"কোনটাই নয়। আমি শুধু আপনাকে চাইছি। "
" আমি তোমার আছি, তোমারই থাকব। এ নিয়ে অত ভাবার দরকার নেই বিবি। "
মেহরাবের কথায় আমিরা তার বুক থেকে মাথা তুলে তার দিকে তাকায়। আঁখিপল্লব মেলে স্বামীর চোখে চোখ রেখে এরপর মৃদুস্বরে বললো,
" কাল নূর জাহান ভাবির বোন আসবে। আপনি দেখতে যাবেন? "
" ঘরে বউ রেখে পরনারীর দিকে নজর দেব এমন পুরুষ আমি নই, বিবি । চোখের জিনার ভয় আছে আমার। তাছাড়া এতো সুন্দর বউ যার ঘরে সে বাইরে নজর দিবে কোন দুঃখে? চাঁদ রেখে জ্যোৎস্নার প্রতি আকৃষ্ট হব এতো বোকা নই আমি।"
লোকটার মুখে এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নিজের প্রশংসা শুনে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল। আমিরা ঠোঁট চেপে হাসি আড়াল করে বললো,
"আমি কি আপনাকে যেতে নিষেধ করেছি নাকি? শুধু জিজ্ঞেস করেছি, যাবেন কি না"
"নিষেধ করোনি তো কী হয়েছে ? তোমার মনের খবর কি আমি বুঝি না? "
আমিরা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
"আপনি না বড্ড বেশি বোঝেন মাষ্টারমশাই। "
মেহরাব মৃদু হেসে বললো,
" অভিমান কমেছে?"
আমিরা মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে বললো,
" হুম।"
" সত্যিই কমেছে? "
" হুম। "
মেহরাব বিছানা থেকে উঠে আমিরার দিকে তাকিয়ে বললো,
" তুমি বিশ্রাম নাও, আমি গোসল সেরে আসছি।"
বলেই সে গোসলখানার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলো। আমিরা তার দিকে তাকিয়ে রইলো। গতকাল রাতের মুরগির মাংস অবশিষ্ট থাকায় আজ আর বেশি কিছু রান্না করলেন না জুলেখা চৌধুরী। গোসল সেরে এসে মেহরাব ল্যাপটপ নিয়ে কাজে বসেছে। আমিরা মেহরাবের কাছে এগিয়ে এসে মৃদুস্বরে বললো,
" শুনছেন?"
মেহরাব ল্যাপটপের পর্দা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমিরার দিকে তাকাল। অতঃপর মৃদুস্বরে বলল,
"শুনছি। কিছু বলবে?"
আমিরা কিছুটা ইতস্তত করে আঙুলের ডগা দিয়ে নিজের ওড়নার প্রান্ত মুচড়াতে মুচড়াতে বলল,
"আম্মার কথা মনে পড়ছে। উনাকে একটা ফোন দিবেন?"
আমিরার কথায় মেহরাব পকেট থেকে মুঠোফোন বের করলো। এরপর মেহেরবানু শাহের নাম্বারের ফোন করে সংযোগ চালু রেখেই ফোন আমিরার দিকে এগিয়ে দিল।
“নাও, কথা বলো।”
মেহরাব তার হাতে থাকা মুঠোফোন আমিরার দিকে এগিয়ে দিতেই সে বিস্মিত দৃষ্টিতে মেহরাবের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। অত:পর মিনমিন করে বললো,
" এটা কি?"
" ফোন। "
আমিরা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। অত:পর পুনরায় মেহরাবের হাতে থাকা ফোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
" কিন্তু টেলিফোন তো বড়ো হয়, এটা তো ছোট। "
মেহরাব তার কথায় মৃদু হেসে বললো,
" এটাকে স্মার্টফোন বলে। "
আমিরা শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে যায় কথা বলতে। ফোনটি কানে ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই আমিরা ইতস্তত করে ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল,
"হ্যালো... আম্মা?"
" ভালো আছি আম্মা, আপনি কেমন আছেন?"
