ফন্ট সাইজ:
থিম:
পরান আমার ভালোবেসেছে

২২তম পর্ব

লেখক: অহনিশা ব্যানার্জি

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ২২(প্রথম অংশ)

“কত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা!!! তাই না??? আমি তোমাদের অন্ধের মতো বিশ্বাস করি আর ভালোবাসি বলে কী?”

বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো নয়ন্তীকা। যা দেখে নৈতিক মুখার্জি মুখ বেঁকালেন । ততক্ষণে হলরুমে ভিড় জমিয়েছে সকলে, পরিস্থিতি একেবারে থমথমে। অপরদিকে , মিসেস আহানা সোফার এককোনে বসে রয়েছেন। তিনি চুপচাপ দেখে চলেছেন তার আপন মানুষগুলোর লীলাখেলা।

“তোমার থেকে এটা আশা করিনি দিদুন!!! তোমাকে কতো ভালোবাসি আমি, সেই তুমি কিনা আমার কথা একবারও ভাবলে না।”

— আমার নিজের জীবনের সিধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার নেই কী?? তোমরা কেন বুঝছো না!!! থাক, কোনোদিন বোঝোনি আর বুঝবেও না। আমি আর এক মুহূর্তও এখানে থাকতে ইচ্ছুক নই।

বলেই নয়ন্তীকা উঠে দাঁড়ালো তৎক্ষণাৎ। কীভাবে, কখন, কথায় যাবে — সে জানে না। তবে, এই মুহূর্তে এই বাড়িতে সে থাকবে না এটা ফাইনাল।

“ ঠিকই বলেছ দাদুভাই! আমি তোমাকে বুঝতে পারিনি। আমি খুব বাজে দিদুন। আমরা সবাই খুব বাজে! নিজেদের সিদ্ধান্ত তোমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছি!”— বলেই নয়ন্তীকার বয়স্কা দিদুন হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন।

যা দেখে নয়ন্তীকার পা জোড়া থেমে গেল আপনাআপনি। সে অশ্রু ভেজা চোখে দিদুনের দিকে তাকিয়ে রইলো। তখনই তার দিদুন কান্নারত গলায় আবার বলে উঠলেন —“কিন্তু কেন, আমরা তোমার উপর আমাদের সিধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছি তা জানতে চাইবে না?”

নয়ন্তীকা প্রতুত্তর করলো না। সে চুপচাপ অশ্রু ভেজা চোখে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো। নিরবতা সম্মতির লক্ষণ ভেবে— বয়স্ক দিদুন নয়ন্তীকার হাত টেনে ধরে নিজের পাশে বসালেন।

তারপর তিনি কান্নারত গলায় বলতে শুরু করলেন——“তুমি জানো তোমার বাবা ওই অনিমেষ আর তার ছেলেকে পছন্দ করে না ! তারা...

“হ্যাঁ!! আর তাই বাবার অপছন্দের মানুষকে আমার মনে জায়গা দেওয়া পাপ হয়েছে! তাকে ভালোবাসা অন্যায় হয়েছে।”— নয়ন্তীকা দিদুনের কথা শেষ করার আগেই নিজে বলে ফেললো। তারপর গা দুলিয়ে কেঁদে উঠলো বোবা কান্না।

“আহা!! দিদিভাই, আমি তা বলছিনা। হ্যাঁ, কাউকে ভালোবাসা অন্যায় বা পাপ নয়। কিন্তু ভুল মানুষকে ভালোবাসা অন্যায়। আর তুমি নিজের সাথে সেই অন্যায়'টাই করছো।”

—— “আচ্ছা যার জন্য তুমি এত অশান্তি করছো সে আদেও তোমাকে ভালোবাসে তো?”

দিদুনের কথায় নয়ন্তীকা প্রশ্ন বোধক দৃষ্টিতে তাকালো দিদুনের পানে। মানে দিদুন বলতে কী চাইছে?? নয়ন্তীকা একাই পাগল তার জন্য। সে রক্তিমের পিছনে যেচে ঘুরঘুর করে?

এইসব ভাবনা চিন্তার মধ্যেই নয়ন্তীকা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলো চুপচাপ। অপরদিকে, হলরুমে উপস্থিত সবাই চুপচাপ ঘটনা দেখে চলেছে। মিসেস আহানার ভাই'রা এবং নৈতিক মুখার্জি গাম্ভীর্যের আড়ালে কুটিল হাসির সহিত বসে রয়েছেন চুপচাপ। কেননা তারা জানে যে তাদের মা কতটা চালাক। মিষ্টি মধুর কথায় তিনি মানুষকে ভালোই বশে আনতে পারেন। তাই তারা নিশ্চিন্তে রয়েছেন আপাতত।

— “রক্তিম তোমাকে ভালোবাসে না দিদিভাই! সে শুধু তোমার বাবাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ভালোবাসা'র নাটক করছে।”

দিদুনের কথায় নয়ন্তীকা তৎক্ষণাৎ অবিশ্বাস্য নয়নে চাইলো দিদুনের পানে।

— হ্যাঁ দিদিভাই!!! এটাই সত্যি।

আচ্ছা, ভাবো তো দুটো পরিবারের সম্পর্ক হঠাৎ কেন ভেঙে গেল? কারণ, অনিমেষ দাশগুপ্ত তোমার বাবার সাথে বেইমানি করেছে। রক্তিমের বাবা ছলচাতুরি করে তোমার বাবার বিজনেসের সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছে। এই কারণেই দুটো বাড়িতে দ্বন্দ চলে আসছে। অনিমেষ দাশগুপ্তের একটাই উদ্দেশ্য ছিল — তোমার বাবাকে কষ্ট দেওয়া। এখন তার ছেলেরও একই উদ্দেশ্যে। সে তোমার বাবার মান সম্মান ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য তোমার সাথে ভালোবাসার নাটক করছে। আমরা সবাই তোমাকে ভালোবাসি বলেই তোমাকে এই বড়ো ঝড় থেকে বাঁচিয়ে দিতে চাইছি। এবার তুমি বাকিটা বুঝে নাও। এই সব জানার পরও যদি তুমি রক্তিমের সাথে থাকতে চাও— তাহলে তাই হবে! তোমার সিধান্তই শেষ সিধান্ত!

নয়ন্তীকা থম মেরে বসে রইলো সেই মুহূর্তে। চোখ থেকে অবিরাম অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তখন। রক্তিমের গাদা গাদা কেয়ার, অ্যাটেনশন সব মিথ্যে ছিল?? সে কখনো তাকে ভালোবাসিনি?? পারিবারিক শএুতার জন্য রক্তিম তার সাথে এইগুলো করলো??— নয়ন্তীকা ভাবতে ভাবতে দুহাতে নিজের মাথা চেপে ধরলো

নয়ন্তীকার এই করুন পরিস্থিতি দেখে নৈতিক মুখার্জি মন মনে কুটিল হাসলো। সে চাইলেই ঢাকঢোল পিটিয়ে ঝামেলা করতে পারতো অনিমেষের সঙ্গে। কিন্তু সে তা করেনি। কাউকে কিছু বুঝতেই দেয়নি। নিরবতার সহিত সে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিচ্ছে। যাতে, সাপও মরে যাবে আর লাঠিও ভাঙবে না!!

“এবার বলো দিদিভাই!! তুমি এখনো বলবে তুমি রক্তিমকে ভালোবাসো? তোমার বাবার ভালোবাসা'র কিছু নয়??? তোমার জন্মদাতা, যে তোমাকে এত বড়ো করেছে তার জন্য তুমি রক্তিমকে ভুলতে পারবে না?? বলো দিদিভাই!!! তুমি এখনো বলবে তুমি তাকে ভালোবাসো?”

দিদুনের কথায় নয়ন্তীকার চোখমুখ তৎক্ষণাৎ শক্ত হয়ে গেল। হ্যাঁ!! মন মানতে চাইছে না যে সে তাকে ভালোবাসে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে স্বীকারোক্তি দেয়নি এটাও তো সত্যি। সে দুই বাড়ির পারিবারিক দ্বন্দ্বের কথা তাকে বলতে চায়নি—— তাহলে দিদুন সত্যিই বলছে!!!

ভেবেই নয়ন্তীকা রাগে-দুঃখে চোখ মুখ শক্ত করে নিল। সে দৃঢ় গলায় বলে উঠলো —— “আমি যেমন ভালোবাসতে পারি! তেমন দ্বিগুণ যত্নে ঘৃণাও করতে পারি। হ্যাঁ!! আমার পক্ষে তাকে ঘৃণা করা সম্ভব নয়। তবে অসম্ভব কিছুও নয়!”

বলেই নয়ন্তীকা গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। সেইদিক পানে চেয়ে নয়ন্তীকার দিদুন কুটিল হাসলেন। সাথে নৈতিক মুখার্জি সহ তার শালাবাবুরাও হাসলেন বিজয়ের হাসি। নয়ন্তীকা'কে এখানে আনা তবে সফল হলো।

অপরদিকে, মিসেস আহানা শান্ত চোখে লোভী-স্বার্থপর মানুষগুলোকে দেখে গেলেন চুপচাপ। তিনি ধৈর্য নিয়ে দেখতে চাইছেন এরা আর কতো নীচে নামতে পারে। আর তিনি তাই করছেন।

#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে

#অহর্নিশা_ব্যানার্জী

#পর্ব_সংখ্যা ২২(দ্বিতীয় অংশ)

স্বর্ণালী সন্ধ্যা তখন, সারাদিনের তুমুল বর্ষনের পর আকাশের বুকে একফালি বাঁকা চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। ঘড়িতে বিকেল সাড়ে ছ'টা সবে! মিসেস আহানা'র বাপের বাড়ি ইতিমধ্যে রঙিন আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে।

অভ্র এবং তার পরিবার সম্ভবত সাতটা নাগাদ এসে পৌঁছাবে রেজিস্ট্রি অফিসে। হালদার বাড়ির থেকে কিছুক্ষণের পথ, দু পা হেঁটেই যাওয়া যায়। তাই কাগজে কলমে বিয়েটা রেজিস্ট্রি অফিসে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই বাড়ির পরিবার। যার দরুন, বাড়ির পুরুষ লোকজন কাগজ পত্রের সুবিধার্থে আগেই চলে গেছে সেথা।

ছেলেপক্ষ রেজিস্ট্রির পর বাড়িতে আসবেন। তাদের জন্য সামান্য আয়োজন করা হয়েছে। তাই নয়ন্তীকা'র দিদুন আহেলী হালদার বাড়ির বউ সহ কাজের মেয়েদের দিয়ে কাজ সেরে নিচ্ছেন দ্রুত। যেহেতু আজকে শুধু রেজিস্ট্রি হবে। তাই, অতিথি বলতে ছেলে আর মেয়ের বাড়ির লোকজন। সুতরাং, অল্প লোকজনের আয়োজন করা হচ্ছে আপাতত।

আহেলী হালদার কাজের মেয়েদের নির্দেশ দিতে দিতে, একফাঁকে বড়ো বউকে বললেন—— “বউমা গিয়ে নয়ন্তীকা'কে রেডি করিয়ে দাও। আর গিয়ে আহানাকে একটু জানিয়ে দাও আমরা কিছুক্ষনের মধ্যেই বেড়োবো!”

--------------

নয়ন্তীকা'র মামী উপর ঘরে যাওয়ার ঠিক পনেরো মিনিটের মাথায় তাড়াহুড়ো করে নীচে নেমে এলেন। ওনার চোখে মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট!! পিছনে চুপচাপ মিসেস আহানাও নেমে এলেন। ভাবভঙ্গি একেবারেই শান্ত। ওনার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই মনে কী চলছে।

“মা!!! নয়ন্তীকা উপরে নেই!”

আকস্মিক বউমার কথা শুনে আহেলী হালদার ভ্রু কুঁচকে বউমার দিকে তাকালেন ! তারপর বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন — “ওপরে নেই মানে??”

“হ্যাঁ মা!! আমি ওপরের সবকটা ঘরে খুঁজেছি। ও কোথাও নেই।”

তারপর আহেলী হালদার চোখ বড়ো বড়ো করে চাইলেন মিসেস আহানার দিকে। তারপর উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন —— “তোমরা সবাই নীচের ঘরগুলো আর বাইরের দিকটা দ্রুত দেখে এসো।”

আহেলী হালদারের এই কথা বলার সাথে সাথেই সবাই ছুটলো বাড়ির আনাচে কানাচে নয়ন্তীকার খোঁজে। হলরুমে রইলেন শুধু আহেলী হালদার আর মিসেস আহানা। এই ফাঁকে আহেলী হালদার মেয়েকে সুধালেন—— “আমার নাতনী কোথায় আছে আহানা? ও কোথায় গেছে?”

মায়ের কথায় মিসেস আহানা হেঁটে গিয়ে মায়ের ঠিক সামনের সোফাটায় গা এলিয়ে বসলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন —— “আমার থেকে ভালো তো তোমাদের জানার কথা। আমি কিছুই জানি না মা।”

--------

রাত আটটা তখন, হালদার বাড়ির পরিস্থিতি একেবারেই থমথমে। আহেলী হালদার সোফার এককোনে মাথায় হাত দিয়ে বসে রয়েছেন। নৈতিক মুখার্জি সহ তার শালাবাবুরাও বেজার মুখে বসে রয়েছেন একভাবে মেঝের দিকে চেয়ে।

হালদার বাড়ি থেকে যখন খবর গেল নয়ন্তীকার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে, তখন অভ্র সহ তার বাড়ির লোক এবং নৈতিক মুখার্জি তখন রেজিস্ট্রি অফিসে। ঘটনা জানার সাথে সাথেই নৈতিক মুখার্জি তার দুই শালা'কে দিয়ে পুরো এলাকা সহ আশেপাশের স্টেশনে খোঁজ লাগালেন। আর নিজে বাহানা দিয়ে অভ্র এবং তার বাড়ির লোককে বসিয়ে রাখলেন।

এরপর সময় গড়ালো দ্রুত বেগে। কিন্তু নয়ন্তীকা'র খোঁজ পাওয়া গেল না। নয়ন্তীকা যে বাড়ি থেকে পালিয়েছে এই কথা অবশেষে অভ্র সহ তার বাড়ির লোকও জেনে গেল।

অভ্রর বাবা মিস্টার অভি খুব রাগারাগি করলেন। এবং জানালেন তিনি নৈতিক মুখার্জির সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চান না। তাদের সমস্ত ডিল ক্যান্সেল করা হলো। এর পরপরই তিনি ছেলেকে নিয়ে বিদায় নিয়েছেন। হয়তো অভ্রর অপেক্ষা করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বাবা-মায়ের কথা'র উপর তার একটা চললো না।

এই ঘটনার পর থেকেই নৈতিক মুখার্জি অসম্ভব রেগে আছে। সাথে চিন্তাও হচ্ছে নৈতিক মুখার্জির। অবশ্য নয়ন্তীকা'কে নিয়ে নয়। নিজের বিজনেস নিয়ে। তার বিজনেসে বড়ো সড়ো লস হয়ে গেল নিজেরই আপদ মেয়ের জন্য। ভেবেই রাগে চোখমুখ শক্ত হয়ে এল নৈতিক মুখার্জির।

তিনি তৎক্ষণাৎ উঠে গিয়ে মিসেস আহানার মাথার পিছনের একগোছা চুল চেপে ধরে টেনে দাঁড় করালেন। পরপর মিসেস আহানার গালে দানবীয় একটা চড় বসালেন।

মূহুর্তে উপস্থিত সবাই থমকে গেল, সবাই চোখ বড়ো বড়ো করে চাইলো দুজনের পানে। অপরদিকে,মিসেস আহানা ডানহাত গালে চেপে অবিশ্বাস্য নজরে তাকিয়ে রইলেন নৈতিকের মুখার্জির মুখপানে।

“তুমিই পালাতে সাহায্য করেছে নয়ন্তীকাকে! তাই না? ওর একার পক্ষে এই কাজ করা কখনোই সম্ভব নয়।”

“হ্যাঁ!!! আমিই তাকে পালাতে সাহায্য করেছি।”

মিসেস আহানার সহজ সরল স্বীকারোক্তি! যা বলার পরপরই মিসেস আহানার অপর গালে আবার একটা চড় পড়লো। মিসেস আহানা তক্ষুণি অপর গালটা চেপে ধরলেন হাতের সাহায্যে।

এরপর কিছু সেকেন্ড গড়ালো। মিসেস আহানা ঝড়ের বেগে চড় বসিয়ে দিলেন নৈতিক মুখার্জির ডান গালে। ঘটনাটা চোখের পলকে ঘটে গেল।

নৈতিক মুখার্জি হতভম্ব হয়ে তাকালেন মিসেস আহানার দিকে। আবার উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে চেয়ে রইলো এই বাড়ির নরমসরম আহানার পানে।

অপরদিকে, রুদ্র রূপ ধারনকারী মিসেস আহানা নৈতিক মুখার্জির একটা কলার চেপে ধরলেন হাতের মুঠোয়। তারপর নৈতিক মুখার্জির চোখে চোখ রেখে বলে উঠলেন —— বেশ করেছি!!! শুনছো ??? আমি বেশ করেছি ওকে পালাতে সাহায্য করে। নিজের মেয়ের জীবন কীভাবে নষ্ট হতে দিতাম মা হয়ে?? তুমি না হয় ওকে মেয়ের চোখে দেখোনা। আমি তো মা, আমি ওকে জন্ম দিয়েছি!!

মিসেস আহানা ঝরঝর করে কেঁদে উঠলেন। কান্নার ফলে ওনার হাত আলগা হয়ে এল। তিনি ছেড়ে দিলেন নৈতিক মুখার্জির জামা। তারপর কান্নারত গলায় বলে উঠলেন ——“ নিজের মেয়ের সাথে এমন ব্যবহার করতে তোমার লজ্জা করে না নৈতিক?? ছি্! আমার তোমাকে নিজের স্বামী বলতে লজ্জা হয়, ঘৃণা হয়। যেই বাবা নিজের লাভের জন্য মেয়েকে বলি দিতে পারে সে নিজের লাভের জন্য বউকেও বিক্রি করতে দুবার ভাববে না নিশ্চয়ই!”

“আহানা...!”

নৈতিক মুখার্জি কথায় মিসেস আহানা তাকে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলেন। তারপর বললেন —

“উহ!! থাক! আজ আমি বলবো আর তুমি শুনবে।”

— “তোমার এটাই অসুবিধা যে নয়ন মেয়ে। তোমার এটাই অসুবিধা যে আমি তোমাকে একটা ছেলে দিতে পারিনি। নৈতিক, তুমি আদেও শিক্ষিত?? এত বড়ো বিজনেস ম্যান হয়ে, আজকের যুগে তোমার এই চিন্তা ধারা?? ছিহ্!!! নৈতিক।

এত বছর তুমি আমার মেয়েকে বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছ। আচ্ছা বলোতো, নয়ন কী তোমার মেয়ে নয়?? ও শুধু আমারই??”

“আহা!! আহানা থাম এবার। জামাইতো দিদিভাইয়ের ভালোই চায়। তাই তো অতো ভালো বাড়িতে বিয়ে দিচ্ছিল।”

——“ হ্যাঁ দিদি!! মা ঠিকই বলছে। তাছাড়া নয়ন তো আমাদেরই মেয়ে। তার ভালো চাওয়ার অধিকার আছে আমাদের।”

মা আর ভাইয়ের কথায় মিসেস আহানা সামান্য হাসলেন। তারপর দৃঢ় গলায় সুধালেন—— “অধিকার??? আমি তাকে ন'মাস পেটে ধরেছি। তাকে বড়ো করেছি‌। ওর ভালো চাওয়ার অধিকার আমার নেই??

লোভে পড়ে তোমরা নিজেরাই সব ঠিক করে নিলে । অথচ আমার মতামত নেওয়ার একবার প্রয়োজন বোধ করলে না। বাহ!!!! ভালো চাওয়ার এই নমুনা তোমাদের।”

মিসেস আহানার কাঠকাঠ কথা শুনে উপস্থিত কেউ টু শব্দ করার সাহস করলো না। সবাই নিরব হয়ে গেল হঠাৎ করেই। মিসেস আহানা সবার লটকানো মুখ দেখে আবার বললেন —— “তোমরা আমার মেয়ের ভালো চাইতেই পারো। তবে তার অতিরিক্ত ভালো করার অধিকার আমি কাউকে দিইনি!!!”

_“ এমনকি নৈতিক মুখার্জি তোমাকেও না!”—— মিসেস নৈতিক মুখার্জির দিকে একটা আঙ্গুল তাক করে বললে।

----------

ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে দশটা। রক্তিম ফাঁকা রাস্তায় তীব্র বেগে গাড়ি চালাচ্ছে। তার প্রানের বাচ্ছা'টা ট্রেনে রয়েছে একা। তার উপর মেয়েটার ফোনে চার্জ নেই। তাই রক্তিমই বলেছে ফোনটা বন্ধ করে রাখতে আপাতত। আর বলেছে স্টেশনের নামের দিকে নজর রাখতে।

রক্তিমের আজকে ম‌্যাচ ছিল বর্ধমানে। খেলা শেষ হতে হতে বিকেল সাড়ে চারটে হয়েছে। তারপর বাড়ি আসতে আসতে সাতটা। রক্তিম ফ্রেশ হয়ে ক্লান্ত শরীর'টা সবে এলিয়েছে বিছানায় , এমন সময় ফোন এসেছে আননোন নাম্বার থেকে। রক্তিম রিসিভ করে জানতে পারলো তার ছোটো মা। নয়ন্তীকা'র মায়ের কল। তারপর, তো সব ঘটনা জানতে পেরে রক্তিমের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল যেন।

রক্তিম তৎক্ষণাৎ বাড়িতে কাউকে কিছু না বলে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে। তার কথা হয়েছে নয়নের সাথে কিছু সময়ের জন্য। এতেই মেয়েটা কেঁদে কেটে অস্থির। তারপর ছোটো মা জানালেন নয়নকে স্টেশন থেকে নিয়ে যেতে। বাকিসব ওখানের ঘটনা আর কিছু রক্তিমের জানা নেই।

শুধু তার জানা আছে আজ সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেত। নয়ন যদি অন্যের হত, তবে রক্তিম মরেই যেত!!!

রক্তিমের এখনো ভয়ে বুক কাঁপছে। মেয়েটাকে সামনে না পাওয়া পর্যন্ত তার মন শান্তি পাবে না। ভেবেই রক্তিম জোরে নিঃশ্বাস ছাড়লো। তার হাত-পা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। নয়নকে হারিয়ে ফেলার ভয় বুকে কাঁটার মতো বিঁধছে যেন।

রক্তিম ফাঁকা রাস্তার একপাশে গাড়ি দাঁড় করালো।তারপর চোখ বন্ধ করে মাথা সিটে এলিয়ে দিল। গাড়ির জানালা হতে দেখা যাচ্ছে বাঁকা চাঁদ। বাইরের হাওয়া হুরমুর করে গাড়ির ভিতর ঢুকছে, এবং রক্তিমকে ছুঁয়ে দিচ্ছে।

রক্তিম চোখ খুলে জানালা দিয়ে ডান দিকে তাকালো। বাঁকা অর্ধচন্দ্র পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দূরের কোথাও থেকে গানের সুর ভেসে আসছে——

একা রাত, বাঁকা চাঁদ লাগেনা ভালো রে আর

নেই রোদ, নেই রং, জানি নেই কিচ্ছুই করার

পড়ছে মনে মুখের আদোল

ভাঙে বুক, ভাঙছে পাহাড়

মন মাঝিরে, বল না কোথায়?

মন মাঝিরে

আয় ফিরে আয়, আয় ফিরে আয়

আয় ফিরে আয়, আয় ফিরে আয়

রক্তিম চোখ বন্ধ করে আবার পিছনের দিকে মাথা এলিয়ে দিল। তারপর জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো —— “তোমার বোকামি-পাগলামি সহ তুমি সারাজীবন আমারই থেকো নয়ন!!! তুমি ছাড়া যে আমি শূন্য, একেবারে নিঃস্ব!!”

চলবে,,,,,,,

আগের পর্ব:

https://www.facebook.com/share/p/19JsfY5vkx/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন