#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা_ব্যানার্জী
#পর্ব_সংখ্যা ২৪
বর্তমানে দাশগুপ্ত বাড়ির পরিবেশ গরম। মিসেস রেবা চিৎকার চেঁচামেচি করে পুরো বাড়ি ততক্ষণে মাথায় তুলে ফেলেছেন। ঘুমে বিভোর থাকা অনিমেষ দাশগুপ্ত ও রূপক ইতিমধ্যে হলরুমে এসে গেছে কোঁচকানো মুখে।
অনিমেষ দাশগুপ্ত একপলক চাইলেন ছেলে আর নয়নের পানে। তবে, তিনি মোটেই অবাক বা হতভম্ব হলেন না। রক্তিমের এই কাজে তিনি যে অসন্তুষ্ট হয়েছেন তাও নয়। বরং, ওনার নয়নকে পছন্দ। কোনো এককালে তিনি মনে মনে ভেবেছিলেন নৈতিকের মেয়েকে পুএবধূ করার কথা। কিন্তু তা যে এইভাবে পুরো হবে , সেটা অনিমেষ দাশগুপ্ত ভাবতেই পারেননি কখনো।
এইদিকে রূপক চোখ বড়ো বড়ো করে দেখে চলেছে দাদাভাই আর তার পাশে দাঁড়ানো শাকচুন্নিটার পানে। তার সব কেমন যেন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। তবে ঘুমের ঘোরে সে উল্টো পাল্টা দেখছে কি। ভেবেই রূপক চোখ ডললো দুহাতে। তারপর চোখ পিটপিট করে আবার তাকালো রক্তিমের দিকে। নাহ!! সে ঠিকই দেখছে। এটা বাস্তব। তার দাদাভাই আর নয়ন বিয়ে করেছে। আর তার মা কাঁদছে। ভেবে মূহুর্তে রূপকের মুখের রঙ পাল্টে গেল। মানে দেশে মেয়ের অভাব পড়েছিল কী!! শেষমেষ কিনা তারই শএুকে বিয়ে করলো তার দাদাভাই। সব জানার পরেও। রূপক অভিমানে গাল ফোলালো।
অপরদিকে, নয়ন্তীকা আর রক্তিম তখনও সদর দরজার কাছে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। রক্তিম তখনও নয়ন্তীকার হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে রেখেছে। দৃষ্টি তার মায়ের উপর স্থির।
মিসেস রেবা হলরুমের সোফার এককোনে বসে রয়েছেন চুপচাপ। চিৎকার চেঁচামেচি করে অনিমেষ দাশগুপ্তকে হাঁক ডাক করলেও, এখন তিনি একেবারেই শান্ত। তা বলে কান্নাকাটি থামেনি এরপরেও।
অবস্থার বেগতিক দেখে অনিমেষ দাশগুপ্ত রক্তিমকে আদেশের স্বরে বলে উঠলো —— “নয়নকে নিজের ঘরে নিয়ে যাও রক্তিম! ওর রেস্টের প্রয়োজন, বাকি কথা না হয় পরে হবে।”
মূহুর্তে গর্জে উঠলেন মিসেস রেবা। অনিমেষ দাশগুপ্তের কথার পিঠে তিনি ক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠলেন —— “খবরদার!! এই মেয়ে যদি এই ঘরে ঢোকে, আমি এক কাপড়ে ঘর ছাড়বো।”
“রক্তিম!! কথা কানে যাইনি তোমার?? ওকে তোমার ঘরে নিয়ে যাও।”
অনিমেষ দাশগুপ্ত রক্তিমের উদ্দেশ্যে নিজের বক্তব্য শেষ করে পরপর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন— আর রেবা, তোমার থেকে অন্তত এই ধরনের ব্যবহার আশা করা যায় না। ওদের বিয়ে হয়েছে। তুমি মেনে নিলে কিংবা না নিলেও তারা স্বামী স্ত্রী। এটাই সত্যি। নয়ন দাশগুপ্ত বাড়ির বৌমা আজকে থেকে। আর দাশগুপ্ত বাড়ির লক্ষ্মীর অসম্মান ব্যাপারটা আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করছি না।
বলেই অনিমেষ দাশগুপ্ত স্থান ত্যাগ করলেন। জীবনে প্রথমবারের মতো স্বামীর কাছ থেকে উচ্চ বাক্যে কথা শুনে কেঁদে উঠলেন মিসেস রেবা। তিনি বিলাপ করে উঠলেন মূহুর্তে— “হ্যাঁ হ্যাঁ!!! এখন যত দোষ আমার হয়েছে। বলেই তিনি দ্বিগুণ জোরে শরীর দুলিয়ে কেঁদে উঠলেন ।”
রক্তিম নয়ন্তীকার হাতখানা ছেড়ে দিল। যা দরুন নয়ন্তীকা তড়িৎ বেগে চাইলো রক্তিমের পানে। রক্তিম চোখে চোখ রেখে ইশারায় বোঝালো — সে সব ঠিক করে দেবে। নয়ন্তীকা ভরসা পেয়ে চুপচাপ মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো দরজার কাছে।
আর রক্তিম তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গিয়ে মায়ের পায়ের কাছে বসলো। মিসেস রেবা তা দেখার পরে না দেখার ভান করে কেঁদে চলেছেন তখনো। রক্তিম এবার মায়ের দুই হাতখানা চেপে ধরলো দুহাতের মুঠোয়। মিসেস রেবা এরপরও রক্তিমের সাথে কোনো রকম বাক্য বিনিময় করলেন না। যা দেখে রক্তিম নিজেই বলা শুরু করলো — “তুমি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত নয়ন এই ঘরে পা রাখবে না মা।”
“আমি ওকে কোনো দিন মেনে নেব না রক্তিম। তা তুমিও ভালো মতো জানো!”
“আমি কারণ'টা জানি। কিন্তু এখানে নয়নের কী দোষ মা?? তুমি তো ওকে ছোটো বেলা থেকেই চেনো। সব জানো। তুমি ওকে কতো ভালোবাসতে। একবার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখো, নিষ্পাপ একটা বাচ্চা মেয়ে!”
রক্তিমের কথায় মিসেস রেবা তাকালেন দরজার কাছে জড়োসড়ো ভাবে দাঁড়ানো নয়ন্তীকার দিকে। সে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, হয়তো বা কান্নাকাটি করছে নিরবে। দূর থেকে নয়ন্তীকার অশ্রু দেখা না গেলেও মিসেস রেবা ঠিকই বুঝলেন। ওনার একটু মায়া হলো বটে। রক্তিম ভুল কিছুই বলেনি। মিসেস রেবা সব জানেন। এই ধ্রুব সত্য যে, এককালে তিনি নয়নকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসতেন। কিন্তু তা রাগ-ঘৃণার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে বহুবছর আগে। সেই সময়ে নয়নের বাবা যে বাটপারি করে তার সংসার ভাসিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি চাননা তা আবার পুনরাবৃত্তি হোক। নৈতিক মুখার্জির সাথে তাদের বিশ্বাসের উপরেরই সম্পর্ক ছিল! ফল কী পেল?? তারা আবার যে বিশ্বাসের পরিবর্তে বিশ্বাসঘাতকতা ফিরে পাবেন না তার কী নিশ্চয়তা আছে?? যার জন্য মিসেস রেবা নয়নকে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। আসলে রক্ত তো একই বইছে!!
“বিয়ে করার সময় যখন আমার মতামত নেওয়া প্রয়োজন মনে হয়নি! এই ঘরে প্রবেশের জন্যও আমার মতামতের কোনো প্রয়োজন পড়বে না! আমার যা মনে হয়!”
মিসেস রেবা শক্ত গলায় বলে উঠলেন। তারপর রক্তিমের হাত থেকে নিজের হাত দুটো ছাড়িয়ে আলগোছে উঠে দাঁড়ালেন স্থান ত্যাগের উদ্দেশ্যে। যা রক্তিম সফল হতে দিল না। সে আবার মায়ের হাত আঁকড়ে ধরলো। তারপর নম্র গলায় সুধালো——
“তখন জানানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না মা।আর তুমি আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। সাথে নয়নও। তোমাকে যেমন ভালোবাসি আমি নয়নকেও ভালোবাসি মা। তোমাদের দুজনকেই আমার প্রয়োজন!”
“আমি নয়নকে ছাড়া ভালো থাকবো না মা!!! প্লিজ মেনে নাও আমাদের। তুমি যেটার ভয় পাচ্ছো তা কখনো হবে না। আমার ভরসা আছে আমাদের ভালোবাসার উপর।”
রক্তিমের আকুতি ভরা কন্ঠস্বরে মিসেস রেবার মন গললো। যতই হোক আদরের ছেলের ভালো থাকা নিয়ে কথা বলে। মিসেস রেবা একপলক নয়ন্তীকার পানে তাকিয়ে রক্তিমের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন ——“ যা খুশি করো। তবে পরে আবার বলো না যে, আমি তোমাকে সাবধান করিনি!”
বলেই তিনি ব্যস্ত পায়ে স্থান ত্যাগ করলেন। অপরদিকে, রূপক তখনো ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে মুভির সিন দেখে চলেছে হা করে।
রক্তিম উঠে দাঁড়ালো, তারপর এগিয়ে গেল জড়োসড়ো নয়নের কাছে। সে হাত ধরে বলে উঠলো — আমাদের বাড়িতে তোমার স্বাগত!!
"দাঁড়াও!”
অনিমেষ দাশগুপ্তের কথায় রক্তিম আর নয়ন দুজনেই থেমে গেল। তারপর প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে দুজনেই তাকালো অনিমেষ দাশগুপ্তের পানে। মহাশয় থালা হাতে এগিয়ে আসছেন। যেখানে জলন্ত প্রদীপ দৃশ্যমান।
“ঘরের লক্ষ্মীকে বরণ করতে হয় !! জানো না হতছাড়া?”
বাবার কথায় রক্তিম মাথা চুলকালো। তারপর সে ধীর স্বরে বলে উঠলো — এত কিছুতে মনে ছিল না!
অনিমেষ দাশগুপ্ত প্রদীপের থালা দিয়ে নয়ন্তীকার সামনে গোল গাল ঘুরিয়ে নিলেন। তারপর , তিনি যতটুকু জানতেন। আরো যা যা করতে লাগে তিনি করলেন। এরপর হাস্যরত গলায় সুধালেন — “কিছু মনে করিস না মা, যেটুকু জানি সেটুকু করলাম!”
“আয় ! ভিতরে আয়! আমাদের বাড়ির লক্ষ্মী!”
নয়ন্তীকার চোখ ছলছল করে উঠলো তৎক্ষণাৎ। “মা”— ডাকটা যে কত আদরের নয়ন্তীকা তা আজকে টের পেল। রক্তিম নয়ন্তীকার হাত চেপে ধরলো, চোখে সাহস দেখিয়ে ইশারা করলো ভিতরে প্রবেশ করতে। নয়ন্তীকা নিজের নতুন পরিচয়ের সাথে নতুন অথচ পুরোনো মানুষটার ঘরে প্রবেশ করলো। এবার পালা মানুষগুলোর মনে প্রবেশ করার।
অনিমেষ দাশগুপ্ত মৃদু হেসে নয়ন্তীকার মাথায় স্নেহ ভরা হাত রাখলেন। তারপর নম্রস্বরে বললেন —— “তোর শ্বাশুড়ির কথা মনে নিস না মা। জানিসই তো ও বাইরে থেকে একটু শক্ত। তবে একদিন দেখবি ওই তোকে চোখে হারাবে। খুব ভালোবাসবে তোকে।”
নয়ন্তীকা অনিমেষ দাশগুপ্তের কথায় হাসলো সামান্য। এতদিন বাবার ভালোবাসা কেমন হয় জানতো না সে। আজকে বাবার আদর যত্ন দেখলো, অনুভব করলো নয়ন্তীকা। খুশিতে তার চোখ ছলছল করে উঠলো তার। মানুষটা তাকে আগাগোড়াই ভালোবাসে। যা এত বছরে , এতকিছুর পরেও কমেনি। নয়ন্তীকার মনে অনিমেষ দাশগুপ্তের জন্য শ্রদ্ধাবোধ আরও বেড়ে গেল।
চলবে,,,,
(রিমেক করা হয়নি, সবাই ভুল-এুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ ♥️।)
আগের পর্ব:
https://www.facebook.com/share/p/1CkAWorvB5/