ফন্ট সাইজ:
থিম:
তাকদীরনামা

তাকদীরনামা পর্ব ৮

লেখক: কংকা চৌধুরী

আমিরা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

"সত্যি আম্মা? উনি সত্যিই আমাকে নিতে লোক পাঠিয়েছেন?"

আমিরা বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকালো মেহেরবানু শাহের দিকে। সামান্য একটি সম্মতিসূচক বাক্যের অপেক্ষায় তার সমস্ত সত্তা ব্যাকুল হয়ে রয়েছে।

" হ্যাঁ, কাল সকালে তোমাকে মেহরাবের কাছে পাঠানো হবে। এবার একটু নিজের যত্ন নেওয়া শুরু করো।"

আমিরার অধরে লাজুক হাসি ফুটে উঠল। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে মেহেরবানু শাহের কথায় সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। মেহরাবের প্রসঙ্গ উঠতেই তার গালজোড়া হালকা রক্তিম আভায় রঞ্জিত হয়ে উঠলো। মেহেরবানু শাহ তার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গার্থের সুরে বলে উঠলেন,

" জ্বর ভালো হয়ে গিয়েছে? "

আমিরা লজ্জায় মাথা অবনত করে নিলো অত:পর মিনমিন করে বললো,

" কিছুটা ভালো লাগছে আম্মা। "

আমিরার ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনে মেহেরবানু শাহের অধরে হাসি ফুটে উঠলো। আমিরার অবশ্য বুঝতে পারলো তার শ্বাশুড়ির হাসির কারণ।

__________

"আমার মেয়েকে বাঁচান, স্যার! আইযানের ছেলেপুলেরা আমার চোখের সামনেই মেয়েটাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল!"

কথাগুলো বলতে বলতে লোকটির কণ্ঠ ভেঙে এলো।চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু। পুলিশ কর্মকর্তাটি আচমকা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পরক্ষণেই লোকটির জামার কলার খামচে ধরে হিংস্র দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে হিসহিসিয়ে বললেন,

" আইযান স্যার বল। তোর সাহস তো কম নয়, চেয়ারম্যানের নাম ধরে ডাকছিস। "

লোকটি ভয়ে কুঁকড়ে গেলেন, অত:পর কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে উঠলেন,

" আইযান স্যার। "

পুলিশ কর্মকর্তা সামিউল হক লোকটির কলার ছেড়ে আবারও নিজের চেয়ারে বসে পড়লেন। লোকটি অসহায় দৃষ্টিতে পুলিশ কর্মকর্তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

"স্যার, আপনার পায়ে পড়ি! আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। ওরা আমার মেয়ের কোনো ক্ষতি করে ফেললে আমি কী নিয়ে বাঁচব? "

সামিউল হক আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তারপর টেবিলের ওপর পড়ে থাকা একটি ফাইল নিজের দিকে টেনে নিয়ে পাতা ওলটাতে শুরু করলেন। তার নির্লিপ্ত ভাব দেখে লোকটি আবারও মিনতির সুরে বললেন ,

" আপনি অন্তত একজন পুলিশ সদস্য পাঠিয়ে খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। "

অথচ তাঁর সেই আকুল মিনতি কর্মকর্তার মনে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করল না। চায়ের কাপটি টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে তিনি বিরক্তিকর কন্ঠে বললেন,

"এত চিৎকার করছেন কেন? থানায় কি আর কোনো কাজ নেই? আপনি বাইরে গিয়ে বসুন। সময় হলে আমরা নিজেরাই খোঁজ নিবো।"

লোকটি কাঁপতে থাকা হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে আবারও পুলিশের টেবিলের সামনে এগিয়ে এলেন।

" স্যার আমি আপনার কাছে ভিক্ষা চাইছি। আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দিন। "

" আহা! একটা কথা বললে কি কানে যায় না? যত্তসব আদিক্ষেতা। এই করিম এই লোকটাকে থানা থেকে বের কর তো। জ্বালিয়ে খাচ্ছে সেই কখন থেকে। "

সামিউল হকের নির্দেশ পেয়ে কনস্টেবল করিম হোসেন

লোকটির দিকে এগিয়ে এসে সে কিছুটা রুক্ষ স্বরে বললেন,

"চলেন, বাইরে যান। স্যারকে আর বিরক্ত কইরেন না।"

লোকটি গেলো না বরং আবারও হাত জোড় করে আকুতি করে বললেন,

" দয়া করে আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দিন স্যার, আপনার পায়ে পড়ি। "

ফাইলের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সামিউল হক বিরক্তিকর কন্ঠে বলে উঠলেন,

"কী মুশকিল! আপনাদের মতো লোকজনের জন্যই থানায় শান্তিতে কাজ করা যায় না। বললাম তো, সময় হলে দেখব। এখন যান এখান থেকে!"

লোকটি তাচ্ছিল্য হাসলো সামিউল হকের কথায়। যারা তার মেয়েটাকে যারা জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছে, তারা কি তার জন্য সময়ের অপেক্ষায় বসে থাকবে? থানা থেকে বেরিয়ে একটি চায়ের দোকানের সামনে বসলেন তিনি। হাঁটার শক্তি নেই বিন্দুমাত্র। টেবিল থেকে জগ নিয়ে পাশে পড়ে থাকা গ্লাসটিতে পানি ঢেলে এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে পান করে ফেললেন। পাশেই বসে থাকা একজন বৃদ্ধ তাকে দেখে জিগ্যেস করলেন,

" থানায় গিয়েছিলেন মনে হচ্ছে?"

" লোকটি সেই বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বললেন,

" চেয়ারম্যান আইযানের ছেলেপুলেরা আমার মেয়েটাকে তুলে নিয়ে গিয়েছে অথচ পুলিশ হাতে চুরি পড়ে বসে আছে। তারা কেইস নিতে রাজি নন।"

" আইযানকে ছোয়ার সাধ্য কারো নেই। এ শহরের পুলিশদের কিনে রেখেছে সে। "

কিছুসময় চুপ থেকে অত:পর সেই বৃদ্ধ আবারও বলে উঠলেন,

" সে নরপিশাচ, র'ক্তই ওর একমাত্র নেশা। নারীজাতি ভোগের বস্তু তার কাছে। র'ক্তের নেশা যার অঙ্গ প্রত্যঙ্গে মিশে আছে তার বিচার কে করবে? মেয়ের আশা ছেড়ে দাও, কাল দেখবে হয়তো কোন এক ময়লার স্তুপে পড়ে আছে তোমার মেয়ের লা'শ। "

_____

রোদের তীব্রতা ফুরিয়ে এসেছে, চারপাশে নেমে এসেছে স্নিগ্ধতার কোমল পরশ। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যটা হেলে পড়েছে অনেকখানি, তার সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের বিস্তীর্ণ ধানখেত আর আঁকাবাঁকা মেঠোপথের বুকে।শাহবাড়ির পেছনের পুরোনো আমগাছটার ডালে বসে কয়েকটা পাখি আপনমনে ডাকাডাকি করছে। ইতিমধ্যেই শাহবাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছেন আঙ্গুরি বেগম আর লোকমান সাহেব । লোকমান সাহেব শহরে বাস চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, আর তার স্ত্রী আঙ্গুরি বেগম ঢাকায় মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহস্থালির কাজ করেন। তাদের অনেক বছর ধরেই চেনে মেহরাব। আমিরাকে অন্য কারো ভরসায় দিতে পারছে না বলে নিযে খরচ দিয়ে তাদের গ্রামে পাঠিয়েছে আমিরাকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার জন্য। একমাত্র বউ তার, পথে যদি কোন বিপদ হয় তাই এতো আয়োজন।

বিছানার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কয়েকখানা শাড়ি, ওড়না আর প্রয়োজনীয় টুকিটাকি জিনিসপত্র। আমিরা ব্যাগ গোছাচ্ছে আপনমনে। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন মেহেরবানু শাহ, তিনি টুকটাক জিনিসপত্র এগিয়ে দিচ্ছেন আমিরাকে। যদিও তিনি বলেছিলেন কাল রওনা দিতে কিন্তু আমিরা তাতে রাজি নয় । তার কাঁদো কাঁদো চেহেরা দেখে শেষমেশ হার মেনে নিলেন। সন্ধ্যার দিকেই রওনা দিবে তারা। মেহেরবানু শাহের দৃষ্টি গিয়ে থামল আমিরার মুখে। মেয়েটা আপনমনে কাপড়চোপড় গুছিয়ে যাচ্ছে। আমিরা চলে যাবে ভেবেই মেহেরবানু শাহের বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠল। মেয়েটাকে কত কথাই না শুনিয়েছেন তিনি। আমিরার ব্যাগ গোছানো শেষ হতেই মেহেরবানু শাহ তার হাতে দুটো স্বর্ণের চুড়ি তুলে দিলেন। চুড়ি দুটো আমিরার হাতের তালুতে রেখে তিনি বললেন,

" আমি হয়তো ভালো শাশুড়ী নই, সারাক্ষণ এটা ওটা নিয়ে তোমায় কথা শুনাই কিন্তু বিশ্বাস করো, একজন মা হিসেবে আমি খারাপ নই। "

মেহেরবানু শাহ কিছু সময় চুপ করে রইলেন অত:পর আমিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

" মেহরাবের খেয়াল রেখো আমিরা। তোমার কাছে এইটুকুই চাওয়া আমার। কখনো ঝগড়া বিবাদ হলে কিংবা ওর কোনো কথায় কষ্ট পেলে রাগ করে মুখ ফিরিয়ে থেকো না। নিজেদের মধ্যে কথা বলে সব মিটিয়ে নিয়ো। অভিমান জমিয়ে রেখে দূরত্ব বাড়িয়ো না।সংসার করতে গেলে অনেক কিছুই হবে , তাই বলে কখনো একজন আরেকজনের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। বিয়ের পর মেয়েদের সবচেয়ে আপন কে হয় জানো?"

আমিরা উনার কথায় মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বললো,

" স্বামী।"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে তাকদীরনামা পর্ব ৮ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন