#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা_ব্যানার্জী
#পর্ব_সংখ্যা ১৫(প্রথম অংশ)
কলকাতার আবহাওয়া তখনও শীতল, আকাশে তখনও কালো মেঘের আনাগোনা। রক্তিম আকাশের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকালো। তার এই বৃষ্টি এই ওয়েদার মোটেই ভালো লাগছে না এই মুহূর্তে। আকাশের অবস্থা দেখতে দেখতে রক্তিম সিগারেটে টান বসালো ধীরে সুস্থে। আজ সে অফিসে যাইনি, বন্ধুদের সাথে কলকাতা এসেছে। আর সে একদিন অফিস না গেলে অনিমেষ দাশগুপ্তের অফিস চলে না বলতে গেলে। তাই মহাশয় ফোন করে করে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন, ওনার বক্তব্য—— এই মুহূর্তে আমি তোমায় অফিসে দেখতে চাই। অপরদিকে, তার বন্ধুরাও তাকে ছাড়তে নারাজ। তাদের দলের একটিমাত্র মেয়ে বন্ধুর বিয়ে সামনে। সেই উপলক্ষে আজকে একসাথে বেরোনো।
ছাতা'র মাথার ফোনের রিচার্জেরও আজই বারোটা বেজে গেছে। অনিমেষ দাশগুপ্তের সাথে জরুরি তলব করার সময়ই শেষ। রক্তিম নিজের কথা পুরো করার আগেই ফোনের লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। যার জন্য রক্তিমকে তৎক্ষণাৎ ভিক্টোরিয়া থেকে কিছুটা দূরে রিচার্জ করাতে আসতে হলো।
রক্তিম সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ফেলে তা পায়ে পিষে দিল। তারপর দোকানের টাকা মিটিয়ে হাঁটা ধরলো বন্ধুদের কাছে। সাথে ফোন লাগালো অনিমেষ দাশগুপ্তের নম্বরে।
ভিক্টোরিয়া থেকে দোকান কিছুটা দূরে থাকায় রক্তিমের পৌঁছাতে বেশিক্ষণ লাগলো না। রক্তিমের কানে তখনও ফোন রয়েছে। সে বন্ধুদের নিকট পৌঁছেই হঠাৎ থম মেরে দাঁড়িয়ে গেল। তার বাবা ফোনের অপরপাশ হতে তখনও বকবক করেই চলেছেন। আর রক্তিম ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো বন্ধুদের ভিড়ে বসে থাকা তার প্রতিবেশী মেয়েটিকে। তাদের বেশ জমেছে। সবাই ভেজা ঘাসে গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। দিশা নয়ন্তীকার হাত ধরে এই ভাবে গল্প করছে যেন কতকাল ধরে চেনে তাকে।
“হ্যালো !! হ্যালো !! রক্তিম তুমি আসছো তবে?”
অনিমেষ দাশগুপ্তের কথায় ধ্যান ফিরল রক্তিমের। সে অপ্রস্তুত ভাবে কেশে উঠলো সামান্য। যার ফলে সবাই ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো রক্তিমের পানে। চাইলো নয়ন্তীকাও। রক্তিম আগে থেকেই নয়ন্তীকার পানে চেয়েছিল বিধায় তাদের দৃষ্টি সংযোগ হলো। রক্তিম যেন হারিয়ে গেল ভেজা পাপড়ি যুক্ত টানা-টানা দুটি চোখে।
“রক্তিম!!! শুনতে পাচ্ছো তুমি?”
রক্তিম দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। অপ্রস্তুত ভাবে নীচের দিকে চেয়ে ভিজে চুলে হাত চালালো। তারপর শান্ত গলায় বলে উঠলো—— “নাহ্!! আজকে যাওয়া হবে না। একটু কাজ আছে।”
ফোনের অপরপাশ হতে কিছুক্ষন নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। তারপর গম্ভীর কন্ঠ ভেসে এল —— “ঠিকাছে!! যা ভালো বোঝো তাই করো।”
ফোনের লাইন বিচ্ছিন্ন হল তৎক্ষণাৎ।রক্তিম ফোন পকেটে পুরলো আলগোছে। তারপর হেঁটে গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো দেবাশীষের পাশে। ওমনি সে প্রফুল্ল গলায় বলে উঠলো —— “দেখ নয়ন !”
“আপানাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য! আমি তো চোখে দেখতে পাই না!”—— রক্তিম নয়ন্তীকার দিকে তাকিয়ে বললো।
দেবাশীষ বোকা হাসলো। তারপর রক্তিমের পেটে গুঁতো মেরে কাশলো নাটকীয় ভঙ্গিতে——“উহুম!! উহুম!!”
রক্তিম রাগি চোখে চাইলো দেবাশীষের পানে। যেন সে চোখ দিয়ে শাসাচ্ছে—— মার না খেতে চাইলে মুখটা বন্ধ রাখ। অপরদিকে, রক্তিমের তাকানো আর উপস্থিতিতে নয়ন্তীকা অস্বস্তিতে গুটিয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ সে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো যাওয়ার জন্য। নয়ন্তীকা'কে দেখে রিহাও উঠে দাঁড়ালো।
“একি উঠে যাচ্ছো যে?? বসো আর একটু আড্ডা দিই!”
দিশা স্নেহ মাখা কন্ঠে বললো। যা শুনে নয়ন্তীকা একপলক রক্তিমের পানে চাইলো, তারপর হাত কচলাতে কচলাতে বললো—— “না আসলে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। অনেকক্ষন হলো এলাম।”
রিহার ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠলো দিশা আর নয়ন্তীকার কথোপকথনের মাঝে। যার জন্য দুজনেই থেমে গেল, তারা রিহার দিকে চাইলো। রিহা ফোন কানে ধরে কথা বললো। তারপর দুই মিনিটের মাথায় ফোন রেখে নয়ন্তীকা'কে উদ্দেশ্য করে বললো—— “আর একটু বোস নাহলে। সুধীর আসছে।”
রিহা লজ্জামাখা কন্ঠস্বর । তার লজ্জা দ্বিগুন বাড়িয়ে দিল রক্তিমের বন্ধুবান্ধব। তারা বেশ ঠাট্টা করতে লাগলো রিহাকে নিয়ে। অপরদিকে, রিহা কথাটা জোরে বলায় উপস্থিত সবাই শুনলো। যার জন্য নয়ন্তীকাকে বসতে হলো।
এইসবের মধ্যেই রক্তিম হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। তারপর বন্ধুদের উদ্দেশ্য বললো—— “আমার একটু কাজ আছে। বাড়ি দিয়ে ফোন আসছে ফিরতে হবে!”
“চলে যাবি?”—— দিশা জিজ্ঞাসা করে উঠলো।
“হু!“
“তুমিও চলো!! আমি তো ওইদিকেই যাচ্ছি!”
রক্তিমের কথায় নয়ন্তীকা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। রক্তিম যে কথাটা তাকেই উদ্দেশ্য করে বলেছে তা সে বেশ বুঝলো। কেননা সে কথাটা তার দিকে চেয়েই বলেছে আর এখনও উওরের আশায় চেয়ে রয়েছে। তবে কথা হলো নয়ন্তীকা'র কি যাওয়া উচিৎ। তার মন তো নাচতে নাচতে হ্যাঁ বলছে। তবে রিহা?? তাকে ছেড়ে তো আর যাওয়া যায় না।
নয়ন্তীকার ভাবনা চিন্তার মাঝেই রিহা নয়ন্তীকার হাতখানা চেপে ধরলো। তার চোখ বলছে— যাস না! আবার মুখ থুবড়ে লোকটার প্রেমে পড়বি। হঠাৎ , নয়ন্তীকার নিজের কথা ছেড়ে মাথায় রিহার কথা এল। মেয়েটার বড্ড সখ ছিল আজকে তার প্রেমিকের সাথে ঘুরতে বেরোনোর। নয়ন্তীকা থাকলে ব্যাপারটা কেমন দেখায় না? ওই কাবাব মেইন হাড্ডি টাইপ।
“কী হলো?? তুমি যাবে আমার সাথে?”
উপস্থিত সবাই দুজনের দিকে চেয়ে রয়েছে তখন ভীষন আগ্রহের সহিত। রক্তিমের বন্ধুগুলোর মুখে তখন মিটিমিটি হাসির রেখা দৃশ্যমান। অপরদিকে, নয়ন্তীকা দোনা মোনা মনোভাব নিয়ে বলে উঠলো —— “যাবো!”
----------
বৃষ্টিটা আবার এসেছে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। কলকাতার ব্যস্ত সড়ক সহ মানুষজন ভিজে যাচ্ছে সেই বৃষ্টিতে। নয়ন্তীকা আর রক্তিম তখন চুপচাপ হাঁটছে পাশাপাশি। বাসে করে স্টেশন যাওয়ার কথা থাকলেও নয়ন্তীকার আবদারে হেঁটে যাচ্ছে তারা। বর্তমানে, দুজনেরই অনেক কথা জানার আর জানানোর রয়েছে। তবে কোথা থেকে কি শুরু করবে দুজনেই বুঝতে পারছে না।
রক্তিম চুপচাপ হাটলেও, নয়ন্তীকা গুনগুন করে গান গাইছে। যা রক্তিমের কানেও যাচ্ছে, তবে অস্পষ্ট। নয়ন্তীকা বেজায় খুশি। তার চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। যা রক্তিমের চোখেও পড়লো। এই মূহুর্তে মেয়েটাকে রাগালে কেমন হয়, ভেবেই রক্তিম ঠোঁট এলিয়ে হাসলো সামান্য। তারপর কৌতুকের স্বরে নয়ন্তীকাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো——“নৈতিক মূখার্জী জানে তার মেয়ে কলকাতার অলি-গলি ঘুরে বেড়াচ্ছে?”
“জী না!! নৈতিক মুখার্জির বউ জানে।”—— রক্তিমের কথায় নয়ন্তীকা দাঁত কেলিয়ে বলে উঠলো।
রক্তিম নয়ন্তীকার পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভ্রু কুঁচকে তাকালো মেয়েটার পানে। নয়ন্তীকাকে বেশ প্রাণোচ্ছল দেখাচ্ছে। রক্তিম তাকিয়ে রইলো মেয়েটার ভেজা স্নিগ্ধ মুখ পানে।
“এই শুনুন, আমার ব্যাগটা বড্ড ভারী! একটু নেবেন?? আমার হাত ব্যাথা করছে।”
নয়ন্তীকার মুখে তখন দুষ্টু হাসি। রক্তিম তা চোখ ছোটো ছোটো করে দেখলো। তারপর স্বভাবত শান্ত গলায় সুধালো——“তোমার মনে হচ্ছে না এই গুলো একটু বেশিই হচ্ছে এবার?”
নয়ন্তীকা চোখ-নাক-মুখ কুঁচকে নিল তৎক্ষণাৎ । তারপর গাল ফুলিয়ে রক্তিমকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো——“একদমই মনে হচ্ছে না আমার!! আপনি যেচে আমাকে নিজের সাথে করে এনেছেন। তো আমার সুবিধা -অসুবিধা দেখা আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।”
“যথা আজ্ঞা মহারানি! আপনার অতি মূল্যবান ব্যাগখানা দিয়ে এই অধমকে উদ্ধার করুন।”—— রক্তিম হাত জোর করে নাটকীয় ভঙ্গিতে নয়ন্তীকাকে উদ্দেশ্য করে বললো।
যা দেখে খিলখিল করে হেসে উঠলো নয়ন্তীকা। সে ব্যাগ রক্তিমের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বললো—— “নিন উদ্ধার করলাম।”
নয়ন্তীকার কালো রঙের টোটা ব্যাগ। ছাতা-জলের বোতল সহ আরও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থাকায় ব্যাগটা একটু ভারী। নয়ন্তীকা এতখন নিয়ে ছিল বিধায় কাঁধ ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল। তবে এখন তার শান্তি লাগছে। তার থেকে বেশি ভালো লাগছে, তার অপ্রিয় শএু তার ব্যাগ বইছে। এর থেকে আনন্দের কিছু আছে নাকি?
--------
রক্তিম বাম হাতে নয়ন্তীকার ব্যাগ আর ডান হাতে নয়ন্তীকার হাতখানা ধরে হেঁটে চলেছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে তখন। নয়ন্তীকা রক্তিমের পানে একভাবে চেয়ে হাঁটতে লাগলো। কলকাতার মতো ব্যস্ত সড়কে যানবাহন আর ভিড়ের থেকে রক্ষার জন্য রক্তিম তাকে নিজের ডান দিকে আগলে রেখেছে। সেই যে তার হাত ধরেছে আর ছাড়িনি। যা দেখে নয়ন্তীকা রক্তিমকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো——“এবার অত্যন্ত আমার হাতটা ছাড়ুন!”
নয়ন্তীকার কথায় রক্তিম একপলক চাইলো। তারপর পুনরায় দৃষ্টি সামনের দিকেই স্থির রেখে শান্ত গলায় বললো——“তোমাকে যেচে যেহেতু এনেছি। তোমাকে ঠিকঠাক বাড়িতে পৌঁছানো আমার দায়িত্বে পড়ে। রক্তিম দাশগুপ্ত আবার দায়িত্ব থেকে পিছু পা হয়না।”
নয়ন্তীকা মুচকি হাসলো রক্তিমের কথা শুনে। হাসলো রক্তিমও, তবে নয়ন্তীকার অগোচরে। নয়ন্তীকার হঠাৎ সব ভালো লাগতে লাগলো। এই কলকাতা, এই রাস্তা, এই বৃষ্টি আর রক্তিম দাশগুপ্ত। নয়ন্তীকা রক্তিমের পানে দৃষ্টি রেখেই তার পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আনমনে গুনগুন করে গান গেয়ে উঠলো,,,,,
“এই পথ যদি না শেষ হয়
তবে কেমন হত তুমি বলো তো,
যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়
#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা_ব্যানার্জী
#পর্ব_সংখ্যা ১৫(দ্বিতীয় অংশ)
রক্তিম আর নয়ন্তীকা তখনও হেঁটে চলেছে কলকাতার পথ ধরে। এই তো আর দু পা হাঁটলে স্টেশন, তারপর বাড়ি। নয়ন্তীকার হঠাৎ মনটা ভার হয়ে উঠলো। তার এই কলকাতায় রক্তিমের সাথে থেকে যেতে ইচ্ছে করছে। এই মুহূর্তটাকে যদি থামিয়ে দেওয়া যেত। ইশ!! কত ভালো না হতো। নয়ন্তীকা মনের ভাবনা চেপে রাখতে পারলো না। সে তৎক্ষণাৎ রক্তিমকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,,,,
“এখন বাড়ি না গেলে হয় না?”
বলেই নয়ন্তীকা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো রক্তিমের পানে। রক্তিম নয়ন্তীকার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো——“তোমার একটু তাড়া ছিল বোধহয়?”
“ছিল !! এখন তো নেই।”
রক্তিম নয়ন্তীকার পানে চোখ ছোট্ট ছোট্ট করে তাকালো। তারপর একটা ভ্রু উঁচিয়ে সুধালো——“তোমার মতলব কী বলো তো?”
“আপাতত এই বৃষ্টি আর কলকাতা'র সৌন্দর্য উপভোগ করা!”
তবে নয়ন্তীকা মনে মনে বলে উঠলো— এই বৃষ্টিভেজা কলকাতায় আপনার সাথে আরও কিছু সময় কাটানোই এই মুহূর্তে আমার প্রধান মতলব হয়ে উঠেছে।
“আচ্ছা বেশ!! আর কিছুক্ষণ নাহয় থাকি।
-------
রক্তিম নয়ন্তীকা'কে কলকাতার একটা নামকরা ঘাটে এনেছে। যেখান হতে একটা ঝুলন্ত সেতু পরিলক্ষিত। একটা সুন্দর ঘাট, তীরে নৌকা বাঁধা রয়েছে। দু-একটা নৌকা দেখা যাচ্ছে। আকাশটা কালো থাকায় পুরো দৃশ্যটা আরও সুন্দর ফুটে উঠেছে।
নয়ন্তীকা এই মনোরম সুন্দর দৃশ্যখানা দেখে রক্তিমের হাত ছাড়িয়ে ছুটে গেল ঘাটের শেষ মাথায়। উদ্দেশ্য ঘাটের জলে পা ডোবানো। অপরদিকে, রক্তিম শীতল নয়নে তাকিয়ে দেখল নয়ন্তীকা'কে। মেয়েটা শাড়ি পড়ায় বেশ অন্যরকম দেখাচ্ছে। উম!! ভেজা গোলাপ!!
হ্যাঁ!! বৃষ্টিতে ভিজা নয়ন্তীকা'কে একটা স্নিগ্ধ ফুলের মতো লাগছে তার কাছে। এইমুহুর্তে নয়ন্তীকা'র হাস্যরত মুখখানি দেখে রক্তিমের কেমন হাঁসফাঁস লাগছে। রক্তিম চোখ ফিরিয়ে নিল। নৈতিক মুখার্জির মেয়ে তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে এই মুহূর্তে।
-------
রক্তিম আর নয়ন্তীকা সেই সুন্দর ঘাট থেকে বেরিয়েছে অনেকক্ষন হলো। বর্তমানে তারা আবার একে অপরের হাতে হাত রেখে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছে। সেই মুহূর্তে নয়ন্তীকা আবার আহ্লাদি স্বরে আবদার করে উঠলো——“এই শুনুন!! আমি চা খাবো।”
নয়ন্তীকা'র চঞ্চল কন্ঠস্বর। সে বলেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো রক্তিমের পানে। রক্তিম সোজা অদূরে দৃষ্টি রেখেই বললো——“সময়ের খেয়াল আছে?? এই ভরদুপুরে কে চা খায়?”
“আমি খাই। তাছাড়া এখন সবে দুপুর দু'টো। চলুন না প্লিজ!”
নয়ন্তীকার কথায় রক্তিম নয়ন্তীকার পানে তাকালো, মেয়েটা আদুরে বিড়াল ছানার মতো শীতল নয়নে তাকিয়ে রয়েছে তার পানে। রক্তিম সেই দৃষ্টিকে উপেক্ষা করতে পারলো না। সে নয়ন্তীকা'র হাতখানা আর একটু চেপে ধরে যেতে যেতে বলে উঠলো——“ আচ্ছা চলো!”
-------
রক্তিম আর নয়ন্তীকা বর্তমানে একটা টঙের চায়ের দোকানে বসে রয়েছে। দোকান'টা আপাতত ফাঁকা। দোকানি ব্যতীত রক্তিম আর নয়ন্তীকা রয়েছে। রক্তিম ফোনে ব্যস্ত থাকলেও, নয়ন্তীকা দোকানির চা করার টেকনিক দেখছে হাঁ করে। মাটির ভাঁড়ের চা দোকানি গরম আগুনে ফুটিয়ে চলেছে ক্রমাগত। যার জন্য চায়ের রঙ একদম লালচে হয়ে আছে। নয়ন্তীকা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। বেশি তাকালে দোকানের লোকটা তাকে হ্যাংলা ভাববে, নতুবা ভাববে তার চায়ের রেসিপি চুরি করছে সে। হুহ!! ভাবতেই পারে। নয়ন্তীকা আশেপাশে তাকালো। প্রতিদিন বেশ ভালোই ভিড় থাকে এই কলকাতায়। নয়ন্তীকা আনমনে ভাবতে ভাবতে তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো অদূরে ফুল বাজারে। সুন্দর সুন্দর রঙের বিভিন্ন ফুলের সমাহার। সম্ভবত এই বাজার হতে সমস্ত ফুল অনান্য অঞ্চলগুলোতে বিক্রি করা হয় স্বল্প মূল্যে।
নয়ন্তীকা এবার রক্তিমের দিকে চাইলো। সে তার ব্যাগ স্বযত্নে তার পাশে রেখে ফোন চাপতে ব্যস্ত। নয়ন্তীকা মায়াময় দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো রক্তিমের পানে। তারপর সে রক্তিমকে উদ্দেশ্য করে ধীর স্বরে সুধালো—— “একটা ফুল কিনে দেবেন??”
নয়ন্তীকার ইহ কথায় রক্তিম ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার পানে। এই মূহুর্তে রক্তিমের কাছে নয়ন্তীকা'র ব্যবহার কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকলো। এতদিন যে মেয়ে তার সাথে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতো, আজ সে তার কাছে আবদারের ঝুলি খুলে বসেছে। ভেবেই রক্তিমের চোখ বিস্ময়ে ছোটো হয়ে এল। সে একবার শীতল দৃষ্টি বুলালো নয়ন্তীকার পুরো মুখমন্ডলে।তারপর বেশ শান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করলো—— “তোমার শরীর ঠিক আছে?”
রক্তিমের কথায় নয়ন্তীকা বোকা হাসলো। তারপর কৈফেত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো—— “আসলে শাড়ি পড়েছি তো। তার উপর বৃষ্টি পড়ছে। তো একটা ফুল হলে ভালো হতো আর কি! তবে পুরো উপন্যাসের নায়িকা-নায়িকা ভাইবস আসতো।”
নয়ন্তীকার এই কথায় রক্তিম কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। তারপর ঘাড় নেড়ে জানালো —“বেশ!! কিনে দেবো।”
-------
চা ততক্ষণে এসে গেছে। দুজনেই চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। গরম চা এই শীতল পরিবেশে বেশ আরামদায়ক ঠেকলো তাদের কাছে। বৃষ্টিতে ভেজার দরুন দুজনরই হালকা শীত করছিল। যার জন্য এই মুহূর্তে এই গরম চা একটু প্রয়োজন ছিল বটে।
রক্তিম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ফোনে ব্যস্ত তখনো। যা নয়ন্তীকার পছন্দ হল না মোটেও। তাই সে নিরবতা ভেঙে নিজেই বলে উঠলো—— “দিশা' দি আপনার খুব প্রিয় মানুষ?”
নয়ন্তীকার কথায় রক্তিম গভীর দৃষ্টিতে তাকালো। তারপর নয়ন্তীকার চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বললো ——“হুম!! শুধু দিশা নয় আমার পাওা পাওয়া প্রতিটা মানুষই প্রিয়। তারা আমার মনের খুব কাছের।”
নয়ন্তীকা এলোমেলো নজর ফেললো। রক্তিমের কথার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে ফুলো ফুলো গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো তৎক্ষণাৎ। রক্তিমের দৃষ্টি যে তখনো তার পানে রয়েছে বুঝতে পেরে নয়ন্তীকা আরও লজ্জায় কুঁকড়ে উঠলো। সে পরিবেশ স্বাভাবিক করতে বলে উঠলো——“আমি প্রথমে ভেবেছিলাম দিশা দিদিভাই আপনার মনের মানুষ।”
“ওহ!! তাই বুঝি কয়েক মাস ধরে ঝগড়া বন্ধ ছিল?”
“ধ্যাত!!”—— বলেই নয়ন্তীকা একহাতে মুখ ঢেকে নিল তৎক্ষণাৎ। যা দেখে রক্তিম স্বশব্দে হেসে উঠলো। নয়ন্তীকার মনে হলো এক ছুটে কোথাও পালিয়ে যেতে। সে লজ্জায় আর মুখ তুলতে পারলো না।
তাদের চা শেষ হয়ে গেছে ততক্ষনে। রক্তিম একপলক নয়ন্তীকা'র দিকে তাকালো, মেয়েটা তখনও হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রয়েছে। যা দেখে রক্তিম ঠোঁট এলিয়ে হাসলো সামান্য। তারপর সে দোকানির বিল মিটিয়ে, এগিয়ে এসে আলগোছে নয়ন্তীকার হাতখানা চেপে ধরলো। নয়ন্তীকাও তাল সামলাতে না পেরে উঠে দাঁড়ালো, রক্তিমের পায়ের সাথে পা মিলিয়ে হাঁটতে লাগলো।
নয়ন্তীকা তাকালো রক্তিমের ধরে রাখা হাতখানা'র দিকে। যেন তার কত অধিকার নয়ন্তীকা'র উপর। আসলেই নয়ন্তীকার উপর রক্তিমের অধিকার রয়েছে। যা সে নিজের অজান্তেই রক্তিমকে দিয়ে দিয়েছে সেই কবেই।
---------
রাত আটটা নাগাদ নয়ন্তীকা বাড়ি পৌঁছে'ছে। নৈতিক মুখার্জি তখনও বাড়ি ফেরেননি। নয়ন্তীকা বাড়ি ফেরা মাএই ধমকাধমকির মুখে পড়তে হলো তাকে।যদিও মিসেস আহানা জানতেন নয়ন্তীকা আর রিহার কলকাতা যাওয়ার কথা। তবু মেয়েকে না বকে পারলেন না তিনি। মেয়েটা একেবারে ভিজে একাকার হয়ে বাড়ি ফিরেছে, না বকে থাকা যায়??
রাত তখন ন'টা, নয়ন্তীকা শাওয়ার নিয়ে বেরোলো সবে। বেরিয়েই জোরে একটা হাঁচি দিল। তার ইতিমধ্যে ঠান্ডা লেগে গেছে, এই পর্যন্ত হাঁচি দিয়ে দিয়ে তার নাজেহাল অবস্থা।
নয়ন্তীকা ভিজে টাওয়াল'টা বেলকনিতে মেলে দিয়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। তার কোমর সমান ভিজে চুল গুলো তখন ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সেই দিকে হুশ নেই তার। সে একভাবে তার সামনের টেবিলে রাখা একগুচ্ছ সূর্যমুখী ফুলের দিকে চেয়ে আছে। যা রক্তিম তাকে কিনে দিয়েছিল। মানে ও রক্তিমের দিয়ে আদায় করিয়েছিল আর কি। যদিও সে রক্তিমের কাছে একটা ফুল চেয়েছিল কিন্তু সে তাকে একগুচ্ছ ফুল কিনে দিল। ভেবেই নয়ন্তীকা মিটিমিটি হাসলো। আজকের দিনটা স্বপ্নের মতো ছিল। যেখানে সে আর রক্তিম প্রেমিক প্রেমিকা ছিল। তাদের মধ্যে মান-অভিমান-ভালোবাসা ছিল। হয়তোবা আছে!!! ভেবেই নয়ন্তীকা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে নিল।
নয়ন্তীকা গভীর ভাবনা চিন্তা করতে করতে কখন নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়লো সে টেরই পেল না। তার মা মিসেস আহানা অনেক বল কয়েও নয়ন্তীকা'কে খাওয়াতে পারেননি। নয়ন্তীকার এই এক বদ অভ্যাস —— সে মরার মতো ঘুমায়, কোনো কিছুরই হুঁশ থাকে না তার।
যেহেতু রাতে সে খাইনি তাই নয়ন্তীকার মধ্য রাতে জোরে খিদে পেল। যার জন্য তার গাঢ় ঘুমটা মূহুর্তে হাওয়া। নয়ন্তীকা আলগোছে উঠে বসলো, তারপর ঘড়িতে নজর দিল। দুটো বাজে এখন। যেখানে এই মধ্যরাতে সবাই ঘুমিয়ে কাদা, সেখানে তার সবে সকাল হয়েছে এখন। নয়ন্তীকা আগের জন্মে হয়তো প্যাঁচার বংশধর ছিল। তাই তার এই অবস্থা।
নয়ন্তীকা খেয়াল করলো তার গা গরম, সম্ভবত জ্বর এসেছে। মাথা কেমন ভারি ভারি লাগছে, গা-হাত-পা এ প্রচন্ড ব্যাথা। নয়ন্তীকা ধপাস করে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লো। তারপর হাত বাড়িয়ে ফোন খুঁজলো। মন'টা তার কেমন রক্তিম-রক্তিম করছে। কি ভাগ্যিস সকালে সে নাম্বার'টা রক্তিমের অজান্তেই নিয়েছিল। যা এখন কাজে লাগবে।
নয়ন্তীকা ফোনটা খুঁজে পাওয়া মাএই ফোন লাগালো রক্তিমের নাম্বারে।
চলবে,,,,
আগের পর্ব:
https://www.facebook.com/share/p/1BxDaTZLaq/