প্রভাতের স্নিগ্ধ আবেশে দেখা দিলো সূর্যের আভাস। নিলিমার বিস্তীর্ণ বুকজুড়ে সূর্য সবে উঁকি দিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার সোনালি আভা,মেঘের ফাঁক গলে আসা কোমল রৌদ্র জানালার কপাট পেরিয়ে ঘরের মেঝেতে আঁকছিল আলোর অপার্থিব কারুকাজ। আমিরার ঘুম ভেঙেছে সবেমাত্র। সূর্যের সোনালী আভা এসে পড়েছে আমিরার নিদ্রামিশ্রিত চোখে । ঘুমজড়ানো চোখ মেলে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলো পাশে মেহরাব নেই। সে কাঠের চেয়ারে বসে আছে। তার সামনে থাকা টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কিছু কাগজপত্র। আমিরার এলোমেলো চুলগুলো বালিশের ওপর ছড়িয়ে আছে। চোখের পাতায় তখনও লেগে আছে নিদ্রার রেশ। আজ ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে তার। ঘুমের রেশটুকু চোখে নিয়েই উঠে বসলো সে । এলোমেলো চুলে হাতখোপা করে অত:পর শাড়ির আঁচল মাথার ওপর টেনে ঘোমটা দিয়ে মেহরাবের কাছে এসে দাঁড়ালো। মেহরাবের হাতের কাগজ টেবিলে রেখে স্মিত হেসে আমিরার দিকে তাকালো। ঘুম থেকে সদ্য ওঠা তৈলাক্ত চেহারা ও এলোমেলো চুলের খোপায় তাকে দেখতে বেশ রূপবতী লাগছে মেহরাবের কাছে। মেহরাবের চোখে সেই অনাড়ম্বর রূপেই যেন আমিরার সৌন্দর্য ফুটে উঠলো। আমিরা তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৃদুস্বরে জিগ্যেস করলো,
" কি করছেন?"
" তোমায় পড়ানোর বন্দোবস্ত করছি। "
" নাস্তা করেছেন?"
" একসাথে করবো বলে অপেক্ষা করছি। "
মেহরাবের কথা শুনে আমিরার বেশ অনুতপ্ত হলো। আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেলো তার অথচ লোকটা কিনা তার জন্য সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছে। নিজের অজান্তেই অপরাধবোধের একটুকরো ছায়া এসে ভর করল তার মনে। আমিরা আঙুলের ডগায় আঁচলের প্রান্তটি মুঠো করে মৃদুস্বরে বললো,
“আজ উঠতে দেরি হয়ে গেলো। অনেকক্ষণ যাবত আমার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে আপনাকে।"
মেহরাব আমিরার খোপা থেকে বেরিয়ে আসা অবাধ্য চুলগুলো আঙুলের ডগায় আলতো করে গুছিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বললো,
" এতে মন খারাপের কি আছে বিবি? অপেক্ষা করতে বরাবরই ভালোবাসি আমি, যদি কারণটা হও তুমি। "
মেহরাবের কথা শুনে আমিরার গালজোড়া লজ্জার রক্তিম আভায় রাঙা হয়ে উঠল। দৃষ্টি নত হয়ে এল আপনা-আপনি। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল লাজুক হাসির ক্ষীণ রেখা। কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে না পেরে আমিরা মিনমিন করে বলল,
" একটু অপেক্ষা করুন আমি নাস্তা নিয়ে আসছি। "
উক্ত কথাটি বলেই আর মেহরাবের চোখের দিকে তাকাল না সে। লজ্জাকে আড়াল করার ব্যর্থ প্রয়াসে দ্রুত পা বাড়িয়ে আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কাঠের পাল্লা খুলে সারি সারি শাড়ির মাঝ থেকে সে আলতো হাতে তুলে নিল গোলাপি রঙের একটি শাড়ি। অত:পর শাড়িটি নিয়ে চলে গেলো গোসলখানার ভেতরে। রান্না বসিয়েছেন শেফালী বেগম। মাঝে মাঝে খুন্তি দিয়ে কড়াইয়ে থাকা তরকারি নেড়ে দিচ্ছিলেন তিনি। ফুটন্ত তরকারির শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল চুলোর আগুনের মৃদু কটকটানি।শেফালী বেগমের কপালে তখন ক্ষীণ ঘামের আস্তরণ। আঁচলের একপ্রান্ত কোমরের কাছে গুঁজে আবারও রান্নায় মনোযোগ দিলেন। আজমিরা খান আজ চলে যাবেন বলে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন। দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পরপরই রওনা দেবেন। ব্যাগে রাখা দুটো নকশীকাঁথা ও ছোট ছোট তিনটে কাচের বয়াম বের করে রাখলেন তিনি। মেহরাবের জন্য নিজের হাতে বানিয়ে এনেছিলেন কয়েক রকমের আচার। বয়ামের মুখ শক্ত করে কাপড় দিয়ে বেঁধে তার ওপর আবার সুতো পেঁচিয়ে রেখেছেন যাতে পথের ঝাঁকুনিতে তেলের একফোঁটাও বাইরে না পড়ে। মেহরাবের সঙ্গে তাঁর মনকষাকষি চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। অভিমান জমেছে কিছুটা কিন্তু তাই বলে ভালোবাসা বিন্দুমাত্র ও কমেনি। মেহরাব কাল চলে যাবে বলে তিনি গতকাল রাতে যাননি। অভিমান করে চলে যেতে নিয়েও থেকে গিয়েছিলেন। শহরে ছেলেটা কি খায় না খায়, তা নিয়ে বেশ চিন্তায় থাকেন তিনি। যদি কোন অসুখ বিসুখ হয় তখন একা একা কি করবে ছেলেটা। তখনই বা পাশে কে থাকবে? জ্বর এলে মাথায় জলপট্টি দেওয়ার মতো কেউ আছে তো? শরীর খারাপ হলে ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মতো কেউ আছে তো? গতবার মেহরাব অভিমান করে বলেছিলো আচার কম দিয়েছে কেন, তাই এইবার বেশি করে বানিয়ে এনেছেন তিনি। নিজের ছেলেকেও এর ভাগ দেননি। বছরে মাত্র দুবার মেহরাবকে দেখার সুযোগ পান তিনি। ছেলে, স্বামী যতই তাকে না যেতে বলুক না কেন, তিনি ঠিকই চলে আসেন। নিজের সন্তান না হলেও মেহরাবকে বেশ যত্নে লালনপালন করেছিলেন তিনি। মেহরাবের কথা মনে পড়তেই স্মিত হেসে একপাশে তুলে রাখলেন আচারের বয়ামগুলো ও নিজের হাতে সেলাই করা নকশিকাঁথাটিও। আমিরা গোসল সেরে রান্নাঘরের দিকে যায় নাস্তা আনার জন্য। হাঁটু অবধি দীর্ঘ কেশরাশি তার পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। ঘন কালো চুলের ডগা থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে জলের ফোঁটা। আমিরাকে সিড়ি বেয়ে নামতে দেখে শেফালী বেগম তাচ্ছিল্য হেসে ব্যঙ্গার্থক স্বরে বলে উঠলেন,
"বেলা গড়াইয়া যাওনের পর স্বামীর পাশ ছাইড়া আইবার সময় হইল নবাবজাদীর! এক দেখলাম স্বামীসোহাগী হইছে।মনে অয়, দুনিয়ায় আর কারও স্বামী নাই, খালি তারই আছে! ঢং দেইখা আর বাঁচি না!"
আমিরা তার কথা শুনে থমকে গেলো। সে একবার আড়চোখে শেফালী বেগমের দিকে তাকালো অত:পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পরোটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালো। শেফালী বেগম আমিরার কোন প্রতিক্রিয়া দেখতে না পেয়ে আবারও বলে উঠলো,
" তোমার সোয়ামীরে নাস্তা দিয়া এইহানে আমার হাতে হাতে কামে সাহায্য কর বউ। দিন নাই, রাইত নাই সোয়ামীর লগে লাইগা থাকলে তো আর সংসার চলব না!"
আমিরার ধৈর্যের বাঁধ এবার সত্যিই ভেঙে যাচ্ছে। এই মহিলা সে আসার পর থেকেই তার সাথে বিনা কারণে বাজে ব্যবহার করে যাচ্ছে। আমিরা শেফালী বেগমের দিকে না তাকিয়েই চাপা বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বলে উঠল,
" আমি আমার স্বামীর সাথে সাথে থাকবো না তো কি পরের বাড়ির বউ থাকবে? আর এতোগুলো মানুষ থাকতে আমি কেন কাজ করবো? আমাকে তো আম্মা কোন কাজ করার কথা বলেনি। "
" এই বাড়িত আইছো দুইডা দিনও হয় নাই, এর মইধ্যেই মুখের চোপা দেহি খুব বাড়ছে ! ছিলা তো ওই কুড়েঘরে , এহন এতো দেমাগ আইল কই থেইকা শুনি? দুইডা দিন সোয়ামীর ঘর করছো বইলা মাটিতে পা পড়ে না, বড় বড় কথা কওনের আগে নিজের জায়গাডা মনে রাইখো বউ! "
" আমার জায়গা আমি ঠিক'ই মনে রেখেছি। আপনি নিজের জায়গা ভুলে যাবেন না চাচী, আপনি এই বাড়ির কাজের লোক আর আমি এই বাড়ির বউ। আশা করি আমার সাথে কিভাবে সম্মান দিয়ে কথা বলতে সেটা অন্তত আপনাকে শিখিয়ে দিতে হবে না। নিচুজাতের মেয়ে হলেও আমার স্বামী আমার ফেলনা মনে করেনি তাহলে আপনি কেন বারবার আমার জাত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন?"
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলো আমিরা। শেফালী বেগম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন তার কথায়। এক মুহূর্তের জন্য তিনি নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন আমিরার দিকে। এই মেয়ে যে এতটা তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন তা আগে টের পাননি তিনি। তিনি দাঁত কিড়মিড় করে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমিরার দিকে, পরক্ষণেই শেফালী বেগম বুক চাপড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। হঠাৎ তাকে কাঁদতে দেখে থতমত খেয়ে গেলো আমিরা। শেফালী বেগমের বিলাপ ক্রমেই তীব্র হতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে কখনো মাথায় হাত দিচ্ছেন, কখনো বুক চাপড়াচ্ছেন। তার চিৎকার শুনে একে একে ঘরের মানুষজন সকলে একপ্রকার ছুটে এলেন। মেহেরবানু শাহ ও আজমিরা খান বুঝতে পারলেন না শেফালী বেগম হঠাৎ করে কাঁদছেন কেন এভাবে। মেহরাব চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ পেয়ে উদ্বিগ্ন পায়ে দ্রুত সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল । মেহরাবের দৃষ্টি প্রথমেই গিয়ে পড়ল আমিরার ওপর। সে থালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শেফালী বেগমের পাশে। আজমিরা খান এক পলক আমিরার দিকে তাকালো অত:পর শেফালী বেগমের অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে। শেফালী বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলেন,
"হায় আল্লাহ গো! আমারে এই কথা শুনতে হইল! আমি কি এই বাড়ির পর মানুষ? আমার এত বছরের সেবা-যত্নের এই দাম! একটা বাইরের মাইয়া আইয়া আজ আমারেই আমার জায়গা চিনাইয়া দেয়!"
আমিরা থালা হাতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, মেহেরবানু শাহ ধীর পায়ে শেফালী বেগমের কাছে এসে বললেন,
" কি হয়েছে শেফালী? কাঁদছো কেন?"
শেফালী বেগম চোখের জল মুছে বললেন,
" আমার কপালডাই পোড়া! এত বছর ধইরা এই বাড়ির মানুষগুলার লাইগা জান-প্রাণ দিয়া খাটলাম, অথচ আইজ বুঝলাম, এই বাড়িতে আমার কোনো দামই নাই!"
" কি হয়েছে খুলে বলো। আমিরা তোমাকে কিছু বলেছে?"
"ওরে জিগান! ও কী কইছে।"
শেফালী বেগমের কথা শুনে উপস্থিত সবাই কৌতূহলী দৃষ্টিতে আমিরার দিকে তাকালো,মেহরাবও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এতোগুলো চোখ একসঙ্গে নিজের দিকে নিবদ্ধ হতে দেখে সে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। মেহেরবানু শাহ আমিরার দিকে জিগ্যেস করলেন,
" আমিরা, কী হয়েছে? শেফালী এভাবে কাঁদছে কেন? কিছু হয়েছে?"
আমিরা সব খুলে বলতেই মেহেরবানু শাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেফালী বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
" আমি আমিরার জাত দেখে নয়, গুণ দেখে নিয়ে এসেছি। যেখানে মেহরাব কিছু বলছে না সেখানে তুমি কেন বারবার আমিরাকে অপদস্থ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছো? তোমার যদি ওকে এই বাড়ির বউ মেনে নিতে কষ্ট হয় তাহলে এই বাড়ির দরজা খোলা আছে।"
" আইজ দুইডা কথা কইছি বইলা আপা, আপনি আমারে বাড়ি থেইকা বাইর হইয়া যাইতে কইতেছেন? এই বাড়ি ছাইড়া আমি কই যামু?"
মেহেরবানু শাহ কি বলবেন খুঁজে পেলেন না, তিনি আমিরার দিকে তাকিয়ে বললেন,
" ঘরে যাও আমিরা। "
মেহেরবানু শাহের কথা শুনে আমিরা মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে চলে যায়। মেহরাবও আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আমিরার পিছু পিছু চলে গেল। তারা চলে যেতেই মেহেরবানু শাহ শেফালী বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
" রান্না শেষ হলে কুলসুমকে বলে দিও ছাদে হলুদ শুকোতে দিয়ে আসতে। "
শেফালী বেগম কিছু বললেন না উনার কথা শুনে। মেহেরবানু শাহ উক্ত কথাটি বলে নিজের ঘরে চলে গেলেন। মেহরাব টেবিলের ওপর রাখা কাগজগুলো একে একে গুছিয়ে নিল। সবকিছু গোছানো হয়ে গেলে মেহরাব একবার আমিরার দিকে তাকাল। আমিরা মন খারাপ করে বসে আছে খাটের উপর। মেহরাব তার সামনে খাতা ও কলম এগিয়ে দিয়ে বললো,
" আজ তোমাকে চিঠি লিখা শেখাবো। "
আমিরা মলিন দৃষ্টিতে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বললো,
" আপনি রেগে আছেন আমার উপর? "
আমিরার কথা শুনে মেহরাব ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে, অত:পর জিগ্যেস করলো,
" কেন মনে হলো আমি রেগে আছি?"
" শেফালী চাচীর সাথে ওভাবে কথা বলেছি তাই। "
" রাগ করিনি তবে খুশি হয়েছি। "
আমিরা বেশ অবাক হলো তার কথায়। সে ইতস্তত করে বললো,
" কেন?"
" নিজের জন্য লড়তে শিখেছো তাই। যে সহ্য করে মানুষ তাকেই আঘাত করার সুযোগ পায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে তোমায়। সবসময় আমি থাকব না তোমাকে রক্ষা করার জন্য। মনে রেখো, এ সমাজে দূর্বলদের জায়গা নেই। "
" তারমানে আমি কোন ভুল করিনি। "
" একদমই না। "
আমিরা ফিক করে হেসে বললো তার কথায়। গোধূলিলগ্নের মায়াবী আবেশে বিকেল ধীরে ধীরে তার শেষ প্রহরের দিকে এগিয়ে চলেছে। পশ্চিম দিগন্তে অস্তগামী সূর্য আকাশের বুকজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে সোনালি, কমলা আর রক্তিম আভা। আজমিরা খান একটু পরেই চলে যাবেন তাই মেহরাবের জন্য রাখা নকশীকাঁথা ও তিনটে আচারের বয়াম নিয়ে মেহরাবের ঘরে এগিয়ে গেলেন তিনি। দরজার সামনে এসে গলা খাকারি দিয়ে উঠতেই মেহরাব ও আমিরা দুজনেই দরজার দিকে তাকালো। আমিরা তার উপস্থিতি টের পেয়ে লাজুক হাতে মাথার ঘোমটাটি আরও খানিকটা টেনে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল।
" কোথাও যাচ্ছেন ফুপি?"
মেহরাবের প্রশ্ন শুনে আজমিরা খান গম্ভীর কন্ঠে উত্তর দিলেন,
" চলে যাচ্ছি। তোমার জন্য কিছু জিনিস এনেছিলাম সেগুলো দিতে এসেছি।"
আজমিরা খান হাতে থাকা আচারের বয়ামগুলো ও নকশীকাঁথা এগিয়ে দিলো মেহরাবের দিকে। মেহরাব হাত বাড়িয়ে তা গ্রহণ করলো। তিনি মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বললেন,
" তুমি নালিশ করেছো বলে বেশি করে বানিয়ে এনেছি। নিজের যত্ন নেবে। শহরে ফিরে খাওয়াদাওয়ায় গাফিলতি যেন না হয়। তোমায় নিয়ে খুব চিন্তা হয় আমার। অনেক যত্ন নিয়ে লালনপালন করেছি তোমায়, শরীরের প্রতি উদাসীন হবে না। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করবে। খাওয়া দাওয়া ভুলে সারাক্ষণ কাজে ডুবে থাকলে কিন্তু চলবে না। "
এতক্ষণ শক্ত করে ধরে রাখা অভিমানের বাঁধ যেন মুহূর্তেই ভেঙে গেল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর সংবরণ করতে পারলেন না তিনি। টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু, পরক্ষণেই তিনি কেঁদে ফেললেন। মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও পারলেন না। মেহরাব জানে আজমিরা খান তাকে কতটা ভালোবাসে। আজমিরা খান এগিয়ে এসে মেহরাবের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন । মেহরাব স্মিত হেসে উনাকে সালাম করে বললো,
" আপনি একদম চিন্তা করবেন না ফুপি, আমি নিজের খেয়াল রাখবো। "
" নিয়ম করে ফোন করবে, শহরে কাজের চাপে ভুলে যেও না আবার। "
" আপনার কথা অমান্য করতে পারি?"
আজমিরা খান তার হাসি দেখে নিজেও হেসে ফেললেন অত:পর তার কান টেনে বললেন,
" কতো যে মান্য করো তা আমার জানা আছে। "
দুজনেই হেসে ফেললেন একসাথে। আজমিরা খান আঁচলের কোণে চোখ মুছে আমিরার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমিরা উনাকে দেখে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ালো। আজমিরা খান তার হাতে একটি খয়েরী রঙের শাড়ি দিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,
" তোমার উপহার। নিজের ও মেহরাবের খেয়াল রেখো। "
আমিরাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তিনি চলে গেলেন সেই ঘর থেকে। মেহেরবানু শাহ অবশ্য খুশিই হলেন তাদের মান অভিমানের পালা শেষ হওয়ায়। বিকেল প্রায় শেষের দিকে, আমিরা গতকাল মেলায় যাওয়ার বায়না করায় মেহরাব ভাবলো একটু পর তাকে নিয়ে বেরোবে। কারণ কাল সকালেই তাকে রওনা দিতে হবে। আমিরা আলমারির কাপড়্গুলো গুছিয়ে রাখছিলো, মেহরাব তার কাছে এসে বললো,
" তৈরি হয়ে নাও বিবি। "
হঠাৎ তৈরি হতে বলায় আমিরা কিছুটা অবাক হলো, সে ভ্রু কুঁচকে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলো,
" কেন?"
আমিরার কথায় মেহরাবের ঠোঁটে দুষ্টুমির আভা ফুটে উঠলো, সে মৃদু স্বরে বললো,
" মেলায় যাবে না? "
মেলায় যাওয়ার কথা শুনে আমিরা বেশ অবাক হলো, সে ভেবেছিলো মেহরাব হয়তো তাকে এমনিই বলেছে, নিয়ে যাবে না। সে উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে উঠলো,
" সত্যিই মেলায় নিয়ে যাবেন?"
মেহরাব তার কথায় মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বললো,
" হ্যাঁ। আলমারিতে একটা বোরকা রাখা আছে, সেটা পরে তৈরি হয়ে নাও।"
মেহরাব যে দুটি বোরকা মেহেরবানু শাহের জন্য এনেছিল, তার মধ্যে একটি মাপের তুলনায় কিছুটা ছোট হয়ে যাওয়ায় তিনি সেটি পরতে পারেননি। বোরকাটি বেশ দামি হওয়ায় মেহরাবের আলমারিতেই তুলে রেখেছিলেন মেহেরবানু শাহ, যার তার স্ত্রী পড়তে পারে। মেহরাব চায়না সে ব্যতীত অন্য কোন পুরুষ তার স্ত্রীর সৌন্দর্য দেখুক। তাই এত মানুষের সমাগমে স্ত্রীকে বোরকা পরিয়ে নেওয়াটাই তার কাছে অধিক নিরাপদ মনে হলো তার কাছে। মেহরাবের কথামতো আমিরা আলমারি থেকে বোরকাটি বের করে পরিধান করল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো বোরকায় নিজেকে আবৃত করে, মুখটুকুও নিকাবে ঢেকে নিল সে। নিকাবের আড়ালে কেবল তার দু’চোখই দৃশ্যমান রইল। আয়নার সামনে একবার নিজেকে দেখে নিল আমিরা, অতঃপর মেহরাবের সামনে এসে দাঁড়াল। মেহরাবের পরনে কালো রঙের পাঞ্জাবি, সে আমিরাকে বোরকা পরা অবস্থায় দেখে মেহরাব এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেলো।
"মাশাল্লাহ! "
অজান্তেই মেহরাবের ঠোঁট থেকে শব্দটি বেরিয়ে আসতেই আমিরা লজ্জায় দৃষ্টি নত করে ফেললো। মেহরাব নিজের হাতের মুঠোয় আমিরার হাত মুঠোবন্দী করে বললো,
" যাওয়া যাক?"
আমিরাকে নিয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই দেখতে পেলো মেহেরবানু শাহ ও শেফালী বেগম রান্নাঘরে কাজ করছেন। মেহরাব ও আমিরাকে তৈরি হয়ে নামতে দেখে তিনি জিগ্যেস করলেন,
" কোথাও যাচ্ছো তোমরা?"
" আপনার বউমাকে মেলায় ঘুরাতে নিয়ে যাচ্ছি।"
" বেশ। সাবধানে যেও। "
কিছু সময়ের মাঝেই মেহরাব ও আমিরা মেলার প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছাল। মেলার কাছাকাছি পৌঁছাতেই দূর থেকেই চোখে পড়ল রঙিন আলোর ঝলমলে আভা। মেলার মাঝখানের পথ দিয়ে এগিয়ে চলল তারা। মানুষের ভিড় দেখে নিকাবের আড়ালে আমিরার চোখে ফুটে উঠলো আনন্দের রেখা। মেহরাব তার পাশ থেকে বারবার খেয়াল রাখছিল, ভিড়ের চাপে যেন আমিরা কারও সঙ্গে ধাক্কা না খায়। আমিরা কৌতুহলী দৃষ্টিতে চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখছে সবকিছু। কোথাও বাহারি কাঁচের চুড়ির দোকান, সারি সারি রঙের চুড়ি আলোয় ঝিকমিক করছে। পাশেই ঝুলছে রঙিন কানের দুল, মালা, ফিতা আর নানান রকম সাজসজ্জার সামগ্রী। মেহরাব আমিরাকে নিয়ে এসে থামলো চুড়ির দোকানের সামনে। দোকানিকে ডেকে এক ডজন লাল চুড়ি বের করে দিতে বললো সে। দোকানি চুড়ি বের করে দিতেই মেহরাব অত্যন্ত যত্নসহকারে চুড়িগুলো পড়িয়ে দিলো আমিরার হাতে। অত:পর বললো,
" পছন্দ হয়েছে?"
" হ্যাঁ। "
আমিরার সহজসরল স্বীকারোক্তি শুনে মেহরাব স্মিত হেসে দোকানির কাছ থেকে লাল সহ আরও কিছু রঙের চুরি কিনে নিলো। হঠাৎ ভীড়ের মাঝখান থেকে ছোট একটি মেয়ে ছুটে এসে ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো আমিরাকে। হঠাৎ আকস্মিক আলিঙ্গনে চমকে উঠল সে অত:পর পরিচিত স্পর্শ টের পেতেই সেও জড়িয়ে ধরলো মেয়েটিকে। এতোদিন পর বড়ো আপাকে পেয়ে সোহানার খুশি আর ধরে না। সে আমিরার দিকে তাকিয়ে বললো,
" কেমন আছো আপা?"
" আমি খুব ভালো আছি। তুই কেমন আছিস?"
" তোমাকে ছাড়া ভালো লাগে না আপা। ইচ্ছে করে তোমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমাই, তোমায় দেখি না আজ কতদিন। দুলাভাই তোমায় ভালো রেখেছে তো? "
সোহানার কথা শুনে মেহরাব তার হাসি সংবরণ করতে পারলো না। আমিরা সোহানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
" হ্যাঁ। একা একা এসেছিস মেলায়?"
" রাবিয়াদের সাথে এসেছি।"
মেহরাব সোহানার কাছে এগিয়ে এসে বললো,
" কি খাবেন বলুন শালি সাহেবা।"
সোহানা এক মুহূর্তও ভাবল না। মুখে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলে উঠল,
" ঝালমুড়ি আর খই। "
রজনীর নীল আঁচলখানি ইতোমধ্যে নেমে এসেছে চারিধার ঘিরে। নীলিমার বুকে জেগে থাকা চাঁদ তার শুভ্র জোছনা ছড়িয়ে দিয়েছে নিস্তব্ধ উঠোনজুড়ে। মেলার কোলাহল ছেড়ে মেহরাব ও আমিরা এইমাত্র বাড়ির আঙিনায় এসে পা রাখল। সোহানাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তারা বাড়ি ফিরেছে। আমিরা বেজায় খুশি আজ। তার চাহনি দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে কতটা খুশি। মেহরাব তাকে দুটো জামদানী শাড়ি কিনে দিয়েছে। খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছেন মেহেরবানু শাহ, আমিরা টেবিলে সব গুছিয়ে রেখে মেহরাবকে রাতের খাবারের জন্য ডাকতে আসতেই দেখতে পেলো মেহরাব নিজের ব্যাগপত্র গোছাতে শুরু করেছে। ভোরের ট্রেনেই তাকে রওনা দিতে হবে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। আলমারি থেকে একে একে প্রয়োজনীয় পোশাক-আশাক বের করে ব্যাগে তুলে রাখতে শুরু করলো। বিছানার ওপর রাখা জামাকাপড়গুলো যত্ন করে ভাঁজ করে ব্যাগের ভেতর সাজিয়ে রাখার ফাঁকে ফাঁকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও দেখে নিচ্ছিল মেহরাব। আমিরা হঠাৎ তাকে ব্যাগ গোছাতে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করলো,
" ব্যাগ গোছাচ্ছেন কেন?"
" ভোরের ট্রেনে ফিরতে হবে আমায়। তাই গুছিয়ে রাখছি সব। "
আমিরা এক মুহুর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো তার কথায়। মেহরাব কি তবে সত্যিই তাকে ছেড়ে চলে যাবে? আর কিছু ভাবতে পারলো না সে, বিষন্নতা এসে ভর করলো তার চাহনিতে। সে মিনমিন করে বললো,
" আম্মা ডাকছে খাওয়ার জন্য। "
" আসছি। "
খাওয়ার টেবিলে পুরোটা সময় মনমরা হয়ে ছিলো আমিরা। মেহেরবানু শাহ তখনো জানতেন না মেহরাব ভোরের দিকে চলে যাবেন। মেহরাব তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে, আমিরা খাটের এক কোণায় চুপ করে বসে আছে, তার নত হয়ে থাকা দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো মেঝের দিকে। মেহরাব তার মলিন চেহারা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার কাছে এসে বললো,
" মন খারাপ কেন বিবিজান?"
" এমনিতেই। "
" ক্লান্ত লাগছে? "
" না।"
" এদিকে এসো, মাথায় হাত বুলিয়ে দিই, ঘুমালে সব ক্লান্তি চলে যাবে। "
আমিরা নাকোচ করলো না। যদি এরপর আর সুযোগ না হয়? মেহরাব আলো নিভিয়ে আমিরার পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করলো। হঠাৎ আমিরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতেই মেহরাব আলতো হাতে তার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললো,
" তুমি কি ভেবেছো, তোমার মন খারাপ আমার হৃদয় স্পর্শ করে না? কেঁদো না বিবিজান। তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে আমি কি করে ভালো থাকব সেখানে?"
আমিরা চুপ করে রইলো তার কথায়। নিঃশব্দে কেঁদেই চলেছে সে। রজনীর শেষ প্রহর তখনও পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। নীলিমার বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গাঢ় অন্ধকার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের দেখা মেলেনি এখনও, কেবল তার আগমনের আভাসটুকু আবছা আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। মেহরাব সাদা রঙের শার্ট পরেছে, এই প্রথমবার মেহরাবকে পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য কোন পোশাকে দেখছে। এতদিন তাকে পাঞ্জাবিতে দেখেই অভ্যস্ত ছিল আমিরা। মেহরাব ব্যাগ হাতে নিয়ে আমিরার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসতেই সে অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে তাকায় মেহরাবের দিকে। মেহরাব তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
" বিদায় দিবে না আমায়? "
মেহরাবের আমিরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বললো,
"আপনি বিহীন এই পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই আপনার মতো করে কেউ কখনো আমায় ভালোবাসেনি,যত্ন করেনি, আগলে রেখেনি। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়নি। আপনি চলে গেলে আমার কি হবে? আমায় ছেড়ে যাবেন না।"
আমিরাকে কাঁদতে দেখে তাকে নিজের বাহুর মাঝে আগলে ধরলো মেহরাব । তার প্রশস্ত বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে আমিরা কেঁদেই চলেছে। মেহরাব তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
" ছেড়ে যাচ্ছি না তো। "
" যাবেন না। "
"কাঁদে না লক্ষীটি। তুমি কিন্তু কথা দিয়েছো আমায়, নিজের যত্ন নেবে। খাওয়া-দাওয়ায় গাফিলতি করা কিন্তু আমার পছন্দ নয়। আমি প্রতি দু-মাস অন্তর অন্তর চলে আসবো। সাবধানে থেকো বিবিজান।"
আমিরার কান্না থামতেই মেহরাব তার কপালে ভালোবাসার পরশ একেঁ দিয়ে বললো,
" মন খারাপ করো না। আমি শীঘ্রই চলে আসব। "