" স্বামীর সব কথা শুনবে কেমন? "
" আচ্ছা আম্মা।"
" স্বামীর মুখে মুখে তর্ক করবে না, হাতের মুঠোয় রাখার চেষ্টা করবে। পুরুষ মানুষকে একমাত্র ঘরের বউ'ই সামলে রাখতে পারে বুঝেছো?"
আমিরা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বললো,
" জি আম্মা। "
উপদেশগুলো দিয়ে দুহাত বাড়িয়ে আমিরাকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। অত:পর কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
" তোমায় অনেক বকেছি, কথা শুনিয়েছি। আমার উপর অভিমান জমা রেখো না, আমি এই আছি এই নেই। নিজের খেয়াল রেখো। ঠিক করে খাওয়া দাওয়া করবে, নিজের প্রতি অযত্নশীল হবে না। পৌঁছে ফোন করবে আমায়।"
কথাগুলো বলতে বলতে মেহেরবানু শাহের কণ্ঠস্বর ক্রমশ ভারী হয়ে এলো। আমিরা মেহেরবানু শাহের বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। দুহাতে শাশুড়িকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল সে। চোখের জলে ভিজে উঠল মেহেরবানুর পরনের পোশাকের একাংশ, অথচ কান্নার তোড়ে মুখ দিয়ে কোনো কথাই বেরোল না। কতবার এই মানুষটার বকুনি শুনে মন খারাপ করেছে, অভিমান হয়েছে কিন্তু আজ কেন যেন সেই বকুনিগুলোকেও বড় আপন মনে হচ্ছে তার।
" এমনভাবে বলবেন না আম্মা। উনি আর আপনি ছাড়া আমার আর আছেই বা কে?"
কান্নাভেজা কণ্ঠে কেবল এইটুকুই বলতে পারল সে। এরপর আর কোনো শব্দ তার ঠোঁট পেরিয়ে এলো না। শাশুড়ির বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে সে আরও নিবিড়ভাবে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন তারপর আমিরার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। মেয়েটার কান্না শুনে তাঁর নিজের চোখের কোণও অশ্রুসজল হয়ে উঠল। অবশেষে মেহেরবানু শাহ নিজেকে সামলে নিয়ে আমিরার মুখখানা দুহাতে আগলে ধরলেন। আঙুলের ডগায় মেয়েটার গাল বেয়ে নেমে আসা অশ্রু মুছে দিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
" কেঁদো না, আঙ্গুরী বেগম নিচে অপেক্ষা করছে চলো
"
আমিরা আঁচল দিয়ে চোখের কোণ মুছে নিল। তবু অশ্রুর রেশটুকু রয়ে গেল পাপড়ির আগায়। তাকে নিয়ে নিচে নেমে এলেন মেহেরবানু শাহ। আমিরার পরনে নীল রঙের শাড়ি। বসার ঘরে অপেক্ষমাণ লোকমান সাহেব ও আঙ্গুরী খালা সিঁড়ির দিকে তাকাতেই তাঁদের চোখে পড়ল দুজনকে।
তারা নেমে আসতেই লোকমান সাহেব এগিয়ে এসে আমিরার হাতের ব্যাগটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আঙ্গুরী বেগম মৃদু স্বরে বললেন,
“চলো, মা। রওনা দিই। সন্ধ্যা হয়ে আসছে।”
মেহেরবানু শাহ আঙ্গুরী বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
" আমিরাকে একটু দেখেশুনে রেখো আঙ্গুরী। পথেঘাটে যেন কোনো অসুবিধা না হয়। আর ওখানে পৌঁছে মেহেরাবের হাতে ঠিকঠাক বুঝিয়ে দিয়ে তবেই ফিরবে। মেয়েটা এমনিতেই একটু বোকাসোকা।"
মেহেরবানু শাহের কথায় আঙ্গুরী বেগম মৃদু হেসে বললেন,
" চিন্তা করবেন না আপা, আমিরাকে আমার সাথে সাথেই রাখব। "
কথাটা শুনে মেহেরবানু শাহ কিছুটা আশ্বস্ত হলেন বটে,তবুও মনের ভেতর জমে থাকা দুশ্চিন্তার মেঘখানি পুরোপুরি কাটল না। মেয়েটা প্রথমবার শহরে যাচ্ছে, কিছুই চেনে না। মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগলেন যাতে পথেঘাটে কোন বিপদ না হয়।
"আচ্ছা, যাও তোমরা। আল্লাহ ভরসা। পৌঁছেই ফোন করতে ভুলবে না, আমিরা।"
আমিরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে মেহেরবানু শাহকে সালাম করলো। মেহেরবানু শাহ সঙ্গে সঙ্গে তাকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এবার আর দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখলেন না, শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে ছেড়ে দিলেন। আমিরা সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলো তবে পা বাড়ানোর আগে একবার পেছন ফিরে বাড়িটাকে আরও একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো, অত:পর সকল পিছুটান ফেলে সে এগিয়ে চললো।
সময় গড়িয়ে গেল আপন নিয়মে। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে, ধুলোমাখা জনপদ আর ব্যস্ত সড়কের দীর্ঘ বিস্তার অতিক্রম করে অবশেষে শুরু হলো ঢাকামুখী যাত্রা। পথের ক্লান্তি শরীরে ভর করলেও চোখের পাতায় একফোঁটা ঘুম নেই আমিরার। সে কৌতুহলী দৃষ্টিতে দেখছে জানালার বাহিরের দৃশ্য। রাতের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন ঢাকা শহরের সীমানায় এসে পৌঁছাল তারা, ততক্ষণে নিশীথিনীর আঁধার ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এসেছে। রজনীর বুক চিরে পূর্বাকাশে উঁকি দিতে শুরু করেছে নবপ্রভাতের আভাস। সারারাত দুচোখের পাতা এক করেনি আমিরা। বাস থামতেই সে নেমে এলো, চারদিকে এতো এতো গাড়ি, দালানকোঠা দেখে সে বেশ অবাক হলো। হঠাৎই দৃষ্টি আটকে গেল রাস্তার পাশের একটি বিশাল দালানে। বিস্ময়ভরা চোখে সে আঙ্গুরি বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
" চাচী , ওই বাড়িটা কি আসমান পর্যন্ত? "
আমিরার কথা শুনে আঙ্গুরি বেগম হেসে ফেললেন। অত:পর বললেন,
" আসমান পর্যন্ত হতে যাবে কেন? এই বিল্ডিং তো মাত্র পাঁচা তলা। মেহরাব থাকে চার তলায়।"
" উনি এতো বড়ো বাড়িতে থাকে?"
আঙ্গুরি বেগম আমিরাকে সঙ্গে নিয়ে পুরোনো ধাঁচের দালানটির ভেতরে প্রবেশ করলেন।
" তোমাকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিলো আমার,দিয়ে গেলাম। এবার আমারও ফিরতে হবে । "
আমিরা ঢোক গিলে আমতাআমতা করে বললো,
" আপনি যাবেন না?"
আঙ্গুরী বেগম বুঝতে পারলেন আমিরা ভয় পাচ্ছে, তাই তিনি আমিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
"ভয় পেয়ো না আমিরা। সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেই ডান পাশে যেই দরজাটা দেখবে ওটাই তোমার স্বামীর বাসা। "
আমিরা উনার কথায় সায় জানিয়ে ভয়ে ভয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলো।
রজনীর শেষ প্রহর ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। নিশীথের কালো চাদরখানি গুটিয়ে নিয়ে পূর্ব দিগন্তের বুকে উঁকি দিতে শুরু করেছে ঊষার ক্ষীণ আভা। আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা গাঢ় অন্ধকার ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে, রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে প্রকৃতির বুকে জেগে উঠছে নতুন দিনের মৃদু পদধ্বনি।ঘরের এক কোণে বিছানো জায়নামাজের ওপর দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছে মেহেরাব। শেষ সিজদা থেকে উঠে বসে তাশাহহুদ পাঠ করল মেহেরাব। অতঃপর দুই দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করে নামাজের জায়নামাজটি গুছিয়ে রেখে বেলকনিতে থাকা কাঠের চেয়ারে এসে বসল মেহরাব। প্রতিদিন সকালে নামাজ পড়ার পর বই পড়ার অভ্যাস তার। টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা বইয়ের মাঝ থেকে একটি বই তুলে নিলো সে পড়ার জন্য। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেতেই মেহরাব কিছুটা অবাক হলো। এই ভোরবেলায় সাধারণত কারও আসার কথা নয়। সে এগিয়ে দিয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলো তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার অর্ধাঙ্গিনী। আমিরার আসার কথা কাল অথচ আজ এতো ভোরে আমিরাকে ব্যাগ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে চিন্তিত স্বরে বললো,
" এতো সকালে কেন আসতে গেলে? একা এসেছো? আসার আগে টেলিফোন করতে পারতে, আমি গিয়ে নিয়ে আসতাম। "
" আঙ্গুরী খালা বিল্ডিং অব্দি এগিয়ে দিয়েছিলো। "
আমিরার হাত থেকে কাপড়ের ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে কোনো কথা না বাড়িয়ে তার হাত ধরে বসার ঘরের দিকে নিয়ে গেল। বসার ঘরে পৌঁছে মেহরাব নিজ হাতে একটি চেয়ার টেনে আমিরাকে বসতে বললো, অত:পর বললো,
" পানি খাবে? খিদে পেয়েছে তোমার? এখানে বসো, আমি নাস্তা নিয়ে আসছি। "
মেহরাবের অস্থিরতা দেখে আমিরা ফিক করে হেসে ফেললো অত:পর তার এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় বন্দী করে বললো,
" পরে খাবো, আগে আপনি আমার পাশে একটু বসুন তো। "
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলতো হাতে আমিরার গাল নিজের দুহাতে আঁকড়ে ধরে বললো,
" এতো জেদ কেন তোমার? চাঁদের মতো রুপ অথচ তেজ দেখো সূর্যের চেয়েও প্রখর। এবার কি তবে আমায় এতটা কাছ থেকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে চাও? একবার যখন কাছে এসেই পড়েছো, আর যেতে দিচ্ছি না তোমায়। তোমার এই জেদের শাস্তি হলো, আমৃত্যু এই মেহরাব শাহের অর্ধাঙ্গিনী হয়েই কাটাতে হবে তোমায়। পালানোর কোনো অবকাশ নেই, বিবি।"
" শাস্তি হিসেবে যদি আপনাকে পাই তাহলে সেই সকল শাস্তি মঞ্জুর।"
আমিরার কথা তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই মেহরাবের অধরপ্রান্তে ধীরলয়ে ফুটে উঠল এক চিলতে মুচকি হাসি। মেহরাবের অধরকোণে লেগে থাকা মৃদু হাসির রেখা ক্রমশ প্রসারিত হলো। সে ভ্রু যুগল সামান্য উঁচু করে, ঠেস মেরে দুষ্টুমির সুরে বলে উঠলো,
" তোমার না জ্বর ছিলো? তিনদিনেও যে জ্বর সারলো না মাত্র দশ ঘন্টার ব্যবধানে সেই জ্বর সারলো কি করে?"
মেহরাবের কথা শুনতেই আমিরার গাল দুটোতে মুহূর্তের মধ্যে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল। লজ্জায় অবনত হয়ে এল তার পল্লবঘন আঁখিপল্লব। আমিরা আড়চোখে একবার মেহরাবের মুখপানে তাকাল। লোকটার অধরকোণে তখনো সেই দুষ্টুমিভরা হাসি লেগে রয়েছে। সে মিনমিন করে বললো,
"আপনার বিচ্ছেদেই তো আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, এখন আপনি আমার কাছে আছেন তাই দ্রুত সুস্থ হয়ে গিয়েছি।"
" তাই নাকি, বিবি? এই অধমের বিচ্ছেদে যদি জ্বর এসে পড়ে তবে তো বেশিক্ষণ দূরে রাখা যাবে না দেখছি। "
আমিরা দৃষ্টি নত করে দাঁড়িয়ে রইলো, এই লোক শুধু তাকে লজ্জা দেয়। আমিরার ইচ্ছে করলো মাটির সাথে মিশে যেতে। মেহরাব আরও একবার আমিরার মুখপানে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তবে এবার আর খুনসুটির অবকাশ নেই। আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার উপায় নেই, ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে তার। সে আমিরাকে ছেড়ে দাঁড়ালো অত:পর অতঃপর কবজিতে বাঁধা ঘড়িত দিকে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বলল,
" রান্নাঘরে দুধ, ডিম ও খাবার রাখা আছে। রান্না খুব একটা ভালো পারি না তবে খাওয়ার উপযোগী। একটু পরেই বের হতে আমায়। রান্না করার প্রয়োজন নেই তোমার, দুপুরে জুলেখা খালা এসে রান্না করে দিয়ে যাবেন। "
" আপনি কবে ফিরবেন?"
" সন্ধ্যার দিকে ফিরব। ফিরে তোমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হবো।"
ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনেই আমিরার অধরপ্রান্তে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি । মেহরাব করিডোর পেরিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো, আমিরাও তার পিছু পিছু সেই ঘরে এসে উপস্থিত হলো। মেহরাবের ঘর বেশ গোছানো। শাহ বাড়ির মতো এখানেও একখানা বইয়ের তাক আছে। মেহরাব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে, তার পরনে শুভ্র রঙের শার্ট। শার্টের হাতা দুটো কনুই অবধি গুটিয়ে রাখা। মেহরাবকে প্রতিদিন সকালে তারাতাড়ি বের হতে হয় কারণ এখান থেকে ভার্সিটি বেশ খানিকটা দূরে। মেহরাব কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আমিরার দিকে তাকিয়ে বললো,
" সাবধানে থাকবে। জুলেখা খালা ছাড়া অন্য কেউ আসলে দরজা খুলবে না। খাবারের ব্যবস্থা করা আছে, কাজেই না খেয়ে থাকার কোনো অজুহাত কিন্তু চলবে না। "
মেহরাবের একের পর এক নির্দেশনা শুনে আমিরা মৃদু মাথা নাড়ল।
" সাবধানে যাবেন।"
" সারারাত নিশ্চয় ঘুমাওনি, এখন একটু ঘুমিয়ে নিয়ো। "
মেহরাব চলে যেতেই আমিরা দরজা বন্ধ করে এগিয়ে গেলো মেহরাবের ঘরের দিকে। রাতের দীর্ঘ প্রহর নির্ঘুম কাটানোর ক্লান্তি এতক্ষণে যেন সমস্ত অবয়বজুড়ে জেঁকে বসেছে। বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিল নরম বিছানায়। বেলা গড়িয়ে ক্রমশ পশ্চিম আকাশের দিকে হেলে পড়েছে সূর্য।অস্তগামী সূর্যের সোনালি আভা ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে তামাটে লালে, আর সেই রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্তজোড়া আকাশের বুকে। দরজায় কড়া নাড়ার মৃদু শব্দে আমিরার তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘুমের রেশ কাটল।দরজায় পুনরায় কড়া নাড়ার শব্দ হতেই আমিরা ধড়মড় করে উঠে বসল। জানলার ফাঁক গলে আসা গোধূলির রক্তিম আভা দেখে বুঝতে পারল, বেলা অনেকখানি গড়িয়ে গেছে। সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, এরপর এলোমেলো চুলগুলো হাতখোপা করে দরজার কাছে এগিয়ে গেলো। ভেতর থেকেই জিজ্ঞেস করল,
"কে?"
" আমি জুলেখা। দরজাটা খুলো।"
জুলেখা নামটা শুনেই আমিরা দরজার ছিটকিনি খুলে দিলো। দরজা খুলতেই জুলেখা চৌধুরীর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল আমিরার মুখের ওপর। আমিরাকে দেখে তিনি কিছুটা অবাক হলেন, কারণ এই ফ্লাটে তিনি এর আগে কখনো কোন মেয়েকে আসতে দেখেননি। জুলেখা চৌধুরী ঘরে প্রবেশ করে পরনের বোরকা ও মুখের নিকাব খুলে একপাশে রাখলেন। কৌতুহলী দৃষ্টিতে আমিরার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন,
" তোমাকে তো আগে কখনো দেখিনি। কে তুমি?"
" আমি আমিরা, আজ ভোরেই এসেছি গ্রাম থেকে। "
জুলেখা চৌধুরী স্মিত হাসলেন আমিরাকে দেখে। আমিরার রূপ দেখে তিনি বেশ মুগ্ধ হলেন। মেহরাবের মুখ থেকে আমিরার সৌন্দর্যের বর্ণনা শুনার পর ভেবেছিলেন, মেয়েটি হয়তো সত্যিই অপরূপা। কিন্তু আজ স্বচক্ষে আমিরাকে দেখার পর মনে হলো এ যেন উনার কল্পনার চেয়েও সুন্দর, স্নিগ্ধ।
" মাশাল্লাহ! তোমাকে যতটা সুন্দর ভেবেছিলাম, তুমি তো দেখছি তার চেয়ে বহুগুণ সুন্দর। "
আমিরা খানিকটা লজ্জা পেলো উনার কথায়। জুলেখা চৌধুরী আর কোন কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন। ফ্রিজ থেকে মিষ্টিকুমড়ো ও মুরগীর মাংস বের করলেন রান্নার জন্য। আজ একটু তাড়া আছে উনার। আমিরা এগিয়ে গিয়ে উনার পাশে এসে বসলো, জুলেখা চৌধুরী বটিতে মিষ্টিকুমড়ো কাটতে বসেছেন।
" আপনি এখানে কখন থেকে কাজ করছেন?"
জুলেখা চৌধুরী নিজের কাজ করতে করতেই উত্তর দিলেন,
" বছর দুই হবে। "
হঠাৎ ক্ষুধায় পেট মোচড় দিয়ে উঠলো আমিরার। গতকাল রাত থেকে তেমন কিছুই খায়নি সে। ঘুমিয়ে থাকায় দুপুরের খাবারটাও খাওয়ার সুযোগ হয়নি তার।ক্ষুধার তাড়না আর উপেক্ষা করতে না পেরে সে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। রান্নাঘরের একপাশে থাকা হাড়ির ঢাকনা সরিয়ে ভেতরে থাকা ঠান্ডা ভাতটুকু নিজের পাতে তুলে নিল, সঙ্গে নিল বেগুনের তরকারি। ক্ষুধার তাড়নায় খাবারটা তার কাছে বেশ তৃপ্তিকর লাগল। জুলেখা চৌধুরী তাকে ঠান্ডা ভাত খেতে দেখে হাতের কাজ ফেলে বলে উঠলেন,
" এ কী! তুমি বাসি ভাত খাচ্ছো কেন? এই ভাত তো গতকাল রাতের। "
আমিরা মৃদূ হেসে বললো,
" আমার অভ্যাস আছে। আর এই ভাত তো পঁচে যায়নি, খেতে অসুবিধে কি?"
" ওসব তুমি বুঝবে না, এইখানে বসো আমি তোমায় গরম ভাত বেড়ে দিচ্ছি। "
জুলেখা চৌধুরী চুলার পাশে রাখা হাঁড়ি থেকে গরম ভাত তুলে অন্য একটি থালায় বেড়ে দিলেন। অত:পর থালাটি আমিরার দিকে এগিয়ে দিলেন।
মেহেরবানু শাহ তাওয়ায় রুটি সেকছেন আর শেফালী বেগম রুটি বেলছেন। শেফালী বেগম মেহেরবানু শাহের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে কটাক্ষের সুরে ঠেস দিয়ে বললেন,
" পছন্দ কইরা পোলার বউ আইনা লাভডা কী হইল আপা? সেই তো বুড়া বয়সে একলা একলাই থাহন লাগব। আপনার পোলার বউ যে শহরে গেল, একবারের লাইগাও কি আপনার খোঁজখবর নিছে?"
শেফালী বেগমের কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মেহেরবানু শাহ
অত:পর বললেন,
" মেয়েটা হয়তো ক্লান্ত তাই ফোন করেনি। "
শেফালী বেগম মুখ বাঁকিয়ে নিজের কাজ করতে লাগলেন। মেহেরবানু শাহ ও আর কোন কথা বাড়ালেন না, শেফালী বেগমের বয়স হলেও তিনি ছোট বাচ্চার মতো আমিরার সাথে গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে চান। পশ্চিম দিগন্তে অস্তগামী সূর্যের শেষ রক্তিম আভাটুকু ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে এসেছে। নীলিমার বুকে গাঢ় হচ্ছে সন্ধ্যার নীলচে আঁধার। মেহরাব দরজায় কড়া নাড়ার মিনিট দুয়েকের মাঝেই দরজা খুলে দেয় আমিরা। ক্লান্ত মেহরাব মৃদু হেসে তাকালো তার দিকে, আজ গোসল করতে দেরি হওয়ায় চুলগুলো এখনো শুকোয়নি।মেহরাব ভেতরে ঢুকে হাতে থাকা শপিং ব্যাগ আমিরার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
" দেখো পছন্দ হয়েছে কিনা। "
সারাক্ষণ শাড়ি পরে থাকলে আমিরার অসুবিধা হতে পারে, এই ভেবেই তার জন্য কয়েক সেট থ্রি-পিস কিনে এনেছে মেহরাব। আমিরার ব্যাগ থেকে থ্রি-পিস গুলো বের করে উলটে পালটে দেখছে।
" আমার জন্য এনেছেন? "
" পাশের বাসার ভাবীর জন্য এনেছি।"
আমিরা আড়চোখে তাকাতেই মেহরাব তার নাক টেনে দিয়ে বললো,
" সবগুলোই তোমার। পছন্দ হয়েছে?"
মেহরাবের কথা শুনে আমিরা দ্রুত মাথা নাড়ল। তার চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক। সে মৃদুস্বরে বলল,
" খুব পছন্দ হয়েছে। "
জুলেখা চৌধুরী চা বসিয়েছেন চুলোয়। মেহরাব রান্নাঘরে এগিয়ে গিয়ে বললো,
" খালা, আজ নাস্তা বানানোর প্রয়োজন নেই। চা খেয়ে বেরোবো ওকে নিয়ে।"
জুলেখা চৌধুরী মাথা নেড়ে সায় জানাতেই মেহরাব করিডোর পেরিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো। আমিরা সেই ঘরে বসে নিজের জন্য আনা থ্রি-পিস গুলো খুটিয়ে খুটিয়ে পরখ করছে। মেহরাব গোসল করার জন্য গামছা হাতে নিয়ে আমিরার দিকে তাকিয়ে বললো,
" তৈরি হয়ে নাও, বিবি। গোসল সেরে তোমাকে নিয়ে বের হবো ঢাকা শহর ঘুরাতে।"