ফন্ট সাইজ:
থিম:
সোনালী রঙের বুনোলতা

পর্ব 4

লেখক: নূপুর ইসলাম

#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৪

ঐশী আকাশের দিকে তাকালো! সাদা শুভ্র আকাশ। মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। সূর্যের তাপে ঘেমে নেয়ে একাকার সে । এলোমেলো চুল! গরমে ফর্সা চোখ মুখ লাল হয়ে আছে।
সে ওড়না টেনে মাথায় ঘোমটা দিলো। আজ গাড়ি আসবেনা! নিজেই নিষেধ করেছে । এটা অবশ্য নতুন না। সে প্রায়ই রিকশা করে বাসায় ফিরে। আজ অবশ্য রিকশার জন্য না। ইমরানের জন্য নিষেধ করেছে। আজ ইমরানের জন্মদিন। ইমরানের হয়তো মনেও নেই। এই ছেলের কিছুই মনে থাকে না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টিউশনের জন্য এ বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি দৌড়াতে থাকে। টিউশন ছাড়া তার মাথায় আর কিছুই ঘুরে না। ইমরান মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির ছেলে। তার লেখাপড়া শেষ।চাকরি খুঁজছে। তবে কোন লাভ হচ্ছে না।

আজকাল চাকরির বাজার খুবই দুর্লভ। সে নিজে একটু চেষ্টা করলেই চাকরি হয়ে যাবে। তবে সে নিজে থেকে কিছুই বলে নি। ইমরানও অবশ্য এখন পর্যন্ত কিছু বলেনি। তবে সে জানে! বলবে! কিছুদিনের মধ্যেই বলবে। যখন বলবে ঐশী তাকে একটা গল্প শোনাবে। উপরওয়ালার লেখা গল্প। এই গল্প শুনে তার রিয়েকশন কি হয়, ঐশী দেখতে চায়। যদি ভালো হয়। তবে আমাদের দু-জনের জন্যই ভালো। আর যদি খারাপ হয়, ইমরানের টা জানে না, তবে তার জন্য খুবই খারাপ হবে। খুব'ই খারাপ!

সে ইমরানকে ভালোবাসে! ভালোবাসায় ধোকা খাওয়া খুবই বাজে ব্যাপার। তার এক ফ্রেন্ডস এর কিছুদিন আগে ব্রেকআপ হলো। কি যে অবস্থা! মরতে পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। সে অবশ্য তা করবে না। সে মরে গেলে মা, দাদু বিশেষ করে মামা খুবই কষ্ট পাবে। তাদের কষ্টের কারণ সে হতে পারবে না। কখনো না। আর এটাই হবে তার জন্য খুব খারাপ। ভাঙা মন নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে কষ্ট আর কি?

সে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল। ইমরানের আসার কথা। সে বার বার বলেছে দেড় টার মধ্যে এখানে থাকবে । খবর নেই! তাই ঐশী আস্তে আস্তে এগুতে লাগলো। সে জানে এই পথেই ইমরান হেঁটে হেঁটে আসবে। ইমরান এমনই! দশটা টাকাও সে ভাঙবে খুব হিসেব করে। এমন না তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। তার আয়ের আশায় সবাই বসে আছে। প্রতি মাসে টাকা পাঠাতে হবে। তবুও সে এমন! বিলাসীতা তার মধ্যে নেই। ইমরানের সাথে প্রথম পরিচয় তার এক ফ্রেন্ডের বাসায়। সেই ফ্রেন্ড ইমরানের কাছেই পড়তো। দিন রাত ইমরানের গুণগান করতো। স্যার এমন, স্যার ওমন, তার মতো এতো লয়াল স্যার নাকি আর দুনিয়ায় নেই। সে নিজেও খুব পছন্দ করতো, তবে স্যার পাত্তা দিচ্ছে না বলে সে ডাল গলাতে পারছে না ।

আগ্রহের বয়স! মোহের মতো আগ্রহ জন্মালো। সেই ফ্রেন্ডস এর কাছ থেকেই নাম্বার নিলো। ভয়ে ভয়ে একদিন কলও দিয়ে ফেললো। সেই এক কল! আস্তে আস্তে কিভাবে কি হয়ে গেল ঐশী নিজেও জানে না। এই কাঠখোরা ছেলেটাকে সে ভালোবেসে ফেললো। সে তো ভালোবেসে ফেললো তবে ইমরানেরটা বোঝে না। মুখে তো বলে তবে সেই বলার অনুভূতি চোখে খুঁজে পায় না কেন?

ঐশী থামলো! ভার্সিটির রাস্তা শেষ। সে পেছনে ফিরে তাকালো। ভার্সিটির গেইট দেখা যাচ্ছে না। সে হাসলো! এই ভার্সিটি তার খুবই কষ্টের ভার্সিটি। কেননা ভার্সিটি পর্যন্ত আসতে তাকে খুবই কষ্ট করতে হয়েছে। না অন্য কোন কষ্ট না। লেখা পড়ার কষ্ট। লেখা পড়া তার জন্য শাস্তি সরুপ। ছোট বেলা থেকেই লেখাপড়ায় মন নেই। টেনে টুনে এই পর্যন্ত এসেছে। এসএসসি তে তো কানের পাশে বুলেট যাওয়ার মতো অবস্থা। পয়েন্ট দেখে মামা হাঁফ ছেড়ে বলেছে, --- তোর মায়ের ইজ্জত বেঁচে গেছে রে ঐশী। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে।

--- একা একা হাসছো কেন?

ঐশী চমকালো! ইমরান দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে বিরক্তি।
---- তুমি নেই! তাই একা একা হাসছি।

ইমরান কিছু বলল না। অন্য দিকে তাকিয়ে রিকশা ডাকলো! কাছে আসতেই উঠে বসলো। সেও নেয়ে ঘেমে একাকার।

ঐশীও উঠে বসলো! তবে তার একটু মন খারাপ হলো। ইমরান কি পারতো না একবার তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকাতে। তার ফ্রেন্ডস রা বলে রোদে তার গাল লাল হলে, গোলাপের পাপড়ির মতো লাগে। কই ইমরানতো কখনো নিজে থেকে বলে না। এখন যদি সে জিজ্ঞেস করে তবে একগাদা প্রশংসার ফুলঝুড়ি ঝড়াতে থাকবে। এত অনিহা কেন?

প্রথম দিকে অবশ্য এমন ছিল না। তখন দেখা না হলেও প্রচুর কথা হতো। কত হাবিজাবি কথা। আর এখন শুধু যেন ধরে রাখা। কোন অনূভূতি নেই। ঐশী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,--- বাসার দিকে যাবো না। কোথাও ঘুরতে নিয়ে চলো।

--- আজকে সময় হবে না। অন্য কোন দিন।

--- আমি বলে রেখেছিলাম!

--- সবার জীবনতো তোমার মতো না। চাওয়া মাত্রই সব নিজের মতো হয়ে যাবে।

ঐশী আর কিছু বলল না । মুখে মুখে তর্ক তার দ্বারা সম্বব না। সে অবশ্য জানে ইমরান কেন এমন করছে। আমি কেন তার এত কষ্ট দেখেও চুপ। সে চাচ্ছে আমি নিজে থেকেই যেন চাকরির ব্যাপারে কিছু বলি।
ঐশী গাল ফুলালো! ইমরানের দিকে তাকিয়ে রইল ! বার বার ঘড়ি দেখছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্য দিকে তাকালো।

রিকশা থামলো তাদের বাড়ির বিশাল গেইটের সামনে। সবসময় ই থামে। তাদের সম্পর্কের কথা মামা জানে। তার কাছে ঐশী কখনো কিছু লুকায় না। মামা শুনে বলেছে, --- মোহের বয়সে মোহে পড়বেই। একবার হলেও পড়বে। তবে মনে রেখ যেই বিশ্বাস আমরা তোমার উপরে করি। মোহেন নেশায় সেটা ভেঙে ফেলো না। সময় হোক ব্যক্তি যদি তোমার যোগ্য হয় আমি নিজে তোমাদের হাত এক করবো। সেই সময় পর্যন্ত নিজের খেয়াল রেখো।

--- ঐশীর খেয়াল রাখতে হয় নি। ইমরান সত্যিই খুব লয়াল। সে নিজে থেকেই একটা দূরত্ব মেনে চলে।

ঐশী রিকশা থেকে নেমে ব্যাগ থেকে একটা গিফ্ট বক্স বের করল। এগিয়ে দিয়ে বলল,--- হ্যাপি বার্থডে! তোমার জীবনের সকল চাওয়া পূর্ণ হোক।

ইমরান হাসলো! প্রাণ খোলা হাসি! এই হাসির মধ্যে কোন কৃত্রিমতা নেই।

-------

সাঈদ চোখ তুলে তাকালো! তার চোখে মুখে রাগ, বিরক্তি, ঘৃণা, ভয় কোনটারই কোন চিহ্ন ইদরিস দেখতে পেল না। শান্ত ভাবে বসে আছে। সে অত্র এলাকার চেয়ারম্যান। পর পর তিন বার চেয়ারম্যান হয়ে আছে। না মানুষের ভালোবাসায় না। ক্ষমতায়! চেয়ারম্যান ছাড়াও তার আরেকটা পরিচয় আছে। সেই পরিচর খুবই ভয়ংকর। তাই তার সামনে দাঁড়াতেও সবাই ভয় পায়। তবে এই ছেলে নির্বিকার।

সে এই ছেলেটাকে ঠিক বুঝতে পারে না। একেবারে শান্ত, শিষ্ট। আগে পিছে কোন খারাপ রেকর্ড নেই। যা বলবে মন দিয়ে শুনবে। কোন রকম উত্তেজনা বা বেয়াদবি করবে না। এক প্রকার সম্মানের সাথেই কথা বলবে। তবে কাজ করে উল্টো। যা মন চায় তাই। প্রথম প্রথম ভাবতো নতুন নতুন টাকা হয়েছে। ক্ষমতা চায়! মানুষের মন পাওয়ার জন্য সাহায্যের ভান করছে। তবে গতকয়েক বছরে এমন কোন লক্ষণ দেখা যায়নি। নিজের মতো কাজ করে। টাকা পয়সারও মনে হয় অভাব নেই। একটার পর একটা জমি কিনছে তো কিনছেই। কিনুক! এতে তার সমস্যা নেই। তার নিজেও কম না। সমস্যা হলো সে গতকয়েক বছরে বিনাশর্তে মানুষদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্যে করছে। কোন লোভ নেই, কোন বিনিময় নেই। শুধু নিজের গ্রাম না যখন যেখানে দেখছে সেখানেই।

মানুষ আগে তাকে ভয় পেত। তার কাছে সাহায্যের ভিক্ষা চাইতো। এখন এরকম হচ্ছে না। সে বুঝতে পারছে গ্রামের মানুষ একজোট হচ্ছে। তাকে চাচ্ছে না। তার গদি নড়বড়ে। সময় মতো ব্যবস্থা না করলে এবার আর চেয়ারম্যান হওয়া যাবে না। তাই সে ভেবেছিল! না থাকবে বাঁশ, না বাজবে বাঁশি। সেই ভাবেই ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু যেই দু-জন কে দায়িত্ব দিয়েছিল সেই দুইজনই গায়েব। গতকাল রাত থেকে গায়েব।

-- সাঈদ!
-- জ্বি চাচা।
-- আমার লোক কোথায়?
সাঈদ স্মিথ হাসলো! হেসে বলল,--- আপনার লোকের কথা আমার জানার কথা?
-- না! কথা না! তবে তুমি জানো। ভালো করেই জানো।
-- না! আমি জানি না।

ইদরিস চুপ হয়ে গেল। সাঈদ এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে এখন চোখে মুখে তার কৌতুক! যেন খুব মজা পাচ্ছে।

সাঈদকে সে নিজে ডেকেছে। সে ভেবে ছিল সাঙ পাঙ নিয়ে আসবে। এই ছেলের আবার একদল বন্ধুবান্ধব আছে। তারা এই ছেলের এক কথায় জীবন দিয়ে দিবে। তবে তাকে ভুল প্রমাণ করে সে এসেছে একা। সাধারণ ভাবে। যেন প্রায় এখানে আসা যাওয়া করে। একেই বলে কলিজা। যে তোমাকে মারার প্ল্যান করছে। সেটা জেনেও তার গুহায় বুক ফুলিয়ে আসা।

সে বড় একটা শ্বাস ফেললো! -- কি চাও তুমি?

--- আমি কিছুই চাই না চাচা! নিজের মতো থাকি। নিজের মতো কাজ করি। আপনার ক্ষমতা আমি কখনো চাই নি। তবে আপনি আমাকে কিছুদিন পর পর খুব বিরক্ত করেন।

-- সেটার দোষ কি তোমার না?
-- না।
-- দুনিয়াতে সব কিছুরই নির্দিষ্ট একটা মূল্য আছে। ফ্রি ফ্রি করে লাভ কি?

-- না! ভালোবাসার কোন মূল্য নেই। ভালোবাসার কাছে কোন লাভ ক্ষতিও নেই। আমি যা করি ভালোবেসেই করি।

-- আমি চাচ্ছি না এটা তুমি আর করো। টাকা পয়সা হয়েছে। বিয়েসাদি, আরাম আয়েশ করো। বউ, মা নিয়ে দেশ বিদেশ ঘুরো।

সাঈদ হালকা হাসলো! তবে কিছু বলল না।

-- না হলে আমার দলে চলে এসো। যা করবে আমার ছায়ার তলে করবে। তাতে তুমিও ঠিক আর আমিও।
-- সেটা সম্ভব না!
-- কেন?
-- এমনিই!
ইদরিসের রাগ হলো! ছেলাটা তার সাথে হেঁয়ালি করছে। সে তার গদিতে হেলান দিয়ে শক্ত ভাবে বলল,--- ছোট থেকেই তুমি এই গ্রামের। আমি তোমাকে যেমন চিনি, আমার সম্পর্কে সব তোমার জানার কথা। তাই আমাকে সেই রুপ দেখাতে বাধ্য করো না।

সাঈদ উঠে দাঁড়ালো! দাঁড়িয়ে শান্ত ভাবে বলল,--- ছোট থেকে দেখলেই কাউকে চেনা যায় না চাচা। সব মানুষর'ই ভিন্ন ভিন্ন রুপ থাকে । মহাপুরুষ আর কয়জন? তাই আমার যে নেই সেটাই ভাবছেন কিভাবে? যাইহোক! আমাকে বিরক্ত না করলেই আমি খুশি হবো। আসি।

সাঈদ বেরিয়ে গেল! ইদরিস সেই যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল । এই ছেলের সাথে তার অনেকটাই মিল। সেও এক সময় এমন ছিল। না ভয়, না ডর। শুধু একটুখানি তফাৎ। ভালো আর মন্দের ।

#চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন