আমিরা মাথা নেড়ে সায় জানালো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটুকরো লাজুক হাসি। মেহরাব তার লজ্জায় রাঙা মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। অতঃপর মৃদু স্বরে বলে উঠল,
" এতো লজ্জা কোথা থেকে আসে শুনি। "
" জানি না। "
আমিরার সহজসরল স্বীকারোক্তি শুনে মেহরাব আর হাসি সংবরণ করতে পারল না। সে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। মেয়েটা বড্ড বেশি লজ্জা পায়। মেহরাবকে হাসতে দেখে আমিরা দৃষ্টি নত করে নেয়, সে ঢের বুঝতে পারছে মেহরাব তার মজা নিচ্ছে৷ হঠাৎ চোখে কিছু একটা পড়তেই সে আঙ্গুলের ডগা দিয়ে চোখের কোণ স্পর্শ করতেই চোখের কোণে তীব্র জ্বালা অনুভব করলো। মুহূর্তেই জ্বালাটা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল। চোখের পাতা কুঁচকে এলো, পলকের ফাঁক গড়িয়ে টলমল করে অশ্রু নেমে এলো গাল বেয়ে। আমিরা ব্যাকুল হয়ে বারবার চোখ মুছতে লাগলো। তখন শিলবাটায় লঙ্কা পিষার পর হাত ধোয়ার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল সে। মেহরাব তাকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে দ্রুত তার কাছে এগিয়ে এসে তার হাত দুটো থামিয়ে দিল। উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে আমিরার অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
"কী হয়েছে ? চোখে কী পড়েছে?"
আমিরা কাতর কন্ঠে বলে উঠলো,
" লঙ্কা পিষার পর যে হাত ধুইনি মনে ছিলো না। "
মেহরাব আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে আমিরার হাত আলতো করে নিজের নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
"চোখে হাত দিও না। গোসলখানায় চলো । "
আমিরা অশ্রুসিক্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। জ্বালায় চোখ মেলতেও পারছে না। মেহরাব তাকে উঠিয়ে গোসলখানায় নিয়ে গেলো। তারপর পরিষ্কার পানি দিয়ে তার হাত ও মুখ ধুয়ে দিলো। কয়েকবার পানি দেওয়ার পর জ্বালা কমলো। অস্বস্তিতে কুঁচকে থাকা চোখের পাতাও এবার কিছুটা স্বাভাবিক হলো। মেহরাব উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
"এতক্ষণে মনে পড়ল হাত ধোয়ার কথা?"
আমিরা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। রজনী তার গাঢ় নীল আঁচলখানি মেলে নিঃশব্দে নেমে এসেছে ধরিত্রীজুড়ে। নীলিমার বুক চিরে উঠেছে পূর্ণচাঁদ , তার শুভ্র জ্যোৎস্নাধারা ছড়িয়ে পড়েছে চারিপাশে। নীলিমার বিস্তৃত বুকে অসংখ্য নক্ষত্র জ্বলছে আপন মহিমায়, আর চাঁদের কোমল জোছনা জানালার ফাঁক গলে ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে দিয়েছে রুপালি আভা। নক্ষত্রেরা দূর আকাশে মিটিমিটি জ্বলছে। জ্যোৎস্নামাখা রাতের নিভৃত আবেশে বিছানার ওপর পাশাপাশি বসে আছে মেহরাব ও আমিরা। আমিরা বড্ড আগ্রহ জেগেছে মেলা নিয়ে। সে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে একরাশ আগ্রহ নিয়ে বলে উঠলো,
" আপনি মেলায় গিয়েছিলেন বুঝি?"
মেহরাব তার আগ্রহভরা চাহনির দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বললো,
" হ্যাঁ।"
" কি কি ছিলো মেলায়?"
" অনেক কিছুই ছিলো। বাহারি চুড়ি আর কানের দুলের দোকানও ছিল। মিষ্টি, জিলাপি, বাতাসা থেকে শুরু করে হরেক রকমের খাবারের দোকান। "
মেহরাবের উত্তরে আমিরার কৌতূহল যেন আরও খানিকটা বেড়ে গেল। সে একটু নড়েচড়ে বসে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বললো,
" আমায় একবার নিয়ে যাবেন মেলায়? আমার নিষেধ জারি করা ছিলো বলে কখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি। "
প্রশ্নটা করেই যেন নিজের সাহসেই লজ্জা পেল সে। দৃষ্টি নামিয়ে নিল বিছানার চাদরের দিকে। মেহরাব কিছুক্ষণ তার লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
" নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো। তবে আজ নয়, কাল। "
" আচ্ছা। "
" কখনো নিজের শখ, ইচ্ছে চেপে রাখবে না। একটা কথা সবসময় মনে রাখবে তোমার শখ, আহ্লাদ পূরণ করার জন্য তোমার স্বামী আছে। আমার পরিশ্রম, উপার্জন সব তোমার জন্যই।"
আমিরা ডুকরে কেঁদে উঠলো তার কথা শুনে। এতো সুখ কি সইবে তার কপালে? এতো সুখ তো সে কখনো আশা করেনি। সে তো ভেবেছিলো সৎ মায়ের মতো এখানেও হয়তো তাকে অত্যাচার করবে কিন্তু মেহরাবের মতো একজনের জীবনসঙ্গী তার তাকদীরে লিখা ছিলো সে কখনো ভাবতেই পারেনি। মেহরাব আলতো হাতে তার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো,
" এতো কাঁদলে তো চোখের পানি শুকিয়ে যাবে, বিবি। "
আমিরা ফিক করে হেসে ফেললো তার কথায়। মেহরাব তার অধরে হাসির রেখা দেখতে পেয়ে বললো,
" সবসময় হাসিখুশি থাকবে, বুঝেছো? নয়তো আমার শালি সাহেবা সবাইকে বলে বেড়াবে আমি তার আপাকে খুশি রাখিনি। "
সুহানা'র কথা মনে পড়তেই আমিরার অধর থেকে হাসি বিলীন হয়ে যায়। একমাত্র সুহানা'ই তাকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবেসেছিলো। আজ দুসিন মেয়েটাকে দেখেনি সে। মেহরাব তার মলিন চেহারা দেখে বলে উঠলো,
" নাইওর কবে যাবে তুমি?"
" মানে?"
"নাইওর যাবে না বাপেরবাড়ি?"
"উঁহু!"
"মেয়েরা তো বাপেরবড়ি যাওয়ার জন্য একমাস আগ থেকেই তৈয়ারি শুরু করে, তোমার বেলায় উল্টো কেন?"
" নাইওরের কথা বলে তাড়িয়ে দিতে চাইছেন?"
"মোটেও না। "
"বাপেরবড়ি রেখে আসলেও যাবো না। দরকার হয় রাস্তায় পড়ে থাকব।"
" আমার বা'পাজরের হাড় দিয়ে তৈরি তুমি, তাড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবি কি করে? "
" আমি তো কখনো ভাবিনি, আপনার মতো এতো ভালো স্বামী আমার তাকদীরে ছিলো। "
" তোমার তাকদীরনামায় আমার নাম লিখা ছিলো বলেই তোমায় আমার করে পেয়েছি।
আজমিরা খান রাগে-ক্ষোভে নিজের ঘর থেকে ব্যাগপত্র হাতে বেরিয়ে এলেন। অপমানের তীব্রতা তখনও তাঁর বুকের ভেতর জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো দাউদাউ করে জ্বলছে। দরজার দোরগোড়ায় এসে তিনি বাইরে পা বাড়াবেন ঠিক সেই মুহূর্তে চিরচেনা পদশব্দ শুনতে পেলো। মেহেরবানু শাহ কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আজমিরা খান থমকে দাঁড়ালেন। মেহেরবানু তাঁর হাতে আঁকড়ে ধরা ব্যাগের দিকে একবার তাকিয়ে অত:পর আজমিরা খানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে কটাক্ষমিশ্রিত স্বরে বললেন,
" এতো রাতে কোথায় যাচ্ছেন আপা? "
আজমিরা খান তার কটাক্ষ হয়তো বুঝতে পেরেছে, তিনি ব্যাগের হাতল হাতের মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
" ফিরে যাচ্ছি। "
" এতো রাতে? ক্রোধ সংবরণ করতে পারছেন না বুঝি, আপা। "
" সব জেনে শুনে নাটক করো না মেহেরবানু। ওই রাস্তার মেয়ের জন্য তোমার ছেলে আমায় অপমান করেছে। খুব শীঘ্রই পস্তাবে তোমরা। "
" আমিরা এই বাড়ির বউ। রাস্তার মেয়ে নয়। জাত-পাত নিয়ে আমায় জ্ঞান দিতে আসবেন না আপা। ইতিহাস খুলতে বাধ্য করবেন না আমায়, আপনি নিজেও জানেন এর পরিণতি কি হতে পারে। "
মেহেরবানু শাহের কথা শুনে আজমিরা খান কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইলেন, তার মুখমণ্ডল ক্রোধে মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। তিনি হিসহিসিয়ে বলে উঠলেন,
" হুমকি দিচ্ছো আমায়?"
" হাসালেন আপা।"
আজমিরা খান কথা বাড়ালেন না, তিনি নিজেও জানেন এর পরিণতি ভয়াবহ হবে। তিনি চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মেহেরবানু শাহ বলে উঠলেন,
" এতো রাত করে যাওয়ার প্রয়োজন নেই আপা। সকালে দরকার হয় মেহরাব নিজে গিয়ে দিয়ে আসবে আপনাকে। ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করুন। "
মেহেরবানু শাহ আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। আজমিরা খান নির্বাক দৃষ্টিতে মেহেরবানুর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখেমুখে তখনও ক্রোধের ছাপ স্পষ্ট। তিনি আর দরজার দিকে পা বাড়ালেন না, মেহেরবানু শাহের কথামতো নিজের ঘরে চলে গেলেন। রান্নাঘরের এক কোণে চুপচাপ বসে ভাত খাচ্ছিল আমিরা। মেহরাবের খিদে নেই বলে সে খায়নি, আমিরাকে খেয়ে নিতে বলায় সে রান্নাঘরের মেঝেতে বসেই খাওয়া শুরু করে। হঠাৎ রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন আজমিরা খান। পানি নিতে এসেছিলেন তিনি, আমিরাকে ভাত খেতে দেখে তিনি অবাক হোন কিছুটা। মাছের বড়ো পেটি বেশ তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে সে। তিনি কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আমিরার দিকে তাকিয়ে থেকে আচমকাই কঠিন স্বরে বলে উঠলেন,
"চোর!"
আমিরা হতভম্ব হয়ে গেলো তার কথায়। আজমিরা খান তার কাছে এসে বললেন,
" চুরি করে মাছ খাওয়া হচ্ছে? চুরির স্বভাব তো থাকবেই। হাভাতে ঘরের মেয়ে এনেছে যে। আজ আমাদের জাতের মেয়ে আনলে এই দিন দেখা লাগতো না। "
আমিরা বাকি ভাতটুকু আর মুখে তুলতে পারল না । তার গলা দিয়ে ভাতের দানা নামছে না। সে আজমিরা খানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
" বিশ্বাস করুন আমি চুরি করিনি। উনি বলেছিলো হিসেল থেকে নিয়ে খেতে। আমি চোর নই।"
" চুপ করো। চোরের মায়ের বড়ো গলা। "
অপমানে নত হয়ে এলো আমিরার চোখ। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠলো,
" আমি চুরি করে খাইনি ফুপিআম্মা। বিশ্বাস করুন। "
মেহেরবানু শাহের ঘর নিচ তলায় হওয়ায় তিনি কথার আওয়াজ শুনতে পেয়ে বেরিয়ে আসলেন। ঘরটি নিচতলায় হওয়ায় রান্নাঘরের প্রতিটি উচ্চস্বরে উচ্চারিত শব্দই তাঁর কানে স্পষ্ট পৌঁছাচ্ছিল। আমিরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মেহেরবানু শাহ কে দেখে। ভাবলো উনিও বুঝে তাকে ভুল বুঝে বাড়ি থেকে বের করে দিবে। কিন্তু তার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে মেহেরবানু শাহ আজমিরা খানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
" কি হয়েছে আপা? "
আজমিরা খান অধরে বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে তুলে বললেন,
" চুরি করে খাচ্ছে তোমার আদরের ছেলের বউ। খুব তো আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলেন কয়লা ভেদ করে সোনা নিয়ে এসেছো। বুঝেছো মেহেরবানু, কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। শত হোক নিচু জাতেরই মেয়ে। "
" নিজের বাড়িতে কিসের চুরি আপা?"
আজমিরা খান থতমত খেয়ে গেলো তার কথায়। তার অধর থেকে হাসি মিলিয়ে গেলো। তিনি অবাক স্বরে বললেন,
" কি বোঝাতে চাইছো তুমি?"
" আমিরা এই বাড়ির বউ। এটা তার নিজের বাড়ি, সে যখন ইচ্ছে খাবে, যতটা ইচ্ছে খাবে। এখানে চুরি করার মতো কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না আমি। "
আজমিরা খান কি বলবেন ভাষা খুঁজে পেলেন না। তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে, অত:পর হনহন করে চলে গেলেন নিজের ঘরে। আমিরা মেহেরবানু শাহের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তিনি আমিরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
" যে যা বলবে মাথা পেতে নিবে? এই বাড়ি তোমার। এই বাড়ির দায়িত্ব তোমার, তাহলে কেন অন্য কেউ এসে তোমায় দুটো কথা শুনিয়ে যাবে?"
" এই বাড়িতে এসেছি আজ দুদিন হয়েছে আম্মা। ফুপিআম্মা আমায় সহ্য করতে পারেন না আমি জানি, কিন্তু আমি চেয়েছিলাম উনার মন জয় করতে।"
" মেহরাব ছাড়া আর কারো মন জয় করার প্রয়োজন নেই। সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে তোমায় এই বাড়ির বউ করে এনেছি। আজমিরা আপা কয়েকদিনের অতিথি মাত্র এখানকার। আমি আর আমার ছেলেকে নিয়েই তোমার সংসার। "
" বুঝতে পেরেছি আম্মা।"
" খাবারটুকু শেষ করে ঘরে যাও। "
আমিরা মাথা নিচু করে মিনমিন করে বললো,
" খিদে নেই আম্মা। "
মেহেরবানু শাহ আমিরার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, মেয়েটা কষ্ট পেয়েছে আজমিরা খানের কথায়। শুধুমাত্র জাতের জন্যই মেয়েটাকে এতো ঘৃণা করেন আজমিরা খান। রাত কিছুটা গভীর হয়েছে, জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া ক্ষীণ বাতাসে পর্দার আঁচল দুলে উঠছে বারবার। মেহরাব বই পড়ছে হেলান দিয়ে। আমিরা ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করলো। তার উপস্থিতি টের পেতেই মেহরাব বই থেকে দৃষ্টি তুলে তাকাল তার দিকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। আমিরা কিছু না বলে এগিয়ে এসে মেহরাবের পাশে চুপটি করে শুয়ে পড়লো। মেহরাব হাতের বই টেবিলের পাশে রেখে নিজেও শুয়ে পড়লো। আমিরাকে চুপচাপ শুয়ে পড়তে দেখে মেহরাব ভাবলো আমিরা হয়তো আজ ক্লান্ত। কারণ গতকাল রাতেও আমিরা তার সাথে মাঝরাত অব্দি গল্প করেছে, মূলত আমিরা অপেক্ষায় থাকে মেহরাবের। কারণ এই বাড়িতে মেহরাব ছাড়া তার কথা শুনার মতো কেউ নেই। আজ আমিরাকে তারাতাড়ি শুয়ে পড়তে দেখে মেহরাব ভাবলো হয়তো তার ঘুম পেয়েছে, তাই আর তাকে কোনো কথা বলে বিরক্ত করল না। নিঃশব্দে চোখ বুজে শুয়ে রইল সে। অথচ মেহরাবের অগোচরে আমিরার দু’চোখে তখনও ঘুমের কোনো ছোঁয়া নেই। বিছানায় শুয়েও তার চোখে ঘুমের কোনো আভাস নেই। এপাশ-ওপাশ করতে করতে বারবার চোখ বুজে আনার চেষ্টা করল সে, অথচ কিছুতেই ঘুম নামল না চোখের পাতায়। মেহরাব তাকে এপাশ ওপাশ করতে দেখে বলে উঠলো,
" ঘুম আসছে না বিবি?"
আমিরা মিনমিন করে বললো,
" অনেক্ষণ যাবত চেষ্টা করছি, কিছুতেই চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না। "
মেহরাভ আমিরার কিছুটা কাছে সরে এসে আলতো হাতে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো, অত:পর বলে উঠলো,
" মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করো। "
মেহরাবকে এতো যত্ন নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দেখে আমিরা মলিন কন্ঠে বলে উঠলো,
" নিচুজাত বলেই কি ফুপিআম্মা আমায় এতো ঘৃণা করেন?"
" কে কি বললো তাতে কি আসে যায়? আমি তোমায় অবহেলা বা অবজ্ঞা করেছি?"
" না। "
" এসব নিয়ে ভেবো না, তুমি আমার স্ত্রী। ফুপি দুদিন পর চলে যাবে, আস্তে আস্তে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। "
" আমায় কেউ কখনো এতো যত্ন করে ঘুম পাড়িয়ে দেয়নি। "
" আমি আছি তো ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। "
" আপনি চলে গেলে কে আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিবে?"
" অল্পদিনেই আমার উপর নির্ভর হয়ে পড়লে? সামনে যদি আমি না থাকি তখন?"
" পরশু তো চলেই যাবেন।"
" এই যাওয়ার কথা বলছি না, যদি মরে যাই তখন?"
আমিরা তৎক্ষনাৎ মেহরাবের হাত নিজের দুহাতের মুঠোয় বন্দী করে বলে উঠলো,
" এসব বলবেন না। আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনাকে চাই আমি। "
" আচ্ছা বলব না। তবে আমায় কথা দিতে হবে, আমি চলে যাওয়ার পর তুমি নিজের খেয়াল রাখবে। আমায় নিরাশ করবে না। "
" ঢাকা চলে যাওয়ার পর?"
" হুম। "
" ঠিক আছে, কথা দিলাম নিজের খেয়াল রাখব।"
মেহরাব আমিরার কপালে ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দিলো, অত:পর বলে উঠলো,
" কথার খেলাপ যেন না হয়, মনে থাকবে?"
" হুম।"