আকাশজুড়ে নেমে এসেছে সন্ধ্যার গাঢ় নীলিমা, তার বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অস্তগামী সূর্যের ফেলে যাওয়া ক্ষীণ আভা৷ দূর আকাশে একে একে জ্বলে উঠছে সন্ধ্যাতারার মিটিমিটি আলো। জুলেখা চৌধুরী রাতের রান্না সেরে মাছ কাটতে বসেছেন। মেহরাব সোফায় বসে চা খাচ্ছিলো, তার পরনে কালো রঙের শার্ট। কিছু সময় পরেই কালো বোরকায় আবৃত আমিরা দুহাত একত্র করে মেহরাবের সামনে এসে দাঁড়ালো। মেহরাব চায়ের কাপ একপাশে রেখে তার দিকে তাকিয়ে বললো,
" চলো তাহলে বেরোনো যাক। "
" ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মেহেরুন্নেসাকে ধ'র্ষণ চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন তালুকদার বাড়ির ছোট ছেলে আশরাফ তালুকদার। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।"
সংবাদপাঠিকার কণ্ঠে শেষ বাক্যটি উচ্চারিত হতেই আশরাফের মুখমণ্ডল ক্রোধে কঠিন হয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত করে টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল সে। ক্রোধে তার চোখমুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে, কপালের শিরাগুলো দপদপ করছে অবিরত। মনে হলো, পর্দার ওপাশে বসে থাকা মানুষগুলোকে এক্ষুনি নিজের সামনে পেলে নির্ঘাত মাটিতে পুতে ফেলত। হাতে থাকা কাচের গ্লাসটি সে মুহূর্তেই সজোরে মেঝেতে আছাড় দিল। বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল কাচের গ্লাসটি। স্বচ্ছ কাচের টুকরোগুলো ছিটকে ছড়িয়ে পড়ল ঘরের বিভিন্ন প্রান্তে।
" শালার মিডিয়া।"
আশরাফ দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল। ক্রোধে তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুতলয়ে, কপালের শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাশেই বসে থাকা আইযান একবার মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কাচের টুকরোগুলোর দিকে তাকাল, তারপর নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকালো আশরাফের দিকে। কিছুক্ষণ আগেই পুলিশের কাছ থেকে আশরাফকে ছাড়িয়ে এনেছে সে। অন্যদিকে আশরাফের চোখে তখন ক্রোধের লেলিহান শিখা। অপমানে তার সমস্ত সত্তা যেন দাউদাউ করে জ্বলছে। সে রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলো,
" শালা! সাহস কত বড়! ওই প্রফেসরকে পেলে ওর শরীরের চামড়া আমি রাস্তার কুকুরকে খাওয়াব।"
আশরাফের এমন উগ্র আচরণেও তার মুখে অস্থিরতার লেশমাত্র নেই। সে আশরাফের দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে জিগ্যেস করলো,
" কার এতো বড়ো সাহস তোর নামে অভিযোগ তোলার। নাম কি তার?"
আশরাফ চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল,
" বাংলা প্রফেসর মেহরাব শাহ তুরাব। "
" কি করেছিলি তুই?"
" মেয়েটাকে প্রপোজ করেছিলাম দুদিন আগে। আর নটি আজ আমাকে রিজেক্ট করে দিয়েছে। এই আশরাফ তালুকদারকে রিজেক্ট করে দিয়েছে, তাই রাগের বশবর্তী হয়ে ওকে উচিত শিক্ষা দিতে তিনতলার খালি ক্লাসরুমে নিয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক একই সময় কোত্থেকে ওই প্রফেসরও চলে এলো। শালি বিচার দিয়েছে আমি নাকি ওকে ধ'র্ষণ করার চেষ্টা করেছি তাই প্রফেসর পুলিশকে ফোন দিয়ে ডেকে এনেছে। আর শালার মিডিয়া, একটা খবর পাইছে ওমনি সারাদেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে বেড়াচ্ছে।"
আশরাফের কথাগুলো শুনে আইযানের মুখাবয়বে বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। সে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বললো,
" প্রত্যাখ্যান করেছে বলে ধ'র্ষণ করার কি দরকার ছিলো? তাও আবার ভার্সিটিতে! কালকুঠুরিতে নিয়ে আসলেই তো সব ঝামেলা শেষ হয়ে যেতো। তোর এই বোকামির ফল আমাকে ভোগ করতে হবে। সামনে নির্বাচন, বিরোধীরা এই ঘটনাকে পুঁজি করে প্রচার চালাবে। "
আইযানের কথা শুনে আশরাফ বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,
" আমি তো একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু শালি যে এমন কাণ্ড করবে, সেটা বুঝতে পারিনি। "
আইযান এবার পিঠ সোজা করে বসল। তার চোখের দৃষ্টি আগের মতোই স্থির। সে আশরাফের কাঁধে হাত রেখে বললো,
" আপাতত কয়েকদিন বাড়ি থেকে বের হবি না আর মেহরাব শাহ তুরাবের ব্যাপারটা আমি দেখছি।"
" আমি ওর লা''শ নিজের চোখে দেখতে চাই ভাইজান। ও এখনো বুঝতে পারেনি কার উপর অভিযোগ তুলেছে। "
" তুই আবদার করেছিস, মেটানোর দায়িত্ব আমার। আপাতত কালকুঠুরি তে যা। পরশু ডিলার আসবে। "
জ্যোৎস্নামাখা রজনীর স্নিগ্ধ আলোয় স্নাত হয়ে আছে চারপাশের নিস্তব্ধ পৃথিবী। মেঘমুক্ত আকাশের বুকে অর্ধচন্দ্রখানি আপন মহিমায় দীপ্তিমান। রিকশার এক পাশে বসে আছে মেহরাব, অন্য পাশে আমিরা।হঠাৎ বয়ে যাওয়া এক পশলা শীতল বাতাস আমিরার মুখমণ্ডল ছুঁয়ে গেল। আরও কিছুটা পথ এগিয়ে যেতেই রিকশাটি ধীরগতিতে থেমে গেল রাস্তার পাশের একটি ফুচকার দোকানের সামনে। মেহরাব রিকশা থেকে নেমে আমিরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো, আমিরার তার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে হাত রেখে রিকশা থেকে নেমে এলো।
" ফুচকা খাবে? "
" হুম। ঝাল বাড়িয়ে দিতে বলবেন। "
আমিরার কথায় মেহরাব ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
" বেশি ঝাল খেয়ে আবার পানি পানি করবে না যেন। "
মেহরাবের কথা শুনে আমিরা নিকাবের আড়ালে মৃদু হাসলো। মেহরাব দু প্লেট ফুচকার অর্ডার দিলো। মিনিট দশেকের মাঝেই দোকানি ফুচকার প্লেট তাদের সামনে এগিয়ে দিল। মেহরাব একটি প্লেট নিজের হাতে নিয়ে অন্যটি আমিরার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমিরা সানন্দে প্লেটটি হাতে নিল। ফুচকা দেখে আমিরার চোখজোড়া আনন্দে চিকচিক করে উঠল। এক হাতে নিকাবের সামনের অংশ সামলে অন্য হাতে ফুচকা তুলে নিল। মেহরাবকে খেতে না দেখে আমিরা ভ্রু কুঁচকে জিগ্যেস করলো,
" আপনি খাচ্ছেন না কেন?"
মেহরাব আমিরার দিকে তাকিয়ে নির্বিকার স্বরে বলল,
" আমি খাবো না, তুমি খাও৷ "
" দু'প্লেট নিলেন যে তাহলে? "
" তোমার জন্য নিয়েছি। হাতের টা তারপর এটা খেয়ো।"
মেহরাবের কথা শুনে আমিরা কয়েক মুহূর্ত নির্বাক হয়ে রইল। এক প্লেট খাওয়া শেষে মেহরাব তার হাতে অন্য প্লেটটি তুলে দিলো। সে একটা ফুচকা মেহরাবের দিকে এগিয়ে দিতেই মেহরাব তা সাদরে গ্রহণ করলো। খাওয়া শেষ হতেই মেহরাব বিল মিটিয়ে আমিরার দিকে তাকিয়ে বললো,
" আর কিছু খাবে?"
আমিরা উৎসুক দৃষ্টিতে আইসক্রিমের ভ্যানের দিকে এক পলক তাকিয়ে এরপর মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বললো,
" আইসক্রিম খাবো। "
" ঠিক আছে। এখানে দাঁড়াও আমি নিয়ে আসছি। "
আমিরা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সায় জানালো৷ তার অবশ্য ভালোই লাগছে। সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগছে চাওয়া মাত্রই সবকিছু হাতের নাগালে পেয়ে যাওয়ায়। এমন একজন স্বামী ক'জনই বা পায়? আমিরা মনে মনে নিজের ভাগ্যের উপর সন্তুষ্টি প্রকাশ করলো। সত্যিই তো ভাগ্য করে এমন স্বামী পেয়েছে সে। মেহরাব আইসক্রিম কিনে আমিরার কাছে এসে দাঁড়ালো, এরপর হাতে থাকা আইসক্রিম তার দিকে এগিয়ে দিলো। মেহরাব আমিরাকে নিয়ে বসলো একটি নদীর ধারে। আমিরা আপনমনে আইসক্রিম খাচ্ছে, মেহরাব তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো,
" ভয় লাগছে না?"
" আপনি থাকতে ভয় কিসের?"
"আমার প্রতি এতো নির্ভরশীল হয়ে পড়লে বিবি? যদি কখনো ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভাবে তোমার বিশ্বাস ভেঙে ফেলি?"
আমিরা তার কথায় মৃদু হেসে কাঁধে মাথা রেখে বললো,
" জন্মের পর থেকে মা-বাবার আদর ভালোবাসা পাইনি। সমাজের কাছে অপয়া, অলক্ষী বলে পরিচিত হয়েছি। ভালোবাসা বলতে একমাত্র আপনাকে বুঝি, আপনি ব্যতীত আমায় কখনো কেউ এভাবে ভালোবাসেনি। আপনি ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার কোন অস্তিত্ব'ই নেই, আপনার হাতে মৃত্যু ও কবুল।"
সময় গড়িয়ে আপন নিয়মে বিদায় নিয়েছে আরও দুটি দিন। দ্বিপ্রহরের প্রখর রোদে প্রকৃতি যেন তপ্ত অগ্নিরূপ ধারণ করেছে। আকাশের মধ্যগগনে বিরাজমান সূর্য তার সমস্ত তেজ ঢেলে দিয়েছে ধরিত্রীর বুকে। চারপাশ যখন রৌদ্রদগ্ধ নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন, তখন একগোছা ধোয়া কাপড় হাতে ছাদের দিকে এগিয়ে এল আমিরা। মেহরাবের কিছু কাপড় বেশ ময়লা হয়ে পড়েছিল, সেগুলোই শুকাতে দেওয়ার জন্যই এই তপ্ত দুপুর উপেক্ষা করে ছাদে আসা। ছাদের একপাশে কাপড় শুকানোর দড়ির কাছে গিয়ে একে একে কাপড়গুলো মেলে দিতে লাগল আমিরা।
" তুমি নতুন এসেছো বুঝি? আগে তো দেখিনি তোমায়।"
পেছন থেকে ভেসে আসা অপরিচিত নারীকণ্ঠে আমিরা কাপড় মেলার ফাঁকে পেছন ফিরে তাকিয়ে বললো,
" জি, তিনদিন আগে এসেছি। "
আমিরার মতো এমন রূপসী মেয়ে এই ফ্ল্যাটে আগে কখনো দেখেননি তিনি । কৌতূহলবশতই আলাপ জমাতে এগিয়ে আসলেন,
" কোথা থেকে এসেছো? "
" সোনাঝুড়ি গ্রাম থেকে। "
" কত তলায় থাকো তুমি?"
" চার তলায়। বাঁ পাশের ফ্ল্যাটে। "
আমিরার কথায় নূর জাহান খানিকটা অবাক হয়ে বললেন,
" মেহরাবের ঘরে থাকো তুমি? মেহরাব কি হয় তোমার? "
আমিরা কিছুটা থতমত খেয়ে গেলো উনার কথায়,অত:পর বললো,
" স্বামী হয় আমার। "
কথাটি বলেই আমিরা পুনরায় কাপড় মেলার দিকে মনোযোগ দিল। আমিরার মুখে এমন অকপট উত্তর শুনে নূর জাহান খানিকটা বিস্মিত হলেন। বিস্ময়ের রেশটুকু তাঁর চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি আমতাআমতা করে বললেন,
" বিয়ে কখন হলো? পছন্দ করে বিয়ে করেছে তোমায়?"
" দু সপ্তাহের মতো হয়েছে। পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়েছে আমাদের। "
" গ্রামে বিয়ে হয়েছে তোমাদের?"
" হ্যাঁ। "
ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে আমিরাকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,
" তুমি তো দেখছি মেহরাবের চেয়ে বেশ ছোট। তা মেহরাবের সাথে তোমার স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন?"
আমিরা ভ্রু কুঁচকে তাকালো নূর জাহানের কথা শুনে। এরপর বললো,
" মানে?"
" মানে মেহরাব তোমায় ভালোবাসে তো? নাকি এমনিতেই স্বামী স্ত্রীর তকমা লাগিয়ে দিন কাটছে?"
" অবশ্যই ভালোবাসে। প্রতিদিন মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, নিজের হাতে খাইয়ে দেয়। অনেক ভালোবাসে। "
" তুমি তো দেখছি কিছুই বুঝো না। এই ভালোবাসা সেই ভালোবাসা নয়। ভালোই হয়েছে, আমার ছোট চাচার মেয়েকে বিয়ে করতে বলেছিলাম,করেনি। এখন জুটেছে অপরিপক্ক বউ। "
কিছু সময় থেমে তিনি আবারও বলে উঠলেন,
" তোমার শাশুড়ীর জন্যই বিয়েটা হয়নি বুঝলে। নাহয় মেহরাব কিন্তু আমার বোনকে ঠিকই পছন্দ করেছিলো। "
নূর জাহানের কথা শুনে আমিরা এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেলো। উনার কথাগুলো তার কানে এসে বিঁধছিল তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো। মেহরাব বিয়ের আগে অন্য কাউকে পছন্দ করত এই কথা সে জানত না। তার স্বামী কেন অন্য কাউকে পছন্দ করবে। আমিরার ভীষণ কান্না পাচ্ছে উনার কথা শুনে। সে নিজেকে সামলে মলিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরস্বরে বললো,
" উনি কি নিজের মুখে বলেছে উনি আপনার বোনকে পছন্দ করেছে?"
" বোকার মতো প্রশ্ন করছো। না বললে কি করে জানলাম? আমার বোন শহরে পড়াশোনা করেছে শুনে তোমার শাশুড়ী রাজি হয়নি, নাহয় দুজনকে একসাথে খুব মানাতো। মেহরাব তো একদিন প্রিয়াকে নিয়ে ঘুরতেও বের হয়েছিলো। দুজনকে একসাথে কি সুন্দর লাগছিলো। তুমি আবার এসব শুনে মন খারাপ করো না। ছেলেদের বিয়ের আগে এমন অনেক কিছুই থাকে। আমার আবার বাসায় অনেক কাজ পরে আছে, কাল প্রিয়া আসবে তো তাই গোছগাছ করা বাকি। "
নূর জাহান চলে যেতেই আমিরাও তাঁর পিছু পিছু নিচে নেমে এল। চারতলার ডান পাশের ফ্ল্যাটটিতে থাকেন নূর জাহান, আর বাঁ পাশের ফ্ল্যাটটিই মেহরাবের। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে আমিরার মনটা কেমন যেন ভার হয়ে রইল। আমিরা ঘরে ঢুকেই ধুম করে সজোরে দরজাটা বন্ধ করল।পাশের ফ্ল্যাটের দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নূর জাহান শব্দটা শুনে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে তাকালেন। তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠল চাপা আমোদের আভা। সে মিনমিন করে বললো,
" এবার কিছুদিন এদের ঝগড়া শুনেই দিন কাটানো যাবে। "
আমিরা বিছানায় বসে দুহাতে বালিশটা বুকে জড়িয়ে ধরল। পরক্ষণেই বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটা। চোখের কোণ বেয়ে টুপটুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। বালিশটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
" আজই চলে যাবো আমি। উনি থাকুক উনার পুরনো প্রেমিকাকে নিয়ে। এইজন্যই আমায় এখানে নিয়ে আসতে চায়নি, নিয়ে এলে তো আমি জেনে যেতাম। দরকার হলে আম্মার মার খাবো তাও উনার সংসার করবো না আমি। আজকেই বাপের বাড়ি চলে যাবো। "
কথাগুলো বলতে বলতে আবারও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে।চোখ দুটো অশ্রুতে ভিজে একাকার। মেঘমুক্ত বিস্তীর্ণ আকাশের বুকে সন্ধ্যাতারার মিটিমিটি আলো জ্বলজ্বল করছে। দিনের শেষ আলোকরেখাটুকু বহু আগেই হারিয়ে গেছে দিগন্তের ওপারে। নগরীর বুকে নেমে এসেছে সন্ধ্যার গাঢ় নীলাভ আঁধার। মেহরাব মাত্র এসে পৌঁছেছে।
ভেতরে প্রবেশ করতেই অভ্যাসবশত তার দৃষ্টি আমিরাকে খুঁজলো। অন্য দিনগুলোতে দরজার শব্দ কানে পৌঁছাতেই আমিরা ছুটে আসত। কখনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত তার অপেক্ষায়,কিংবা সোফায় বসে অপেক্ষা করতো। অথচ আজ তার ছায়াটুকুও দেখতে পেলো না মেহরাব। নিজের ঘরে পা রাখতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামল বিছানার ওপর। আমিরা এলোমেলো হয়ে শুয়ে আছে সেখানে। কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি সে। বিছানার কাছে এসে আমিরার দিকে তাকাতেই মেহরাবের দৃষ্টি আটকে গেল তার মুখে। ঘুমন্ত মুখখানিতে লেগে আছে কান্নার স্পষ্ট ছাপ। মেহরাব কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটা ভয়-টয় পেলো কিনা বুঝতে পারলো না। নাহয় হঠাৎ করে কাঁদলো কেন? কোনো কারণে মন খারাপ হয়েছে? নাকি শরীর খারাপ লাগছিল বলে কেঁদেছে। একের পর এক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল তার। মেহরাব ধীর পায়ে বিছানার কিনারায় বসে পড়ল। নিজের পাশে কারো অস্তিত্ব টের পেতেই আমিরার ঘুম ভেঙে গেলো। সে শোয়া থেকে উঠে বসলো। মেহরাব তার মলিন চেহারা দেখে জিগ্যেস করলো,
" কান্না করেছো কেন? ভয় পেয়েছিলে নাকি?"
আমিরা অভিমানী কন্ঠে শুধালো,
" না। "
" তাহলে কেঁদেছো কেন?"
" কাপড় বদলে আমায় বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিন। "
আমিরার এমন আকস্মিক আবদারে মেহরাব খানিকটা অবাক হলো তার কথায়। সে ভ্রু কুঁচকে বললো,
" বিয়ের পরদিন তো বলেছিলে রেখে আসলেও যাবে না বাপেরবড়ি। তাহলে আজ হঠাৎ ফিরে যেতে চাইছো কেন?"
আমিরা জবাব দিল না। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রইল সে। মেহরাব তাকে চুপ করে থাকতে দেখে বললো,
"কি হয়েছে বলবে তো। নাহয় আমি বুঝব কি করে? "
" সতীনের সংসার করব না আমি। "
আমিরার কথা শুনে মেহরাব অবাক হয়ে বললো,
" সতীন?"
" বিয়ের আগে নূর জাহান ভাবির বোন প্রিয়াকে নিয়ে ঘুরতেন, আমাকে বলেছে নূর জাহান ভাবি। এইজন্যই আপনি আমায় এখানে নিয়ে আসতে চাননি। কাল তো উনার বোন আসবে, আপনার পুরনো প্রেমিকা। তার চেয়ে বরং আমি আজই চলে যাই৷ "
নূর জাহান ভাবি বরাবরই রসিক স্বভাবের মানুষ। কথায় ঠাট্টা করা, অন্যকে খুনসুটি করে বিব্রত করা এসব তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। মেহরাব উনাকে ভালো করেই চেনেন। সে এবার পুরো ঘটনা বুঝতে পারলো, আমিরার কথা শুনে হাসি পাচ্ছে তার। না জানি নূর জাহান ভাবি হাসি-ঠাট্টার ছলে কি না কি বলেছে আর তার পিচ্চি বউ তা বিশ্বাস করে বসে আছে। মেহরাব তার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো,
" তোমরা মেয়েরা জন্মগত হিংসুটে। "
মেহরাবের কথায় আমিরা নাকের পাটা ফুলিয়ে বললো,
" আপনার বেলায় আমি বরাবরই হিংসুটে। আপনি শুধু আমার স্বামী, আমার মাস্টারমশাই। "
" মাস্টারমশাই কবে থেকে হলাম?"
" যেদিন থেকে পড়ানো শুরু করেছিলেন। "
" তুমি ভুল বুঝছো, নূর জাহান ভাবির বোনের সাথে আমার তেমন কিছুই ছিলো না। "
" উনি বলেছে আমায়। আপনি উনার বোনকে পছন্দ করতেন। দুজনে একসাথে ঘুরতেও গিয়েছেন। আমার আগে আপনার জীবনে অন্যকেউ ছিলো বললেননি কেন আমাকে? উনার হাত ও কি ওই ভাবে ধরেছিলেন যেমনটা আমার ধরেছিলেন গতকাল?"
" একবার'ই গিয়েছিলাম। সেখানে আমি একা ছিলাম না, নূর জাহান ভাবি ও উনার বর ও ছিলো। উনারা জোর করেছিলো বলেই গিয়েছিলাম। আমি তাকে কখনো স্পর্শ অব্দি করিনি। "
" তারমানে আমার সাথে বিয়ে না হলে আপনি অন্য কাউকে বিয়ে করতেন?"
" মোটেই না, অপেক্ষা করতাম তোমার জন্য। "
আমিরা কিছুসময় চুপ থেকে এরপর মলিন কন্ঠে বললো,
" ভালোবাসতেন উনাকে? "
মেহরাব মৃদু হেসে বললো,
" কি মনে হয়?"
"সতীনের সংসার করবো না আমি। স্বামীর ভাগ দিতে রাজি নই আমি, যদি ঘরে সতীন আনতেই হয় তবে আমায় বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিন। মেয়েরা সব কিছুর ভাগ দিতে পারলেও স্বামীর ভাগ দিতে পারে না। আমিই আপনার একমাত্র স্ত্রী, আমি ছাড়া যদি অন্য কারো আগমন হয় তাহলে এই সংসার আমি করব না।"
"শাহ বাড়ির বউদের বাপের বাড়ি ফেরত পাঠানো হয় না বিবি। তোমার স্বামী তোমার'ই আছে। মেহরাব শাহের জীবনে আসা একমাত্র নারী তুমি, তোমার আগে কখনো কোন নারী আসেনি আর না তোমার পরে আসবে।"
" তাহলে উনার কথা জানালেন না কেন আমায়? আপনি আমায় ভালোবাসেন না। বাসেন না! "
মেহরাব আমিরার খানিকটা কাছে এগিয়ে এসে আলতো হাতে চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বললো,
" কে বলেছে ভালোবাসিনি? আমার হৃদয়জুড়ে কেবল তোমারই বসবাস। আমার অস্তিত্বের প্রতিটি ভাঁজে মিশে আছো তুমি। "
আমিরা মেহরাবের বুকে মুখ গুজে ডুকরে কেঁদে উঠে বললো,
" আপনি আমায় ভালোবাসেন না বলেই এতো দিনেও আপন করে নিতে পারেননি। তবে কি ধরে নেবো ঘরে সতীন আমন্ত্রিত?"
মেহরাব মৃদু হেসে আমিরাকে আগলে ধরলো বুকে,অত:পর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
"নিজের ধ্বংস নিজে ডেকে আনছো? তুমি কি চাইছো বিবি? আমায় মারতে নাকি নিজে মরতে?"