#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৫
আনিস কিচেন রুমে উঁকি দিলো। ঐশী আনাড়ী হাতে শসা কাটছে। আজকাল প্রায় সময়ই তাকে কিচেন রুমে'ই দেখা যায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রান্না দেখে। আনিস একবার জিজ্ঞেস করল, --- ব্যাপার কি?
ঐশী মুখ ভোঁতা করে বলেছে, --- আমার তো কোন গুণ নেই মামা ! লেখাপড়াও ডাব্বা। তাই একদিকে একটু গুণবতী হওয়ার চেষ্টা করছি।
-- চেষ্টা করাটা কি খুব জুরুরী?
-- হ্যাঁ! খুব খুব জুরুরী! দাদু বলেছে, -- গুণ ছাড়া রুপবতী মেয়ে, লবণ ছাড়া তরকারির মতো।
-- তাই নাকি?
-- হ্যাঁ তাই! তোমার যদি বউ থাকতো তাহলে তুমিও জানতে।
-- বিরাট মিস হয়ে গেছে রে।
-- তা গেছে! তবে সময় শেষ হয়ে যায়নি।
এই কথা শুনেই আনিস আর কিছু বলে নি। বলতে গেলে পালিয়েছে। সে জানে! কথা বাড়ালেই বিপদ। এই মেয়ে খুবই সাদাসিধে। রাগ, জেদ নেই বললেই চলে। তবে কোন কোন বিষয় সে কামড় দিয়ে ধরে। সেই ধরা কচ্ছপের কামড়ের চেয়েও ভয়ংকর। তাই সে চায়না এই ব্যাপারে তাঁর মাথায় কিছু ঢুকুক।
-- কিছু বলবে মামা?
-- হ্যাঁ!
-- তাহলে ভেতরে এসো! এভাবে চোরের মতো উঁকিঝুঁকি মারছো কেন?
-- উঁকিঝুঁকি মারছি না মা! তবে ভয় পাচ্ছি।
ঐশী ছুরি রেখে মামার দিকে তাকালো! তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,--- কাকে?
-- তোকে?
ঐশী হেসে ফেললো! হেসে বলল,--- তুমিও না মামা! কি বলবে বলতো?
-- একজন কে লাঞ্চে বলেছি। আসলে! কুশল বিনিময়ের জন্য ফোন দিয়ে দেখি ঢাকায়। তাই খুব ইনসিস্ট করলাম। লাঞ্চটা অন্তত আমার সাথে করে যাও।
-- করলে করবে! এতে সমস্যা কি? আমি এখনি খালাকে সব কিছু রেডি করতে বলছি।
-- আসলে?
ঐশী মামার দিকে তাকালো। মামা করুণ চেহেরা করে দাঁড়িয়ে আছে। এটা অবশ্য ঢং। সে মামার সব চেহেরাই চিনে। এই বাসায় দু-দিন পর পর মামার দুনিয়ার গেষ্ট আসে। তাঁকে বলার কিছু নেই। তারমানে যে আসছে সে মামার জন্য খুবই স্পেশাল এবং আমার রাগ টাগ করার চান্স আছে। তাই আগে থেকে একটু ঝালাই করে নেওয়া। সে একটু ভাবলো! বেশি ভাবতে হলো না অবশ্য ! এত বছরে এই বাসায় এসে একজনই এমন করেছে । ঐশী হাসলো! হেসে বলল, --- তুমি নিশ্চিন্তে থাকো মামা! তোমার ঐ ঘ্যাড়ত্যাড়া বেয়াদবকে আমি আর কিছুই বলছি না। পরে দেখা যাবে যাওয়ার সময় আমার পুরো বাগানই বোমা মেয়ে উড়িয়ে দিয়ে গেছে।
আনিস হাসলো! হেসে বলল,--- এতটাও খারাপ না।
ঐশী আর কিছু বলল না। সেই লোক খারাপ না ভালো এতে তাঁর কিছু আসে যায় না। সে এগিয়ে এসে মামার মুখে শসা টুকরো ঢুকিয়ে দিলো। তাঁর পাগল মামা!
সাঈদ আসলো দুপুরের একটু পরে। সে একা আসেনি। সাথে নিয়ে এসেছে পিচ্ছি পিচ্ছি একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। তাঁদের গায়ে মলিন জামা। ঐশী তাকিয়ে রইল। ছেলে দুইটা কি করে বোঝা না গেলেও। তবে মেয়েরটা বোঝা গেল। তাঁর হাত ভর্তি ফুলের মালা। মেয়েটা কে দেখে ঐশীর এত মায়া লাগলো। ইচ্ছে করলো এগিয়ে যেতে। তবে সে এগিয়ে গেল না। দ্বিতীয় তলায় থেকেই তাদের দেখতে লাগলো। আর মামা চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে বললেন, --- আরে এরা কারা?
সাঈদ হালকা হেসে বলল,--- আমি আপনার গেষ্ট! এরা হচ্ছে আমার গেষ্ট।
আনিস হাসলো! হেসে পিচ্চি গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,--- এই যে মেহেমানের মেহমান! আমাদের বাসায় আপনাদের স্বাগতম।
পিচ্চি গুলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে জড়োসড়ো ভাবে হাসলো। তাঁরা হয়তো কখনো কল্পনাও করে নি। রাজপ্রসাদের মতো বাড়িতে তাঁরা কখনো প্রবেশ করতে পারবে।
টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে। তবে সাঈদ বসেনি।সার্ভ করার লোক আছে। তবুও সে নিজ হাতে বাচ্চাগুলোকে এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে। বাচ্চাগুলো যাতে ভালোভাবে খেতে পারে। তাই খাবার গুলো গুছিয়ে দিচ্ছে। ঐশী উপর থেকে তাকিয়ে রইল। তাঁর দেখতে ভালো লাগছে। তাই তাকিয়েই রইল!
এই প্রথম সে এই মানুষটাকে ভালোভাবে খেয়াল করলো। লম্বা, চওড়া, শ্যামলা বরণের মুখ। চুলগুলো সিল্কি সুন্দর। যতটুকু থাকলে দেখতে মার্জিত লাগে ঠিক ততটুকুই। সাধারণ শার্ট প্যান্ট পরা। এর বাইরেও কিছু একটা আছে যা অন্য সবার থেকে আলাদা। সেটা কি ঐশী ধরতে পারল না। সে কুসুম কে ডেকে দাদুকে আসতে বলল। সে এই ছেলের আসার কথা শুনে অস্থির হয়ে আছে। কিসের এত ব্যস্ততা এই সাধারণ ছেলেটাকে নিয়ে সে বুঝতে পারে না। সে নিচে নেমে এলো। সাঈদের পাশে গিয়ে শান্ত ভাবে বলল,---
-- আপনি বসুন! আমি সার্ভ করছি।
সাঈদ সাথে সাথে ঐশীর দিকে একপলক তাকালো। সাধারণ ভাবে তাকানো। মেয়েটা সম্ভবতো কিছুক্ষণ আগে গোসল করেছে। চুল ছাড়া, স্নিগ্ধ চেহেরা! সাথে মিষ্টি সুভাস। মেয়েটা হয়তো খেয়ালও করেনি। এই সাধারণ ভাবে তাকানোর এক সেকেন্ডের মধ্যেই সাঈদ থমকেছে। যেই ছেলের ভিতরে কোন ভয়ই কাঁপাতে পারে না। সেই ছেলেটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য হালকা কেঁপেও উঠেছে।
আনিস হাসলো! হেসে বলল,--- বসে যাও সাঈদ! যত্নের ক্ষেত্রে আমার মায়ের হাত খুবই দক্ষ। তোমার গেষ্টদের কোন সমস্যা হবে না।
সাঈদ চুপচাপ বসলো! ঐশী তাঁর পাশে দাঁড়িয়েই তাঁকে খাবার সার্ভ করল। বাচ্চাদের এটা সেটা এগিয়ে দিলো। এগিয়ে দিতে গিয়ে তাঁকে নড়তে হচ্ছে, কাত হতে হচ্ছে, নিচু হতে হচ্ছে। আর যতবারই নিচু হচ্ছে তাঁর চুল গড়িয়ে সাঈদের বাহুতে লাগছে। মেয়েটা কি জানে! ভাতে মাখা হাত ততবার'ই থেমে গেছে। তবে তাঁর চেহেরা নিশ্চুপ, নিশ্চল, শান্ত।
----
যুথি আড়চোখে গেইটের দিকে তাকালো। শূণ্য খাঁ খাঁ করছে। সে এসেছে ঘন্টার মতো হয়েছে। সাঈদ ভাইয়ের খবর নেই। সে আসলে এই সময়ের কাছাকাছিই আসে। কারণ, এই সময় সাঈদ ভাই বাসায় ফেরে। ঊনিশ,বিশ হয় তবে ফেরে। ফিরে গোসল করে, নামাজে যায়, এসে দুপুরের খাওয়া দাওয়া করে। সে সব কিছুই খেয়াল করে। ছোট বেলা থেকেই করে। তাঁর এই বাসায় আনাগোনা সেই পিচ্চি বয়স থেকে। আর সেই পিচ্চি বয়স থেকেই সে সাঈদ ভাইকে পছন্দ করে। সে কাউকে বুঝতেও দেয়নি। তবে তাঁর ধারনা সাঈদ ভাই বুঝে গেছে। কেননা আগে আসলে সাঈদ ভাই হেসে টুকটাক কথা বলতো, পড়ালেখার খবর জানতে চাইতো। কোন সমস্যা হলে তাঁকে যেন বলি সে কথাও বলতো। তবে এখন বলে না। এমনকি ফিরেও তাঁকায় না।
যুথি দীর্ঘশ্বাস ফেললো । সে আর সাবিহা বসে আছে পুকুর ঘাটের উপরে। বাড়ির মেইন প্রবেশ গেইটের পাশেই সাঈদ ভাই পুকুর খনন করেছে। মাঝারি সাইজের পুকুর। পুকুরের শুরুতেই পাকা করে বসার সুন্দর জায়গা। সেখান থেকেই নেমে গেছে ঢালু সিঁড়ি। পুকুরের চারদিকে ফুল, ফলের গাছ। দেখতে এত ভালো লাগে। সে প্রায় ই স্বপ্ন দেখে। চাঁদনী রাতে সাঈদ ভাইয়ের কাঁধে মাথা রেখে পুকুরের পানিতে পা ভিজিয়ে বসে আছে। আহারে! স্বপ্নই এত সুন্দর, বাস্তব না জানি কত মুধুর । হুহ্! তাঁর স্বপ্ন বাস্তব হবে কবে ?
-- কার স্বপ্নে বিভোর হয়ে এমন দেবদাস হয়ে বসে আছিস?
-- তোর ভাইয়ের!
সাবিহা খিল খিল করে হেসে উঠল । এই মেয়েটাও না। সব সময় ভাইকে নিয়ে ফাজলামি। তবে তাঁর মাঝে মাঝে সত্যি মনে হয়। সত্যিই হলেও অবশ্য সমস্যা নেই। সে যুথিকে খুবই পছন্দ করে করে। মাও করে। তবে ভাইকে নিয়ে সমস্যা আছে। বিয়েইতো করতেই চায় না।
একবার সাবিহা যুথিকে খুব করে চেপেও ধরেছিল। তবে স্বীকার করাতে পারে নি । স্বীকার করলে অবশ্য ভালোই হতো। তাঁকে ক্ষেপানো যেত। এই মেয়ে এমনিতেই তাঁকে উঠতে বসতে ক্ষেপিয়ে মারে । তাকেও যেত। আর কথায় কথায় শুনতে হতো না , সাবিহা ছ্যাঁকা খেয়ে গেছে বাঁকিয়া।"
সে অবশ্য কোন ছ্যাঁকা ট্যাকা খায়নি। তুহিন ভাইকে একটা চিঠি লিখেছিল। চিঠি মানে প্রেম পত্র। তুহিন ভাই এমন ধমক দিয়েছিল। যে সে সারা জীবনে ভুলতে পারবে না । তাই সে ঠিক করেছে বাকি জীবন আর কাউকে প্রেম পত্র টত্র দেবে না। ভাই যাকে ঠিক করবে চোখ বন্ধ করে তাঁকেই বিয়ে করে ফেলবে।
-- তোর ভাইয়ের খবর কি? তিনটের উপরে বাজে! খবর নেই।
সাবিহা হাসলো! হেসে ফাজলামি করে বলল, --- ভাই ঢাকা গেছে! টেনশন নিয়েন না ভাইয়ের দেবদাসী। সন্ধ্যের আগেই এসে যাবে।
যুথি ভেঙচি কাটলো! কেটে বলল,--- আমার বয়েই গেছে টেনশনের জন্য। আর আজকাল ঢাকা এমন কি ছাতার মাথা। দুই -তিন ঘন্টার রাস্তা।
--- হ্যাঁ! হ্যাঁ! তাতো দেখতেই পাচ্ছি! এই দুই -তিন ঘন্টার দূরত্ব একজনের কাছে জনম জনমের দূরত্ব।
যুথি আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলো! তবে পারল না। তাদের সামনে কাদেরের বউ দৌড়ে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,-- আপাগো তাড়াতাড়ি আহো আম্মা চক্কর খাইয়া পইড়া গেছে। মাথাও ফাইট্টা গেছে।
যুথি আর সাবিহা অন্য কোন দিকে তাকালো না। হন্তদন্ত হয়ে ঘরের দিকে ছুটলো।
চলবে......