#পরাণ_আমার_ভালোবেসেছে
#অহর্নিশা_ব্যানার্জী
#পর্ব_সংখ্যা ২৮
বেলা দ্বিপ্রহর তখন, দাশগুপ্ত বাড়িতে ইতিমধ্যে আত্মীয় স্বজনের ভিড় লেগে গেছে। নয়ন্তীকা এতক্ষণ হলরুমেই বসেছিল। বড়ো মায়ের আদেশে এইমাত্র সে রুমে এসেছে একটু রেস্ট নিতে। তাই সে আপাতত গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।
নয়ন্তীকা অভ্যাসগত ভাবে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে। মাথাটা খাটের বাইরে মেঝের দিকে, মাথার চুল গুলো ফ্লোরে লুটিয়ে রয়েছে। পা দুটো ক্রস করে দেওয়ালে রাখা। আর নয়ন্তীকা ফোনের মাঝে ব্যস্ত।
অবশ্য, রিহা'র সাথে তার কথা হচ্ছে। কথা হচ্ছে বললে ভুল হবে। নয়ন্তীকা মহারানির রাগ ভাঙ্গাতে ব্যস্ত। তার দুঃখ নয়ন্তীকা তাকে না বলেই পালিয়ে বিয়ে কীভাবে করতে পারে। তবে এটা ভাবছে না — আমার প্রেম পাগল বন্ধু মনের মানুষকে পেয়েছে অবশেষে। যেভাবেই হোক!
না, সে পড়ে আছে তার রাগ নিয়ে। নয়ন্তীকা কত করে বলছে বিকেলে তাকে আসতে। তার একটাই কথা— আমাকে ছেড়ে বিয়ে যেমন করেছিস, বাকিসব করতে পারবি।
নয়ন্তীকা ফোনে একেবারে ঢুকে পড়লো, তার কোনো দিকে খেয়ালই নেই। ফোন করলো সে রিহার নাম্বারে। তবে অভিমানী বন্ধু তার ফোন রিসিভ করছে না। নয়ন্তীকা ম্যাসেজ করে অনুনয় করতে লাগলো।
ঠিক তখনই দরজা খোলার জোরে শব্দ হল। যেহেতু নয়ন্তীকা দরজা লক করেনি, তাই দরজা খুলে গেল। সম্ভবত রক্তিম এসেছে ভেবে নয়ন্তীকা আর উঠে দেখার প্রয়োজন বোধ করলো না।
ইতিমধ্যে কিছুক্ষণ সময় পেরিয়ে গেল, তবে রক্তিমের দেখা তখনো পাওয়া যায়নি। তাই নয়ন্তীকা ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালো রক্তিমের খোঁজে। কিন্তু রক্তিমকে ঘরের কোথাও দেখা গেল না।
দেখা গেল বান্টিকে। সে দরজার কাছে সঙের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে মুখটা পাঁচ করে, চোখে রাগের ঝিলিক। হাতে রয়েছে ট্রে, সম্ভবত বড়ো মা তার জন্য কিছু পাঠিয়েছে।
যা সে দিতে এসেছে, তবে দিয়ে যাচ্ছে না কেন — তা মোটেই বুঝলো না নয়ন্তীকা। উল্টো মূর্তি সেজে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাকে এমন দেখছে যেন কাঁচা নুন ছাড়াই গিলে নেবে। নয়ন্তীকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সে তখনো তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। যা দেখে নয়ন্তীকা বিরক্তিকর গলায় বলে উঠলো — “ আমি জানি আমি সুন্দর, তোর দেখা শেষ হলে বিদায় হ!”
“নয়নের বাচ্ছা! আমাকে তোর চাকর মনে হয়?“
নয়ন্তীকা রিহাকে লাস্ট মেসেজ সেন্ড করে ফোনটা বন্ধ করে রাখলো। তারপর সোজা হয়ে শুয়ে দুহাতের তালুতে মাথা ভর দিয়ে চাইলো রাগত বান্টির পানে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তাকে উদোম পেটানো হয়েছে। মুখটা এমনই প্যাঁচার মতো করে রেখেছে। যা দেখে নয়ন্তীকার দম ফেটে হাসি পেল। তবু সে হাসলো না। প্রতিবারের ন্যায় উল্টো প্রশ্ন করে উঠলো— “কেন তোর নিজেকে রাজা মনে হয়?“
রূপক রাগে ফুঁসে উঠলো। সে ফোঁস ফোঁস করে এগিয়ে এসে ট্রে শব্দ করে টেবিলের উপর রাখলো। তারপর নয়ন্তীকার দিকে একটা আঙ্গুল তাক করে বলে উঠলো —— “না আমার নিজেকে ডাইনী-শাকচুন্নি ফালতু মঞ্জুলিকা মনে হয়।”
নয়ন্তীকা বিরক্তিতে নাক ফোলালো। এই এক বিরক্তিকর ছেলে, যেকিনা মেয়েমানুষের মতো ঝগড়ুটে হয়েছে। পাড়ার কাকিমাদের মতো একবেলা ঝগড়া না করলে পেটের ভাত হজম হয় না।
নয়ন্তীকা রূপকের পানে রাগী চোখে তাকিয়ে উঠে বসলো। তারপর রূপকে ডানহাত উঁচিয়ে শাসিয়ে উঠলো—— “শোন বান্টি, শুধু শুধু লাগতে আসবি না। তোর সাথে ঝগড়া করার কোনো ইচ্ছা নেই আমার!”
নয়ন্তীকার কথা শোনা মাত্রই খেঁকিয়ে উঠলো রূপক। সে মুখের অদ্ভুদ অঙ্গিভঙ্গি করে বললো—— “হ্যাঁ হ্যাঁ!! সেই ইচ্ছা থাকবে কেন। তোর আমাকে দিয়ে চাকরগিরি করানোর ইচ্ছা আছে ।”
“তোর পছন্দের কাজ করতেই পারিস। আমি বলার কে?”
“তুই হচ্ছিস নাটের গুরু! তুই কিছু বলবি না, ডাইরেক্ট করাবি। দাশগুপ্ত বাড়িতে তুই আসার থেকেই শনি নাচছে।”
রূপকের কথায় কিচ্ছুক্ষণের জন্য থমকে গেল নয়ন্তীকা। মনটা দুম করেই খারাপ হয়ে গেল। আসলেই সে শনি । যেখানে যায় ঝামেলা নিয়ে যায়।আগে বাবা-মায়ের জীবনে ছিল, এখন রক্তিমের জীবনে আছে। হ্যাঁ, বান্টি ভুল কিছুতো বলিনি। ভেবেই নয়ন্তীকার চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো তৎক্ষণাৎ। কিন্তু সে বান্টিকে কিছু বুঝতে দিলো না। নয়ন্তীকা মূহুর্তে নিজেকে সামলে বলে উঠলো —— “দাশগুপ্ত বাড়িতে শনি নাচলেও, তোর কপালে মঙ্গল নাচবে!”
“নাচবে কী নাচছে!! শুরু হয়ে গেছে আজ থেকে।”
রূপকের দুঃখী কন্ঠস্বর। সে ধপ করে নয়ন্তীকার পাশে বসে পড়লো। তারপর নয়ন্তীকার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো — আগে এই বাড়ির লোকের জন্য চাকরগিরি করতে হতো, এখন তোর জন্যও করতে হতো। বান্টি বোতলে জল ভর, বান্টি দোকান যা, বান্টি জামাকাপড়ের বালতি ছাদে নিয়ে চল -- এইসব ঠিক ছিল। কিন্তু এখন, বান্টি নিজের বউমনিকে শরবত দিয়ে, বান্টি বউমনির কিছু লাগবে কিনা দেখ। এইসব শুনতে হচ্ছে....
বান্টি তখনো বকেই চলেছে ক্রমাগত। আর নয়ন্তীকা অবিশ্বাস্য নজরে রূপকের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার নিন্দা তারই সামনে বসে করছে। কত সাহস এই বান্টির। এমনই সে তাকে বেয়াদব বলে।
“নিজের বাড়ি কাজ তাও ঠিক আছে। তা বলে নিজের শএুর কাজ?? তাও আবার তার নিজের জন্মদাত্রী মা করাচ্ছে এইসব। তার মা তার বেলায় ঘষেটি বেগমের রোল প্লে করছে!
তবে বান্টির দুঃখভরা বিলাপ দেখে খিক খিক করে হেসে উঠলো নয়ন্তীকা। সে ভুলে বসলো সামনের এই ছেলেটার কথাতে সে কষ্ট পেয়েছিল কিছুক্ষণ আগেই।
অপরদিকে, নয়ন্তীকা'কে হাসতে দেখে চোটে গেল রূপক। সে নয়ন্তীকার দিকে একটা আঙ্গুল তাক করে রাগি কন্ঠে বলে উঠলো তৎক্ষণাৎ——“শাকচুন্নি! তুই দাভাই ছাড়া আর কাউকে পেলি না?”
“নাহ রে! ”
নয়ন্তীকা আবার হেসে ফেললো স্বশব্দে। যা দেখে রূপক রাগে নাক ফোলালো। পৃথিবীতে কী মেয়ের অভাব পড়েছিল? শেষ পর্যন্ত তার দাদাভাইকে এই শাকচুন্নিকে বিয়ে করতে হলো! ছ্যাহ্!! এতদিন যাবত রূপক তার দাদাভাইয়ের পছন্দ নিয়ে মাতামাতি করতো। হোক জামাকাপড় থেকে ঘড়ি পর্যন্ত। কিন্তু দাদাভাইয়ের এই পছন্দ দেখে রূপক নাকমুখ কুঁচকে নিল। আসলেই — “ লোক পেয়ার মেইন অন্ধে হো জাতে হেয়!”
--------------
গোধূলি লগ্নের শেষ মুহূর্ত তখন, বিস্তর আকাশের বুকে আবছা চাঁদ দেখা যাচ্ছে। চারিদিকে তখন ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে। অপরদিকে, দাশগুপ্ত বাড়ি ততক্ষণে আলোকিত হয়ে উঠেছে বাহারি আলো ও সাজে।
দাশগুপ্ত বাড়ির বড়ো ছেলের রিসেপশন নিয়ে কথা। অনিমেষ দাশগুপ্তের সমস্ত বন্ধু থেকে শুরু করে বিজনেস পার্টনার'রা এসেছে। পাড়া প্রতিবেশী থেকে শুরু করে রূপকের বন্ধুবান্ধবরাও আমন্ত্রিত এই পার্টিতে।
দাশগুপ্ত বাড়ির পিছনের বাগেনের দিকে চলছে আয়োজন। বাগানের একপাশে স্টেজ করা হয়েছে। আর একপাশে আয়োজন হয়েছে বিভিন্ন ধরনের ড্রিঙ্কস সহ খাবার দাবারের।
রক্তিম কালো রঙের স্যুট পরেছে। সে পরিপাটি হয়ে তখন মেহমানদারী করতে ব্যস্ত। রক্তিমের ক্লাবের সবাই এসেছে। স্যার থেকে শুরু করে তাদের টিমের সব ছেলেরা। বর্তমানে রক্তিম তাদের সাথেই দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করছে।
আসলে তারা রক্তিমকে নিয়ে মজা নিতে ব্যস্ত। আর রক্তিম চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে হাস্যরত মুখে। কেননা তার কিছুই বলার নেই। বন্ধুগুলো হয়ই এইরকম। তাছাড়া রক্তিম তাদের কারোর কথা কানেই তুলছে না। সে এখানে স্বশরীরে থাকলেও মন পড়ে আছে অন্য দিকে।
রক্তিম কথার ফাঁকে ফাঁকে দরজার দিকে চাইছে। যেইদিক দিয়ে নয়ন আসবে। সকাল থেকেই তার ব্যস্ততাতে দিন কেটেছে। মেয়েটাকে সকাল থেকেই একটু 'চোখের দেখাও' দেখার সুযোগ হয়নি। রক্তিম বিকেলের দিকে রেডি হতে গিয়েও নয়নকে রুমে পেল না। তার বাচ্ছা বউকে পার্লারের লোকেরা তুলে নিয়ে গেছে ততক্ষনে। তারপর বাড়ির বড়োরা হাঁক ডাক করে তাকেও এই লোকজনের ভিড়ে ছেড়ে দিয়েছে। রক্তিমের সেই থেকে মন মেজাজ ভালো লাগছে না। মেয়েটাকে এবার একা পেলে বুকের সিন্দুকে তালা মেরে রেখে দেবে একবারে।
“ভাই রক্তিম, তোর স্টোরি তো দারুন। একটা শর্টে মেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ডাইরেক্ট তোর প্রেমে পড়ে গেল। আর টুপ করে বিয়েও হয়ে গেল। জিওওও ভাই...!”
বলেই রিজু রক্তিমের কাঁধ জড়িয়ে ধরলো। উপস্থিত সব ছেলে গুলোও হো হো করে উঠলো উল্লাসে। ঠিক যেইভাবে ম্যাচ জিতলে তারা হইহই করে উঠে।
“ ভাই দীর্ঘদিনের তোমার পরিশ্রম ও অগাধ ভালোবাসার জন্য ট্রফি আজ তোমার ঘরে।”— সুজন চোখ টিপ দিয়ে বললো।
সবকটা পাজি হয়েছে। এরা যে এত সহজে ছাড়বে না তা বেশ বুঝলো রক্তিম । সে মাথা নীচু করে ঘাড় চুলকালো। ঠোঁটে তখন বাঁকা হাসির রেখা। আসলেই সে জিতেছে। মেয়েটা এখন তার। তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো পাওয়া।
রিজু গুঁতো দিল রক্তিমের পেটে। রক্তিম তাকালে সে দরজার পানে ইশারা করলো। রক্তিম সেইদিকে দেখা মাএই থমকে গেল। সে মুহূর্তে চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেল যেন। চারিদিকের হইহুল্লোড় রক্তিমের কানে তখন ঢুকছে না। আশেপাশের মানুষজনও ভেনিশ হয়ে গেছে রক্তিমের নজরে। তখন ব্যাকগ্ৰাউন্ড মিউজিক চলছে ——
Tumhein Jo Maine Dekha,
Tumhein Jo Maine Jaana
Jo Hosh Tha, Wo To Gaya
Badan Ki Khushboo,
Jagaae Lagi Jaadu...
To Hoke Beqabu, Dil Kho Gaya
Tumhein Jo Maine Socha,
Tumhein Jo Maine Maana
Tumhein Jo Maine Dekha,
Tumhein Jo Maine Jaana
Jo Hosh Tha, Wo To Gaya.....
রক্তিম হা করে তাকিয়ে রইলো নয়ন্তীকার পানে।
মেয়েটা জাম কালারের স্টাইলিশ গাউন পড়েছে। হালকা জুয়েলারির সাথে চুল গুলো পনিটেইল করা। মুখে মেকাপ থাকলেও লাজুক হাসিতে ফুলো ফুলো গাল দুটো লাল হয়ে আছে। সে ধীর গতিতে এইদিকেই এগিয়ে আসছে। রক্তিম মুগ্ধ নয়নে তাকিয়েই রইলো , কেবল তাকিয়েই রইলো তার নয়নের পানে।
অপরদিকে , রক্তিমকে নিজের বউয়ের দিকে এইরকম বলদের মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে রিজু পেটে একটা গুঁতো দিল তার। রক্তিম চমকে উঠলো তৎক্ষণাৎ। নিজের কল্পনা জগৎ থেকে বাইরে বেরিয়ে এল মূহুর্তে। সে রিজুর দিকে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকালে, রিজু নিজের মাথা চাপড়ালো। তারপর রক্তিমকে ধাক্কা দিয়ে বললো —— “এই বলদ, যা নিজের বউকে স্বযত্নে স্টেজ পর্যন্ত নিয়ে যা! এই গুলোও শিখিয়ে দিতে হবে শা*লা।”
রিজুর কথায় রক্তিমের যেন ধ্যান ফিরলো। সে লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। তারপর এগিয়ে গেল নয়ন্তীকার দিকে। মেয়েটা তখন দুহাত গাউন ধরে এইদিকেই আসছে। তার দুপাশে রক্তিমের মাসির মেয়ে ও রিহা রয়েছে।
রক্তিম নয়ন্তীকার দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে। নয়ন্তীকা একপলক হাত আর হাতের মালিকের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতখানা রাখলো রক্তিমের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের উপর। ওমনি চারিদিকে হইহুল্লোড়ে মেতে উঠলো পরিবেশ। রক্তিমের বন্ধুবান্ধব চেঁচিয়ে উঠলো জোড়ে।
অপরদিকে, অনিমেষ দাশগুপ্ত ও মিসেস রেবা তখন স্টেজের উপর থেকে নয়ন্তীকাকে স্বাগত জানালেন হাস্যরত মুখে।
--------------
রাত তখন প্রায় বারো'টার কাছাকাছি। দাশগুপ্ত বাড়ির পার্টি তখনো চলছে । বাড়ির লোকজন ব্যতীত বড়োরা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। এমনকি পাড়া প্রতিবেশীর লোকজন হাস্যরত মুখে পিঠ পিছনে সমালোচনা করেও গেছেন। মোট কথা, বর্তমানে পার্টিতে ইয়াং জেনারেশনের মানুষজন উপস্থিত আছে। এই যেমন রক্তিমের মাঠের ছেলেপুলে সহ নয়নের গুটিকয়েক বন্ধু। অনিমেষ দাশগুপ্ত ও মিসেস রেবা বাড়ির আত্মীয় স্বজনদের নিয়ে খাওয়া দাওয়ায় ব্যস্ত। ঠিক এই সময়ের সুযোগ নিল রক্তিমের বন্ধুবান্ধব।
কুল তলা সহ দাশগুপ্ত বাড়ি তখন ডিজের শব্দে কাঁপছে। বাগানের একপাশে সব নাচগানে ব্যস্ত। রক্তিম আর নয়ন্তীকার ফটোশুট ততক্ষণে শেষ হয়েছে।
এখন তারা স্টেজের উপর বসে সবার আনন্দ দেখছে। নয়ন্তীকা চোখ জোড়া চকচক করে চারিদিক অবকলন করতে ব্যস্ত। তার খুব সখ ছিল ধুমধাম করে বিয়ে করার। কিন্তু তা হলো না । তবে এই আয়োজন তার পছন্দ হয়েছে অনেক। তা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তবে নয়নের এই খুশির ফাঁকেও মনের কোথাও না কোথাও অল্প দুঃখও রয়েছে। এই যেমন আজ তার এই সুখের দিনে তার আপনজন সবাই উপস্থিত ছিল।মা, রিহা, দিশা দি সহ রক্তিমের কলেজ ফ্রেন্ডরাও। শুধু তার বাবা ছিল না। কী অভাগা না নয়ন্তীকা?? ভেবেই হতাশা ঘিরে ধরলো তাকে। তবু সে মুখে প্রকাশ করলো না। আগের মতোই হাস্যরত মুখে চেয়ে রইলো চারিপাশে।
অপর দিকে, চারিদিকে ব্যস্ত নয়নের পানে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রয়েছে রক্তিম। আজ চোখই সরাতে পারছে না মেয়েটার উপর থেকে। তার মন চাইছে শুধু দেখে যেতে আর দেখে যেতে।
কিন্তু তা আর হলো না। রিজু সহ আরও পাজিগুলো ততক্ষণে স্টেজে উঠে এসেছে। তাদের চারিদিক দিয়ে সবাই ঘিরে ধরলো মূহুর্তে। তার মধ্যে দিশা বলে উঠলো —— ভাই রক্তিম, অনেক তো শুনলাম নয়ন্তীকার নাচের প্রশংসা! আজ আমরা দেখতে ইচ্ছুক!
“তাও আবার কাপল ডান্স। দুজনকে একসাথে দেখতে চাই আমরা।” —— রিজু জোর গলায় বলে উঠলো।
“শা*লা, আমাকে নাচ করতে দেখেছিস কখনো?”
“কোনো ব্যাপার নেই বস! আজকে দেখে নেব আমরা।”— রিজু দাঁত কেলিয়ে বললো।
—— তাছাড়া এবার বউয়ের ইশারাতেই নাচতে হবে। আজকে না হয় গানে নাচ করে নে।
নিতিনের কথায় উপস্থিত সবাই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো, ব্যতিক্রম দিশা। সে চোখ পাকালো, ইশারায় বোঝালো-- বাড়িতে চলো চাঁদু তারপর দেখাচ্ছি মজা। অপরদিকে সবার ঠাট্টা দেখে নয়ন্তীকা লজ্জায় মাথা নীচু করে রেখেছে।
"এই নয়ন, তোমার বরকে এট্টু বোঝাও না মানা।— দিশা দুষ্টু কন্ঠে বলে উঠলো।
নয়ন্তীকা রক্তিমের দিকে অসহায় নজরে চাইলো। রক্তিম আগে থেকেই তার দিকে শান্ত চোখে চেয়েছিল। দুজনের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে গেল। দুজনেই একে অপরের দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
অপরদিকে, রক্তিমের বন্ধুবান্ধব হইহই করে নেমে গেলো স্টেজ থেকে। তারা নিরবতাকে সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ধরে নিল। সবকটা মিলে গেল ডিজের দায়িত্বে থাকা লোকেদের কাছে।
কিছু জন মিলে বাগানের সমস্ত লাইট নিভিয়ে দিল। মূহুর্তে শুধুমাত্র আলো এসে পড়লো দুজনের উপর। তা দেখে রক্তিম নয়ন্তীকার চোখে চোখ রেখে সুধালো—— “আমি কিন্তু নাচ পারি না!”
“আমি আছি তো!”
নয়ন্তীকার সাহসী কন্ঠস্বর। যা শুনে রক্তিম অদ্ভুদ ভাবে হাসলো। সে নয়ন্তীকার হাত ধরে ধীরে ধীরে স্টেজ থেকে নামলো। ততক্ষণে সবাই তাদেরকে ঘিরে ধরেছে চারিদিক থেকে।
সাউন্ড বক্সে ততক্ষণে গান বেজে উঠলো । যেহেতু রক্তিম নাচ পারে না, তাই নয়ন্তীকাই গানের স্টার্টিং থেকে নাচ শুরু করলো। মিউজিক চলছে তখন। নয়ন্তীকা দক্ষ ভাবে গানের মিউজিকের সাথে পা মেলাতে ব্যস্ত। আর রক্তিম হাত দুটো পকেটে গুঁজে থাকা অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলো। চোখ তখন স্থির নয়ন্তীকার উপর। এরপর গানের লাইন শুরু হবে, ঠিক এমন সময় রক্তিম নয়ন্তীকার কোমর চেপে কাছে টেনে ধরলো। তখন গানের লাইন চলছে ——
Tumko Paya Hai To Jaise Khoya Hoon
Kehna Chahoon Bhi To Tumse Kya Kahon...
রক্তিম গানের সাথে ঠোঁট মেলাচ্ছে। এবং ভালোই তাল মেলাচ্ছে দেখে নয়ন্তীকা হতভম্ব হয়ে গেল। সে এক্সপ্রেশন, লোকজন ভুলে তাকিয়ে রইলো রক্তিমের মুখের দিকে। নয়ন্তীকা নিজের ভর ততক্ষণে রক্তিমের উপর ছেড়ে দিয়েছে। তার কাছে এই মূহুর্তে ঘটা ঘটনাটা স্বপ্নের মতো লাগছে। সে একেবারেই ভুলে বসলো নাচ করার কথা। রক্তিম যেইদিকে যেইভাবে নিয়ে যাচ্ছে সে শুধু পুতুলের মতো যাচ্ছে। সাউন্ড বক্সে তখনো গান চলছে ——
Tumko Paya Hai To Jaise Khoya Hoon
Kehna Chahoon Bhi To Tumse Kya Kahon
Kisi Zabaon Mein Bhi Woh Labaz Hi Nahi
Ki Jeene Mein Tum Ho Kya Tumhein Mein Bata Sakun
Main Aagar Kahoon Tumsa Haseen
Kaynaat Mein Nai Hai Kahin
Tareef Yeh Bhi To Sach Hai Kuch Bhi Nahi
চলবে,,,,,
( রিচেক করা হয়নি। সবাই ভুল-এুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ ♥️ 🥰)