#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৮
আনিস ট্রি হাউজে উঁকি দিলো! ঐশী জানালায় মাথা এলিয়ে বসে আছে। এলোমেলো চুল, চোখের নিচে কালি। মুখটা শুকিয়ে এইটুকু হয়ে আছে। মেয়েটা ঠিকমতো ঘুম, খাওয়া দাওয়া কিছুই করছে না।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেললো! সেই দিন বিকেলে অফিস থেকে আয়েশা ফোন দিলো। চিন্তিত হয়ে বলল,--- ভাইয়া ঐশী কি কোন রিলেশনে ছিল?
আনিস অবাক হলো! তবে বুঝতে দিলো না। সে স্বাভাবিক ভাবেই বলল,--- কেন কি হয়েছে?
আয়েশা বিষন্ন মাখা কন্ঠে বলল,--- সে ভালো নেই! একদম নেই!
--- তুই টেনশন করিস না! আমি দেখছি! বলেই ফোন রাখলো। বোনকে সান্তনা দিলেও তার নিজেই বিপি হাই হয়ে গেল। কোথায় আছে তার মা? কি করছে সে ?
সে রাবেয়াকে ফোন দিলো। সে শুনে বলল,--- "টেনশন করো না। সে অবশ্যই সেইফ বাসায় আসবে। সে তোমাদের অনেক ভালোবাসে। তোমরা কষ্ট পাবে এমন কোন কাজ সে করবেনা। "
হলোও তাই! সন্ধ্যার একটু আগে ঐশী বাসায় এলো। এলোমেলো, বিদ্ধস্ত। এসেই মামার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। যেন কখন থেকে এই আশ্রয়টাই খুঁজেছে ।
ঝাঁপিয়ে পড়েই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল! কেঁদে কেঁদে বলল,--- ভুল করেছি মামা! ভুল, ভুল ভুল! সব কিছুই ভুল। মানুষ আমি চিনতে পারিনি । সে আমাকে ভালোবাসেনি! কখনো ভালোবাসেনি মামা। কখনো না!
আনিস শান্তির নিশ্বাস ফেলে ঐশীর মাথায় হাত রাখলো। হৃদয় ভাঙার কষ্ট তার চেয়ে বেশি কে জানে! সে স্নেহ মাখা কন্ঠে বলল,--- ভুল ছাড়া কি কোন মানুষ আছে। আমরা সবাই ভুল করি। সেই ভুল থেকেইতো আমরা শিখবো, জানবো। আবার সেই ভুলকেই পিছনে ফেলে এগিয়েও যাবো।
--- আমার কষ্ট হচ্ছে মামা! ভীষণ, ভীষণ কষ্ট।
আনিস আর কিছু বলতে পারল না! কি বলে তিনি এই কষ্টের সান্তনা দেবে। সেই শব্দ তিনি খুঁজে পেলেন না । তবে তিনি জানতেন এই দিনটি আসবে। ঐশী যখন তাকে ইমরানের ব্যাপারে বলেছিল। সে তখনি খোঁজ খবর নিয়েছিল। না ছেলের কোন খারাপ রেকর্ড নেই। তবে ফ্যামেলি! টাকা পয়সা না থাকলেও কিছু কিছু ফ্যামিলি মার্জিত,ভদ্র হয়। কিন্তু ইমরানেরটা সেরকম না। ইমরানের বাবা বেকার ছিল । টাকা পয়সা নিয়ে তার মাকে বিয়ে করেছে। সেই দেমাগেই সম্ভবতো তার মার ব্যবহার যা ইচ্ছে তাই। এলাকায় খুব একটা ভালো রেকর্ড ও নেই। এক বোন, তার জামাই নিয়ে বাড়িতেই থাকে । সেই বোন আর মায়ের মাঝে নিত্য কাহিনী। এই রকম ফ্যামিলি থেকে আসা ছেলের মনোভাব কতটা কিরকম হবে সে আগেই ধারণা করেছিল।
তবে তিনি কিছু বলেন নি। তখন বললে অবশ্য কোন লাভও হতো না। হিতে বিপরীত হতো। কারণ! ইমরান আসেনি! ঐশী নিজেই মুগ্ধ হয়ে ইমরানের দিকে এগিয়ে গেছে। তাই তখন ইমরানের বিরুদ্ধে কিছু বললে ঐশী হয়তো তাকে পাওয়ার জন্য অন্য ডিসিশান নিতো। তাই বুদ্ধি করে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে বলেছিল। সে জানতো ইমরান তার জন্য সঠিক না ভুল তার মা একদিন না একদিন অবশ্যই বুঝবে।
--- দাঁড়িয়ে আছো কেন মামা? ভেতরে এসো।
আনিস এগিয়ে গেল! এগিয়ে গিয়ে ঐশীর পাশে বসতে বসতে বলল,--- ঘুরতে যাবি?
ঐশী একটু এগিয়ে এসে মামার কাঁধে মাথা রেখে বলল, --- উঁহু।
-- কেন?
-- এমনি মামা! ভালো লাগছে না।
-- চললা! বাসায় বোর হচ্ছি! কোথায় গেলে একটু রিফ্রেশ লাগবে।
ঐশী মলিন ভাবে হাসলো! হেসে বলল, --- তোমার রিফ্রেশ আমি জানি। ঘুরতে গিয়ে হাবিজাবি কান্ডকারখানা করো। তোমার সাথে আমি যাচ্ছি না।
-- এবার কোন রকম কিচ্ছু করছি না! প্রমিস।
-- তবুও যেতে ইচ্ছে করছে না মামা।
-- চললা! দূরে কোথায় যাবো না, এইতো কাছেই!
-- এইতো কাছেই কোথায়?
-- যেখানে হাওয়া বয় মৃদু মৃদু! বাতাসে ধানের গন্ধ। বৃষ্টির টাপুর টুপুর টিনের চাল। পিঠা পায়েসের ছন্দ।
ঐশী হাসলো! --- গ্রামে দিকে যেতে চাইছো।
-- হ্যাঁ! তুই তো কখনো গ্রামে যাসনি । এবার চল দেখে আসি।
-- থাকবে কোথায় গিয়ে? গ্রামে হোটেল থাকার কথা না। আমাদের আগের বাড়ি টাড়িও তো নেই।
-- সেটা আমার উপরে ছেড়ে দে।
-- আচ্ছা, যাও দিলাম। কে কে যাবো?
-- তোর মা তো যাবে না জানা কথাই! তোর ফ্যাশন কুইন কে বলতে পারিস। তাকে কোথাও নেওয়া রিস্ক। তবুও বল! ঘুরতে গেলে দুই একজন তাড়ছেঁড়া না থাকলে ঘুরাঘুরি ঠিক জমেনা।
ঐশী হেসে উঠল। ক্লান্ত চেহেরার মুক্ত ঝরা হাসি। আনিস আর কিছু বলল না। সে তাকিয়ে রইল। তার মাকে এভাবে দেখতেই তো তার ভালো লাগে।
-------
যুথি এসে অবাক হলো। উঠানে বাজারের মেলা। ঘরবাড়ি ধুয়ে মুছে একাকার। চাচি ব্যস্ত ভাবে এটা ওটা করতে বলছে। ব্যাপার কি? সে চোখে মুখে বিস্ময় নিয়েই সাবিহার রুমে গেল। এই মেয়ে বইয়ে ডুবে আছে। সে বিরক্ত হলো! কি হবে এত পড়ে। সেই তো বিয়ের পরে চুলাই গুতাতে হবে।
সে বিরক্ত মাখা কন্ঠেই বলল -- কি মহারাণী! পড়ে মনে হয় গুষ্টি উদ্ধার করে ফেলছেন।
সাবিহা হাসলো! হেসে যুথির দিকে তাকিয়ে গালে হাত রেখে বলল,--- গুষ্ঠি তো জানিনা! তবে নিজেকে অবশ্যই করছি।
-- ছাই করছিস! ইন্টারটা শুধু শেষ হতে দে। দেখবি বিয়ের লাইন লাগিয়ে দিয়েছে। আমাদের গ্রামে কোন মেয়ে ইন্টার শেষ করতে পারে?
-- তা পারে না! তবে আমি পারবো। ভাইয়া বলেছে যতখুশি লেখাপড়া করো। কোন বাঁধা নেই।
-- হুম! তোর তো আবার ভাইয়া আছে! আমার কে আছে? না আছে ভাইয়া না আছে ছাইয়া।
-- ভাইয়া না থাক মনের মতো ছাইয়া খুঁজে নে । তারপর বিয়ে করে নাতি পুতিদের হাগুমুতু সাফ করার ডিউটি নে।
-- তা না হয় নিলাম । কোন সমস্যা নেই। যদি নাতি পতির নানা, দাদা তোর ভাইয়া হয়।
সাবিহা ফিক করে হেসে চেয়ার থেকে উঠে সাবিহার পাশে বসতে বসতে বলল,--- আমার ভাইয়াকে ছাইয়া বানানো এত সোজা না।
যুথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,--- হুম জানি! আর এই জন্যই আমার এই এক জীবনই বৃথা।
-- সত্যিই!
যুথি ভ্রু কুঁচকে বলল,---- কি সত্যিই?
-- এই যে বললি বৃথা। সত্যি করে বলতো, তুই কি ভাইয়াকে ভালোবাসিস?
যুথি আজকে মানা করল না। সে পা দুটো গুটিয়ে খাটে উঠিয়ে বিষন্নভাবে জানালার দিকে তাকালো। তাকিয়ে বলল,--- তোদের বাসায় কেউ আসবে?
সাবিহা কিছুক্ষণ যুথির দিকে তাকিয়ে রইল। এতদিন যে ধারণা করেছে তা তাহলে সত্যি। সেও আর কথা বাড়ালো না। মেহমান যাক! তারপরে সে মার সাথে কথা বলবে। বিয়ে তো ভাইয়া আগে পরে করবেই। যুথিকে করলে সমস্যা কোথায়?
-- হ্যাঁ! আনিস মামা আসবে ।
যুথি অবাক হয়ে সাবিহার দিকে তাকালো! তাকিয়ে বলল,--- তোর ভাইয়া ঢাকায় যাদের বাসায় যায়?
-- হ্যাঁ।
-- ঐ হুরপরীর মতো মেয়েটাও আসবে?
-- আমি ঠিক জানি না কে কে আসবে ।
যুথি নিঃষ্পল ভাবে তাকিয়ে রইল। তার মনে কু ডাকছে। সাঈদ ভাই তার হওয়ার আগেই হারিয়ে যাবে নাতো।
_____
ঐশী গাড়ির জানালা খুলে প্রাণ ভরে শ্বাস নিল। কি নির্মল, স্নিগ্ধ বাতাস। তার মনে হচ্ছে সে অনেক অনেক দিন পরে নিজেকে ফিরে পেল। সে চোখ বন্ধ করল। বাতাসের স্পর্শ সে অনুভব করতে লাগলো।
-- এই ঐশী! মাথা ভিতরে ঢোকা। অন্য গাড়ি এসে বাড়ি মেরে তো তোর কল্লা নিয়ে যাবে ।
ঐশী হাসলো! হেসে বলল,--- নিলে নেবে! আমি মাথা ঢোকাবো না। এই নেওয়ার মাঝেও সুখ দাদু। এই নেওয়ার মাঝেও সুখ।
সাহানা আর কথা বাড়ালো না। আনিসের সাথে থাকতে থাকতে এই মেয়েরও তাড় ছিঁড়ে গেছে। সে নড়েচড়ে বসলো। পিছনে বসেছে তিনজন । ঐশি, সাহানা আর কুসুম। তিন জনই চিকনা চাকনা। তবুও বসে আরাম হচ্ছে কেন কে জানে?
কুসুম বিরক্ত হয়ে বলল, --- ঠেইলা ঠেইলা তো আরেকটু পরে জানালা দিয়া বাইরই কইরা দিবেন। আহেন আরেকটু উপরে আহেন।
-- আমি তোরে কোথায় ঠেললাম। আমার ঐ শক্তি আছে। নিজের পাছা সামলা। খাইয়া খাইয়া তো দুম্বার মতো বানায় ফেলছো। এখন গাড়িতে জায়গা হয়না।
আনিস খুক খুক করে কেশে উঠল। সে বসেছে ড্রাইভারের সাথে। কি বলে এই মহিলা। মুখে কোন লাগাম টাগাম নেই। এরে আনাই ভুল হয়েছে। তার মাথা শেষ।
কুসুম ঠাটা পড়া চেহেরা করে বলল,--- আমার পাছা দুম্বার মতো। এটা আপনে কইয়া পারলেন দাদু। আমি যামু না। আনিস মামা গাড়ি থামান। আমি যামু না। কিছুতেই যামু না।
ঐশী মাথা ভিতরে আনলো! এনে বলল, -- তোমরা কি শুরু করছো? বলতেই হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল। ঐশী বিরক্ত হয়ে বাইরে তাকালো। তাদের গাড়ির সামনে একটা বাইক। ধূলার কারণে ক্লিয়ার দেখা যাচ্ছে না। সাদা শার্ট গায়ে কেউ এগিয়ে আসছে। ঐশী চোখ ছোট করে দেখার চেষ্টা করল। গাড়ির কাছে আসতেই ঐশীর চোখ কপালে উঠল। আর সাথে সাথেই দাদুর একটা কথা মনে পড়লো।
সাঈদরা তাদের প্রতিবেশী। তারাই আমাদের গ্রামের বাড়িসহ আরো জমিজমা কিনে নিয়েছে। তারমানে! সে কোন রকম ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,--- মামা! আমরা কি এই ঘ্যাড়ত্যাড়া বেয়াদবের বাসায় থাকবো?
চলবে.....