আমিরা মাথা নিচু করে রইল উনার কথায়। তার আঙুলগুলো তখনও আঁচলের প্রান্ত নিয়ে অস্থিরভাবে খেলা করছে। মেহেরবানু শাহ আমিরাকে চুপ করে থাকতে দেখে বললেন,
" আমি হয়তো রাগ করে দু-একটা কথা শুনিয়ে ফেলি। তাই বলে রাগ করে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিবে? নিজের মা হলে এভাবে রেগে থাকতে পারতে?"
" এ কি বলছেন আম্মা, আমি আপনার উপর রাগ করিনি। আমার আম্মা মারা গিয়েছেন বহু বছর আগে, এখন আপনিই আমার আম্মা। "
" তাহলে খাচ্ছো না কেন? সকাল থেকে কিচ্ছু খাওনি। "
" খিদে ছিলো না আম্মা। "
" মেহরাব আমায় তোমার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে। তোমার খাওয়া দাওয়ায় যেন কোনপ্রকার গাফিলতি না হয়। ভাত বেড়েছি, খেতে এসো। "
কথাটি বলেই মেহেরবানু শাহ রান্নাঘরে চলে গেলেন। তার পিছু পিছু আমিরাও রান্নাঘরে এসে দাড়ালো। রজনীর প্রথম প্রহর পেরিয়ে রাত ধীরে ধীরে আরও নিবিড় হয়ে উঠেছে। নীল আকাশের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসজুড়ে ছড়িয়ে আছে অগণিত নক্ষত্রের মৃদু ঝিকিমিকি । দূর থেকে তাদের ক্ষীণ আলো যেন রজনীর আঁধারে ছড়িয়ে দিচ্ছে মৃদু দীপ্তি। দূরের কোনো বাঁশঝাড় থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক। রান্নাঘরের ভেতরটায় অবশ্য তখনও ক্ষীণ আলো জ্বলছে। মেহেরবানু শাহ রান্নাঘরে গিয়ে নিজের হাতে আমিরার জন্য ভাত বেড়ে নিলেন। ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাতের পাশে এক টুকরো মুরগির কলিজা। সাথে রাখলেন শাক-সবজি আর এক বাটি ডাল। সারাদিন না খেয়ে থাকা মেয়েটার কথা ভেবে তিনি নিজের হাতেই সবকিছু গুছিয়ে নিলেন। হাত ধুয়ে টেবিলে এসে বসলো আমিরা, থালায় রাখা মুরগির কলিজাটার দিকে একবার তাকাল আমিরা। মুরগির কলিজা বরাবরই তার ভীষণ পছন্দের। অন্যদিন হলে পাতে কলিজা দেখলেই হয়তো তার মুখে আপনাতেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠত, অথচ আজ খেতে ইচ্ছে করছে না তার। সে অন্যমনস্ক হাতে ভাতের সঙ্গে সামান্য ডাল মিশিয়ে নিল। আঙুলের ডগায় ভাতের দানা এলোমেলো করে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করল। শরীর ক্লান্ত লাগছে তার, তবুও মেহেরবানু শাহের দিকে তাকিয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও দু-এক লোকমা ভাত মুখে তুলল সে। কিন্তু দু-লোকমার বেশি আর খেতে পারল না। ভাত মুখে তোলার পর থেকেই কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে শুরু করেছে তার। শরীর ক্রমশ ভার হয়ে আসছে, মাথাটাও কেমন ঝিমঝিম করছে। শেষ পর্যন্ত হাত গুটিয়ে নিল সে। মেহেরবানু শাহ আমিরার মলিন চেহারা লক্ষ্য করে বললেন,
" কি হয়েছে? "
" খেতে ইচ্ছে করছে না আম্মা, ক্লান্ত লাগছে। "
" ঠিক আছে, জোর করে খেতে হবে না। তুমি ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নাও। "
আমিরা মাথা নেড়ে সায় জানায়,অত:পর পাতে পানি ঢেলে হাত ধুয়ে নিলো সে। এরপর ধীর পায়ে ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো সে। বিছানায় মাথা রাখতেই চোখের পাতাগুলো ভার হয়ে এলো তার। রাত গভীর হতেই গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো তার। রজনীর গভীরতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল প্রভাতের প্রথম আলো। পূর্ব আকাশের গাঢ় নীলিমা ফিকে হয়ে সেখানে ছড়িয়ে পড়ল অরুণ আভা। রাতের আঁধার সরিয়ে সূর্যের মিহি রোদ এসে পড়ল উঠোনে। সকাল গড়িয়ে বেলাও অনেকটা চড়ে বসেছে আকাশের বুকে; তবুও বিছানা ছেড়ে ওঠেনি আমিরা। রাতভর জ্বরের তাপে আমিরার শরীর অবসন্ন হয়ে পড়েছে। এলোমেলো চুলগুলো ঘামে ভিজে কপাল ও গালের পাশে লেপ্টে আছে। বিবর্ণ মুখখানি নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে বালিশের ওপর। নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘের ফাঁক গলে রৌদ্র এসে পড়ছে ছাদজুড়ে। এক পাশে বাঁশের চাটাই পেতে আমসত্ত্ব শুকোতে দিচ্ছিলেন মেহেরবানু শাহ। আমসত্ত্বগুলো রোদের তাপে রেখে কিছুক্ষণ পর ছাদ থেকে নেমে এলেন তিনি । এদিকে শেফালী বেগম কলপাড়ে গিয়েছেন হাঁড়ি-পাতিল ধুতে। বেলা গড়িয়ে যাওয়ার পরেও আমিরার কোন দেখা নেই। তাকে দেখতে না পেয়ে কিছুটা চিন্তিত হলেন মেহেরবানু শাহ। প্রতিদিন ভোরের দিকেই আমিরা উঠে যায় অথচ আজ সকাল পেরিয়ে বেলা গড়িয়ে যাওয়ার পরেও মেয়েটার কোনো সাড়াশব্দ নেই। মেহেরবানু শাহ চিন্তাভারাক্রান্ত পায়ে এগিয়ে গেলেন তার ঘরের দিকে। তিনি দ্রুত দরজার কপাট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। বিছানার ওপর নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে আমিরা। রাতভর জ্বরের তাপে শরীর ভেঙে পড়েছে তার। চোখের নিচে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কালচে ছাপ। এমন এমন নিস্তেজ অবস্থা দেখে মেহেরবানু শাহের সমস্ত উৎকণ্ঠা মুহূর্তেই আতঙ্কে রূপ নিল। তিনি তড়িঘড়ি শয্যার পাশে গিয়ে বসলেন। কাঁপা হাতে আমিরার কপালে হাত রাখতেই জ্বরের উত্তাপ স্পষ্ট অনুভব করলেন।
" হায় আল্লাহ! শরীর তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। "
মেহেরবানু শাহের কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই জ্বরের ঘোরে আচ্ছন্ন আমিরা পিটপিট করে চোখ খুললো। মেহেরবানু শাহ তার এমন অসহায় চাহনি দেখে আরও ব্যাকুল হয়ে উঠলেন, আমিরার কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সযত্নে সরিয়ে দিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন,
" জ্বর কখন এলো? "
আমিরা কোনো উত্তর দিল না। শুধু ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। জ্বরের উত্তাপে বিবর্ণ মুখখানিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অবসাদের ছাপ। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে মেহেরবানু শাহের দিকে তাকিয়ে বললো,
" উনাকে একটা ফোন দিবেন আম্মা?"
" আচ্ছা দিচ্ছি। "
মেহেরবানু শাহ দ্রুত বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। পুরোনো টেলিফোনটির কাছে গিয়ে রিসিভার তুলে মেহরাবের নম্বর ঘুরিয়ে দিলেন তিনি। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া এলো না। তিনি ফোন রেখে আবারও নম্বরটি ঘুরিয়ে দিলেন। এবারও একইভাবে দীর্ঘক্ষণ বেজে চলল টেলিফোন, অথচ মেহরাব ফোন ধরল না। বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়ার পরেও মেহরাব ধরলো না। মেহেরবানু শাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেহরাবের ঘরের দিকে এগিয়ে যান আমিরার কাছে। মেয়েটা কত আশা করে বলেছিলো ফোন করতে, কিন্তু এখন আমিরাকে কি জবাব দেবেন তিনি। মেহেরবানু শাহ আমিরার পাশে এসে বসতেই সে আগ্রহ নিয়ে জিগ্যেস করলো,
" ফোন দিয়েছেন আম্মা?"
মেহেরবানু শাহ আমতাআমতা করে বললেন,
" আগে হাতমুখ ধুয়ে দুটো খেয়ে নেবে চলো। কাল রাতেও ভালো করে খেতে পারোনি। "
আমিরা হয়তো বুঝতে পেরেছে মেহরাব ফোন ধরেনি। তার মলিন দৃষ্টিতে মেহেরবানু শাহের দিকে তাকিয়ে বিছানা ছেড়ে নামে। গরমে অস্থির লাগছে তার, এক মুহুর্তে গোসল করতে পারলে ভালো লাগতো। তাই সে আলমারি থেকে গাঢ় সবুজ রঙের একটি শাড়ি বের করে গোসলখানায় চলে গেলো। গোসল সেরে বেরিয়ে এসেছে আমিরা, জ্বরের উত্তাপ কিছুটা কমলেও দূর্বলতা এখনো কমেনি। ভেজা চুলের ডগা থেকে টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। মেহেরবানু শাহ বসে আছেন তার অপেক্ষায়। সামনে ছোট্ট একটি পিঁড়ির ওপর সাজানো রয়েছে ধোঁয়া ওঠা পরোটা আর এক কাপ গরম চা। সদ্য তাওয়া থেকে নামানো পরোটার উষ্ণ সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। আমিরা এগিয়ে এসে মেহেরবানু শাহের পাশে বসে পড়ল। ভেজা চুলের ডগা থেকে তখনও জল পড়ছে। । মেহেরবানু শাহ সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে একটি পরিষ্কার তোয়ালে এগিয়ে দিলেন।
"আগে মাথাটা মুছে নাও। এই ভেজা চুল নিয়ে বসে থাকলে আবার ঠান্ডা লেগে যাবে।"
চুল মুছা শেষ হলে মেহেরবানু শাহ আমিরার দিকে চা ও পরোটা এগিয়ে দেন। জ্বরের কারণে মুখে তেমন রুচি নেই, তবুও মেহেরবানু শাহের মন রাখার জন্য আমিরা অর্ধেকটা খেলো। মেহেরবানু শাহ আর জোর করলেন না খাওয়ার জন্য। শেফালী বেগম রান্না চড়িয়েছেন। দিনের শেষ প্রহর ধীরে ধীরে গড়িয়ে এলো গোধূলির স্নিগ্ধ সীমানায়। পশ্চিম দিগন্তে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল আকাশজুড়ে। নীলিমার গায়ে লেগে থাকা সোনালি রঙ ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। এরই মধ্যে ডাক্তার এসে আমিরাকে দেখে গিয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ তার শারীরিক অবস্থা দেখে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে গেছেন তিনি। মেহেরবানু শাহ ডাক্তারের কথা শুনার পর কিছুটা শান্ত হলেন। এখন অবশ্য আগের চেয়ে কিছুটা ভালো লাগছে আমিরার। দরজার চৌকাঠের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে কুলসুম, কিন্তু ভেতরে ঢোকার সাহস করল না সে। শুধু একটু আড়াল থেকে মাথা বাড়িয়ে ঘরের ভেতর উঁকি দিল। এই বাড়িতে সে কাজ করছে দু বছর হলো। সাহসের অভাবে সে ভেতরে ঢুকলো না, পাছে যদি কেউ কিছু বলে। আমিরা তার উপস্থিতি লক্ষ্য করে বললো,
" কে ওখানে? সামনে আসুন।"
" আমি আপামণি! "
কুলসুম তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এলো। কুলসুমকে বেশ কয়েকবার দেখেছে সে। দেখতে শান্ত মনে হএও বেশ চঞ্চল। সে এক পলক আমিরার দিকে তাকালো অত:পর দৃষ্টি নত করে বললো,
" আপনের জ্বর হইছে হুনলাম, তাই দেখতে আইলাম। আর হইবো না এমন। "
" আমি কি তোমায় নিষেধ করেছি আসতে?"
কুলসুম বেশ অবাক হলো তার কথায় অত:পর মাথা নেড়ে বললো,
" না। "
" ঘরে বসে থাকতে আর ভালো লাগছে না। আমায় কিছু সময়ের জন্য পুকুরঘাটে নিয়ে যেতে পারবে?"
"এই শরীল লইয়া আবার পুকুরঘাটে যাইবেন ক্যান? অহন তো শরীলডা পুরাপুরি ভালো হয় নাই।"
"জানি, কিন্তু সারাদিন এই ঘরে শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগছে না। একটু বাইরে গেলে হয়তো ভালো লাগবে। "
কুলসুম বেশ দ্বিধায় পড়ে গেল। মেহেরবানু শাহ জানতে পারলে যদি তাকে কথা শুনায়।
"কিন্তু খালাম্মা যদি জানে?"
"আমি বেশি দূর যাব না। শুধু কিছুক্ষণ পুকুরঘাটে বসব। তুমি সঙ্গে থাকলেই হবে।"
"আচ্ছা, যাইবেন। কিন্তু বেশি সময় বইসা থাকতে পারুম না। শরীল খারাপ হইলে কিন্তু আমারে দোষ দিতে পারবেন না ।"
আমিরার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
"ঠিক আছে।"
পুকুরঘাটের এক প্রান্তে কয়েকজন মহিলা ঘাটের সিঁড়িতে বসে আপনমনে গল্পে মশগুল। শাহ বাড়ির ঘাট আলাদা, কুলসুম আমিরাকে নিয়ে সেই ঘাটে বসলো। আমিরাকে দেখে একজন মহিলা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠলেন,
" শুনলাম জমিদার বাড়ির ছেলে মেহরাব বিয়ের তিনদিন পরেই শহরে ফিরে গিয়েছে। নিশ্চয়ই শহরে বউ আছে নাহয় নতুন বউ রেখে কে-ই বা যেতে চাইবে?"
তাদের মাঝ থেকে অন্য একজন মহিলাআমিরার দিকে এক পলক তাকিয়ে অত:পর তাল মিলিয়ে বিদ্রূপ মেশানো কণ্ঠে বললেন,
" ওর মতো অপয়া মেয়েকে এই বাড়িতে জায়গা দিয়েছে এই অনেক। কয়েকমাস গেলেই দেখতে পাবে মেহরাব শহর থেকে বউ-বাচ্চা নিয়ে হাজির হয়েছে । অভাগী আমিরা। "
কথাগুলো কানে পৌঁছাতেই আমিরার মাথাটা হঠাৎ ঝিমঝিম করে উঠল। চারপাশের সবকিছু যেন মুহূর্তের জন্য কেমন অস্পষ্ট হয়ে এলো। অজান্তেই তার চোখ দুটো ভরে উঠল জলে। বারবার সেই কথাগুলোই তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তার শরীর কাঁপতে শুরু করলো। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা অশ্রু। আমিরাকে আঁচলের প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছে নিলো। তাকে কাঁদতে দেখে কুলসুম বললো,
"ওইসব মানুষের কথায় মন খারাপ কইরেন না আপামণি মানুষ তো কত কথাই কয়। সব কথা কি আর সত্যি হয়? ভাইজান আপনারে মেলা ভালোবাসে। "
" সন্ধ্যা হয়ে আসছে ঘরে চলো। "
কুলসুম বাড়তি কোন কথা বললো না, সে আমিরাকে নিয়ে শাহ বাড়িতে ফিরে গেলো। সে রাতে আমিরা একটিবারের জন্যেও ঘর থেকে বের হয়নি। বিছানার এক কোণে গুটিসুটি হয়ে বসে রইলো। মেহেরবানু শাহ রাতে খাওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার জোড়াজুড়ি করেছিলেন কিন্তু আমিরা খায়নি। দেখতে দেখতে সময়ের স্রোতে গড়িয়ে গেল তিনটি দিন। আমিরার জ্বর ভালো হয়নি এখনো। ডাক্তার দেখিয়েও তেমন একটা ভালো ফলাফল পাওয়া যায়নি। দিন দিন শরীরের অবনতি ঘটছে তার। এর মাঝে মেহরাব একটিবারের জন্যেও ফোন করেনি। মেহেরবানু শাহ আমিরার জন্য ভাত বাড়ছিলেন, হঠাৎ বসার ঘরে থাকা টেলিফোন বেজে উঠতেই তিনি হাতের কাজ ফেলে দ্রুত এগিয়ে গেলেন সেইদিকে। শাড়ির আঁচল সামলে টেবিলের ওপর রাখা কালো রঙের ভারী রিসিভারটির দিকে হাত বাড়ালেন। অত:পর রিসিভারটি তুলে কানে চেপে ধরলেন।
" হ্যালো। "
" মেহরাব, কেমন আছো বাবা?"
" ভালো আছি আম্মা। আপনি কেমন আছেন?"
" ভালো নেই মেহরাব। আমিরার অবস্থা খুব খারাপ। গত তিন দিন ধরে জ্বর, ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছে না। "
মেহেরবানু শাহের কথা শুনে মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এই মেয়ে নিজের প্রতি এতো উদাসীন কেন বুঝতে পারলো না সে। মেহরাব মনে মনে বললো " না নিজে ভালো থাকবে আর না আমাকে ভালো থাকতে দিবে। দূর থেকেই জ্বালিয়ে ছাই করে দিচ্ছে। " মেহরাব কিছুসময় চুপ থেকে অত:পর বললো,
" সকালেই ওকে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন আম্মা, আমি লোকমান চাচা আর আঙ্গুরী খালাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, ওরাই আমিরাকে নিয়ে আসবে। "
" এই অবস্থায় নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে?"
" আমি খেয়াল রাখবো আম্মা। ফোনটা ওকে দিন।"
মেহেরবানু শাহ আর কিছু বললেন না মেহরাবের কথায়। তিনি কুলসুমকে ইশারা করে বললেন আমিরাকে ডেকে দিতে। তিনদিনের জ্বরে শরীর অবশ হয়ে পড়েছে আমিরার, পা দুটোও ভারী হয়ে আছে, অথচ মেহরাব ফোন করেছে শুনে আমিরা আর মুহুর্ত ও দেরি করলো না। ছুটে এলো বসার ঘরে, তাকে দেখে মেহেরবানু শাহ রিসিভারটি এগিয়ে দিলেন। আমিরা রিসিভারটি তুলে কানের কাছে চেপে ধরলো। ওপাশ থেকে ভেসে আসলো চেনা পরিচিত কন্ঠস্বর,
" বিবিজান। "
আজ তিনদিন পর মানুষটার গলার স্বর শুনতে পেলো আমিরা। সে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো,
" হুম। "
" জ্বর কমেছে বিবি? কেমন লাগছে এখন?"
" আপনি কি করে জানলেন? "
" আম্মা বলেছে। "
আমিরা আচমকা কেঁদে ফেললো হুট করে। সে ক্রন্দনরত স্বরে বললো,
" একবার ও তো খোঁজ নিলেন না। তিনদিন ধরে কোন খোঁজ নেই আপনার। আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি সেই খবর রেখেছেন? "
আমিরার অভিমানি কন্ঠস্বর শুনে মেহরাব মৃদু হেসে বললো,
" কে বলেছে খোঁজ নেইনি? এই যে তিনদিন ধরে না খেয়ে বিছানায় পড়ে ছিলে, লাল নকশীকাঁথা জড়িয়ে জ্বরে কাঁপছিলে, খোঁজ না নিলে কি করে জানলাম?"
" তাহলে ফোন করলেন না কেন? একটা বারও তো কথা বললেন না আমার সাথে। আমি আপনার জন্য কত অপেক্ষা করেছি, জানেন?"
" জানি। "
আমিরা চুপ করে রইল। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। মেহরাব কিছুসময় চুপ থেকে এরপর বললো,
" ঔষধ খেয়ে বিশ্রাম নাও, রাখছি। "
আমিরাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোন রেখে দিলো মেহরাব। আমিরা হাতের পিঠে চোখ মুছে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেলো। মেহেরবানু শাহ তার কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করলেন, অত:পর ধীর পায়ে তার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমিরা বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছিলো, মেহেরবানু শাহ তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
" শুনো মেয়ে, তুমি কি সত্যিই অসুস্থ নাকি স্বামী বিচ্ছেদে তোমার এই হাল?"
আমিরা চুপ করে রইলো উনার কথায়। মাথা নত করে আঁচলের প্রান্ত আঙুলের ডগায় পেঁচাতে লাগল অন্যমনস্কভাবে।
মেহেরবানু শাহ তার দিকে এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বললেন,
" সুখবর আছে তোমার জন্য। "
" কি সুখবর আম্মা?"
"এই যে স্বামীসোহাগী আর চিপা চাপায় মুখ লুকিয়ে কাঁদতে হবে না। তোমার স্বামী তোমায় নিতে লোক পাঠিয়েছে। দ্রুত ব্যাগপত্র গুছিয়ে নাও যাতে স্বামীর কাছে তারাতাড়ি পৌঁছাতে পারো। "