ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান আমার ভালোবেসেছে

১৬তম পর্ব

লেখক: অহনিশা ব্যানার্জি

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ১৬

মধ্য রাত তখন, তবে ঘড়িতে ঠিক ক'টা বাজে জানা নেই রক্তিমের। আর না সময় জানার তার মধ্যে কোনো তাড়া দেখা গেল। রক্তিম তখনও ল্যাপটপ নিয়ে অফিসের কাজ করছে। যেহেতু আগের দিন তার অফিস যাওয়া হয়নি, তাই সে এখন বাকি কাজগুলো করেনিছে।

রক্তিম সোফায় বসে কোলের উপর ল্যাপটপ রেখে ঠক্ ঠক্ শব্দে ল্যাপটপের কী বোর্ডে আঙ্গুল চালাচ্ছে। দৃষ্টি তার ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্থির। তখন গভীর রাত হওয়ায় রক্তিমের রুমের ঘড়ি ব্যতীত তার ল্যাপটপের টাইপিং এর শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ রক্তিমের ফোন স্বশব্দে বেজে উঠলো। নিস্তব্ধ পরিবেশে রক্তিমের ফোনের ভাইব্রেশন বেশ জোরালো শোনালো।

রক্তিম পাশে থাকা ফোনের দিকে তাকালো , তারপর ভ্রু কুঁচকে ঘড়ির পানে চাইলো। ঘন্টার কাঁটা তখন দু'টোয়। যা দেখে রক্তিমের ভ্রু আরো কুঁচকে গেল। এই রাতদুপুরে মেয়েটা'র আবার কী দরকার পড়লো?? ভেবেই রক্তিম আলগোছে হাত বাড়িয়ে ফোন তুলে কানে চেপে ধরলো —— “বলো!”

রক্তিমের পুরুষালী গম্ভীর কন্ঠস্বর প্রথমবার ফোনে শুনে নয়ন্তীকার হৃদযন্ত্র তীব্র বেগে ছুটতে লাগলো। তার গলা দিয়ে যেন আওয়াজ বের হতে চাইলো না। তবু নয়ন্তীকা কাঁপা-কাঁপা গলায় সুধালো——“এটা যে আমি বুঝলেন কী করে? আমি তো কিছুই বলিনি এখনও!”

নয়ন্তীকার কথায় রক্তিম মাথা সোফার উপরে এলিয়ে দিয়ে বসলো। তারপর ধীর গলায় বলে উঠলো ——“তুমি আর তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসের সাথে আমি পরিচিত!”

নয়ন্তীকার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে এল। নয়ন্তীকা চোখ বন্ধ করে নিল তৎক্ষণাৎ। তার কেমন কেমন একটা লাগছে। তবে ঠিক কেমন লাগছে বোঝানো মুশকিল। এরপর, বেশ কিছুক্ষণ নিরবতা চললো দুজনের মাঝে। রক্তিম ও কিছু বললো না। শুধু ফোনের অপর প্রান্তের এলেমেলো রমনীর নিঃশ্বাসের তীব্রতা অনুভব করতে লাগলো। তাদের কারোর মধ্যে ফোন রাখার তাড়া দেখা গেল না খুব একটা। এরপর, নয়ন্তীকা বেশ সময় নিয়ে স্বাভাবিক হল। তারপর সে ধীর স্বরে সুধালো—— “ঘুমাননি কেন?”

নয়ন্তীকার প্রশ্নে রক্তিম হাসলো সামান্য। মেয়েটা'র কথা শুনে মনে হচ্ছে তাদের যেন কত পুরোনো প্রেমের সম্পর্ক। নয়ন্তীকা অভিমানী প্রেমিকার মতো তার কাছে কৈফেত চাইছে এক একটা । আর রক্তিম বাধ্য প্রেমিকের ন্যায় তার প্রেমিকার সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।

রক্তিম নিজের চুলে হাত গলিয়ে সেট করতে করতে বললো ——“অফিসের কাজ করছিলাম!!”

“ওহ!!”—— নয়ন্তীকা'র ছোট্ট উত্তর।

“তুমি ঘুমাওনি যে?”

“জ্বরে ঘুম ভেঙে গেছে!”

নয়ন্তীকার অসুখের কথা শুনে একটু চিন্তিত হল রক্তিম। সে বুঝলো, সারাটাদিন বৃষ্টিতে ভেজার দরুন মেয়েটা জ্বর বাঁধিয়েছে। যদিও নয়ন্তীকা'র সাথে সেও ছিল, তারও অসুখ করার কথা। কিন্তু রক্তিমের যে বৃষ্টির জল সয়ে যায়। তার অভ্যাস আছে দীর্ঘক্ষণ ভেজার। কত-শত বৃষ্টিতে তারা মাঠে প্র্যাকটিস সহ ম্যাচ খেলেছে তার হিসাব নেই। প্রথম প্রথম সর্দি কাশি হত তার। এখন সব চলে যায়। ভেবেই রক্তিম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তারপর নিজের চিন্তা গোপন করে নরম গলায় সুধালো——“ওষুধ নিয়েছ?”

রক্তিমের ইহ কথার উত্তর দিল না নয়ন্তীকা। সে তৎক্ষণাৎ পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো ——“আপনি একবার বেলকনিতে আসবেন?”

রক্তিম ঠোঁট এলিয়ে হাসলো সামান্য। কী সুন্দর একটা আবদার! তাদের মধ্যে ভালোবাসা-বাসির কথা স্বীকার করা হয়নি এখনো। তবু, তাদের মধ্যে একে অপরের প্রতি অধিকারবোধ জন্মেছে। না বলেও মনের খবর জানানো হয়েছে, এবং এখনো হচ্ছে।

“বললে না তো? ওষুধ খেয়েছ?”

“আপনাকে দেখলে সব ঠিক হয়ে যাবে!”

নয়ন্তীকার লাজুক কন্ঠস্বর। রক্তিমের ঠোঁটে তখনো মুচকি হাসির রেখা। রক্তিম কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বললো—— “আমি ওষুধ নয় যে! জ্বর সারবে বুঝি?”

“অত-শত জানি না। আপনি আসুন, আমার আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে!!”

-------------

মুখোমুখি অন্ধকার বেলকনির দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই মানব-মানবী। দুজনেই কানে ফোন চেপে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অন্ধকারে দুজনের মুখ স্পষ্ট না দেখা গেলেও তারা একে অপরকে দেখে চলেছে অপলক। অবশেষে নয়ন্তীকা নজর ফিরিয়ে নিল। সেই মুহূর্তে নিরবতা ভেঙে সে বলে উঠলো——“আপনি অন্য দিকে তাকান আমার আপনার দিকে তাকাতে লজ্জা করছে!”

“আচ্ছা ম্যাডাম! আপানার লজ্জাও আছে বুঝি?”

রক্তিমের কথায় বিদ্রুপ স্পষ্ট! যা শুনে মূহুর্তে নয়ন্তীকা'র লজ্জা হম্বিতম্বি করে পালালো। পরিবর্তে একরাশ বিরক্তি এসে ভর করলো। নয়ন্তীকা রাগে নাক ফোলালো, তারপর রক্তিমের দিকে তাকিয়ে মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলো—— “জী না!! নেই!! আমি একটা নির্লজ্জ মেয়ে মানুষ। হয়েছে?”

নয়ন্তীকার ইহ কথায় হেসে ফেললো রক্তিম। যা দেখে নয়ন্তীকা আবার বলে উঠলো—— “মাঝে মাঝে একটু নির্লজ্জ হওয়া ভালো। বুঝলেন??”

নয়ন্তীকার কন্ঠস্বর একটু অন্যরকম। যা শুনে রক্তিমের হাসি উড়ে গেল তৎক্ষণাৎ। সে গভীর চোখে চাইলো নয়ন্তীকার পানে।

“নির্লজ্জ বলেই — এই যে আমি আপনাকে ভালবাসি, কথাটা নির্দ্বিধায় বলতে পারলাম!”

বলেই নয়ন্তীকা ফোন কাটলো, তারপর মূহূর্তে প্রস্থান করলো সেখান হতে। ঘটনা'টা এতই দ্রুত ঘটলো কি সব রক্তিম রক্তিমের মাথার উপর দিয়ে গেল। তারপর যখন রক্তিমের মাথায় হঠাৎ নয়ন্তীকার বলা শেষ কথাটা এল, ওমনি সে ঠোঁট চেপে হেসে ফেললো।

রক্তিম মুচকি হাসতে হাসতে নয়ন্তীকার নাম্বারে একটা ক্ষুদ্র বার্তা পাঠালো—— “ওষুধ'টা যেন মনে করে নেওয়া হয়! আমি আমার নয়নকে সুস্থ দেখতে চাই! বুঝলেন ম্যাডাম?”

রক্তিমের বার্তা দেখে লাজুক হাসলো নয়ন্তীকা, এতক্ষণ সে মহাশয়ের ফোনের অপেক্ষাতেই ছিল। নয়ন্তীকা ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরলো। সে ইতিমধ্যে বুঝে গেছে যে, তার প্রেম রোগের ওষুধ নিতে গিয়ে রোগটা বাড়িয়েছে ভীষন। তার প্রচুর জ্বর হতে চলেছে, তা নয়ন্তীকা বেশ বুঝলো।

পাশাপাশি বাড়িতে থাকা দুই মানব-মানবির প্রেমের সূচনা হলো এই মধ্যরাত'কে সাক্ষী রেখে। তাদের প্রেম শুরু হল অনুভূতিগুলোর অপ্রকাশিত প্রকাশ্যে!!

-----------

সকাল ছ'টা তখন, দাশগুপ্ত বাড়িতে ইতিমধ্যে হইচই পড়ে গেছে। বাড়ির গিন্নি মিসেস রেবা চেঁচিয়ে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছেন। রক্তিম অফিসের কাজ সেরে ঘুমিয়েই ছিল সকাল পাঁচটা নাগাদ। তার মধ্যে এই হট্টগোল শুনে নীচে নেমে হল রুমে বসেছে। পাশেই অনিমেষ দাশগুপ্ত বসে রয়েছেন বেজার মুখে, তিনি অফিসের জন্য বেরোচ্ছিলেন মাএ।

অপরদিকে, রূপকের তো দশটার আগে ঘুম ভাঙে না, সেখানে সেও হইচই এর আওয়াজে হলরুমে এসে ঘুমাচ্ছে। রূপকের দুপাশে টুইটার আর কাজু বসে রয়েছে নিষ্পাপ মুখভঙ্গি করে। যেন তাদের মতো সহজ সরল এই পৃথিবীতে আর একটি নেই। অথচ, এই সাতসকালে দাশগুপ্ত বাড়িতে লঙ্কা কাণ্ড বাঁধিয়েছে এই দুই বিচ্ছু মিলে। সম্ভবত, কাজু কোথাও থেকে বড়ো ইঁদুর ধরে এনে মিসেস রেবা'র রান্না ঘরের বাইরে রেখেছিল।

রেখেছিল বললে ভুল হবে। টুইটার আর কাজু ঝগড়া করছিল ওই মরা ইঁদুর নিয়ে। দুজনে মিলে রান্না ঘরের বাইরের অবস্থা খারাপ করে দিয়েছিল। যা দেখে মিসেস রেবা চিৎকার করতে করতে সবাইকে জড়ো করলেন হলরুমে। তারপর, কাজু আর টুইটারকে দু'ঘা করে দিয়ে রাগে গজ গজ করতে করতে পুরো রান্না ঘর সহ হলরুম পরিষ্কার করেছেন। এরপরও ওনার রাগ যাইনি। যার দরুন বাড়ির সবাইকে এখনো হলরুমে বসিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করে চলেছেন।

“আমি কিন্তু এই চিড়িয়াখানা নিয়ে সংসার করতে পারবো না বলে দিলাম। নয় এই বাঁদররূপী দুই জানোয়ার থাকবে, নয়তো আমি!!”

এতক্ষণ পর্যন্ত চুপ করে ছিলেন অনিমেষ দাশগুপ্ত। কিন্তু প্রতিবারের মতো একই ডায়ালগ শুনে তিনি বিরক্তির সহিত বলে উঠলেন—— “ওহ হো রেবা!! এই বয়সে তুমি কোথায় যাবে?? পাড়া প্রতিবেশীর লোকে শুনলে কি বলবে বলোতো?”

বাবার কথায় রক্তিম কপাল চুলকালো। তখনই নি তার কানে এল মায়ের কন্ঠস্বর—— “হ্যাঁ হ্যাঁ!! তুমি তো চাওই আমি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। তবে না তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে।”

ব্যাস ঝগড়ার মোর ঘুরে গেল। রূপক উঠে দাঁড়ালো, তারপর ছুটলো ঘুমাতে। টুইটার-কাজুও বুঝলো তাদের চর্চা শেষ হয়েছে। তাই তারা নিজের নতুন আকামের উদ্দেশ্যে চললো। শুধু বসে রইলো রক্তিম। তার গুনধর মা-বাবা তখনও তর্ক-বিতর্ক করে চলেছেন। যা দেখে রক্তিম দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এদের একে অপরের ছাড়াও চলে না, আবার একসাথেও চলে না। কি বিচিত্রময় ভালোবাসা!!!

চলবে,,,,,,

আগের পর্ব:

https://www.facebook.com/share/p/15sSZwKnR9/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন