#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৩
সাহানা বিরক্ত হলেন। তিনি ঐশীকে ডেকেছিলেন আরো ঘন্টাখানেক আগে। তখন এই মেয়ের খবর ছিল না। এসেছে এখন! এসেছিস ভালো কথা। সোজা ভেতরে চলে আয়। তা না দরজায় দাঁড়িয়ে মিউ মিউ করছে। আসবো দাদু? আসবো?
আরে ফাজিল ছেমড়ী! দাদির ঘরে আসবি আবার অনুমতি কি? তোর দাদা আছে যে গলা ধরে বসে থাকবো। কতবার বলেছি দাদির ঘরে আসবি যাবি নাচতে নাচতে। অনুমতির দরকার নেই? এই মেয়ের সেই কথা মনে আছে বলে মনেও হয় না। আর এসেছে তো এসেছে একেবারে ফেসপ্যাক লাগানোর সময় । কিছুক্ষণ আগে আয় নয়তো পরে। তা না!
এরা সবাই ভালো করেই জানে ফেসপ্যাক লাগালে সে কথা বলা পছন্দ করে না। তাবুও এসে মিউ মিউ করছে। তার মিউ মিউ শুনে বিরক্ত হয়ে ভেতরে আসার জন্য হাত দিয়ে দু-বার ইশারাও করেছে । এই মেয়ের দেখার বা বুঝার খবরও নেই। চোখ, ব্রেইন সব খুলে রুমে রেখে এসেছে নাকি এই মেয়ে ? আর কুসুম ফাজিলটা ফেসপ্যাক লাগিয়ে উধাও, কোথায় গিয়ে মরেছে কে জানে?
সে বিরক্তমুখে চোখ থেকে শসার টুকরো সরিয়ে ঐশীর দিকে তাকালো! তাকাতেই ঐশী হেসে ফেললো। হেসে ভেতরে এলো।
সাহানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার শসার টুকরো চোখে রেখে শুয়ে পড়লো। এই গাধীর ভবিষ্যৎ যে কি একমাত্র আল্লাহই জানে।
-- ডেকেছো দাদু?
-- হুম!
ঐশী দাদির পাশে বসলো! তার খুব হাসি পাচ্ছে! দাদুকে এখন লাগছে ভূতনীর মতো। ঢিলেঢালা চামড়ার সাদা সাদা হাত পা, তাঁর মধ্যে মুখে কালো কালো ফেসপ্যাক। হঠাৎ করে কেউ রুমে আসলে চিৎকার দিয়ে দাঁত দুপাটি লেগে যাবে। তাই সে কখনো রিস্ক নেয় না। কারণ দাদু চব্বিশ ঘন্টার এক তৃতীয়ংশ সময়ই রুপচর্চায়'ই ব্যয় করে।
এসব ক্ষেত্রে তাঁর আবার খুব শখ। বয়সের ধার সে ধারে না। আর তাঁকে সাহায্য করেন কুসুম আপা। সে আবার রুপচর্চায় খুবই এক্সপার্ট। কি খেলে কি হবে, কি বাটা দিলে আরো সুন্দর হওয়া যাবে। সিরিয়াল বাই সিরিয়াল তাঁর সব মুখস্ত।
--- হাসছিস কেন?
--- তোমাকে ভূতনীর মতো লাগছে, তাই হাসছি।
সাহানা বেগম উঠে বসলেন! চোখ থেকে শসা সরিয়ে বললেন,--- ভূতনী মতো লাগলেতো চিৎকার দেওয়ার কথা। হাসছিস কেন?
--- তুমি আমাদের পেয়ারের ভূতনী তাই হাসছি?
--- ভালো!
---- ডেকেছিলে কেন?
--- তোর রুমে কি হয়েছে? মাঝ রাতে ভূতুম ভূতুম শব্দ বের হচ্ছে। কুসুম রাতে ভয়ে ঠাঁটা মেরে গেছে। নিচে আর শুবে না। পরে বাতি জ্বলিয়ে ঘুমালো। বাতি জ্বালিয়ে ঘুম হয় বল। সারা রাত আমি জেগে। এই দেখ ডার্ক সার্কেল পড়ে গেছে।
ঐশী হেসে উঠল! হেসে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে বলল, --- এখনি আসছি দাদু।
সাহানা বেগম হতম্বভ হয়ে গেলেন। এরকম ঝড় তুফান মাথায় নিয়ে দৌড়ে যাওয়ার মানে কি? তার হতম্বভ কাটতে না কাটতেই ঐশী আবার ফিরে এলো। তাঁর হাতে পাখির খাঁচা। সে অবাক হয়ে বলল,--- এটা কি?
ঐশী দাদুর সামনে নিচে খাঁচাটা রাখল! রেখে তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল,--- বলতো কি?
সাহানা বেগম ভালো করে তাকালেন। তাকিয়ে বললেন--- " আরে এটা তো পেঁচা! ভুতুম পেঁতা! তুই কোথায় পেলি?
--- উঁহু! হুতুম পেঁচা! ভালো নাম খয়রা মেছো পেঁচা।
--- যেটাই হোক! তুই কোথায় থেকে আমদানি করলি।
--- মামা দিয়েছে।
--- এই বানরের বাঁদরামী শেষ হবে কবে? চুল টুল পেকে উঠে শেষ। বিয়ে সাদির খবর নেই। তোর মাও দিন রাত কোর্ট নিয়ে নাচানাচি। ভাই এদিকে ডেট অভার সেই খবর আছে?
---- আছে! আমার মা সুপারহিরো! তাঁর সব দিকেই নজর।
--- ছাই নজর! তাঁর ভাই বনে বাদরে ঘুরে বাড়িতে এই ছাই বাই নিয়ে এসেছে। রাত ভরে ভুতুম ভুতুম! তোর মা একবারো শুনেছে?
--- শুনেছে! আর তাছাড়া এটা মামা গিফ্ট করলেও এনেছে এক বেয়াদব ছেলে।
--- আবার এক নতুন বেয়াদব! কে এই বেয়াদব। পুরানগুলোর জ্বালাইতো বাঁচিনা ।
--- আমরা কেউ বেয়াদব না দাদু! এই ছেলে বেয়াদব। শুধু বেয়াদব না! ভয়ংকর রকমের বেয়াদব। সে কি করেছে জানো? ইচ্ছে করে আমার ফুলের গাছ দফারফা করেছে। কোন ভালো মনের মানুষ এটা করতে পারবে বলো? এত সুন্দর ফুলের গাছ। টোকা দিতেই তো কষ্ট লাগে।
---- আমার বাড়িতে এসে গুন্ডামি! এত বড় সাহস! আমি কোথায় ছিলাম। ডাকিসনি কেন? দাঁত ভেঙে লুডুর গুটি না বানিয়েছি তো আমি সাহানা না।
---- ডাকতাম দাদু, শুধু মামার জন্য কিছু বললাম না। আমাদের গ্রামের বাড়ির সাইডের নাকি কে? নাম যেন কি বলল,-- সা, সা, সাফিন না না সফিক ...
--- সাঈদ!
--- হ্যাঁ! হ্যাঁ! তুমি চেন?
---- ওমা সাঈদ এসেছিল! কখন?
ঐশী আবাক হয়ে বলল,--- এত ব্যস্ত হচ্ছো কেন? কোন দেশের মহারাজা সে?
সাহানা স্মিথ হাসলেন! হেসে বললেন, --- তুই তো কখনো আমাদের গ্রামে যাসনি। অবশ্য যাওয়ার মতো এখন কিছু নেই ও । আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন সাঈদের দাদা, দাদিরা। তখন আমি নতুন বউ। সাঈদের দাদিও। দুজনের মধ্যে গলায় গলায় ভাব। একজনকে ছাড়া আরেকজন কিছুই খেতাম না। যা রান্না করতাম বাটি ভরে দিয়ে আসতাম। আবার সে যা করত আমাকে দিয়ে যেত। তখনের ব্যাপারই আলাদা ছিল। এখনকার মতো না। প্রতিবেশী প্রতিবেশীরা আত্মীয়ের মতোই থাকতো। তারপরে তোর দাদা শহরে এসে পড়লো। আমিও এসে পড়লাম। তবে আমাদের যোগাযোগ ছিল। এখনকার মতো তো এত হাতে হাতে মোবাইল ছিল না। চিঠিতে চিঠিতে যোগাযোগ রাখতাম। সাঈদের বাবার বিয়েতেও তো গিয়েছিলাম। কি যে বিয়ের আনন্দ। শহরের বিয়ে বিয়ে হলো? গ্রামের বিয়ের উপরে বিয়েই নেই। আহারে সেই দিনগুলো। স্বপ্নের মতো শেষ হয়ে গেল।
সাহানা থামলেন! দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন,--
তারা আমাদের মতো এত অবস্থাসম্পূর্ণ ছিল না। তবে মনের ক্ষেত্রে তাঁরা ছিল অনেক অনেক উপরে! তাইতো সাঈদও এমন হয়েছে। একেবারে সোনার টুকরা। কি যে কষ্টের মধ্যে দিয়ে গেছে ছেলেটা । তবুও মাথা নিচু করেনি। আমাদের গ্রামের বাড়িটাসহ অনেক জমি জমাইতো সাঈদই কিনেছে। আহারে আমার সোনা বাচ্চাটা!
ঐশী ভ্রু কুঁচকালো! ভ্রু কুচকে বলল,--- এই তোমার সোনার বাচ্চার নমুনা? দেখলামতো! ঘ্যাড়ত্যাড়ার ঘ্যাড়ত্যাড়া।
ঐশীর দাদি ভেঙচি কেটে আবার শুয়ে পড়লো। চোখে শসা রাখতে রাখতে বললেন, --- আদার যেমন ঝাঝ না থাকলে চাহিদা নেই। তেমনি ব্যাটাছেলের রগ ত্যারা আর তেজ না থাকলেও দাম নেই। ব্যাটা ছেলে হবে সিংহের মতো। যেখানে দাঁড়াবে সেখানের সেই রাজা। তাঁর গর্জনে পুরো দুনিয়া কাঁপবে।
ঐশীও ভেঙচি কাটলো! কেটে নিজে নিজেই বিরবির করল, --- হুহ্! এসেছে আমার সোনার টুকরা।
-----
সাঈদ উপুর হয়ে চাপ কলে চাপ দিতেই কাদের দৌড়ে এলো। কাদের তাদের বাসায়ই কাজ করে। তাদের বাড়ি বিশাল উঠানের উত্তর সাইডে টিনের ঘর তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁর বউ বাচ্চা নিয়ে থাকে। তাঁর বউ বাড়ির ভিতরে কাজ করে । খাবার দাবার তাদের সাথেই।
--- সরেন সরেন ভাইজান! আমি দিতাছি।
সাঈদ হাসলো! হেসে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিতে দিতে বলল, --- ঠিক আছি আমি! আজকের বাজারটা করেছিল?
--- হ ভাইজান! আম্মা যা যা কইছে সবই আনছি।
--- দুপুরে খেয়েছিস?
--- হ! ভাইজান।
--- তাহলে কষ্ট করে একটু পরে আবার বাজারে যাবি। লোকমানকে নিয়ে আসবি। আমাদের মাড়াইয়ের মেশিনে সমস্যা হয়েছে। ঠিক করতে হবে।
--- আইচ্ছা ভাইজান! আপনে টেনশন নিয়েন না।আমি ওরে একেবারে ধইরা বাইনন্ধা নিয়া আসুম।
সাঈদ হাসলো! হেসে এগুতে লাগলো। এই টিউবওয়েলটা বাড়ির বাইরে রাস্তার পাশে। আর্সেনিকমুক্ত কল। এলাকার মানুষদের জন্য। সে চুল, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ঝাড়তে ঝাড়তে বাড়ির উঠানে প্রবেশ করল। ঘামে তাঁর পুরো শরীর ভেজা। সাদা শার্ট গায়ে লেপটে আছে। লম্বা চওড়া শ্যামলা বরণ শক্ত সামার্থ শরীর পুরোটাই বিদ্যমান।
যুথি আড়চোখে সাঈদের দিকে তাকালো! তাকাতেই তাঁর বুকের মাঝে ঝড় শুরু হয়ে গেল। এটা অবশ্য নতুন না। তাঁকে দেখলেই এমন হয়। এই যে এখনো হচ্ছে। কাঁপা কাঁপা হাতে বটিতে কাঁচা আম ছোঁয়াতেই ফসকে হাতে লেগে গেল।
--- আল্লাহ! যুথি তোর হাত কেটে গেছে। দেখি দেখি বলেই সাবিহা যুথির কাটা আঙুল চেপে ধরলো।
সাঈদ ভ্রু কুঁচকালো! তবে এগিয়ে গেল না। যুথি তাঁর ছোট বোনের বান্ধবী! দিনরাত এই দু-জন গলায় গলায় থাকে। বাড়ি তাঁদের দু বাড়ি পরে। সে ছোট বোনের মতোই দেখে। তবে এই মেয়ে তাঁকে বড় ভাইয়ের নজরে দেখে কিনা সন্দেহ আছে। তাই সে সাইড কেটে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল।
সে তাঁর রুমে বসতেই আসমা এগিয়ে এলো। হাতে তাঁর শরবতের গ্লাস। সাঈদ হেসে গ্লাস নিতে নিতে বলল,--- তুমি নিয়ে এসেছো কেন মা? তোমার পায়ে না বাতের ব্যথা।
আসমা হেসে ছেলের পাশে বসে ছেলের মুখ আঁচল দিয়ে মুছে দিতে দিতে বলল,--- এজন্যই তো কই তাড়াতাড়ি বিয়া কর। দায়িত্ব দিয়া একটু আরামে বসি।
-- কেন, কাজের জন্য মানুষের অভাব?
-- কাজের মানুষ কাজ করবো। কিন্তু দায়িত্ব অন্য জিনিস। সেটা বিশেষ মানুষরেই দেওয়া যায়। আর এখানেতো আমার সোনার টুকরা ছেলের দায়িত্ব। সেটা বুঝি কাজের মাইনষেন হাতে দিয়ে আমি বইয়া থাকুম।
সাঈদ কিছু বলল না! সে উঠে দাঁড়ালো। গোসল করতে হবে। প্রচুর গরম পড়েছে। এই গরমকে বলে ধানা পাকার গরম। আগে অবশ্য একটু কম লাগতো। টিনের ঘর ছিল। এখনও আছে তবে শুধু উপরের চালা । শীতের সময় মায়ের খুব কষ্ট হয়। তাই দেয়াল টেয়াল, বারান্দা, বাথরুম সব পাকা করে ফেলেছে।
আসমা হাসলো! হেসে ছেলের দিকে তাকালো।
বিয়ের কথা উঠলেই ছেলে চুপ। কত ভালো ভালো সম্বন্ধ আসে। ছেলে হু,হা কিছুই করে না। একবার তো জোর করে মেয়ে দেখাতেও নিয়ে গিয়েছিল । চোখ তুলে তাকায়ওনি। বাসায় এসে শুধু শান্ত ভাবে বলেছে, --- আমি আমার জীবনে কিছুই পাইনি মা। যা পেয়েছি নিজে কষ্ট করে অর্জন করেছি । কষ্টের এই অর্জন করতে করতে আমি ক্লান্ত। তাই এটা আমি অর্জন করতে চাই না। এটা ছেড়েছি উপরওয়ালার উপর! আমি চাই এটা সে ই আমাকে দিক। নিজের মতো করে দিক। যাকে নিয়ে আমি সুখে থাকবো তাকেই দিক।
চলবে.....