#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা_ব্যানার্জী
#পর্ব_সংখ্যা ১৮
রাত তখন প্রায় বারো'টার কাছাকাছি। দাশগুপ্ত বাড়িতে সবাই ঘুমে বিভোর হলেও, হলরুমে'র সোফায় বসে আছে দুই বাপ-ছেলে। মূলত, অনিমেষ দাশগুপ্তের হঠাৎ জরুরি তলবের জন্য রক্তিমের এই মুহূর্তে হলরুমে আসা।
অনিমেষ দাশগুপ্ত সোফায় মাথা এলিয়ে বসে রয়েছেন চুপচাপ, দৃষ্টি তার সিলিং ফ্যানের দিকে স্থির। তাকে দেখে মনে হচ্ছে মানুষটা বেশ চিন্তিত।
অনিমেষ দাশগুপ্ত'কে ইহ অবস্থায় দেখে রক্তিম বেশ বিচলিত বোধ করলো। আবার অফিসে কোনো ঝামেলা হলো না তো?? ভেবেই রক্তিম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।
সে বসে আছে প্রায় কুড়ি মিনিট হলো। এতক্ষণ অনিমেষ দাশগুপ্ত'ও একই ভঙ্গিতে বসে রয়েছেন ঠাঁই। যদিও রক্তিম অনিমেষ দাশগুপ্তের জরুরি কথা শোনার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু বাবা'কে কিছু বলতে না দেখে সে একটু অধৈর্য হয়ে উঠলো। এবং সে অনিমেষ দাশগুপ্তকে সুধালো——“বাবা!! সব ঠিকাছে?? তোমাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?”
ছেলের কথায় মাথা তুলে চাইলেন অনিমেষ দাশগুপ্ত। বেশ কিছুক্ষণ ছেলের মুখপানে তিনি চেয়ে রইলেন নিঃশব্দে। অপরদিকে, রক্তিমও চুপচাপ বাবার ভাবভঙ্গি অবকলন করলো শান্ত চোখে।
“তুমি কী প্রতিশোধের জন্য নয়ন্তীকা'কে ব্যবহার করছো রক্তিম? তাহলে বলবো ওইসব করো না।নৈতিকের অপরাধের শাস্তি ওই নিষ্পাপ বাচ্ছা'টাকে দিও না!!”
নয়ন্তীকার কথা ওঠা মাএ রক্তিম ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো বাবা'র মুখ পানে। অনিমেষ দাশগুপ্ত আকার ইঙ্গিতে কি বোঝাতে চাইছেন তা বুঝতে একটুও অসুবিধে হল না রক্তিমের। তবু ইহ মূহুর্তে সে চুপ করে বাবার পানে চেয়ে রইলো। অপরদিকে, ছেলেকে প্রতুত্তর না করতে দেখে অনিমেষ দাশগুপ্ত আবার বলে উঠলেন—— “এখন দুই বাড়ির মধ্যে যতই অশান্তি হোক না কেন, নয়নকে আমি নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসি! এই কথাটি ধ্রুব সত্য। আমার মেয়ের সখ পূরণ করেছে নয়ন। তাকে কষ্ট দিও না রক্তিম!”
বাবার কথায় রক্তিমের কুঁচাকানো ভ্রু জোড়া আরো কুঁচকে গেল। তার বাবা সবসময় উল্টো'টাই কেন ভাবেন, বুঝে উঠতে পারলো না রক্তিম। সে বাবার কথায় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তারপর বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে গম্ভীর কন্ঠে সুধালো——“তোমার নিজের শিক্ষা'র ওপর অবিশ্বাস আছে?”
“তা নয়!! তবে, বাবা'র মন তো; একটু ভয় হয়।”
বাবার কথায় রক্তিম মাথা নীচু করে ঘার চুলকালো। ব্যাপার'টা হয়ে গেল — মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি।
রক্তিম মনের কথা মনেই রাখলো! এই রাতদুপুরে বাবা'কে আর ঘাঁটাতে চাইলো না। সে আলগোছে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ব্যস্ত পায়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে উঠলো—— “শুধু শুধু চিন্তা করো না বাবা । রক্তিম নিজের জিনিস'কে যত্নে রাখতে জানে। তোমার আদরের-সখের মেয়ের ও তার মন ভালো রাখার দায়িত্ব নাহয় আমি নিলাম!”
------------------------------
সময় প্রবহমান, ইতিমধ্যে দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কয়েকটা দিন। সেই দিন সোমবারের এক ব্যস্ত বেলা, তখন ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে বারো'টা বেজে পাঁচ মিনিট। মুখার্জি বাড়িতে প্রতিদিনের তুলনায় আজকের দিনটা একটু ভিন্ন। এই যেমন; আজ নয়ন্তীকা বেলা দশটা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমাইনি। আবার, আজকে নৈতিক মুখার্জি অফিস যাননি প্রতিদিনের মতো। তারপর, আজকে রান্না ঘরে এলাহি কান্ড চলছে একেবারে।
কারন একটাই; বাবার কোন বন্ধু নাকি আসছে। নয়ন্তীকা যতদূর শুনেছে বাবার নতুন কোনো বিজনেস পার্টনার ও তার স্ত্রী। আর এই খুশিতে তার মা জননী সাত সকালে তাকে ঘুম থেকে তুলে দিয়েছেন, আবার তিনি এইটুকুতেই ক্ষ্যান্ত হননি। নয়ন্তীকা'কে সাতসকালে শাড়ি পড়িয়ে তবে থেমেছেন মিসেস আহানা।
এতে নয়ন্তীকা অবশ্য বেশ বিরক্তই হয়েছে। কে না কে আসবে, যাকে নয়ন্তীকা চেনেও না। তাদের জন্য তাকে সং সেজে বসে থাকতে হচ্ছে। ভেবেই নয়ন্তীকা বিরক্তিতে মুখ কুঁচকালো।
সে অন্তর্মুখী স্বভাবের হওয়ায় সবার সাথে অত মিশতে পারে না। তার উপর আত্মীয় স্বজনদের সাথে কথা বলতেও কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হয় নয়ন্তীকার। আগে বাড়িতে কোনো আত্মীয় আসবে জানলে, নয়ন্তীকা আগেভাগে স্কুল কেটে পড়তো। আজকেও সে এই কারনে কলেজ যেতে চাইলো। তবে নৈতিক মুখার্জির বকাঝকা শুনে আর যাওয়া হল না। নয়ন্তীকার বাবার মতে— নয়ন্তীকা কলেজ গিয়েও ফেলই করবে। তার চেয়ে না যাওয়াই ভালো।
বাবার কথা নয়ন্তীকা'র মনে পড়ে যাওয়ায় নয়ন্তীকা'র বেশ মন খারাপ হল। আর এই মনখারাপ তাড়াতেই নয়ন্তীকা নিজেকে আয়নায় ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলো।
বর্তমানে নয়ন্তীকার পরনে সাদা রঙের জামদানির সাথে খয়েরী রঙের ব্লাউজ রয়েছে। লম্বা চুল গুলো ঢিলা বেণী করে একপাশে ঝুলছে। দুহাতে হাতে ডজন খানেক খয়েরী চুড়ি, কানে দুটো ছোট্ট ঝুমকো। কপালের মধ্যিখানে একটা ছোট্ট খয়েরী টিপ আর চোখে গাঢ় কাজল। ব্যাস, নয়ন্তীকার সাজ এইটুকুই। সে কোনো রকম প্রসাধনী ব্যবহার করেনি। তাছাড়া সে আগেও ওইসব ব্যবহার করতো না।
নয়ন্তীকা নিজেকে মুগ্ধ চোখে দেখলো। ওমনি মনে প্রশ্ন জাগলো— রক্তিম এই রূপে তাকে দেখে নিশ্চয়ই অজ্ঞান হয়ে যাবে? ভেবেই নয়ন্তীকা মিটিমিটি হাসলো। মহাশয়ের আবার প্রিয় রঙ সাদা!
নয়ন্তীকার প্রেমিকা স্বওার মূহুর্তে ইচ্ছা হলো — তার প্রিয় মানুষ তাকে একবার দেখুক। সে দেখুক তার প্রেমিকা তার প্রিয় রঙে নিজেকে রাঙালে ঠিক কেমন দেখতে লাগে।
নয়ন্তীকা নিজের ইহ চিন্তাভাবনায় নিজেই লজ্জায় ফুলে ফেঁপে উঠলো। তার এই মূহুর্তে ইচ্ছা করছে রক্তিমের কাছে ছুটে যেতে। আবার তার সামনে পড়লেই তাকে একরাশ লজ্জা ঘিরে ধরে। কী অদ্ভুত অনুভূতি!!! নয়ন্তীকার কাছে এইগুলো একেবারেই নতুন। তবে এই অনুভূতিগুলো সুন্দর ও মিষ্টি। প্রেমে পড়লে যে নিজেকে এইরকম পাগল পাগল লাগে তা একেবারেই জানাছিল না নয়ন্তীকা'র।
রক্তিম এখন নিশ্চয়ই অফিসে। অবশ্য রক্তিমের সহিত নয়ন্তীকা'র সকাল থেকেই কোনোরকম কথা হয়নি। তবে আগের দিন তাদের কথোপকথনের মধ্যে রক্তিম জানিয়েছিল যে আজ তার একটা ইম্পর্টেন্ট ডিল আছে। সে সূএে মহাশয় নিশ্চয়ই সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়েছে তাও নয়ন্তীকা বেশ জানে। তার ইহ মূহুর্তে ফোন করার ইচ্ছা হলেও, নয়ন্তীকা তা করলো না। কেননা এতদিনের তাদের সম্পর্কের মধ্যে তারা দুজনে দুজনের সব খবরা খবরই জানে। এবং তাদের একটা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত করা আছে একে অপরের জন্য। যাতে তাদের কাজে আর পড়াশোনায় কোনোরকম ক্ষতি না হয়। তাই নয়ন্তীকা ভেবে নিল রক্তিম অফিস থেকে না আসা পর্যন্ত সে এই শাড়ি খুলবে না। সে রক্তিমকে একেবারে চমকে দেবে এই লুকে। ভেবেই নয়ন্তীকা লাজুক হাসলো।
__________________________
বিকেল পাঁচটা তখন, নয়ন্তীকা'র বাড়ির হল রুমে হাসি আড্ডা চলছে। মিসেস রেবা রান্না ঘরে অতিথিদের জন্য জলখাবারের ব্যবস্থা করছেন। আর নয়ন্তীকা রান্নাঘরের এককোনে দাঁড়িয়ে বিরক্তিভরা চোখে মাকে দেখে চলেছে।
হ্যাঁ, সে জানে অতিথি দেবতার মতো। কিন্তু এই অতিথিদের জ্বালায় আজকে তার বারোটা বেজে গেছে। যার জন্য নয়ন্তীকা বিরক্ত না হয়ে পারলো না।
বাবার কলিজার বন্ধু'র আসার কথা ছিল দুপুরে। নয়ন্তীকার বাড়িতে তাদের মধ্যাহ্ন ভোজের নিমন্ত্রণ ছিল। কিন্তু ওনারা কোনো অসুবিধা থাকায় আসতে পারেননি। অবশ্য নয়ন্তীকা'র এই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে এখন তাকে তার মা জননী রান্নাঘরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন সাহায্যের জন্য। যা মোটেই ভালো লাগেনি নয়ন্তীকা'র।
“নয়ন, যা একটু ওনাদের চা দিয়ে আয়!”— মিসেস আহানা চায়ের ট্রে এগিয়ে দিয়ে বললেন।
“মা, তুমি যাও না!”
নয়ন্তীকা'র বিরক্তি ভরা কন্ঠস্বর। যা দেখে মিসেস আহানা চোখ রাঙালেন। এতে একটু কাজ হল বটে। মায়ের রাগি চোখ দেখে নয়ন্তীকা চায়ের ট্রে নিয়ে সুরসুর করে বেরিয়ে গেল রান্না ঘর হতে। মিসেস আহানাও হালকা খাবার নিয়ে হাঁটা ধরলেন মেয়ের পিছনে।
বসার ঘরে গিয়ে নয়ন্তীকা সবাইকে চা এগিয়ে দিল এক এক করে। বাবার বন্ধু সহ ওনার স্ত্রী আর ছেলে এসেছে। যার দরুন নয়ন্তীকা অস্বস্তিতে একটু গুটিয়ে গেল। সে ট্রে'টা টেবিলে রাখার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত মহিলাটি বলে উঠলেন —— “নাম কী মা?”
“নয়ন্তীকা মুখার্জি!”
“বাহ!! খুব সুন্দর নাম।”
— এদিকে এসো দেখি।”
ভদ্রমহিলার কথায় নয়ন্তীকা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল ওনার দিকে। তখন তিনি নয়ন্তীকা'র চিবুক ছুঁয়ে বলে উঠলেন—— “নৈতিক দা, আপনার মেয়ে তো ভারী মিষ্টি!”
বলেই তিনি নয়ন্তীকা'র হাতখানা টেনে নিজের পাশে বসালেন। ব্যাস!! নয়ন্তীকা অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করে উঠলো। ভদ্রমহিলার পাশে বসাতে নয়ন্তীকার অসুবিধা নেই। তবে তার দামড়া ছেলের পাশে বসাতে নয়ন্তীকার মারাত্মক অস্বস্তি হলো। অর্থাৎ সে মা ছেলের মাঝে বসে রয়েছে ইহ মূহুর্তে।
নয়ন্তীকার রাগ হল মায়ের উপর। বড়োদের মাঝে তার কী কাজ এখানে? সং সেজে বসে থেকে লাভ কী? মোটেই ভেবে পেল না নয়ন্তীকা। তবে সে ইহ মূহুর্তে টু শব্দ করলো না। ভদ্রতার খাতিরে নয়ন্তীকা চুপচাপ রইলো!
অনেকক্ষন হাসি ঠাট্টা চলছিল,অবশ্য নয়ন্তীকা মূর্তি সেজে বসে ছিল শুধু। তো তাদের কথোপকথনের মাঝেই ভদ্রমহিলা নয়ন্তীকা'কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন—— “যাও মা, অভ্রকে তোমার রুমে নিয়ে যাও! কিছুক্ষণ নাহয় কথা বলো দুজনে। তোমরা বড়োদের মাঝে বিরক্ত হচ্ছো হয়তো।”
“কে অভ্র?”
নয়ন্তীকার সরল প্রশ্ন! যা শুনে ভদ্রমহিলা খিক খিক করে হেসে উঠলেন, হাসলেন বাবার বন্ধুও। শুধু বারোটা বেজে ছিল তার মা-বাবার মুখের।
“আমার ছেলে!”
ভদ্র মহিলা আঙ্গুল উঁচিয়ে নয়ন্তীকার বাম দিকে ইশারা করলেন। নয়ন্তীকা সেই দিকে একপলক চাইলো, ছেলেটা ড্যাবড্যাব করে তার পানেই তাকিয়ে আছে! নয়ন্তীকা চোখ ফিরিয়ে নিল, ওমনি মনে পড়লো ভদ্রমহিলার কিছুক্ষণ আগে বলা কথা। ব্যাস! মূহুর্তে নয়ন্তীকা'র মাথা গেল গরম হয়ে। আরে ভাই ঘরের অভাব পড়েছে নাকি, তার বিরক্ত লাগলে সে যাক না জাহান্নামে। নয়ন্তীকার কী দায় পড়েছে! তাছাড়া, চেনা নেই জানা নেই তার সাথে আবার কীসের গল্প ভাই। ভেবেই নয়ন্তীকা রাগে ফুঁসে উঠলো। সে রাগি চোখে তাকালো মায়ের দিকে, যিনি এখন নয়ন্তীকা'কে চোখের ইশারায় হ্যাঁ বোঝাচ্ছেন। এবার নয়ন্তীকা একটু আশায় বাবার দিকে চাইলো। বাবা নিশ্চয়ই কোনো অজানা ছেলের সাথে গল্পগুজব করার অনুমতি দেবে না!
কিন্তু নয়ন্তীকা'র ধারনা ভুল হলো। নয়ন্তীকা নৈতিক মুখার্জির পানে চাওয়ার সাথে সাথেই তিনি গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন—— “যাও!”
অগত্যা নয়ন্তীকা'কে যেতে হলো। পিছনে কি অভ্র না টভ্র সেও হাঁটছে। নয়ন্তীকা সিঁড়ি দিয়ে যেতে যেতে ভেবে নিল— ব্যাটাকে তার ঘরে পুরে দিয়ে, সে একটু ছাদে ঘুরে আসবে।
-------------------
“তোমার নাম কী বেশ ?”
নয়ন্তীকা উড়ে এসে জুড়ে বসা অতিথিকে সোফায় বসতে দিয়ে বেরোচ্ছিল সবে। কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে সে ঘুরে চাইলো তার পানে। তারপর নয়ন্তীকা বেশ ঝাঁঝালো গলায় বললো —— “ফুল কুমারী!”
“কিন্তু তখন তো তুমি নয়ন্তীকা বলেছিলে !”
“হ্যাঁ, যখন জানেন জিজ্ঞাসা করছেন কেন?”
বলেই নয়ন্তীকা উল্টো ঘুরে হাঁটা দিল। ওমনি লোকটা আবার বলে উঠলো— “নয়ন কোথায় যাচ্ছো?”
মূহুর্তে চটে গেল নয়ন্তীকা! এই আপদটাকে তার এখন মোটেই ভালো লাগছে না। নয়ন্তীকা নিজের রাগকে সামলে তেজি গলায় বলে উঠলো—— “নয়ন্তীকা!!! আমার নাম নয়ন্তীকা!”
“ওই একই হলো!”
“জি না!! ওই নামে আমার কাছের মানুষরা ডাকে!”
নয়ন্তীকার কথায় অভ্র হাসলো অদ্ভুত ভাবে। তারপর নয়ন্তীকা'র উদ্দেশ্যে বলে উঠলো—— “বেলকনিতে যাই?? এখানে বড্ড গরম!”
“আপনি যেখানে খুশি যান! আমাকে বলছেন কেন?”
“কারন, আমাদের মা-বাবা আমাদেরকে কথা বলতে পাঠিয়েছে উপরে। তাছাড়া, তোমার কোনো কথা না বলার থাকলেও। আমার আছে!”
বলেই অভ্র হেঁটে গেল বেলকনিতে। যা দেখে নয়ন্তীকাও ধীর পায়ে হাঁটা ধরলো। কেননা অভ্র যদি নীচে গিয়ে বলে দেয় সে বাজে ব্যবহার করেছে তার সাথে, তাহলে নয়ন্তীকার কপালে দুঃখ থাকবে।
________________________________
“আমার তোমাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। নামের মতোই তুমি খুব সুন্দর। আর এই সাদা রঙের শাড়িতে তোমাকে দ্বিগুণ সুন্দর লাগছে!”
বেলকনিতে ঢোকার সাথে সাথেই এমন কথা শুনে বাকহীন হয়ে গেল নয়ন্তীকা। মূহুর্তে রাগও হল তার। সে মুখ খুললো কিছু ভালো মতো শুনিয়ে দিতে। কিন্তু তার আগেই অভ্র আবার বলে উঠলো—— “যেহেতু আমাদের বিয়ের কথা চলছে। আমার তোমাকে পছন্দ, তাই বিয়েটা হচ্ছে। সেহেতু আমি তোমার কাছের মানুষ হলাম। এবার তোমাকে নয়ন ডাকতে পারি নিশ্চয়ই?”
নয়ন্তীকা থম মেরে দাঁড়িয়ে গেল। তার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল মূহুর্তে। বার বার কানে বাজতে লাগলো অভ্রের বলা কথা—— আমাদের বিয়ে চলছে।
নয়ন্তীকা'র রাগে দুঃখে কান্না পেয়ে গেল। সকাল থেকে এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া এক একটা ঘটনা সব চোখের পাতায় ভেসে উঠলো নয়ন্তীকার। এবার তার কাছে সব স্পষ্ট হয়ে গেল। কেন তার মা এত জোর করে তাকে শাড়ি পড়ালো, কেন তাকে দিয়ে চা দেওয়া করালো। ভেবেই চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠলো নয়ন্তীকার। তার মা-বাবার উপর বেশ অভিমান হলো। তাকে একটা বার জিজ্ঞাসা করা গেল না? অত্যন্ত একটা বার তাকে জানানোর প্রয়োজন বোধও করলো না তারা। তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তার নেই বুঝি?
“হেই বিউটিফুল!! কোথায় হারিয়ে গেলে?”
—— ড্যাম!! তোমার অবিরাম পলক ঝাপটানোর ব্যাপারটা তো বেশ সুন্দর!
নয়ন্তীকা রাগি চোখে তাকালো, তার ইচ্ছা হল কঠিন কিছু শুনিয়ে দিতে। কিন্তু তার কিছু বলার আগেই পাশের বেলকনি থেকে জোরে শব্দ হল। নয়ন্তীকা আর অভ্র দুজনেই চাইলো সেদিক পানে।
ওমনি নয়ন্তীকার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে এল! তাদের ঠিক সামনেই রক্তিম দাঁড়িয়ে । নামের মতোই তার চোখ-মুখ অসম্ভব লাল এই মুহূর্তে। তার হাত মুষ্টিবদ্ধ থাকায় শিরা গুলো কেমন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। মেঝের উপর কফি মগের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যা দেখে নয়ন্তীকা'র বুঝতে বাকি রইলো না কী হয়েছে!
চলবে,,,,
আগের পর্ব:
https://www.facebook.com/share/p/192tJnNAeK/