বিভোর হল। সে মেয়েটা'র এইপর্যন্ত সব কথা শুনে বুঝলো রক্তিম আর তার মাঝে কিছু ছিল না,তারা শুধুমাএ বন্ধু। ভেবেই নয়ন্তীকা মনে একটু শান্তি পেল যেন। তবে সে রক্তিম কে ভুল বুঝে কষ্ট পেয়েছে ভেবেই আবার দুঃখ হল একটু। সে শুধু শুধু দেবদাসী সেজে পরীক্ষাও খারাপ করেছে। নয়ন্তীকার এই মূহুর্তে খুব করে কাঁদতে ইচ্ছা করলো। আসলেই কথায় আছে না —— চোখের দেখা সবসময় সত্যি হয় না!!!
চলবে,,,,
আগের পর্ব:
https://www.facebook.com/share/p/1Ap6M6P9ag/