#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা_ব্যানার্জী
#পর্ব_সংখ্যা ২৬
অবশেষে রক্তিমের অনেক অনুরোধের পর ইন্সপেক্টর নয়ন্তীকার স্টেটমেন্ট শোনার জন্য রাজি হলেন। অগত্যা, তাদের সবাইকে পুলিশ স্টেশন যেতে হতো। যদিও, অনিমেষ দাশগুপ্তের নিজের এই লাইনের পরিচিত অনেক মানুষের সাথে যোগাযোগ করা হয়ে গেছে। তিনি পাড়ার বিখ্যাত ব্যাবসায়ী। সে সূত্রে অনেক ক্ষমতাশালী মানুষদের সাথেই ওনার পরিচয় আছে। তার জন্য এই পরিস্থিতি'টা সামলানো কোনো ব্যাপারই নয় অনিমেষ দাশগুপ্তের কাছে। কিন্তু কথা উঠছে রক্তিমের উপর। তাই তিনি চাইছেন যেটা সত্যি তাই সবার সামনে আসুক। আর যাই হোক রক্তিম চুরি তো করেনি। ভালোবেসে বিয়ে করেছে। এই মনোভাবের জন্যই অনিমেষ দাশগুপ্ত আপাতত চুপচাপ আছেন। তিনি দেখতে চাইছেন ব্যাপারটা কতদূর যায়।
অপরদিকে, ইন্সপেক্টর ও তার টিমকে ভিতরে আসার অনুরোধ করে রক্তিম মায়ের কাছে গেল দ্রুত পায়ে। অনিমেষ দাশগুপ্ত, রূপক সহ মিসেস রেবা তখন হলরুমে বসে রয়েছেন। অনিমেষ দাশগুপ্ত চুপচাপ থাকলেও, মিসেস রেবা ক্রমাগত বকেই চলেছেন।
তিনি রক্তিমকে দেখা মাএই উঠে দাঁড়ালেন। রক্তিম মা কে কিছু বলতে না দিয়ে নিজেই আগেভাগে বলে উঠলো —— “মা নয়নকে একটু নীচে নিয়ে এসো! ওর রেডি হতে তোমার একটু হেল্প লাগবে।”
রক্তিমের কথায় মিসেস রেবার ভ্রু দ্বয়ের মাঝে ভাঁজ পড়লো। পুলিশদের সাথে কথা বলার জন্যও আবার রেডি হতে হবে নাকি! তার ছেলের প্রেমে পড়ে মাথা বোধ হয় গেছে। তবে সেই মুহূর্তে মিসেস রেবা আর কথা বাড়ালেন না। মনের কথা মনেই রাখলেন। তিনি রক্তিমের কথা মতো উপরের ঘরে, অর্থাৎ রক্তিমের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
নয়ন্তীকা তখন ঘর জুড়ে পায়চারি করছে। বাইরের চিৎকার চেঁচামেচি থেকে ঘটনা সেও জেনেছে ইতিমধ্যে। তখন থেকেই অস্থিরতায় তার হাত পা কাঁপছে। সে চিন্তায় তখন ঘর জুড়ে পায়চারি করছে। তাছাড়া আর কিই বা করার আছে তার।
তখন ঘটনা'টা জানালা দিয়ে দেখার সময় নয়ন্তীকার মায়ের সাথে দেখা হলো। মিসেস আহানাও তখন বাড়ির জানালা দিয়ে দেখছিলেন নৈতিক মুখার্জির আকাম। তিনি নীচে গিয়ে আর নিজের বেঁচে থাকা মান সম্মান'টা হারাতে চাননি।
নয়ন্তীকা'কে দেখা মাএই তিনি ঘটনা বিস্তারিত জানালেন নয়ন্তীকা'কে। তিনি জানালেন — কীভাবে তার নিজের বাবা নিজের স্বার্থের জন্য তার পিছনে উঠে পড়ে লেগেছে। মিসেস আহানা আরো বললেন যে, ভয় না পেতে। যা সত্যি তাই বলতে।
তারপর থেকেই নয়ন্তীকার দুঃখে কান্না পাচ্ছে। নিজের বাবা'কে এত নীচে নেমে যেতে নয়ন্তীকার কষ্ট হচ্ছে। কী হতো যদি তার আর বাবার মধ্যে সম্পর্ক'টা ভালো হতো। কী হতো যদি তার বাবাও বাকি বাবাদের মতো তাকে ভালোবাসতো। কী হতো...
নয়ন্তীকা'র ভাবনা চিন্তার মধ্যেই দরজা খট করে খুলে গেল। নয়ন্তীকা পায়চারি ছেড়ে ঘুরে দাঁড়ালো। ওমনি সে চমকে উঠলো। মিসেস রেবা দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দৃষ্টি তার পানেই স্থির। তিনি বিস্মিত নয়নে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করছেন।
“এই রকম সং সেজে ঘুরছো কেন?”
মিসেস রেবা ভ্রু কুঁচকে বললেন। নয়ন্তীকা তখন হাত কচলাতে-কচলাতে আমতা-আমতা করে বলে উঠলো— “এখানে আমার জামা নেই বড়ো মা!”
“বাহ!! দুজনে মিলে একবার আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করলে না। যেন আমির শাড়ির অভাব রয়েছে। একদিনের বউমা সং সেজে ঘুরছে, পাড়া প্রতিবেশীর লোকে দেখলে কী বলবে!”
মিসেস রেবা গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। নয়ন্তীকা চিন্তা ছেড়ে লজ্জায় মুখ ঢেকে নিল। সব উল্টো পাল্টা হচ্ছে। তার কপালটাই খারাপ। ভেবেই নয়ন্তীকা কাঁদো কাঁদো মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মিসেস রেবা ফিরে এলেন শাড়ি এবং আরোও প্রয়োজনীয় কাপড় নিয়ে। মিনিট খানেকের মধ্যে তিনি ঝটপট নয়ন্তীকাকে শাড়িটা পড়িয়েও ফেললেন। এতক্ষণ নয়ন্তীকা চুপচাপ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। শেষ মুহূর্তে, মিসেস রেবা নয়ন্তীকার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন —— “আশা করি সত্যিটাই বলবে! নিজের বাবার মতো আবার বিশ্বাসঘাতকতা করো না। আমার ছেলেটা পাগল হয়ে যাবে।”
“বড়ো মা”..
নয়ন্তীকা কথা পুরো করতে পারলো না। তার আগেই মিসেস রেবা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলেন —— বিয়ের পর স্বামীর সাথে তার পরিবার'ও আপন হয়। যা তুমি এখনও করে উঠতে পারোনি।
নয়ন্তীকা মাথা নীচু করে নিল। মিসেস রেবা আর দাঁড়ালেন না। তিনি একপলক নয়ন্তীকার দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
নয়ন্তীকা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। তারপর সেও নামলো মিসেস রেবার পিছন পিছন।
------------
রক্তিম ইন্সপেক্টর ও তার টিমকে বাড়ির ভিতরে আসার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু তারা আসেননি। সাথে নৈতিক মুখার্জি তো ছিলই ফোঁড়ন দেওয়ার জন্য। তখন রক্তিম ইন্সপেক্টরকে জানায় যে নয়ন্তীকার নীচে নামতে একটু দেড়ি হবে। ততক্ষণ তারা হলরুমে বসতে পারেন। রক্তিমের এই কথার পিঠে নৈতিক মুখার্জির বক্তব্য ছিল —— ওনারা নিজের কাজ করতে এসেছেন, আত্মীয়থা করতে আসেননি।
যার দরুন পুলিশ বাহিনী এতখন বাড়ির বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। নয়ন্তীকা আসা মাত্রই সবাই তাকালো তার পানে। আর রক্তিম তাকিয়েই রইলো তার বাচ্চা বধূর পানে।
“তো নয়ন্তীকা মুখার্জি”...
“মিসেস নয়ন্তীকা দাশগুপ্ত”— রক্তিমের সম্মোহিত কন্ঠস্বর। যা সে ইন্সপেক্টরের কথার পিঠে বলে উঠলো।
রক্তিমের কথায় ইন্সপেক্টর একপলক তাকালেন রক্তিমের পানে। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন —
“যাইহোক!!
তো আপনি জানেন নিশ্চয়ই আপনার বাবা কমপ্লেইন করেছেন আপনার হাসবেন্ড রক্তিম দাশগুপ্তের নামে। কারণটা ও আশা করি জানেন?”
নয়ন্তীকা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
“কত'টা কী সত্যি আপনি আমাদের বলুন। রক্তিম দাশগুপ্ত আপনাকে জোর করে বিয়ে করেছেন?? বা ব্ল্যাকমেইল?”
নয়ন্তীকা না সূচক ঘাড় নাড়লো। রক্তিমের ততক্ষণে ধ্যান ফিরেছে। সে ইন্সপেক্টরকে কিছু না বলতে দিয়ে নিজেই বলে উঠলো —— “স্যার, ও এখন প্রাপ্তবয়স্ক!!! ওর নিজের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। তাছাড়া , আমরা একে অপরকে ভালোবাসে বিয়ে করেছি।”
রক্তিম তাদের বিয়ের রেজিস্ট্রি পেপার দেখালো। নয়ন্তীকা'কে স্টেশন থেকে নিয়ে সে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়েছিল। তারপর মন্দিরে গিয়ে বিয়ে। এতে অবশ্য রক্তিমের বন্ধুবান্ধব সাহায্য করে ছিল। এবং নয়নেরও মত ছিল।
ইন্সপেক্টর রক্তিমের দেওয়া কাগজ পত্র গুলো উল্টে পাল্টে দেখলেন। তারপর বেশ কিছুক্ষণ রক্তিমের সাথে কথা বলে বিদায় নিলেন। যেতে যেতে অবশ্য নৈতিক মুখার্জিকে পুলিশ স্টেশন যেতে বলে গেলেন।
-----------
বিকেল চারটে তখন, দাশগুপ্ত বাড়িতে ইতিমধ্যে খাওয়া-দাওয়ার পাঠ চুকে গেছে। সারাদিনের ঝড় ঝাপটায় ক্লান্ত মানুষজন ঘুমোচ্ছে। এমনকি দাশগুপ্ত বাড়ির প্রাণীরাও ঘুমে।
তবে ঘুম নেই এক জোড়া চড়ুইয়ের। আর না আছে দুজনের কোনো ক্লান্তি। একে অপরকে সারাজীবনের জন্য পেয়ে দুজনেই পুলকিত।
রক্তিম কোলে ল্যাপটপ নিয়ে সোফার উপর বসে রয়েছে । তবে দৃষ্টি তার ঘরের ঘুরঘুর করা নয়ন্তীকার উপর। মেয়েটাকে বেশ খুশি দেখাচ্ছে। মিসেস রেবার পড়িয়ে দেওয়া লাল-সাদা শাড়ি এখনও তার পড়নে। হাতে শাখা-পোলা সহ কয়েক জোড়া চুড়ি, পায়ে নুপুর, কপোলে অস্ত যাওয়া সূর্যের মতো লাল টিপ, ঢিলা-ঢালা খোঁপা। সব মিলিয়ে মেয়েটাকে সুন্দর লাগছে। একেবারে নতুন বউ। তাই তো রক্তিম কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে হাঁ করে চেয়ে রয়েছে মেয়েটার পানে। তবে মহারানির সেই দিকে ধ্যান নেই। তিনি ব্যস্ত আলতা বাটিতে ঢালতে।
খাওয়া দাওয়ার পর মিসেস রেবা নয়ন্তীকাকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বেশ অনেক্ষণ জ্ঞান দিয়েছিলেন। বিয়ের পর কীভাবে থাকতে হয়, কী পড়তে হয়। আর গয়নাগাটি গুলোও উনিই পড়িয়ে দিয়েছেন।
নয়ন্তীকা মিসেস রেবার ঘর থেকে বেরিয়ে আলতা পড়ার মিশনে নেমেছে। সে এখন নতুন বউ কিনা।
রক্তিম ল্যাপটপ রেখে উঠে দাঁড়ালো। তারপর ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গেল নয়ন্তীকার দিকে। মেয়েটার থেকে চোখই ফেরানো যাচ্ছে না। রক্তিম আগেও বহুবার নয়ন্তীকাকে শাড়িতে দেখেছে । কিন্তু আজকে মেয়েটাকে একটু অন্যরকম লাগছে। তবে বিয়ের জন্য কী?? হয়তো!!!
রক্তিম নয়ন্তীকার পাশে বসলো। তারপর আলতা-তুলি নিয়ে ব্যস্ত নয়নের হাত ধরে সুধালো—— “আমি পড়িয়ে দিই?”
রক্তিমের ধীর কন্ঠস্বর। যা শুনে নয়ন্তীকার বুকটা কেঁপে উঠলো তৎক্ষণাৎ। সে চোখ পিটপিট করে একপলক তাকালো রক্তিমের পানে। তারপর এলেমেলো দৃষ্টি ফেলে বলে উঠলো —— “আমি পারবো তো। আপনার কাজ ছিল না?”
রক্তিম নয়ন্তীকার হাত ধরে টেনে তুললো। তারপর তাকে টুলে বসাতে বসাতে বললো—— “আপাতত আপনি ছাড়া এই মুহূর্তে কোনো কাজ নেই ম্যাডাম!”
নয়ন্তীকা লজ্জা পেল রক্তিমের কথায়। অপরদিকে, রক্তিম নয়ন্তীকাকে টুলের উপর বসিয়ে নিজে মেঝেতে বসলো। এরপর নয়ন্তীকার পা নিজের কোলের উপর তুলে নিল। ঠিক তখনই নয়ন্তীকা সুধালো—— “এমা, আপনি পায়ে হাত দেবেন??”
“তোমার সিঁথিতে আমার নামের সিঁদুর যখন আমিই দিয়েছি, বিয়ের পর তোমার পায়ে প্রথম আলতা পড়িয়ে দেওয়ার অধিকারও আমার আছে নয়ন!!!”
— তাই না?
নয়ন্তীকা কেবল মুচকি হাসলো, সে আর কিছু বললো না। রক্তিম তখন মনোযোগ সহকারে নয়ন্তীকার পায়ে আলতা পড়িয়ে দিচ্ছে। আর নয়ন্তীকা মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলো তার ব্যক্তিগত পুরুষের পানে। যে আজ থেকে কেবল তার। যার যত্ন, ভালোবাসা, রাগ, অভিমান একান্ত তার ব্যক্তিগত!
নয়ন্তীকার চোখ যেন ভরে আসতে চাইছে। এত যত্ন তার আদেও কাম্য? এত সুখ ছিল তার কপালে?? পুরুষের ভালোবাসা এত সুন্দর হয় আজ খুব করে অনুভব করছে নয়ন্তীকা।
চলবে,,,,,
আগের পর্ব:
https://www.facebook.com/share/p/1CXCEnoTKR/