ফন্ট সাইজ:
থিম:
সোনালী রঙের বুনোলতা

পর্ব 6

লেখক: নূপুর ইসলাম

#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৬

আসমা চোখ খুলে দেখলো তার সামনে পরীর মতো একটা মেয়ে বসে আছে। গায়ে তার লাল টকটকে জামা। লাল টকটকে জামার জন্য তাকে আরও সুন্দর লাগছে। মেয়েটির ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি। বিস্ময়ভড়া নয়নে সে তাকিয়ে রইল। সে স্বপ্ন দেখছে না বাস্তব তফাৎ বুঝতে পারল না।

-- আপনি ঠিক আছেন?

আসমা বিভ্রন্তের মতো মাথা দোলালো। তার এখনো স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কে এই মেয়ে? সেই কি মারা গেছে! এ কি কোন বেহেশতের হুর। না! কালকে রাতেও একবার সে চোখ খুলেছিল! সাঈদ তার হাত ধরে বসে ছিল । তাকে দেখে গালে হাত রেখে বলল,--- চিন্তা করো না মা! সব ঠিক হয়ে যাবে। তাহলে সে কোথায় ? আসমা আশে পাশে দেখার চেষ্টা করল।

সেই সময় সাঈদ দরজা ঢেলে ভিতরে আসলো। এসে সেও ঝটকার মতো খেলো। সে এখানে ঐশীকে আশা করে নি।

কালকে ঐ বাসায় থাকতে থাকতেই সাঈদের মোবাইলে ফোন আসে। মায়ের কথা শুনে সাথে সাথেই সাঈদ বেরোতে চেয়েছিল । তবে বাঁধা দিলেন আনিস মামা। সে বলল,--- তুমি যেতে যেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। কাউকে বলো এম্বুলেন্স করে এমার্জেন্সি ঢাকায় নিয়ে আসতে। এখানেই ভালো হবে। তাছাড়া গ্রামের সাইডে রোগীর একটু ক্রিটিকাল হলে এমনিতেই ঢাকার দিকে পাঠিয়ে দেয়। তবে এমন সময় পাঠায় আসতে আসতে আর কিছু করার থাকে না। তাই এটাই ভালো হবে। শুধু ব্লিডিং বন্ধ করার জন্য কিছু করতে বলো।

সাঈদেরও তাই ঠিক মনে হলো। এখানে নিয়ে আসা কোন ব্যাপার না। সে সাথে সাথে তুহিন কে ফোন করল। সে মায়ের কাছেই ছিল। শুনে সাথে সাথেই বলল,--- তুই টেনশন করিস না। আমি সব ব্যবস্থা করছি।

এবং করেছেও। দু-ঘন্টার মধ্যেই নিয়ে এসেছে। তারা আসার আগেই সাঈদ আর আনিস মামা হসপিটালে সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। তাই কোন রকম আর সমস্যা হয় নি।

হসপিটালে আসার আগ পর্যন্ত সাঈদ সেই বাসায়ই ছিল। পিচ্চি গুলোকে জায়গামতো পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা মামা করেছে। সে বসে ছিল নিশ্চুপ! দেখতে নিশ্চুপ বসে থাকলেও তখন তার হুঁশ ছিল না। কিভাবে থাকবে? তার মা! তার শেষ সম্বল মা অসুস্থ! তখন তার ভেতরে কি চলছিল একমাত্র সেই জানে। সবাই সান্তনা দিচ্ছিল! তবে এর মধ্যে ঐশী ছিল না। থাকার কথাও না। সে চুপচাপ এক কর্নারে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই আজ দেখতে আসবে এটা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

ঐশী উঠে দাঁড়াতে চাইলো! সাঈদ দেখে বলল,--- উঠতে হবে না! আপনি প্লিজ বসুন। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,--- মা ইনি শাহেদ চাচার মেয়ে। তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে।

আসমা হাসলো! হেসে আস্তে আস্তে বলল, --- মাশাল্লাহ! আল্লাহ তোমারে তো নিজ হাতে বানাইছে মা। আমিতো ভাইবাই বইছিলাম, বেহেশতের হুরের সামনে আছি।

ঐশী হাসলো! হেসে বলল, --- আমি দুঃখিত! আমি বুঝতে পারিনি আপনি ভয় পাবেন। আসলে এসে দেখলাম দরজার সামনে কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে । তারা বললো উনি নাকি একটু বাইরে গেছেন। আপনি ও ঘুমে। আমাকে ভিতরে বসতে বলল। তাই আমিও....

--- তুমি একদম ঠিক করছো মা! এখন একটু কাছে আসোতো! আইসা আমার হাতটা একটু ধরো । আমার এখনো কেমন জানি স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হইতাছে ।

ঐশী এবার খিলখিল করেই হেসে ফেললো!হাসতে হাসতে একবার সাঈদের দিকে তাকালো। সে এক পলকে তাকিয়ে আছে । ঐশীর ধারণা এই লোকটারও বিশ্বাস হচ্ছে না, সে এখানে এসেছে। তার নিজেরও অবশ্য এক'ই অবস্থা। সে এসেছে হঠাৎ করে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তার মনে হলো দেখতে যাওয়া উচিত। তবে কেন উচিত বুঝতে পারল না।

তাই মামার রুমে গেল। মামা এসে ঘুমিয়েছে শেষ রাতে। তাকে ঝাঁকিয়ে ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞেস করতেই বলল,--- যেতে ইচ্ছে করছে যাও, এত মানে টানে খোঁজার দরকার কি? আর খবরদার তোমার দাদুকে ভুলেও বলতে যাবে না যে যাচ্ছো! কাল থেকে মাথা খেয়ে ফেলছে। যদি জানে জোঁকের মতো সেঁটে যাবে।আর সে হসপিটালে যাওয়া মানে ভূমিকম্প। সবার মাথা ধরিয়ে ফেলবে।

ঐশী এটা জানে! একবার তো এক নার্সের সাথে বিরাট কাহিনী। শুধু চুল ছিঁড়াছিঁড়ি বাকি ছিল। তাই সে মাকে বলে চুপ করে বেরিয়ে এসেছে। কি দরকার এত ঝামেলার।

--- আপনি গাড়ি আনেননি?

ঐশী পেছনে তাকালো, সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে। সে হসপিটাল থেকে এই মাত্রই বেরুলো। হয়ত তার পেছন পেছন সাঈদও বেরিয়ে এসেছে। সে খেয়াল করে নি।

-- এনেছিলাম! চলে যেতে বলেছি। "ঐশী মনে মনে বিব্রত হলো। লোকটাকে কোন সম্মোধন করা দরকার। তবে কি বলবে বুঝতে পারছে না। ভাইয়া! দূর! নিজের কাছেই কেমন জানি বেমানান লাগছে।

---- এখানে রিকশা পাওয়া যাবে না। হেঁটে হেঁটে একটু সামনে যেতে হবে। আসুন! আমি দেখছি। বলেই সাঈদ এগুতো লাগলো।

ঐশীও পেছন পেছন এগুতে লাগলো! তবে সাঈদের একটু পেছনে পড়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারে না। গাড়িটাকে পাঠিয়ে দিয়ে ভুলই হয়েছে। কিছুদূর যেতেই ঐশী থমকে গেল। চায়ের দোকানে একদল ছেলে বসা। তাদের মধ্যে একজন শিস বাজালো। ঐশী তাকাতেই চোখও মারলো। ঐশী হা হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করল। তার হাত পা কাঁপছে। এরকম পরিস্থিতিতে তো সে কখনো পরেনি।

ঐশী রিকশায় উঠল থমথমে মুখে। সাঈদ একবার তাকালো তবে কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু রিকশাওয়ালাকে বলল,--- সাবধানে নিয়ে যাবেন! বলেই রিকশার ভাড়াও মেটালো।

ঐশীর সেই দিকে খেয়াল নেই। সে চুপচাপ বসে আছে।

রিকশা চলতেই সাঈদ ফিরে আসতে লাগলো। তার চোখ মুখ শান্ত। খুব শান্ত! সেই শান্ত চেহেরায় সুক্ষ্মভাবে খেয়াল না করলে বোঝার উপায় নেই। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ভয়ংকর রকম শক্ত। সে এগুতে লাগলো! এগুতে এগুতে সোজা সেই চোখ মারা ছেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো! আর কিছু বোঝার আগেই এক চড় মাড়লো।

এক চড়েই সেই ছেলে বসা থেকে মাটিতে উলটে পড়লো। কান দিয়ে রক্ত বেরিয়ে গেছে। পাশে যারা আছে সবাই আঁতকে দাঁড়িয়ে গেছে।

উলটে পড়া ছেলে মাটিতে উঠে বসলো। কানে হাত রেখে সাঈদের দিকে হা করে তাকিয়ে রইল। তার মাথা ঘুরছে। সব কিছু এত তাড়াতাড়ি হলো! কি হচ্ছে এখনো সম্ভবতো বুঝে উঠতেই পারেনি।

সাঈদ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে শীতল চোখে ছেলেটাকে দেখলো। তারপর হাঁটুগেড়ে ছেলেটার সামনে বসে শান্ত কন্ঠে বলল,--- একটা মানুষের জন্য চোখ খুব মূল্যবান। আমি মূল্যবান জিনিসের খুব কদর করি। তা না হলে এই দু-টো চোখ এতক্ষণে আমার হাতে থাকতো।

সাঈদ চলে এলো! সেই ছেলে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছে। তারসাথে পাশের ছেলেরাও। যার এক চড়ে এত দম। তাকে কিছু বলার সাহস তাদের হলো না।

------
আয়েশা মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কি নিষ্পাপ একটা মুখ। কেঁদে কেঁটে চোখ মুখ লাল করে ফেলেছে। ছোট বেলার মতো দু-হাতের আজলায় ধরে বুকে জড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করল। তবে সম্ভব না। মেয়ে এখন তার চেয়েও উঁচালম্বা। বরং মেয়েই তাকে কোলে নিতে পারবে।

সে হাসলো! আজকালকের দুনিয়ায় এত সোজা হলে চলে। সেতো ভয়ই পেয়ে গিয়েছিল। এই অসময়ে তার মেয়েকে অফিসে দেখে।

সে উঠে দাঁড়ালো! দাঁড়িয়ে পানির গ্লাস নিয়ে ঐশীর হাতে দিয়ে, পাশে বসে মমতা মাখা গলায় বলল,

--- তুমি যেই দুনিয়াটায় আছো! সেটা সুন্দর,কোমল, মসৃণ। সেখানে তুমিই সব। কিন্তু সেই দুনিয়ার বাহিরটা কাদাকার, কুৎসিত, অসুন্দর। সেখানে কেউ তোমার কথা চিন্তা করবে না। ভাববে না। বরং দুমড়ে মুচড়ে শেষ করতে চাইবে। এই যে কোর্ট, এখানে আমি হাজার হাজার পরিবারকে দেখি। যাদের মেয়েকে এই দুনিয়া দুমড়ে মুচড়ে ফেলেছে । শেষ করে ফেলেছে! শুধু একটু বিচারের আশায় দারে দারে ঘুরছে। তোমার সাথে আজ যা হয়েছে। তা প্রতিনিয়তই হাজার হাজার মেয়ের সাথেই হচ্ছে। তাই শক্ত হও। সব সময়তো আর তোমার দুনিয়ায় থাকতে পারবে না। এক সময় না এক সময় বের হতেই হবে। তাই নিজেকে এমন ভাবে গড়ে তোলো। যখন তোমার মনে হবে ঠিক হচ্ছে না। তখন রুখে দাঁড়াতে পারো। তাদের শাস্তি দিতে পারো। আর এভাবে চুপচাপ এসে কাঁদার কিন্তু কোন মানে নেই। তুমি তো কোন ফেললা নও। তাদের দেখিয়ে দেয়া উচিত ছিল তুমি কে?

ঐশী হেঁচকি দিতে দিতে বলল, --- কি করবো আমি?

আয়েশা হাসলেন! হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,--- আমি, মামা, কিংবা দাদু কেউই সব সময় থাকবো না। তাই কি করবে, কি করতে হবে। সেটা পরিস্থিতি বুঝে তোমার ঠিক করতে হবে। নিজের ব্রেইন ব্যবহার করতে হবে। বুঝেছো মাই ডেয়ার সুইট ডটার।

ঐশী মাথা দোলালো! তবে কিছু পারবে বলে মনে হয় না। সে এমন কেন? এখনো সেই ছেলের চোখ মারা নোংরা হাসি চোখে ভাসছে। সে আবার কেঁদে ফেললো।

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 6 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন