ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান আমার ভালোবেসেছে

১৭তম পর্ব

লেখক: অহনিশা ব্যানার্জি

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ১৭(প্রথম অংশ)

জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ তখন ; আবহাওয়ার তেমন একটা ঠিক ঠিকানা নেই। এই প্রবল ঝড়-বৃষ্টি, তো কখন তীব্র রোদ সহ গরম। এই যেমন আজ ধরনীতে সূর্যের দেখা মিলেছে সকাল সকাল। রোদ'টা পড়ছে যেন লম্বভাবে, তাই তো এই সাত সকালে আকাশ ছোঁয়া গরম !!

এই তীব্র গরম আর চ্যাট-চ্যাটে ভাবের কারণে নয়ন্তীকা চোখমুখ কুঁচকালো। সাথে কোনো ভাঙা রেডিও ও কর্কশ যানবাহনের শব্দে নয়ন্তীকা দুহাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরলো। সে ঘুমের ঘোরেই বিড়বিড় করে উঠলো—— “কোন বলদ আমার ঘরে রেডিও চালিয়েছে এই সাত সকালে!! মা গো, বন্ধ করো এই রেডিও।”

নয়ন্তীকার বলার সাথে সাথেই আওয়াজ'টা দ্বিগুণ জোরে শোনালো। মূহুর্তে নয়ন্তীকা চোখ পিটপিট করে চাইলো। প্রথমেই নজরে এল রক্তিমের কাজু-টুইটার, দুজনে রক্তিমের বেলকনির রেলিং এর ফাঁক থেকে মাথা বের করে তাকেই দেখছে। নয়ন্তীকা ঘাড় ঘোড়ালো, ওমনি নজর এল অটো-টোটো। কর্কশ শব্দ করে যানবাহন যাচ্ছে আর আসছে। যা দেখে নয়ন্তীকা দু হাতের সাহায্যে চোখ মুছলো। সে কি কাল রাতে রাস্তায় ঘুমিয়ে ছিল নাকি? তা মোটেই ভেবে পেল নয়ন্তীকা। ঘুম থেকে উঠেই মেয়েটা যেন ঘোরের মাঝে রয়েছে। তার মধ্যেই হঠাৎ সেই কর্কশ রেডিও ওর আওয়াজ শোনা গেল ——

মনটা করে উরু উরু,

বুকটা করে দুরু দুরু

পরানের বন্ধু যখন পায় রে

আকাশে উড়াল দিয়া

যামু রে ওরে লইয়া

কলিজায় বাজে বোল

তাক ধুমা ধুম ধুম রে

আজ আমার মনটা যে তাই পেখম তুইলা নাচে রে...

নয়ন্তীকা চোখ তুলে চাইলো ভাঙা রেডিয়ো'র পানে। সেটা আর কেউ নয়; তার পাশের বাড়ির বেয়াদব ছেলে রূপক। যে কুটিল হাসির সহিত তার পানেই তাকিয়ে আছে এই মূহুর্তে। যা দেখে নয়ন্তীকা'র আর বুঝতে বাকি রইলো না একটু আগের কর্কশ ভাঙা রেডিও -এর শব্দের উৎস।

নয়ন্তীকা চোখ ছোটো ছোটো করে চাইলো। ঠিক তখনই রূপক আবার তার ফালতু গলায় গান গেয়ে উঠলো ——

ইচ্ছেরা দেয় হামা গুড়ি..

আরে বন্ধু আমার সুন্দরী..হায়

ইচ্ছেরা দেয় হামাগুড়ি,

বন্ধু আমার সুন্দরী

বোবা এই জীবনটা গান গায় রে..

“তোর শেষ হয়েছে?? না আরো গান গাওয়া বাকি আছে?”

নয়ন্তীকার কথায় রূপক দাঁত বের করে হাসলো। তারপর নয়ন্তীকা'কে সুধালো—— “আমার গান তোর খুব ভালো লেগেছে তাই না?”

“তা আর বলতে! ভালো না লেগে উপায় আছে বুঝি? পুরোই রানু মন্ডলের মতো গলা! ভাবছি জি বাংলা'র ’সা রে গা মা পা তে’ তোর নাম পাঠাবো।”

নয়ন্তীকা যে তার গান গাওয়া নিয়ে কৌতুক করছে তা নয়ন্তীকার কথা শুনে বেশ বুঝলো সে, ফলে রূপক চোটে গেল মূহুর্তে। হ্যাঁ তার গানের তেমন কোনো শখ নেই, এখন সে নয়ন্তীকা'কে জ্বালাবে বলেই হেঁরে গলায় গান করছিল। তা বলে এই মঞ্জুলিকা তার উপর হাসবে?? ভেবেই রাগে ফুঁসে উঠলো রূপক।সেও তাচ্ছিল্য করে নয়ন্তীকার উদ্দেশ্যে বললো— “আমাকে ‘সা রে গা মা পা’ তে নিলেও তোকে ‘ডান্স বাংলা ডান্স’ এ নেবে না কখনোই! তোর যা নাচের শ্রী। ছ্যাহ্!!”

শেষের কথাটা রূপক নাক সিঁটকে বললো। যা দেখে নয়ন্তীকা ছ্যাৎ করে উঠলো রাগে। সেও চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো —— “কী বলতো? রত্নের মূল্য জহুরির কাছে!! বাঁদর কি জানে মুক্তর মালার মর্ম!! সেই ব্যাপার'টাই হয়েছে।”

নয়ন্তীকার কথায় রূপক রাগে ফুঁসতে-ফুঁসতে একটা আঙ্গুল উঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো—— “তুই আমাকে বাঁদর বললি?”

“বলার কী আছে? তুই তো আছিসই!”

নয়ন্তীকার ইহ কথায় রূপক গর্জে উঠলো জোরে—— “মঞ্জুলিকা তোকে আমি খুন করবো! শাকচুন্নি কোথাকার!!”

রূপকের গর্জনের সাথে সাথেই তার দুপাশে থাকা কাজু আর টুইটার ও গর্জে উঠলো। যদিও টুইটারের আওয়াজের কাছে কাজুর গলা শোনা গেল না। টুইটারের চিৎকারে নয়ন্তীকার আত্মা কেঁপে উঠলো ভয়ে। কুকুর'টা রেলিং এ উঠে দাঁড়িয়েছে, যেন বেলকনি টপকেই নয়ন্তীকার উপর হামলা চালাবে। ভেবেই নয়ন্তীকা'র ভয়ে গলা শুকিয়ে এল। সে রূপক'কে আঙ্গুল উঁচিয়ে বললো—— “এ বান্টি!! তুই আর তোর চামচা নিয়ে কেটে পড় এখান থেকে। এই সাত সকালে তোর মুখ দেখতে ভালো লাগছে না। সারাটাদিন তো পড়েই আছে এখন, কি জানি কি হবে।”

“হু রে!! তোর চাঁদখানা মুখ দেখাবো বলে মরে যাচ্ছি।

—দাঁড়া, দাদাভাই আসুক! বলবো এইদিকে একটা বড়ো পাঁচিল দিয়ে দিতে। যাতে কোনো শাকচুন্নির মুখ না দেখতে হয়। সকাল'টাই আমার মাটি হয়ে গেল। নিজের ঘরে দোরেও এবার শান্তিতে বসা যাবে না দেখছি।”

রাগে গজগজ করতে করতে রূপক ততক্ষণে প্রস্থান করেছে। তার পিছু পিছু চামচা গুলোও ছুটেছে তখনই। নয়ন্তীকা সেই দিক হতে চোখ ফিরিয়ে পাশে থাকা ফোনের দিকে চাইলো। সকাল দশ'টা বেজে পাঁচ মিনিট তখন।

যা দেখে নয়ন্তীকা মুখ ফোলালো অভিমানে। এতক্ষণ ঝগড়ার চক্করে সে রক্তিমের কথা ভুলেই গিয়েছিল। এবার তার মনে পড়লো, সে রক্তিমের জন্য সকাল সকাল বেলকনিতে এসেছিল একটু দেখা করার জন্য। আর অপেক্ষা করতে করতে দোলনাতেই ঘুমিয়ে পড়লো সে। কিন্তু তার তো উচিৎ ছিল তাকে তুলে দেওয়া। কিন্তু সে তা করেনি। আর না ফোনে এখনো কোনো মেসেজ এসে পৌঁছেছে তার।

নয়ন্তীকার অভিমানে চোখ ছলছল করে উঠলো। তাদের অপ্রকাশিত অনুভূতি গুলো প্রকাশের পর এক সপ্তাহ পেরিয়েছে। এই কয়েক দিনে তাদের না দেখা হয়েছে আর না তেমন কথা হয়েছে। রক্তিম যখন বাড়ি ফিরতো রাতে তখন নয়ন্তীকা ঘুম, আবার যখন সে সকাল সকাল অফিসের জন্য বেরাতো তখনো সে ঘুম। যদিও নয়ন্তীকা শত চেষ্টা করতো বেশি রাত পর্যন্ত জেগে থাকার, আবার সকালে দ্রুত ওঠার। কিন্তু সে কুম্ভকর্ণের ফিমেল ভার্সন হওয়া'র দরুন কখনোই তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যার জন্য তাদের এই কয়েকদিন সাক্ষাৎ ও হয়নি। তবে রক্তিম মাঝে-সাঝে ছোট্ট বার্তা পাঠাতো। কিন্তু প্রেমিকা সুলভ মন এইটুকু তে সন্তুষ্ট হয় বুঝি?

হ্যাঁ মানুষটার ভীষন ব্যস্ততা! নয়ন্তীকা বোঝে। অফিস সামলে মাঠে সময় দেওয়া তার জন্য বড়োই কঠিন তাও সে বোঝে। তাই তো এতদিন সে যেচে বিরক্ত করেনি তাকে। কিন্তু একসপ্তাহ পেরিয়েছে তাদের দেখা হয়নি।এই একসপ্তাহ নয়ন্তীকার কাছে এক যুগের সমান মনে হয়েছে। তার উপর নতুন নতুন প্রেমে পড়লে মন বড্ড বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একটু দুঃখতেই কেঁদে কেটে ভাসিয়ে দিতে মন চায়। আবার একটু সুখে ডানা মেলে আকাশে উড়তে ইচ্ছা হয়। এই সময় মন বড্ড আবেগী হয় কিনা। হ্যাঁ সে প্রেমে অনেক আগেই পড়েছে, তার সাথে এই কান্নাকাটি-অভিমান যায় না এখন। কিন্তু এখন অনুভূতি দ্বিপাক্ষিক!! মানুষটা'কে তার রাগ-অভিমান-দুঃখ দেখানোর অধিকার আছে।

এই মূহুর্তে নয়ন্তীকার অভিমানে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। আজ সে সকাল সকাল উঠে বেলকনিতে এসে বসেছিল শুধুমাত্র রক্তিমের জন্য। তার অফিস যাওয়ার আগে মানুষটা'কে একটু দুঃচোখ ভরে দেখার লোভে। কিন্তু, হায় রে কপাল!!!

নয়ন্তীকা নিজের অনুভূতির সাথে না পেরে উঠে ফুঁপিয়ে উঠলো তৎক্ষণাৎ। তার প্রেমিকা স্বওা বড্ড বেপরোয়া হয়ে উঠলো মূহুর্তে। সে কোনো কিছুর চিন্তা না করেই ফোন লাগালো রক্তিমের নাম্বারে!!

রক্তিমের আজ একটা বড়ো কোম্পানির সাথে ডিল ছিল। যার দরুন সে আর অনিমেষ দাশগুপ্ত সকাল সকাল আজ *** উদ্দেশ্যে বেরিয়ে ছিল। এই কিছুক্ষণ আগে তাদের ডিল ফাইনাল হল। তা শেষ করে বাবার সাথে রক্তিম বেরিয়ে ছিল সবে। ঠিক তখনই নয়ন্তীকার ফোন এল। যা দেখে রক্তিম বাবা'কে বললো——“তুমি গাড়িতে গিয়ে বসো। আমি পাঁচ মিনিটে আসছি।”

বলেই রক্তিম ফোন তুলে কানে ধরলো। এবং সামনের দিকে এগিয়ে গেল। অপরদিকে, অনিমেষ দাশগুপ্ত জহুরির নজরে চেয়ে রইলেন ছেলের যাওয়ার পানে। রক্তিমের চাল চলন কয়েক দিন ধরে সুবিধার মনে হচ্ছে না ওনার।

--------------

“হ্যাঁ বলো!!”—— রক্তিম ফোন কানে ধরে বললো।

কিন্তু ফোনের অপরপাশ হতে নাকটানার আওয়াজ ছাড়া কিছুই শোনা গেল না। রক্তিম ফোনের অপর প্রান্তের নিরবতা দ্বারা বুঝলো মেয়েটা কাঁদছে। সে নরম কন্ঠে সুধালো—— “নয়ন!! কী হয়েছে?”

রক্তিমের নরম কন্ঠস্বর শুনে আহ্লাদি হয়ে উঠলো নয়ন্তীকা। সে আরও জোরে কেঁদে উঠলো। তারপর একের পর এক অভিযোগ করতে শুরু করলো তার একান্ত পুরুষের কাছে —— “আপনি খুউব বাজে! আমার অনুভূতির কোনো দাম নেই আপনার কাছে?? আমি প্রথমে মনের কথা জানিয়েছি বলে এত অবহেলা করছেন বুঝি?”

“তুমি ভুল বুঝছো বাচ্ছা!!”

রক্তিমের শান্ত কন্ঠস্বর। নয়ন্তীকার এতগুলো অপবাদের পরও সে ধৈর্য ধরে বললো। অপরদিকে রক্তিমের কথায় নয়ন্তীকা কান্নারত অবস্থায় বলে উঠলো—— “আপনি ভীষন কষ্ট দিয়েছেন আমাকে!! আপনি আপনার নামের মতোই আমার মনকে রক্তিম করেছেন। আগেও এবং এখনো!”

“আমার ভালোবাসা আমার নামের মতোই!! লাল আভাযুক্ত। যা কষ্ট দেয়, আবার সময়ের সাথে যত্ন আর ভালোবাসাও।”

নয়ন্তীকার কান্না থেমে গেল মূহুর্তে । সে রক্তিমের শীতল কন্ঠস্বর শুনে নাক টানলো। দুজনেরই কিছুক্ষণ কাটলো নিরবতায়। অতি আবেগে ভেসে যা না তাই বলে দিল সে, কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে— এই কয়েক দিনে ব্যস্ততা'র পরেও রক্তিম তার খোঁজ করেছে। নিজের ভুলের কথা ভেবে অনুশোচনা বোধ হল নয়ন্তীকার। সে মিন মিন করে বলে উঠলো——“আমি ওই ভাবে বলতে চাইনি!”

নয়ন্তীকার কথায় রক্তিম ঠোঁট এলিয়ে হাসলো সামান্য। যা ফোনের এপাশ হতে নয়ন্তীকা টের পেল না। রক্তিম স্বভাব সুলভ শান্ত অথচ ধীর স্বরে বললো—— “তোমার মতোই তোমার রাগ-অভিমানও ভীষন সুন্দর ! এতে দুঃখ পাওয়ার কিছুই নেই নয়ন, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ অভিমান দিয়েই হয়। তোমার সকল রাগ-অভিমান আমি মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত আছি, এবং আগামী দিনেও থাকবো। কথা দিলাম!!”

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ১৭(দ্বিতীয় অংশ)

তখন রাত আট'টা, মৃদু বাতাস সহ আকাশে গোল চাঁদ দৃশ্যমান। কুল তলার মোর মাথায় বাচ্ছা থেকে শুরু করে বয়স্কদের আড্ডা জমেছে। বেশ কোলাহলে মুখরিত হয়ে আছে কুল তলা'র অলি গলি। তার মধ্যে কুল তলায় কোথা হতে ক্ষীণ স্বরে ভেসে বেড়াচ্ছে গানের সুর। সম্ভবত কেউ ব্লুটুথে গান চালিয়েছে!!

সেই কেউ'টা আর কেউ নয় নয়ন্তীকা। সাউন্ড বক্সে চলছে তখন ‘আজা নাচলে' র হিন্দি একটা গান — ইষ্ক হুয়া। গানের তালে তালে নয়ন্তীকাও তাল মিলিয়ে চলেছে ক্রমে।

রক্তিম বুকের কাছে দুহাত গুঁজে, নিজের বেলকনির দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে তার প্রতিবেশী বাড়ির রমনীর পানে। নয়ন্তীকা'কে সম্পূর্ণ ভাবে ঠিক দেখা যাচ্ছে না। কখনো মেয়েটা'র আঁকাবাঁকা বিনুনী দেখা যাচ্ছে, কখনো বা ওরনা'র একাংশ। কখনো বা হরিণী চঞ্চল চোখের নয়ন্তীকা'কে দেখা যাচ্ছে অল্পস্বল্প।

এই দৃশ্য রক্তিমের কাছে নতুন নয়। সেই কলেজ পড়ুয়া রক্তিমের কাল থেকে সে লক্ষ করছে মেয়েটাকে। তখন সে পায়ে ঘুঙরু বেঁধে বেশ ধুপধাপ পা ফেলে নৃত্য করতো। আর সেই ঘুঙুরের শব্দ অজানা ঝড় তুলতো কলেজ পড়ুয়া রক্তিমের বুকে।

মেয়েটার চোখের কী কারুকার্য! এক মিনিটে যে কাউকে বশ করে নিতে পারবে অনায়াসে। নয়ন্তীকার ভাসা ভাসা নিষ্পাপ চোখের চাহনিতেই তো রক্তিমের খুন হল সেই যুবক বয়সে। মন সহ রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে ছিল তার প্রতিবেশী বাড়ির কিশোরী এক মেয়ে। ভেবেই রক্তিম মুচকি হাসলো!!

যেহেতু তাদের বাড়ি পাশাপাশি তাই রক্তিমের গান শুনতে মোটেই অসুবিধা হল না, যে গানে নয়ন তাল দিচ্ছে বর্তমানে। রক্তিম ঘাড় কাত করে ডান হাত বোলালো ঘাড়ের পিছনে। আগে মেয়েটা কী সব গানে নাচ করতো, যা রক্তিমের মাথার উপর দিয়ে যেত। তবে এখন সে হিন্দি গানে নাচ করে। মাঝে মধ্যেই দেখেছে রক্তিম।

------------

রক্তিমের ভাবনার মধ্যেই নয়ন্তীকা দেখে ফেলেছে তাকে। ফলে সে পর্দা'র পিছনে গিয়ে লুকালো তৎক্ষণাৎ, লজ্জায় নয়ন্তীকার গাল তখন লাল হয়ে উঠেছে। মানুষটা তবে তাকেই দেখছিল গভীর দৃষ্টিতে। ভেবেই ধুপ ধুপ শব্দ শুরু হল নয়ন্তীকার হৃদ গহীনে।

নয়ন্তীকা একটু নিঃশ্বাস নিয়ে, রয়ে সয়ে উঁকি দিল শুধুমাত্র চোখজোড়া বার করে। ওমনি তার সহজ দৃষ্টি গিয়ে মিললো গভীর দৃষ্টি যুক্ত চক্ষু যুগলের সাথে। নয়ন্তীকা যেন থমকে গেল। চোরে'রা যেমন চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে, ব্যাপারটা ঠিক ওইরকম হয়ে গেল।

রক্তিম নয়ন্তীকা'কে দেখেছে উঁকি-ঝুঁকি দিতে! আর নয়ন্তীকা যে পর্দার পিছনে তখনো লুকিয়ে রয়েছে তা রক্তিম বেশ জানে। ভেবেই সে ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। তারপর পকেট হতে ফোন বার করে ফোন লাগালো নয়ন্তীকার নাম্বারে।

খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি রক্তিম'কে। মেয়েটা সেই মুহূর্তেই তার কল রিসিভ করেছে। যেন সে তার ফোনের অপেক্ষাতেই ছিল।

“বাইরে এসো নয়ন! তুমি যে দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে আছো আমি তা জানি!”

রক্তিম প্রতুত্তরে ফোনের অপর প্রান্ত হতে নিঃশ্বাস ব্যতীত কিছুই শুনতে পেল না। সে বুঝলো মেয়েটা এখন লজ্জায় টু' শব্দ করতে ইচ্ছুক না। যা ভেবেই রক্তিম একপাশে হাসলো সামান্য। তারপর ধীর গলায় সুধালো,,,,

“নয়ন!!”

“হু??”

“আমি কিন্তু আগেও দেখেছি তোমাকে নাচ করতে। স্টেজেও দেখেছি অনেকবার! আমি আমিই তো, তাই না?? এতে অস্বস্তি বা লজ্জা'র কিছুই নেই!”

রক্তিমের ইহ কথায় নয়ন্তীকা চুপ করে থাকতে পারলো না। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলো ——“অস্বস্তি নয়!! তবে কেমন যেন লাগছে। আজকে বোধহয় আপনার সামনে দাঁড়াতে পারবো না। আর আপনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেও, আপনার চোখের দিকে তাকাতে পারবো না।”

নয়ন্তীকার কথায় রক্তিম হেসে ফেললো। সে হেসে বেলকনির রেলিং এ ঠেস দিয়ে পিছন ঘুরে দাঁড়ালো। তারপর ফিসফিসিয়ে বললো—— “কেমন লাগছে?”

“ধ্যাত!! বোঝানো যাবে না!”

নয়ন্তীকা'র বলার ভঙ্গিমা শুনে আবার উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো রক্তিম। তারপর কৌতুকের স্বরে বলে উঠলো—— “আমাদের বাচ্ছা নয়ন দেখি বড়ো হয়ে গেছে !! ”

রক্তিমের কথায় নয়ন্তীকা লাজুক হাসলো। তারপর সে ধীর গতিতে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। যেখান হতে রক্তিমের পুরুষালী পিঠখানা দৃশ্যমান। নয়ন্তীকা সেইদিকে পানে চেয়ে সুধালো— “তা মহাশয়ের দর্শন আজ এত জলদি পেলাম যে??

“কী করবো বলো? পাশের বাড়ির বাচ্ছা মেয়েটা আমাকে না দেখতে পেয়ে কান্নাকাটি করে যা‌ তা অবস্থা করেছে নিজের! না এসে পারা যায় বুঝি?”

রক্তিমের ইহ কথায় রাগে নাক ফোলালো নয়ন্তীকা। সে কানে থাকা ফোন নামিয়ে বেশ উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো —— “রক্তিইইম!!”

নয়ন্তীকার ডাকে রক্তিম ঘুরে তাকালো নয়ন্তীকা'র পানে। মেয়েটা তার পানেই ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। যা দেখে রক্তিম সামান্য হাসলো। মেয়েটা বড্ড আহ্লাদি হয়েছে, সাথে ছিঁচকাদুনি। কথায় কথায় ফ্যালফ্যাল করে কেঁদে ভাসিয়ে দেয়। এই যেমন, এই মুহূর্তেই কেঁদে দেবে-কেঁদে দেবে একটা ভাব করে রেখেছে। তবে মেয়েটা'কে কাঁদলে ভালোই লাগে রক্তিমের, কেমন আদুরে বিড়াল ছানার মতো। কিন্তু এই মূহুর্তে সে মেয়েটাকে কাঁদাতে চাইলো না। রক্তিম বেলকনির রেলিঙে আর একটু ঝুঁকে বেশ নরম গলায় সাফাই গাইতে লাগলো —— “আজ তাড়াতাড়ি কাজ মিটিয়ে এলাম! পাশের বাড়িতে থাকা আমার ব্যক্তিগত চাঁদ'কে সময় দেওয়া হয়না বহুদিন।”

“আহা!!! ঢং!“

বলেই নয়ন্তীকা মুখ বেঁকালো। যা দেখে রক্তিম তৎক্ষণাৎ নয়ন্তীকা'কে উদ্দেশ্য করে গানের সুর তুললো,,,

“ Mere saamne waali khidki mein

Ek chaand ka tukda rehta hai

Afsos ye hai ke vo hamse

Kuchh ukhda ukhda rehta hai”.....

__________________________________

রাত তখন প্রায় ন'টা! অনিমেষ দাশগুপ্ত কাজু'কে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আজ তিনি আর রক্তিম অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছেন অনেক আগে।

হলরুমে বসা মাএই দেখলেন, ওনার স্ত্রী কাজু'কে আচ্ছা মতো ঝাড়ি দিচ্ছেন। মূহুর্তেই কাজু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ব্যস্ত পায়ে।

তিনি ভেবেছিলেন সবসময়ের মতোই কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে সে। এরপর তিনি ফ্রেশ হয়ে এসে শুনলেন কাজু'কে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাস! ওনার চিন্তা হতে শুরু করলো। যতোই যাই হোক, একটা মায়া তো থাকে। আর অনিমেষ দাশগুপ্ত বেশ ভালোবাসেন কাজু'কে। তার উপর এই রাত বিরাতে নিখোঁজ হওয়া ব্যাপারটা পছন্দ হলো না অনিমেষ দাশগুপ্তের। কেননা পাড়ায় কেউ কাজুকে দেখতে পারে না, যদিও তার দুষ্টুমির জন্যই।

ব্যাস! অনিমেষ দাশগুপ্ত তৎক্ষণাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন কাজুর খোঁজ করতে। বেশ খোঁজার পর তাদের বাড়ির ঠিক দুটো বাড়ির পড়েই পাওয়া গেছে তাকে। সে তাদের বাড়ির কার্নিশে বসে ছিল আরামে। তারপর তো অনিমেষ দাশগুপ্ত অনেক বলে কয়ে বাবু-সোনা করে ধরেছেন কাজুকে।

“বুঝলি কাজু, আমার বউ'টা একটু রাগি। তবে তোকে খুব ভালোবাসে। বকলেই ঘর ছেড়ে যাবি না। কেমন?”

অনিমেষ দাশগুপ্তের কথার বিপরীতে কাজুও ‘ম্যাও’ করে উঠলো। এইভাবে দুজনের কথোপকথনের মাঝেই তারা বাড়ি পর্যন্ত এসে পৌঁছালেন। গেট খুলে ভিতরে যাওয়ার সময়ই অনিমেষ দাশগুপ্ত হঠাৎ থেমে গেলেন। তিনি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন রক্তিম আর নয়ন্তীকা'র পানে। যারা কিনা দিন দুনিয়া ভুলে গল্পে ব্যস্ত আছে।

দুজনকে দেখে অনিমেষ দাশগুপ্ত যা বোঝার বুঝে গেলেন মূহুর্তে। ছেলের পরিবর্তনের কারণ'টাও ধরে ফেললেন চট করে। তার চুলে তো আর এমনি এমনি পাক ধরেনি।

বেশ কিছুক্ষণ তাদের হাস্যরত মুখপানে দেখে তিনি বাড়ির ভিতরের দিকে হাঁটা দিলেন। সেই মুহূর্তে তার বুক চিরে বেরিয়ে এল একটা দীর্ঘশ্বাস।

অপরদিকে রক্তিম আর নয়ন্তীকা হাসি-ঠাট্টা, একটু রাগ-অভিমানে, তাদের প্রেমালাপে এতই ব্যস্ত ছিল যে আশেপাশের কোনো খেয়াল ছিল না। তাদের খেয়াল ছিল না মোটেই যে তাদের এই সুন্দর মূহুর্ত পরবর্তীতে কী ঝড় আনতে পারে তাদের জীবনে।

চলবে,,,,,

( রিচেক করা হয়নি, সবাই ভুল এুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ 🥰)

আগের পর্ব:

https://www.facebook.com/share/p/15Y2FwaPos/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন