" সত্যি?"
" তিন সত্যি। "
" সেখানে গিয়ে ভুলে যাবেন না তো আমায়?"
আমিরার কথা শুনে মেহরাব হেসে ফেললো। অত:পর
দু’হাত বাড়িয়ে আমিরার দু’গাল আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় আগলে নিয়ে বললো,
"নিজেকে ভুলে যেতে পারি, কিন্তু তোমাকে নয়। আমার প্রাণভোমরা তুমি, ভুলি কী করে?"
আমিরার চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো, পলক ফেলতেই এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো। মেহরাব সযত্নে তার গাল বেয়ে নেমে আসা অশ্রু মুছে দিল। কিন্তু মুছে দেওয়ার আগেই চোখের কোণে আবারও জমে উঠল নোনা জলের কণা। মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমিরাকে আবারও বুকে আগলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। মেয়েটা বাচ্চাদের ন্যায় করছে। এভাবে কাঁদলে সে কি করে যাবে?বিদায়ের প্রহর এসে দুয়ারে কড়া নাড়ছে। মেহরাব আমিরাকে বুক থেকে সরিয়ে বললো,
" লক্ষীটি আর কাঁদে না। এবার আমায় যেতে হবে। "
আমিরা চোখের জল মুছে কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,
" সাবধানে যাবেন।"
" হাসবে না বিবি? "
আমিরা অশ্রুর আড়াল ভেদ করে ফিক করে হেসে ফেলল। রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ততক্ষণে নিঃশব্দে পৃথিবীর দুয়ারে কড়া নাড়ছে। পূর্ব দিগন্তের কালচে আকাশ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এসেছে। রাতের গভীর নীলিমার গায়ে লেগেছে ম্লান রুপালি আভা, তার নিচে দূর দিগন্তে সূর্যোদয়ের পূর্বাভাস হয়ে ফুটে উঠছে হালকা অরুণিমা।মেহরাবের পিছু পিছু আমিরাও সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। অন্দরমহলের নীরবতা পেরিয়ে দুজন এসে দাঁড়াল সদর দরজার সামনে। শেফালী বেগম গাছে পানি দিচ্ছিলেন। মেহরাব আমিরাকে বিদায় জানিয়ে সে বেরিয়ে গেলো। কিছুদূর যেতেই মেহরাব শেষবারের মতো তার দিকে তাকাল। অত:পর রওনা দিলো নিজ গন্তব্যে। আমিরা দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে। চোখের দৃষ্টি মেহরাবের চলে যাওয়ার পথেই স্থির। মানুষটা যতক্ষণ চোখের আড়াল হয়নি, ততক্ষণ সে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। নিজের ঘরেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন মেহেরবানু শাহ। শেফালী বেগম মেহরাবকে চলে যেতে দেখেই হতদন্ত হয়ে ছুটে যান মেহেরবানু শাহের ঘরে। তিনি মেহেরবানু শাহের শয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। অত:পর কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে করে ডাকলেন,
"আপা... ওঠেন।"
ঘুমের আবেশে মেহেরবানু শাহ প্রথমে কোনো সাড়া দিলেন না। চোখের পাতায় তখনও নিদ্রার ভার। শেফালী বেগম এবার একটু কাছে ঝুঁকে আগের চেয়ে জোরে ডাকলেন। ধীরে ধীরে নড়ে উঠল তার চোখের পাতা।নিদ্রার ঘোর ভেঙে অস্পষ্ট দৃষ্টিতে তিনি তাকালেন সামনে অত:পর শেফালী বেগমের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন,
" কী হয়েছে? এই ভোরবেলায় ডাকছো কেন?"
শেফালী বেগম সময় নষ্ট না করে বললেন,
"মেহরাব চইলা গেছে, আপা।"
শেফালী বেগমের কথা শুনেই মেহেরবানু শাহের চোখের ঘুম যেন এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। তিনি দ্রুত উঠে বসলেন শয্যার ওপর। কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না। কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন শেফালী বেগমের মুখের দিকে, যেন কথাটা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছেন না। তিনি কাঁপা কাঁপা স্বরে বললেন,
" কোথায় চলে গিয়েছে? "
" শহরে চইলা গেছে। দেখলাম ব্যাগপত্র লইয়া রওনা দিছে। আমিরা নিজে দাঁড়াইয়া থাইকা তারে বিদায় দিছে।"
শেফালী বেগমের কথা শুনে মেহেরবানু শাহ এক মুহূর্তও আর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারলেন না । ব্যস্ত-বিহ্বল পায়ে শয্যা ছেড়ে উঠে পড়লেন মেহেরবানু শাহ। বুকের ভেতর অজানা উৎকণ্ঠা নিয়ে দ্রুত পায়ে ছুটে গেলেন আমিরার ঘরের দিকে। পূর্ব দিগন্তের অরুণিমা পেরিয়ে সূর্য উঠে এসেছে আকাশের গাঢ় নীলিমার খানিকটা ওপরে। জানালার ধারে গুটিসুটি হয়ে বসে দুই হাঁটুর ওপর মাথা ঠেকিয়ে বাইরের পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল সে। বাতাসে উড়ছিল কপালের পাশের চুলগুলো,কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। হঠাৎ কারো পদশব্দ টের পেতেই সে সোজা হয়ে বসে। মেহেরবানু শাহ রাগে গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকে কয়েক পা এগিয়ে এলেন তিনি। অত:পর আমিরার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলেন,
" মেহরাবকে আটকালে না কেন তুমি?"
আমিরা চুপ করে রইলো উনার কথায়। কি'ই বা বলবে সে?আমিরাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে উনার বিরক্তি আরও বেড়ে গেল। তিনি ভ্রু কুঁচকে ক্ষুদ্ধ স্বরে বলে উঠলেন,
" কোন ধরনের স্ত্রী তুমি? দুদিনেও নিজের স্বামীকে আটকে রাখতে পারলে না! বিয়েটা হয়েছে কদিন, অথচ এর মাঝেও স্বামীর উপর অধিকার ফলাতে শিখলে না। বিয়ের পরও বউ রেখে আমার ছেলেটা চলে গেল! ভেবেছিলাম, বউ পেয়ে ছেলেটা অন্তত ঘরমুখো হবে। অথচ বিয়ের পরও সেই আগের মতোই নিজের মনমর্জি মতো চলাফেরা করছে। এতো রুপ দিয়ে কি হবে,যদি স্বামীকে আটকাতেই না পারো। পুরুষ মানুষ বউ রেখে কি করে চলে যায়? তুমি আটকানোর চেষ্টা করোনি বলেই আমার ছেলেটা চলে গিয়েছে, চেষ্টা করলে কখনোই যেতো না।"
মেহেরবানু শাহের কথা শুনে আমিরা মাথা নত করে রইলো।ঠোঁট কামড়ে কান্না নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেও নিজেকে আটকাতে পারলো না সে। দু'ফোটা উষ্ণ অশ্রুবিন্দু নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে। শব্দ করে কাঁদতে না চাইলেও অশ্রুগুলো তার অবাধ্য হয়ে গাল ভিজিয়ে দিতে লাগল। কথাগুলো বলতে বলতেই মেহেরবানু শাহের কন্ঠস্বর ভারী হয়ে আসে। সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে আমিরাকে এই বাড়ির বউ করে এনেছিলো তার রুপ দেখে, অথচ এইসব কিছুর পরেও ছেলেকে আটকাতে পারেননি তিনি। তিনি আঁচলের প্রান্ত দিয়ে চোখের জল মুছে চলে যান। তিনি যেতেই আমিরা শব্দ করে কেঁদে উঠলো, অত:পর মিনমিন করে বললো,
" আমায় ফেলে কেন চলে গেলেন আপনি? আপনি চলে যাওয়াতে সকলে আমায় দোষারোপ করছে। কেউ আমার সাথে ভালো ব্যবহার করছে না।"
আকাশের নীলিমা ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে রাত্রির আগমনী বার্তা জানাচ্ছে। পশ্চিম দিগন্তে বিকেলের শেষ আলোটুকু ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে, অস্তগামী সূর্যের লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ছে আকাশজুড়ে। দিনের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এসেছে। পাখিরা একে একে ফিরে যাচ্ছে আপন নীড়ে। দূরের মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে মাগরিবের আজানের সুমধুর ধ্বনি। পবিত্র সেই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে সন্ধ্যার নীরবতা ভেদ করে। গোধূলির শেষ রক্তিম আভাটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের অতলে। আমিরা নিজের ঘরের এক কোণে নিঃশব্দে বসে রয়েছে।বাইরে ততক্ষণে দিনের আলো ফুরিয়ে এসেছে। গোধূলি পেরিয়ে চারপাশে নেমে এসেছে রজনীর প্রথম প্রহর। সারাদিন আমিরা ঘরের চৌকাঠ পেরোয়নি। মেহরাব যাওয়ার পর সে খাওয়ার জন্য নিচেও নামেনি। যদিও কুলসুম দুবার তাকে খেতে ডেকেছিলো কিন্তু আমিরার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না। মেহেরবানু শাহ রান্নাঘরে ছিলেন শেফালী বেগমের সাথে, হঠাৎ বসার ঘর থেকে টেলিফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোন ভেসে এলো। একবার।দুবার।তারপর একটানা বেজেই চলল। টেলিফোনের শব্দ কানে যেতেই তিনি দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলেন বসার ঘরের দিকে। পুরোনো কালো টেলিফোনটির পাশে গিয়ে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে রিসিভারটি তুলে কানে ধরলেন। ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর,
"আসসালামু আলাইকুম, আম্মা।"
মেহরাবের কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে তিনি রিসিভারটি আরও শক্ত করে ধরে কাঁপা গলায় বলে উঠলেন,
"ওয়ালাইকুমুস সালাম।"
" দুঃখীত আম্মা, আপনাকে না জানিয়েই চলে এলাম।"
" বিয়ের এক সপ্তাহ ও হলো না আর কিনা তুমি নতুন বউ রেখে চলে গেলে? সংসারের প্রতি কি তোমার কোন দায়িত্ব নেই?"
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেললো উনার কথায়।অত:পর বললো,
" পেশায় একজন শিক্ষক আমি। সংসারের পাশাপাশি আমার নিজের কাজের প্রতি থাকা দায়িত্বও পালন করতে হবে। আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন আম্মা।"
মেহেরবানু শাহ চুপ করে রইলেন তার কথায়। মেহরাব কিছুসময় চুপ থেকে অত:পর বললো,
" একটা কথা বলার জন্য ফোন করেছিলাম আম্মা। একটা আর্জি ছিলো। "
" কি আর্জি?"
"আপনার পছন্দের উপর আমি সন্তুষ্ট। আমার আমানতের দায়িত্ব আমি আপনার হাতে তুলে দিয়ে গেলাম। আশা করি আপনি আমার স্ত্রীর খেয়াল রাখবেন। তার খাওয়া দাওয়ায় যেন গাফিলতি না হয় সেইদিকে খেয়াল রাখবেন। তাকে যেভাবে রেখে গিয়েছিলাম আশা করি ফিরে এসে সেভাবেই দেখব। "
" চিন্তা করো না। আমি খেয়াল রাখবো আমিরার। "
" ধন্যবাদ আম্মা। সে এখন কোথায়?"
"ঘরে মুখ ভার করে বসে আছে। সকাল থেকে কিছুই খায়নি। "
মেহেরবানু শাহের কথা শুনে মেহরাব চিন্তায় পড়ে যায়। এই মেয়েকে নিয়ে সে কি করবে, আসার সময় এতো করে বলে এসেছিলো যেন খাওয়া দাওয়া নিয়ে গাফিলতি না করে। কিন্তু কে শুনে কার কথা। মেহরাবের ইচ্ছে ছিলো বউকে সহ নিয়ে আসবে তার সাথে, কিন্তু সেই সাহস হয়নি তার। আমিরার বয়স কম, তাই নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়েই আমিরাকে নিজের কাছ থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। অল্প অল্প করে প্রেমে পড়তে চাওয়া মেহরাব ছাব্বিশ ঘন্টার মাঝেই নিজেই স্ত্রীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, কিন্তু যাকে ভালোবাসে তার নিকট সে প্রকাশ করতে পারবে না। প্রকাশ করলেই সে নিজেকে তার মাঝে বিলীন করতে চায়বে, এতেই মেহরাবের আপত্তি। কিন্তু এই মেয়ে তার কল্পনার চাইতেও বড্ড বেশিই জেদী, বারবার নিজের সমস্তটুকু নিয়েই ছুটে আসছে তার কাছে একটুখানি ঠাঁই পাওয়ার আশায়। কিন্তু এই বয়সে এসে যে তাকে কাছাকাছি ঠাঁই দেওয়া সম্ভব না মেহরাবের পক্ষে। তাতে মনের ক্ষুধা বাড়বে, শারিরীক তৃষ্ণারও জন্ম হবে।
" তোমার বর টেলিফোন করছে, তোমারে ডাকতেছে কথা কওনের লাইগা।"
কুলসুমের কথা শুনে এক মুহুর্তের মাঝেই জন্য আমিরার সকল মন খারাপ মিলিয়ে গেলো। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু হাতের পিঠ দিয়ে মুছে নিল সে। তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত উত্তেজনায় ধুকপুক করছে। আমিরাকে ছুটে আসতে দেখে মেহেরবানু শাহ তার হাতে রিসিভার দিয়ে আবারও রান্নাঘরে চলে গেলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে রিসিভারটা কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো চেনাপরিচিত কন্ঠস্বর
" বিবিজান ।"
মেহরাবের আদুরে ডাক কানে আসতেই এতক্ষণ জমে থাকা অভিমান, কষ্ট আর অপেক্ষা একসঙ্গে এসে যেন গলার কাছে আটকে গেল। কথা বলতে চেয়েও প্রথম কয়েক মুহুর্ত তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
মেহরাব আবার ডাকল,
"শুনতে পাচ্ছো বিবিজান?"
আমিরা অতি ক্ষীণ স্বরে বলল,
"হুম…"
মেহরাব ভেবেছিলো সকাল থেকে না খেয়ে থাকার জন্য দু'চারটা কড়া কথা শুনিয়ে দিবে তাকে। কিন্তু তার যে বড়ো আহ্লাদী বউ। কড়া কথা কি করে শুনাবে তাকে? আমিরার অভিমানি কন্ঠস্বর কানে আসতেই মেহরাব মৃদু স্বরে বললো,
" সকাল থেকে কিছু খাওনি কেন? তুমি কিন্তু আমায় কথা দিয়েছিলে, ভুলে গিয়েছো?"
মেহরাবের প্রশ্ন শুনে আমিরার চোখ দুটো আবার ছলছল করে উঠল। এতক্ষণ কেউ তার না-খাওয়ার কারণ জানতে চায়নি। ঠোঁট দুটো সামান্য উঠলো তার। সে অভিমানী স্বরে বলল,
" খিদে নেই। "
" আপাতত নিজের হাতে খাও, আমি এলে নাহয় নিজের হাতে খাইয়ে দিবো। তুমি না খেয়ে থাকলে আমি কাজে মন বসাতে পারব?"
" আমায় আপনার কাছে নিয়ে চলুন। আপনি ছাড়া কেউ আমার সাথে ভালো করে কথা বলে না।"
" তোমায় নিয়ে আসা সম্ভব না, আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি বাহিরে থাকি। তোমায় নিয়ে এলে একা একা কি করে থাকবে তুমি? তখন কাজের চেয়ে বেশি চিন্তা হবে তুমি সুরক্ষিত আছো কিনা। "
আমিরা এবার শব্দ করেই কেঁদে উঠলো, এতক্ষণ বুকের গভীরে যে কান্নাটুকু সে দাঁতে দাঁত চেপে আটকে রেখেছিল, মেহরাবের শেষ কথাগুলো যেন তার সমস্ত বাঁধ এক নিমেষেই ভেঙে দিল। চোখের পলক ফেলার আগেই অশ্রুগুলো গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। কাঁদতে কাঁদতে আঁচলের প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছে নিল সে। অশ্রু মুছতে না মুছতেই আবার চোখ ভরে উঠল। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল সামান্য। আমিরার কান্নার শব্দ পেয়ে মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
" কেঁদো না বিবি, আমি শীঘ্রই চলে আসবো। "
" হুম। "
" রাখছি। "
রান্নাঘরে মশলা বাটছিলেন শেফালী বেগম, আমিরাকে কাঁদতে দেখে তিনি বিরবির করে বললেন,
"এই মাইয়াডা ক্যামনে যে এতো কান্দে! এতো চোখের পানি কই থেইকা আসে, আল্লাহই জানে!"
শেফালী বেগমের বিরবির করে বলা কথাগুলো কানে যেতেই মেহেরবানু শাহের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি খুন্তি নাড়াতে নাড়াতে বললেন,
" এই মেয়ে বড্ড স্বামীসোহাগী। একটা পাগল নিয়ে এসেছি ঘরে। "
"সোয়ামী’র লাইগা আইজ পর্যন্ত কোনো মাইয়ারে এতো চোখের পানি ফেলতে দেখি নাই!"
" ছেলে আমার, বউকে কতটা যত্নে রেখেছে তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। "
" কপাল কইরা একখান পোলার বউ পাইছেন আপা। এতোদিন জানতাম সোয়ামী বউরে চোখে হারায়, এখন দেখতাছি উল্টা।"
ঢাকা শহরের আকাশে তারার চেয়ে কৃত্রিম আলোর আধিক্য। দিনভর মানুষের পদচারণা, যানবাহনের কোলাহল, হর্নের তীক্ষ্ণ শব্দ আর ব্যস্ততার যে অবিরাম স্রোত শহরটাকে জাগিয়ে রাখে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার তীব্রতা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। টেলিফোনের ওপাশ থেকে আমিরার ক্ষীণ কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পর মেহরাব বেশ কিছুক্ষণ রিসিভারটি কানে ধরে বসে রইল। অত:পর ধীর হাতে রিসিভারটি যথাস্থানে রেখে দিল সে। মেহরাব তার ক্লান্ত শরীর চেয়ারের পিঠে এলিয়ে দিলো।
" মেহরাব, খেতে এসো। "
জুলেখা চৌধুরী গত দুবছর ধরেই মেহরাবের বাসায় রান্নাবান্নার কাজ করেন। তিনি রাতের খাবার যত্ন করে টেবিলের ওপর সাজিয়ে রেখেছেন। ধোঁয়া ওঠা ভাতের পাশে একে একে সাজানো হয়েছে তরকারির বাটি, ভাজি আর মেহরাবের জন্য আলাদা করে তুলে রাখা মুরগির রান। সবকিছু গুছিয়ে রেখেও জুলেখা চৌধুরী লক্ষ করলেন, মেহরাব এখনো ঘর থেকে বের হচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তিনি উড়না মাথায় ভালো করে টেনে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। করিডোর পেরিয়ে তিনি মেহরাবের ঘরের দরজার কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। অত:পর মৃদুস্বরে ডেকে বললেন,
" বাবা, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খেতে এসো।"
দুই বছরের পরিচয়ে মেহরাবের স্বভাবটা তাঁর অজানা নয়। কাজের মধ্যে ডুবে গেলে সময়ের হিসাব থাকে না ছেলেটার। তাই রাতের খাবার রান্না করে দিয়ে চলে যাওয়ার আগে অন্তত ছেলেটাকে খাইয়ে দেওয়াটুকু নিজের দায়িত্বের মতোই মনে করেন তিনি। মেহরাব উনার ডাক শুনে টেবিলে এসে বসতেই দেখতে পেলো তার পাতে মুরগির রান দেওয়া। মুরগির রান দেখে মেহরাবের মনে পড়লো আমিরার কথা। আমিরা মুরগির রান আর কলিজা খেতে খুব ভালোবাসে, মেহরাব কিছু সময় নিজের পাতের দিকে তাকিয়ে অত:পর জুলেখা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললো,
" খালা, মুরগির রান নিয়ে যান। আমি খাবো না। "
জুলেখা চৌধুরী বেশ অবাক হলেন তার কথায়। মুরগির রান মেহরাবের বেশ পছন্দের অথচ আজ কিনা বলছে সে রান খাবে না। তিনি আমতাআমতা করে বললেন,
" তোমার শরীর খারাপ মেহরাব?"
" না, খালা। "
" আমি যতদূর জানি মুরগির রান তোমার বরাবরই পছন্দ। তাহলে আজ খাচ্ছো না কেন?"
মেহরাব উনার কথায় স্মিত হেসে বললো,
" আমার বিবির খুব পছন্দ মুরগির রান ও কলিজা। তাকে ছাড়া আমার গলা দিয়ে এসব নামবে না। রান আর কলিজা সবসময় তার জন্যেই বরাদ্দ। "
মেহরাবের কথায় তিনি ফিক করে হেসে ফেললেন। অত:পর মুরগির রান তুলে নিয়ে অন্য এক টুকরো মাংস তার পাতে দিয়ে বললেন,
" এতো ভালোবাসো বউকে? পছন্দ করে বিয়ে করেছো বুঝি?"
" মায়ের পছন্দে বিয়ে করেছি। "
মেহরাবের কথায় তিনি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন,
" মাত্র তিনদিনে বউকে এতো ভালোবেসে ফেলেছো, তা সে দেখতে কেমন? "
" খুব সুন্দর। "
কথাটা বলেই মেহরাব যেন একটু থামল। ‘সুন্দর’ শব্দটা তার কাছে কেমন যেন অপ্রতুল মনে হলো। আমিরাকে শুধু সুন্দর বললে যেন তার রূপের প্রতি অবিচার করা হবে। তাই কিছুক্ষণ ভেবে আবার বলল,
" ওর দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরানো কঠিন, খালা। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে ওর চোখ দুটো। তার বোকা বোকা চাহনি। আর চুল... একেবারে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা। ঘন কালো চুল। খোলা রাখলে পিঠ বেয়ে এমনভাবে নেমে থাকে, মনে হয় কালো রেশমের ধারা। ওর সৌন্দর্যের বর্ণনা করা যায় না খালা।"
জুলেখা চৌধুরী মেহরাবের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। বউয়ের রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে ছেলেটার চোখেমুখে একরাশ মুগ্ধতা ফুটে উঠেছে। তিনি কৌতুকের সুরে বললেন,
" তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে সে কোন হুরপরির চেয়ে চেয়ে কম নয়। "
রজনীর দ্বিতীয় প্রহর পেরিয়ে তৃতীয় প্রহরের দিকে এগিয়ে চলেছে সময়। জানালার ধারে বসে থাকা মেয়েটির সামনে সাদা কাগজ, হাতে কলম। মেহরাবের জন্য চিঠি লিখতে বসেছে সে। হঠাৎ কারো পদশব্দ শুনতে পেতেই আমিরা তড়িঘড়ি করে কাগল লুকিয়ে ফেললো। মেহেরবানু শাহ'কে দেখে আমিরা আঁচল টেনে ঘোমটা দিলো, অত:পর বিছানা থেকে নেমে বললো,
" কোন দরকার আম্মা?"
মেহেরবানু শাহ গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
" হাতমুখ ধুয়ে এসো, খাবার খাবে। "
উনার কথা শুনে আমিরা আমতাআমতা করে বললো,
" খিদে নেই আম্মা, পরে খাবো। "
" আমার ছেলে তোমার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে আমার হাতে। নাটক বন্ধ করে খেতে এসো। "
" এ-একটু পরে খাবো আম্মা। "
মেহেরবানু শাহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তার কথায়। মেয়েটার চাহনি দেখলে তিনি নিজেকে কঠোর করে রাখতে পারেন না। তিনি আমিরাকে ইশারায় তার পাশে বসতে বলেন। আমিরা চুপচাপ তার পাশে এসে বসতেই তিনি বললেন,
" খাচ্ছো না কেন? এভাবে চলতে থাকলে তো তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে।"