" আলহামদুলিল্লাহ। আজ হঠাৎ কি মনে করে ফোন করলে আমায়? আমি তো ভেবেছিলাম স্বামীসোহাগী স্বামী পেয়ে শাশুড়ীকে ভুলে গিয়েছে। "
মেহেরবানু শাহের কথাগুলো শুনে আমিরার মুখখানি লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।ঘন পাপড়ির আড়ালে আড়ষ্ট হয়ে রইল তার দৃষ্টি। সে আমতাআমতা করে বললো,
" ভুলিনি আম্মা। আসলে এখানে টেলিফোন ছিলো না তাই ফোন করতে পারিনি।"
আমিরার কথায় মেহেরবানু শাহ ক্ষীণ হেসে বললেন,
" বুঝতে পেরেছি। সেখানে দিনকাল কেমন কাটছে তোমার?"
" ভালোই কাটছে আম্মা। তবে সারাদিন একা একাই কাটাতে হয়। উনি সেই সকালে বেরিয়ে যান, ফেরেন সন্ধ্যায়"
" সব ঠিক হয়ে যাবে আস্তে আস্তে। মেহরাব আর তোমার মাঝের দুরত্ব কেটেছে?"
মেহেরবানু শাহের কথায় আমিরা মলিন কন্ঠে বললো,
" উনি আমাকে ভালোবাসলেও কোথায় যেন একটা শূন্যতা থেকেই যায় আম্মা। ভালোবাসলেও কাছে টেনে নেওয়ার বেলায় বেশ উদাসীন। "
আমিরার কণ্ঠে চাপা অভিমানের আভাস ফুটে উঠল। মেহেরবানু শাহ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
" মন খারাপ করো না আমিরা, মেহরাবের চোখে আমি তোমার প্রতি ভালোবাসা দেখেছি। আমি যখন তোমাদের বিয়ে ঠিক করি তখন ভেবেছিলাম মেহরাব হয়তো তোমাকে খুব একটা আপন করে নেবে না, কিন্তু বিয়ের পরদিন থেকে তোমার প্রতি তার ভালোবাসা দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মনোবল হারিও না আমিরা, পুরুষ মানুষকে আঁচলে বেঁধে রাখতে হয়। "
" বুঝতে পেরেছি আম্মা। "
আমিরা কথা বলা শেষে মেহরাবের কাছে ফোন ফিরিয়ে দিলো। রজনীর গভীরতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। নীলিমার বুকে রুপালি থালার মতো চাঁদখানি আপন মহিমায় বিরাজমান, তার স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না জানালার কাচ ভেদ করে ঘরের মেঝেতে বিছিয়ে দিয়েছে শুভ্র আলোর চাদর। দূর আকাশের নক্ষত্ররাজি চাঁদের সঙ্গী হয়ে মিটিমিটি জ্বলছে, আর মৃদুমন্দ বাতাসে পর্দার প্রান্তটুকু দুলে উঠছে বারবার।
বিছানার এক পাশে হাঁটু জড়িয়ে মাথা ঠেকিয়ে বসে আছে আমিরা। দীর্ঘ কেশরাশি ছড়িয়ে রয়েছে পিঠ বেয়ে। দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই মেহরাবের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো বিছানার এক পাশে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা আমিরার ওপর। সে আমিরার কাছে এসে বসলো অত:পর মৃদু স্বরে বললো,
" এখনো অভিমান করে আছো বিবি?"
মেহরাবের প্রশ্নের উত্তরে আমিরা চুপ করে রইল। মুখ তুলে তাকানোর প্রয়োজনটুকুও বোধ করল না সে। হাঁটুর ওপর মাথা ঠেকিয়ে বসে রইল আগের মতোই। মেহরাব কিছুসময় চুপ করে তাকিয়ে রইলো এরপর বললো,
" তুমি হলে চঞ্চল পাখি, এই চুপচাপ স্বভাব তোমাকে মানায় না বিবি। "
মেহরাবের কথায় আমিরা হাটু থেকে মাথা তুলে অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালো। অত:পর বললো,
" তাহলে আমার বেলায় আপনি এতো উদাসীন কেন? কেন বারবার দূরে ঠেলে দিচ্ছেন? আমি অপরিপক্ক বলে?"
" তোমায় দূরে ঠেলে দেওয়ার সাধ্য আছে আমার? রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পড়ো।"
মেহরাবের প্রত্যাখ্যানে আমিরা ডুকরে কেঁদে উঠে অস্ফুট স্বরে বললো,
" আমি লাজ-লজ্জা ভুলে নিজেকে আপনার কাছে সপে দিচ্ছি আর আপনি কিনা আমায় প্রত্যাখ্যান করছেন। তবে ধরে নিবো স্বামীর মন জয় করতে আমি ব্যর্থ? "
মেহরাব আমিরার অশ্রুবিন্দু আলতো হাতে মুছে দিয়ে বললো,
" তোমার বয়স কম বিবি, না বুঝে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছো। "
" আপনার মতো বুঝদার নই আমি। তবে শুধু এইটুকু বুঝি, শেষ নিঃশ্বাস অব্দি আপনাকে চাই আমার। "
" খাল কেটে কুমির আমন্ত্রণ করছো?"
" ধরে নিন তাই। "
আমিরার পৃষ্ঠদেশে মেহরাবের আঙুলের মৃদু স্পর্শ পড়তেই তার শরীরজুড়ে শিহরণ বয়ে গেল। লোমকূপগুলো কেঁপে উঠল অনভ্যস্ত শিহরণে, লজ্জায় অবনত হলো পাপড়িঘেরা আঁখিযুগল। গালজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল রক্তিম আভা। সংকোচে স্বামীর বক্ষস্থলে মুখ লুকিয়ে নিল আমিরা। সে রাতে মিলিত হলো দুটি অন্তরাত্মা। নিশীথের নিবিড় আঁধার ভেদ করে পূব আকাশের দিগন্তে উঁকি দিল নবপ্রভাতের প্রথম আভা। রাতের কালিমা সরিয়ে নীলিমার বুকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল ঊষার সোনালি আভাস। ফজরের নামাজ আদায় করে মেহরাব শাহ তুরাব বারান্দার এক কোণে রাখা কাঠের চেয়ারে বসে প্রতিদিনের ন্যায় বই পড়তে শুরু করলো। বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে আমিরার দিকে তাকাচ্ছে সে। সবেমাত্র ঘুম ভেঙেছে আমিরার। নিদ্রার রেশ তখনো কাটেনি তার, ঘুমজড়ানো পাপড়ি বারবার নুয়ে আসছে। এলোমেলো চুলগুলো কপালের ওপর ছড়িয়ে আছে। ব্যথায় শরীর টনটন করছে তার। রাতের কথা মনে পড়তেই গাল দুটো রাঙা হয়ে উঠল রক্তিম আভায়। মেহরাবের ইচ্ছে করলো একবার গিয়ে জিগ্যেস করতে এখন কেমন লাগছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংকোচের কারণে আর জিজ্ঞেস করা হয়ে উঠলো না। অগত্যা বইয়ের পাতায় চোখ ফিরিয়ে নিল সে। আমিরা বিছানা থেকে নেমে মেহরাবের কাছে আসতেই মেহরাব তাকে উপেক্ষা করে বসার ঘরে চলে গেলো। আমিরা বুঝে উঠতে পারলো মেহরাবের এমন আচরণের কারণ। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারি থেকে হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি বের করে গোসলখানার দিকে পা বাড়াল। সেই সকাল থেকে মেহরাবের পিছু পিছু ঘুরছে আমিরা, কথা বলার চেষ্টা করছে বারবার কিন্তু মেহরাব রীতিমতো তাকে উপেক্ষা করেই চলেছে। তার চোখে চোখে তাকানোরও প্রয়োজনবোধ করছে না। আমিরা বুঝতে পারছে না হঠাৎ কি হয়েছে মেহরাবের। মেহরাবের ধৈর্যের বাঁধ ক্রমশ আলগা হয়ে আসছে, তার ইচ্ছে করলো এখনি বেরিয়ে যেতে কিন্তু এখনো ঢের সময় বাকি। আজ যেন সময় এগোচ্ছেই না। সে বিছানায় বসে কাগজপত্র দেখছিলো ঠিক সেই মুহূর্তেই আমিরা তার সামনে এসে কোমরে দুহাত রেখে দাঁড়াল, অত:পর গম্ভীর কন্ঠে বললো,
"ঘটনা কি বলুন তো? আপনি লজ্জা পাচ্ছেন? এই মাস্টারমশাই তাকাচ্ছেন না কেন? কথা না বললে কিন্তু এক্ষুণি বাপের বাড়ি চলে যাবো।"
মেহরাব তার দিকে না তাকিয়েই কাগজপত্রগুলো গোছানোর ভান করে আমতাআমতা করে বলল,
" লজ্জা কেন পাবো আমি? তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে বিবি।"