#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৭
সাঈদ তার মায়ের রুমে আসতেই দেখলো যুথি বসে আছে। সে আজকাল বেশি ভাগ সময় এই বাসায়ই থাকে। মায়ের দেখাশোনাও করে। এসব কাজ এই মেয়ে কেন করছে সে ভালো করেই বুঝে। তবে সে এখনো কিছু বলেনি। না বলার অবশ্য কারণ আছে। ছোট বেলা থেকে এই বাসায় মেয়েটার আসা যাওয়া। সবার সাথেই ভালো সম্পর্ক। সে চাচ্ছে না সেটা শেষ হোক। বড়াবাড়ি তো কিছু করছে না । থাকুক নিজের মতো। সে বেরিয়ে যেতে চাইলো, কিন্তু তার মা পিছু ডাকলেন,
--- যাইতাছোস ক্যা? এদিকে আয়। বয়! যুথি কি অচেনা কেউ। ওতো আমাগো বাড়ির ই মাইয়া। সাবিহা যেমন, ও তেমন। তোর ছোট বোনের মতনই।
যুথির মুখ কালো করে ফেললো। সাঈদ খেয়াল করল। তার হাসি পাচ্ছে! তবে হাসলো না। সে তার সব কিছুই নিমন্ত্রণ করতে পারে। সে এগিয়ে গেল।
--- ঔষুধগুলো খেয়েছো মা?
--- হ, যুথি এই মাত্রই খাওয়াইলো।
--- এখনতো কোন সমস্যা নেই না, মাথায় কোন যন্ত্রনা?
--- নারে বাজান।
--- হুম। খাবার দাবার নিয়ে আর খামখেয়ালি করো না মা। প্রেশার তোমার একদম লো। লো প্রেশার থেকেই মাথা ঘুরেছে, বুঝেছো?
--- হ রে বাজান বুঝেছি।
--- বুঝলে ভালো! আর শোন বিকেলে আমি উত্তরের খেতগুলো দেখতে যাবো। একটু দেরি হতে পারে। টেনশন করো না। সাবিহাকে সব বুঝিয়ে বলেছি, ও আসছে। আমি না আসা পর্যন্ত এই রুমেই থাকবে।
আসমা কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই যুথি থমথমে কন্ঠে বলল,--- আমি এখানেই আছি! আপনি নিশ্চিন্তে যান।
সাঈদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তারপর এগিয়ে খাটের এক পাশে বসলো। বসে শান্তভাবে বলল,---- তোমার লেখাপড়া নেই? দিনরাত এখানে থাকলে লেখাপড়া কখন করবে? মায়ের পাশে থাকার অনেক মানুষ আছে। আমি তোমাকে আসতে মানা করছি না। তবে তোমার আরেকটু লেখাপড়ার ব্যাপারে সিরিয়াস হওয়া উচিত। গলায় গলার বান্ধবী! একজন ভালো করবে, আরেকজন খারাপ। ভালো লাগবে বলো? সাবিহাকেই দেখো, সে কিন্তু তোমার বাসায় গিয়ে তোমার মায়ের সেবা করছে না। নিজের দিক সে নিজে ঠিকিই রেখেছে।
যুথি চোখে টলটলে পানি নিয়ে সাঈদের দিকে তাকালো। কি সুন্দর ভাবে তাকে অপমান করছে। কি সুন্দর ভাবে বাসায় আসতে নিষেধ করছে। কি সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে দিলো, যে অধিকার দেখাচ্ছো সেটা তোমার না। তাহলে কার? সেই হুরপরীর! যার গুণ গান চাচি বাসায় এসেছে পর থেকে বলছে তো বলছেই। তার জন্যই বুঝি এতো বার বার ঢাকায় যাওয়া। সে আসলেও কি এই কথা বলবে, নাকি তার ক্ষেত্রেই এই নিষ্ঠুরতা।
আসমা ছেলেকে ধমক দিয়ে বললেন,-- সাঈদ! কি কস তুই? মেয়েটারে কান্দায় দিলি। ওর মতো লক্ষী কি সাবিহা। দিন ভরে ঢিং ঢিং করে ঘুরতাছে। মায়ের খবর আছে তার। এইডা তো আমার আরেক মাইয়া। এই মাইয়া ই তো আমারে দেইখা রাখে। ওর যহন খুশি যতক্ষণ খুশি এই বাড়িত থাকবো। কাউরে জানি কিছু কইতে দেখি না। আয়, এদিকে আয় মা। আমার কাছে আয়। আসমা হাত বাড়িয়ে যুথিকে কাছে ডাকলো।
যুথি সাঈদের দিকে তাকালো! তাকিয়ে আসমার পাশে গিয়ে বসলো। তার চোখে মুখে রাগ। আসমা খেয়াল না করলেও সাঈদ ঠিকিই দেখলো। দেখে মুচকি হাসলো।
________
-- তোমার ধারণা আমি তোমাকে ভালোবাসি না।
--- না।
ঐশী শান্ত ভাবে বলল,--- এতদিন পরে এই মনে হলো বুঝি?
--- হ্যাঁ।
--- কেন?
ইমরান কথা বললো না। সে চোখে মুখে বিরক্ত নিয়ে অন্য পাশে তাকালো।
ঐশী মলিন ভাবে হাসলো! ইমরান যখন ফোন করে বলল,--- বিকেলে দেখা করবে। সে খুশিতে বাকবাকুম। কতদিন পরে তারা এভাবে দেখা করছে। হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে সে রেডি হলো। সকাল থেকে বিকেল হওয়ার আগ পর্যন্ত কিভাবে কেটেছে সে ই জানে। আর এখন শুনতে হচ্ছে সে তাকে ভালোবাসেনা।
ঐশী দীর্ঘশ্বাস ফেললো! ফেলে ইমরানের হাতের আঙুলের ভাজে আঙুল রাখল। কতদিন পরে এভাবে পশাপাশি বসে আছে।
ইমরান অবশ্য হাত ধরলো না। সে হাত শক্ত করে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। এত সুন্দর বিকেল, এত সুন্দর রমণী, তার পাশে বসে এক বুক ভালোবাসা নিয়ে হাত ধরে আছে। সে সেটা অনুভব করতে পারল না। সে বিরক্ত! অনেক অনেক বিরক্ত। এই যে সে এত কষ্ট করছে। কেন এই মেয়ে তার জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করছে না। শুধু একটা ফোনই তো। ভালোবাসার মানুষের জন্য এতটুকু করতে না পারলে কিসের ভালোবাসা। চাকরির টা হলে দুজনের জন্যই তো ভালো। তাহলেই বাসায় বিয়ের কথা বলতে পারবে। তার মা আবার খুব কড়া। চাকরি বাকরি নেই বিয়েও নেই। হাজার আদরের দুলালি হোক। ধারও ধরবে না।
-- আজ একটা গল্প বলতে চাই শুনবে?
-- না।
-- কেন?
-- শুনতে ইচ্ছে করছে না, তাই।
-- এর পরে বলার সুযোগ আর হয়তো নাও থাকতে পারে ।
-- না হলে নেই, আমার শুনতে ইচ্ছা করছে না।
ঐশী হাসলো! হেসে বলল,--- অতি মূল্যবান কিছু মানুষ সহজেই পেয়ে গেলে তার কদর করে না।
ইমরান তেঁতে উঠল! তার বলতে ইচ্ছা করল কবে তার কদর করেনি? কখনো খারাপ ব্যবহার করেছে? তবে সব সময়ের মতো কিছু বলল না। মুখও ফেরালো না। এই মেয়েটার মুখে কিছু একটা আছে। সে কখনো কড়াকরে কিছু বলতে পারে না। অন্তত এই পর্যন্ত পারেনি। সে ফোস করে শ্বাস ফেললো।
-- টেনশন করো না। তোমার চাকরির হয়ে যাবে। এক সাপ্তাহের মধ্যেই হয়ে যাবে।
ইমরান অবাক হয়ে ফিরে তাকালো! তার চোখ চিকচিক করছে। এবার সে হাত ধরলো! দু হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরলো।
-- এবার বলো, শুনবে?
ইমরান হাসলো! হেসে বলল,--- শুনবো! অবশ্যই শুনবো। আজ তুমি যা যা বলবে সব শুনবো। তুমি জানো না, আজ আমি কত খুশি। অনেক অনেক খুশি! এই খুশিটুকু দেওয়ার জন্য তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জান। অনেক অনেক ধন্যবাদ।
ঐশী কিছুক্ষণ চুপচাপ নিঃসাড় ভাবে ইমরানের দিকে তাকিয়ে রইল। ইমরান তার খুশিতে খেয়ালই করল না। এই হাসি খুশি মেয়েটার মুখ শান্ত। একেবারেই শান্ত।
ঐশী চোখ ফিরিয়ে সামনের দিকে তাকালো! তাকিয়ে নিঃস্পৃহ কন্ঠে বলল,--- গল্পটা এক রাজা রানীর।
ইমরান হাসলো! হেসে বলল, --- সব গল্প রাজা রানীর ই থাকে। তারপর বলো।
--- না, সব গল্প রাজা রানীর থাকে না। কিছু কিছু গল্প কাচ আর হীরাও থাকে। সেটা তুমি বুঝবে না।
--- আচ্ছা বাবা সমস্যা নেই, এবার বলো।
-- তারা ছিল খুব সুখী। কোন কিছুরই তাদের অভাব ছিল না। ছিলোনা ভালোবাসারও। কিন্তু তাদের ঘর ছিলো খালি। তারা ছিলেন নিঃসন্তান। রাজা যেমন তার রানীকে ভালোবাসে তেমনি রানীও। তাই এই অভাবটুকু তাদের ভালোবাসায় ফাটল ধরাতে পারে নি। তাদের দিন সুখে সুখেই কেটে যাচ্ছিল। একদিন রাজা তার রাজ্য ভ্রমনের জন্য বের হলেন। পথে দেখতে পেলেন এক পাগলীকে। যে প্রসব ব্যথায় ছটফট করছে। কেউ এগিয়ে আসছে না। কে যাবে? একতো নোংরা পাগলী। তার মধ্যে কার না কার পাপ। কে যাবে এই পাপের ভাগিদার হতে। রাজা এগিয়ে এলেন। রাজ্যের সবচেয়ে ভালো চিকিৎসালয়ে তাকে নিয়ে গেলেন। সেই পাগলী জন্ম দিলো ফুটফুটে এক কন্যা সন্তান। যেমন তার চোখ, তেমন তার নাক, তেমনি তার গায়ের রং। রাজা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। কিন্তু পাগলী! তার হুঁশ নেই। তার যে একটা কন্যা সন্তান হয়েছে সেই খবরও নেই। সে ব্যথায় থেকে মুক্ত এতেই খুশি। রাজা পড়ল মহা বিপদে। এই মেয়ে নিয়ে এখন কি করবে? পাগলী তার মেয়েকে ছুঁয়েও দেখছে না।
আসন্ন এই বিপদ থেকে রক্ষা করলো রানী। সে এসে আগলে ধরলেন সেই মেয়েকে। বুকে জড়িয়ে নিলো পরম মমতায়। তার কোলওতো খালি! আফসোস ছিল না অবশ্য। তবে আকাঙ্খাতো ছিল। সেই পাগলী আর তার মেয়ের স্থান হলো রাজপ্রসাদে। রাজা রানীর পরম আদরে বড় হতে লাগলো সেই মেয়ে। হয়ে গেল রাজপ্রসাদে রাজকুমারী। আর পাগলী তার কাছে রাস্তা কি আর রাজপ্রসাদই কি? তার দুনিয়া ছিল ভিন্ন। সেই ভিন্ন দুনিয়ায় সে একদিন হারিয়ে গেল নিজের মতো। রাজা তাকে অনেক খোঁজার চেষ্টা করলেন। তবে সে নেই, কোথাও নেই। সে হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাওয়া মানুষকে কি আর ফিরে পাওয়া যায়?
ঐশী থামলো, থেমে হাতের দিকে তাকালো। ইমরান হাত ছেড়ে দিয়েছে। সে শূণ্য দৃষ্টিতে ঐশীর দিকে তাকিয়ে আছে।
ঐশীও এবার হাত গুটিয়ে নিল। তারপর ইমরানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, --- তুমি কি জানো সেই রাজকুমারীটা কে ?
-- ইমরান কোন উত্তর দিলো না, সে নিশ্চুপ।
-- আমি রাস্তায় যখন কোন পাগলীকে দেখি। তাকিয়ে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখি। এদের মধ্যেই তো আমার মা। যে আমাকে জন্ম দিয়ে হারিয়ে গেছে। সে জানেও না মাতৃত্ব কি? যে জানেও না তার একটা মেয়ে আছে। যার স্থান ছিলো ফুটপাতে। কিন্তু ভাগ্য গুনে স্থান হয়েছে রাজপ্রসাদে।
ঐশী উঠে দাঁড়ালো! তারপর বলল,--- যে রাজ্য দেখে রাজকন্যা কে তুমি ভালোবেসেছো। সে আসলে কেউ না। শূণ্য! জন্মেরও ঠিক নেই। তাই তোমাকে নিরাস করার জন্য আমি দুঃখিত।
ইমরানকে হতভম্ব রেখে সে চলে এলো। রিকশায় উঠে অনেক কষ্টে কান্না গিলে তার মাকে ফোন দিলো। ফোন ধরতেই ঢোক গিলে বলল,--- কি করো আম্মু?
আয়েশার কপালে ভাঁজ পড়লো । চিন্তত স্বরে বললেন, --- তুমি ঠিক আছো?
--- হুম।
--- কোথায় তুমি?
--- রিকশায়, বাসায় যাচ্ছি।
--- সব ঠিক আছে, কন্ঠ এমন লাগছে কেন?
ঐশীর বুক ফেঁটে কান্না বেরুতে চাইলো। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করল, " ঠিক নেই আম্মু, কিচ্ছু ঠিক নেই। তোমার মেয়ে ভুল মানুষকে ভালোবেসেছে। ভুল, ভুল সব ভুল।
-- হ্যালো, ঐশী?
-- আমি ঠিক আছি আম্মু। তোমাকে একটা দরকারে ফোন দিয়েছি।
-- বাসায় আসো, তারপরে কথা বলছি।
-- না, আমি এখুণি বলবো।
-- আচ্ছা, বলো।
-- একজন কে একটা চাকরি দিতে হবে। এক সপ্তাহের মধ্যেই। ভালো একটা চাকরি। যাতে সে তার সব স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।
-- সেই স্বপ্নের মধ্যে কি তুমি আছো?
-- না।
-- গুড। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য যাদের অন্যের ধাক্কার প্রয়োজন হয়। তাদের স্বপ্নে না থাকাই ভালো। তার সিভি পাঠিয়ে দাও। হয়ে যাবে! টেনশন করো না। বাসায় এসো। একটা কথা মাথায় রেখো। তুমি আমাদের কাছে খুবই মূল্যবান। আর আমরা তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি।
চলবে....