মেহেরবানু শাহ সকাল থেকেই আজমিরা খান ও শেফালী বেগমের কর্মকান্ড লক্ষ্য করছেন। কোন কিছুই তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তবে তিনি কিছুই বললেন না, নিজের ঘরে চুপচাপ বসে রইলেন। মূলত তিনি দেখতে চেয়েছিলেন মেহরাব আদৌ তার পছন্দের উপর সন্তুষ্ট কিনা। তবে মেহরাবের কর্মকান্ডে তিনি বেশ খুশি হলেন। আমিরার পক্ষ নিয়ে মেহরাবের বলা কথায় আজ আজমিরা খানের সহ্যের সীমা পুরপুরি ভেঙে গিয়েছে। বুকের ভেতর যেন ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে অপমান ও ক্রোধে। তিনি বেশ ক্রুদ্ধ হয়ে মেহেরবানু শাহের ঘরে প্রবেশ করলেন। রাগে তার শরীর কাঁপছে রীতিমতো। মেহেরবানু শাহ কৌতুহলী দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য হেসে বললেন,
" অত বড়ো রুই মাছ রান্না হয়েছে আজ, আর আপনি কিনা না খেয়ে চলে এলেন। "
মেহেরবানু শাহের কথায় আজমিরা খানের ক্রোধ যেন তরতর করে বাড়তে লাগলো। তিনি নিজেকে সংবরন করে বললেন,
" খিদে নেই আমার।"
মেহেরবানু শাহের চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠল চাপা বিদ্রূপ। তিনি সামান্য হেলান দিয়ে বসে ঠোঁটের কোণের হাসিটুকু আরও প্রশস্ত করে বললেন,
" আপনার পছন্দের রুই মাছ আনিয়েছি আপা , খিদে নেই বললে চলে? গিয়ে খেয়ে নিন। "
আজমিরার চোখের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে উঠল। ঠোঁট দুটো ক্রোধে কেঁপে উঠল নিমেষেই। তিনি ক্রুদ্ধ স্বরে বলে উঠলেন,
" আজ মেহরাব ওই নিচুজাতের মেয়েটার জন্য আমার সাথে উচ্চস্বরে কথা বলেছে। দুদিন হয়নি মেয়েটা এই বাড়িতে প্রবেশ করেছে, এর মাঝেই মেহরাব আদব,কায়দা ভুলতে শিখেছে। যেই মেহরাব কখনো আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনি সেই মেহরাব আজ আমার সামনে উঁচু গলায় কথা বলেছে,তাও একটা বাইরের মেয়ের সামনে। রীতিমতো অপমান করেছে আমায়। "
" আপনি তার স্ত্রীকে গাধার মতো খাটাবেন, আর সে স্বামী হয়ে তা মেনে নেবে? নিতান্তই কাপুরুষের লক্ষণ! আমার ছেলেকে আমি কাপুরুষের মতো করে গড়ে তুলিনি। স্ত্রীর বিপদে যে স্বামী তার পাশে দাঁড়াতে পারে না, সে স্বামী হওয়ার কোনো যোগ্যতাই রাখে না।"
আজমিরা খান মেহেরবানু শাহের কথায় এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ ও ক্রোধে কাঁপতে থাকা হাত দুটো শক্ত হয়ে মুঠোবদ্ধ হলো। তিনি মেহেরবানু শাহের নির্লিপ্ত চাহনির দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বললেন,
" দেখো স্বামী হওয়ার তাড়নায় যেন মায়ের কথা ভুলে না যায়। এখনো সময় আছে মেহেরবানু, নয়তো দেখবে মেহরাবকে তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে আমিরা। আমিরাকে তুমি যেমন ভাবছো সে মোটেও তেমন নয়, সে একটা কালসাপ। সময় হলেই তার আসল রুপ দেখতে পাবে। "
" আপনাকে ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না আপা। বাছাই করে সোনা এনেছি কয়লা ভেদ করে। "
" তুমি ভীষণ পস্তাবে মেহেরবানু।"
মেহেরবানু শাহ আজমিরা খানের কথার জবাবে আর কোনো প্রতিউত্তর করলেন না। তিনি স্মিত হেসে সামনে রাখা পানদানটি নিজের দিকে টেনে নিলেন। যত্ন করে সাজানো পান থেকে একটি পান তুলে নিয়ে তাতে সামান্য চুন-সুপারি মিশিয়ে ভাঁজ করে নিলেন। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পানটি মুখে পুরে নিলেন। আজমিরা খান তার কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নীলিমার বিস্তীর্ণ বুকজুড়ে বিকেল ধীরে ধীরে শেষ প্রহরের দিকে এগিয়ে চলেছে। পশ্চিম দিগন্তে অস্তগামী সূর্য বিদায়ের পূর্বমুহূর্তে যেন তার সমস্ত রঙের পসরা সাজিয়ে বসেছে। আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত অবধি ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি আভা। জানালার ফাঁক গলে পশ্চিম আকাশের সেই অস্তরাগের ক্ষীণ আভা এসে মেঝের ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে। সেই ম্লান আলো-আঁধারির মাঝে কাঠের টেবিলের পাশে বসে আছে মেহরাব। রান্নাঘরের দরজার কাঠের পাল্লার পাশে নিজেকে সামান্য আড়াল করে সে উঁকি দিয়ে দেখছে মেহরাবকে। মেহরাবের হাতে হাতে ধরা কালো রঙের অদ্ভুত এক যন্ত্র। কানে সেটি ঠেকিয়ে সে আপনমনে কথা বলে চলেছে। আমিরা বেশ অবাক হলো তাকে দেখে। সে ভেবেছে মেহরাব হয়তো একা একাই কথা বলে যাচ্ছে তখন থেকে। তার চোখেমুখে একরাশ বিষ্ময়। মেহরাবের ঠোঁট নড়ছে, অথচ তার সামনে কেউ নেই। আমিরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো মেহরাবের দিকে, তার সরল মনে কিছুতেই হিসাব মিলছে না। মেহরাব টেলিফোন রেখে ঘরে যাওয়ার জন্য পেছনে ফিরতেই দেখতে পেলো আমিরা উঁকি মেরে তাকে দেখছে। মেহরাবের চোখে চোখ পড়তেই আমিরা যেন আচমকাই ধরা খেয়ে গেলো। আমিরার এমন আড়চোখে উঁকি দেওয়ার কারণটি তার বাধগম্য হলো না। আমিরা অবশ্য ততক্ষণে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। মেহরাবের দৃষ্টি নিজের ওপর স্থির হতেই আমিরা লজ্জা আর অপ্রস্তুততায় দৃষ্টি নত করে রইল। মেহরাব তার লজ্জামিশ্রিত মুখমণ্ডল দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
" এদিকে এসো। "
আমিরা ধীরপায়ে মেহরাবের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। দৃষ্টি তখনো মাটিতে নিবদ্ধ। অথচ চোখের পাতা কাঁপছে সামান্য। মনের ভেতর অগণিত প্রশ্ন জমে থাকা সত্ত্বেও সে চুপ করে রইলো। মেহরাব স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা শেষ বিকেলের আলো এসে পড়লো আমিরার মুখে।
"এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে কী দেখছিলে?"
আমিরা তার প্রশ্নে কোন দ্বিধাবোধ ছাড়াই টেলিফোনের দিকে আঙ্গুল তাক করে বলে উঠলো,
" এটা কি?"
" টেলিফোন। "
টেলিফোনটি মেহরাব শহর থেকে নিয়ে এসেছিলো। দু হাজার চার সাল। টেলিফোন এই সময়টাতে কিছুটা সহজলভ্য। শহরের অনেক বাড়িতেই এর ব্যবহার চলমান ছিলো। বাড়িতে কথা বলতে অসুবিধা হওয়ায় টেলিফোন কিনে এনেছিলো সে। তবু আমিরার কাছে কালো রঙের এই অদ্ভুত যন্ত্রটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন। বিস্ময়ভরা চোখে কিছুক্ষণ টেলিফোনটির দিকে তাকিয়ে থেকে আমিরা বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
" টেলিফোন? টেলিফোন দিয়ে কি করে?"
মেহরাব স্মিত হেসে আমিরার মুখের ওপর এসে পড়া চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বললো,
" আমি যখন চলে যাওয়ার পর যদি আমায় মনে পড়ে তখন এই টেলিফোনের মাধ্যমে আমার সাথে কথা বলতে পারবে। "
মেহরাবের চলে যাওয়ার কথা শুনতেই আমিরার অধর থেকে হাসি মিলিয়ে গেলো। এক মুহূর্ত আগেও যে মুখখানি আনন্দের আভায় দীপ্ত ছিল, সেখানে হঠাৎ নেমে এলো বিষণ্ণতার ছায়া। আমিরা দৃষ্টি নত করে আঙুলের ডগা দিয়ে আঁচলের প্রান্তটি অকারণে কচলাতে কচলাতে ক্ষীণ স্বরে বলল,
" কোথায় চলে যাবেন?"
" ঢাকা শহরে, চাকরির তাগিদে চলে যেতে হবে কিছুদিন পরেই।"
" সবাইকে ছেড়ে? "
" হুম। "
আমিরা মলিন দৃষ্টিতে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বললো,
" আমাকে ছেড়ে? "
" হুম। "
আমিরার বড্ড অভিমান হলো। এই লোকটা কত সহজেই বলে ফেললো অথচ একটিবারের জন্যেও ভাবলো না তার কথা। আমিরা আরও কিছু বলতে চেয়েছিলো কিন্তু পারলো না, মুখ দিয়ে শব্দ বের হলো না তার। সেআবারও দৃষ্টি নত করে নিলো। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান আর অজানা শূন্যতা যেন গলার কাছে এসে আটকে রইল। তার অধর কেঁপে উঠল ক্ষীণ অভিমানে। মেহরাব তার অর্ধাঙ্গীনির অভিমান বোধহয় বুঝতে পেরেছে। সে আমিরার খানিকটা কাছে এসে আলতো করে আঙুল রাখল আমিরার থুতনিতে। অত:পর মৃদু স্পর্শে তার থুতনি ওপরে তুলে ধরল। আমিরার অবনত দৃষ্টি অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেহরাবের চোখের সীমানায় এসে থামল। দু’টি দৃষ্টি মুখোমুখি হতেই আমিরা তার দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। মেহরাব তার কর্মকান্ড দেখে মৃদু হেসে বললো,
" অভিমান হয়েছে বিবি?"
" উহু। "
" অভিমান তো দেখা যাচ্ছে খুব জোড়ালো, ভাঙ্গার কি তবে কোন রাস্তাই নেই?"
" করি নি অভিমান। "
" আমার চোখের দিকে তাকাও বিবিজান। "
আমিরার অভিমানী দৃষ্টি মেহরাবের চোখের দিকে তাকাতেই মেহরাব বলে উঠলো,
" তুমি চাও না আমি চলে যাই?"
" থেকে গেলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে?"
" কাজ না করলে খাবে কি?"
" তিন বেলার খাবার এক বেলা খাবো দরকার হলে। আপনি ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই। আপনি চলে গেলে আমার কি হবে?"
" বেঁচে থাকার তাগিদে আমাদের অনেক কিছুই করতে হয়। তোমার যখন আমার কথা মনে পড়বে তখন চিঠি লিখে আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিও। টেলিফোন তো রয়েছেই। "
" টেলিফোনে আপনাকে দেখা যাবে?"
আমিরার বোকা বোকা প্রশ্নে মেহরাব ফিক করে হেসে ফেললো। মেহরাবকে হাসতে দেখে আমিরা ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে। তার কথায় মেহরাব হঠাৎ হাসতে লাগলো কেন তা তার বোধগম্য হলো না। মেহরাব হাসি থামিয়ে আমিরার দিকে তাকিয়ে বললো,
" না, শুধু কন্ঠস্বর শুনা যাবে। "
আমিরা এক পলক মেহরাবের দিকে তাকিয়ে অত:পর টেলিফোনের দিকে তাকালো। সে হাত বাড়িয়ে টেলিফোনের রিসিভারটিকে স্পর্শ করলো। কালো রঙের ভারী রিসিভারটি হাতে তুলতেই তার কব্জিতে থাকা লাল চুড়িগুলো মৃদু শব্দে বেজে উঠল। সে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
" কোন আওয়াজ'ই তো আসছে না। "
" এখনো কোন ফোন আসেনি তাই আওয়াজ আসছে না। "
রজনীর গাঢ় নীল আঁচল ধীরে ধীরে ঢেকে দিয়েছে সমগ্র নীলিমা। দিনের সমস্ত কোলাহল পেরিয়ে নেমে এসেছে রজনী। আকাশের বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অগণিত নক্ষত্রগুলো একে একে জ্বলে উঠেছে। গ্রামে মেলা বসেছে আজ, রজনীর নীল আঁচলের নিচে মেলার অসংখ্য বাতি যেন ছোট ছোট জোনাকির মতো জ্বলছে। মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত সারি সারি ছোট ছোট দোকান বসেছে। বাঁশের খুঁটি আর রঙিন কাপড় দিয়ে সাজানো দোকান। মেহরাব বেরিয়েছে ঘন্টাখানেক হলো। আমিরা মেহেরবানু শাহের সাথে বসে পিঠা বানাচ্ছে রান্নাঘরে। কাজে ব্যস্ত থাকলেও আমিরার মনটা যেন পুরোপুরি রান্নাঘরে ছিল না। অজান্তেই তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছিল দরজার দিকে। চুলোর মৃদু আঁচে জ্বলে উঠছে। আগুনের লাল আভা মেহেরবানু শাহ পিঠার পুর তৈরি করছিলেন। মেহেরবানু শাহ'কে ভীষণ ভয় পায় আমিরা। কাজ করার মাঝেই মেহেরবানু শাহ বলে উঠলেন,
" মেহরাব আর কিছুক্ষণ পরেই চলে আসবে, বারবার দরজার দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই। "
আমিরা থতমত খেয়ে গেলো তার কথায়। সে আমতাআমতা করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মেহেরবানু শাহ বলে উঠলেন,
" শুনো স্বামীসোহাগী, মেহরাব আর কিছুদিন পরই চলে যাবে শহরে। যে করেই হোক আটকে রাখবে। ছেলেটা আমার শহরে চলে গেলে ফের আসবে ছ মাস বাদে। বুঝেছ কি বলেছি?"
মেহেরবানু শাহ ‘স্বামীসোহাগী’ সম্বোধন করায় আমিরার মুখে ফুটে উঠল লজ্জার রক্তিম আভা। নত হয়ে এল তার দৃষ্টি। সে মিনমিন করে বললো,
" বুঝেছি আম্মা। "
পিঠা বানানো প্রায় শেষের পর্যায়। আমিরা অপেক্ষা করছে মেহরাব কবে আসবে। এই বাড়িতে তার সাথে কেউ তেমন একটা কথা বলে না, একা একা সময় কাটাতে একেবারেই ভালো লাগে না তার। মেহেরবানু শাহ নিজের ঘরে চলে যেতেই আজমিরা খান আমিরার কাছে এসে দাঁড়াতেই আমিরা মাথার আঁচল খানিকটা টেনে দিয়ে আমতাআমতা করে বললো,
" কিছু বলবেন? "
" গুদামঘরে শুকনো লঙ্কা রাখা আছে বস্তায়, শিলপাটায় পিষে গুড়ো করে আনো। লঙ্কা গুড়ো ফুরিয়ে এসেছে। "
" আচ্ছা। "
কথা শেষ করে সে হাতের কাজটুকু গুছিয়ে অত:পর ধীরে ধীরে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গুদামঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ঘরজুড়ে মাটির হাঁড়ি, চাল-ডালের বস্তা আর নানারকম শুকনো মসলার মৃদু গন্ধ ছড়িয়ে আছে। এক কোণে রাখা বস্তাটির মুখ খুলে শুকনো লঙ্কা থেকে প্রয়োজনমতো কয়েক মুঠো তুলে নিতেই আজমিরা খান ধমকে উঠে বললেন,
" এইটুকু লঙ্কাতে কি হবে? পুরো বস্তার সবগুলো লঙ্কা'ই গুড়ো করতে হবে। অবশ্য জানবে কি করে, জীবনে কখনো এতোগুলো লঙ্কা কখনো দেখেছো? নর্দমা থেকে উঠে আলিশান বাড়িতে জায়গা হয়েছে। "
আমিরা হাতের লঙ্কাগুলো পুনরায় বস্তার ভেতর রেখে দিল। আজমিরা খানের কথার প্রতিউত্তরে সে কিছুই বললো না। সে আঁচলের প্রান্ত দিয়ে চোখের কোণে জমে ওঠা অশ্রুটুকু মুছে নিল। বস্তাটি টেনে নিয়ে গেলো রান্নাঘরে, বস্তার মুখ খুললে কয়েক মুঠো তুলে নিল সে। রান্নাঘরের এক পাশে রাখা শিলপাটার কাছে এসে বসে আঁচলটি আরেকটু সামলে নিয়ে শিলের ওপর একে একে শুকনো লঙ্কাগুলো রাখল। শিলটি হাতে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে পিষতে শুরু করতেই শুকনো লঙ্কার খসখসে শব্দে ও লঙ্কার ঝাঁঝালো গন্ধে আমিরার নাক-মুখ কুঁচকে এল। আজমিরা খান তার কাছ থেকে খানিকটা দূরে কাঠের চেয়ারে বসে রইলেন। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে আমিরা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলো মেহরাব দাঁড়িয়ে আছে। মেহরাবকে দেখেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো তার অধরে। মেহরাব আমিরার সেই প্রাণভরা স্নিগ্ধ হাসি দেখে নিজেই স্মিত হাসলো। মেহরাবের মুখোমুখি হতেই আমিরার চোখেমুখে যেন মুহূর্তেই ফিরে এলো সমস্ত ক্লান্তির অবসান। মেহরাব ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আমিরা আবারও রান্নাঘরে চলে গেলো। মেহরাব আজমিরা খানকে দেখেই বুঝতে পেরেছে আবারও কিছু একটা হয়েছে হয়তো। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা শিলপাটার শব্দ কানে আসতেই থমকে গেলো সে, এক মুহূর্ত ও দেরি না করে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে পৌঁছতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল আমিরার ওপর। মাটির পিঁড়িতে বসে আপনমনে লঙ্কা পিষছে । সে আমিরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
" তোমাকে এসব কে করতে বলেছে?"
মেহরাবের কথায় আমিরা হাতের কাজ থামিয়ে চুপ করে রইলো। আজমিরা খান তেঁতেঁ উঠে বললেন,
" বাড়ির বউ কাজ করছে তাতে কি এমন হয়েছে মেহরাব? আমরাও করেছি এসব কাজ।"
" আমিরার এখনো বয়স হয়নি এসব কাজ করার। "
" বাপেরবড়িতে ঠিকই সব কাজ করেছে। সেখানে পারলে এখানেও করতে পারবে। সংসারের কাজ করলে কারো হাত-পা ভেঙে যায় না। "
" সংসারের কাজ নিয়ে আমার আপত্তি নেই ফুপি,এসব কাজ করার জন্য লোক আছে, বাপেরবড়িতে করেছে বলে যে শ্বশুরবাড়ি তে করতে হবে এমন তো কোন নিয়ম নেই। "
" বাড়ির বউ হতে গেলে এমন একটা দুটো কাজ করতে হয় মেহরাব। এই সামান্য ক'টা সামান্য লঙ্কা পিষতে বলেছি বলে তুমি এমনভাবে কথা বলছো যেন ওকে দিয়ে অনেক বড় কোন কাজ করানো হচ্ছে!”
" সকাল থেকে দেখছি এটা ওটা কাজ করিয়েই যাচ্ছেন ওকে দিয়ে। ওর এখনো এতো ভারী ভারী কাজ করার মতো বয়স হয়নি। এতোগুলো মানুষ রাখার পরেও কেন ওকে কাজ করতে হবে?"
"বাহ! বউকে দুটো কাজ করতে বলেছি বলে দরদ উথলে পড়ছে দেখি। "
" কাজ করার জন্য হলে চাকরানী নিয়ে আসতে পারতাম, বিয়ে করার কোন প্রয়োজন'ই ছিলো না। "
আজমিরা খান কিছু বলতে যাবেন তার আগে মেহরাব বিরক্তিকর স্বরে বলে উঠলো,
" উঠে এসো বিবি। "
আমিরা এক পলক আজমিরা খানের দিকে তাকিয়ে অত:পর মেহরাবের দিকে তাকালো। মেহরাব তার দিকে হাত বাড়াতেই সে নিজের হাতটি মেহরাবের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের ওপর রাখল। মেহরাব আলতো করে তার হাতটি ধরে তাকে পিঁড়ি থেকে উঠিয়ে নিল। আমিরা উঠে দাঁড়াতেই মেহরাব তার দিকে তাকিয়ে বললো,
" ঘরে চলো। "
আমিরা মাথা নেড়ে সায় জানায় তার কথায়।তারা দুজন চোখের আড়াল হতেই আজমিরা খান রেগে নিজের ঘরে গিয়ে আলমারি খুলে একে একে নিজের ব্যাগপত্র গোছাতে শুরু করলেন। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন,এত অপমানের পর এই মুহূর্তেই তিনি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন। মেহরাব আমিরাকে বিছানায় বসিয়ে তার মুখোমুখি বসে বলে উঠল,
"পা এগিয়ে দাও। "
মেহরাবের কথায় থতমত খেয়ে গেলো আমিরা। দু’চোখ বড় বড় করে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে রইল। মেহরাবের কথার অর্থ যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি সে। আমিরা নিজের পা দুটো গুটিয়ে নিলো, অত:পর মিনমিন করে বলে উঠলো,
" কেন?"
" দিতে বলেছি, দাও। "
আমিরা কিছু না বলে লজ্জায় নত করে ফেলল দৃষ্টি। সংকোচ কাটিয়ে ধীরে ধীরে পা দুটো মেহরাবের সামনে বাড়িয়ে দিল। আমিরা পা বাড়িয়ে দিতেই মেহরাব নিজের পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করলো রুপালি নূপুরজোড়া। সে কোনো কথা না বলে নূপুরের একটি হাতে তুলে নিল। অত:পর অত্যন্ত যত্নে আমিরার পায়ের পাতা নিজের দিকে সামান্য টেনে নিয়ে নূপুরটি তার গোড়ালির কাছে পরিয়ে দিল। আমিরা প্রচন্ড অবাক হলো তার এহেন কান্ডে। মেহরাবের এমন যত্নে সে যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে পা সরিয়ে নিতে চাইলেও মেহরাব দিলো না। সে নূপুরের বন্ধনীটি ভালোভাবে আটকে দিল। তারপর দ্বিতীয় নূপুরটিও যত্ন সহকারে তার অন্য পায়ে পরিয়ে দিল। জানালার ফাঁক গলে আসা চাঁদের আলোয় রুপালি নূপুর দুটি চিকচিক করে উঠল।
" পছন্দ হয়েছে বিবিজান?"