ফন্ট সাইজ:
থিম:
সোনালী রঙের বুনোলতা

পর্ব 9

লেখক: নূপুর ইসলাম

#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০৯

ঐশীদের গাড়ি থেমেছে দেয়াল ঘেরা এক বিশাল বাড়িতে। নেমেই কি আপ্যায়ন। সবাই দৌড়ে বেরিয়েছে। যেন কত দিনের চেনা। আন্টি, তাঁর মেয়ে সাবিহা তাদের সাথে কথা বলে মনেই হয়নি। তারা দূরের কেউ। মনে হয়েছে খুব আপন। আর সাঈদ!
তাঁর কথা মনে হতেই ঐশীর তখনের কথা মনে পড়লো। লোকটা তাদের এগিয়ে নিতে গিয়েছিল। মামা তো খুব খুশি। পারলে বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে।

তাঁর খুব হিংসে হলো। তাঁর মামা! তাঁর একমাত্র মামা। কেন এই লোকটাকে এত পছন্দ করে। সে অবশ্য কথা বলেনি। লোকটাও না। বাইকে উঠার আগে লোকটা একবার তাকিয়েছিল। সাধারণ ভাবে! সামনে কেউ পড়লে যেভাবে তাকায় সেভাবে। তবুও ঐশীর কেমন জানি লাগলো। মনে হলো এই তাকানোর পেছনেও কিছু আছে।

সে আমাদের গাড়ির আগে আগে বাইক চালিয়ে এসেছে। ঐশীর তখন খুব ইচ্ছে হলো। এই সুন্দর নির্মল গ্রামের মেঠো পথে বাইকে চড়ে যেতে। এই লোকটার জায়গার অন্য কেউ থাকলে হয়তো বিনা সংকোচে বলেই ফেলতো। এই লোকটা বলেই পারেনি। কেন পারেনি! ঐ যে প্রথমেই গিট্টু লেগে গেছে। এই গিট্টু আর সহজে ছুটছে না।

ঐশী পুরো বাড়িতে চোখ বুলালো। সবাই ভিতরে বসে কথা বলছে। সে অবশ্য সেখানে বসে নি। পুরো বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখছে। এই বাড়ির অর্ধেক আগে তাদের বাড়ি ছিল। এখন অবশ্য বোঝা যায় না। দাদু তো গাড়ি থেকে নেমেই শুরু করেছে আফসোস। " আহারে আমার স্বামীর ভিটা। "

ঐশী এগিয়ে গেল। পুরোটা জুড়ে বিশাল উঠান। উঠানের চারিদিকে গাছগাছালি। সেই গাছগাছালির তিন সাইডে তিনটা ঘর। মাঝেরটা বড়। বড় বলতে অনেক বড়। লম্বাকরে চার পাঁচটা মতো রুম । রুমের সামনে বিশাল বারান্দা। বারান্দা ঘিরে লোহার গ্রিল। বারান্দার মাঝামাঝি প্রবেশদার। সেখানে রয়েছে বেশ কয়েকটা সিঁড়ি। ঐশীর এত ভালো লাগলো। তার মনে হচ্ছে। সে কোন গ্রামের বাড়ির ছবির সামনে আছে। বাড়ি, উঠান, সবুজ গাছগাছালি, বাড়ির সাইডে পুকুর। এতো সুন্দরও বুঝি মানুষের বাড়ি হয়। এটাতো সাধারণ বাড়ি না। রুপকথার বাড়ি! সাধারণ মানুষের বাড়ি হবে ইট, পাথরের । এভাবে স্বপ্নের মতো রঙিন হয় নাকি।

ঐশী পুকুর পারে গিয়ে দাঁড়ালো। সে পানি ভয় পায়। সাঁতারও জানে না। তা না হলে সিঁড়ি ভেঙে আরো সামনে যেত। পুকুরের চারিদিকে ফুল, ফলের গাছ। সে এগিয়ে গেল! একটা ফুল গাছের সামনে এসে দাঁড়ালো। গাছটা চিনতে পারল না। তবে গাছ ভর্তি হলুদ ফুল।

এই ফুলগুলো ছিঁড়ে গাছটাকে ন্যাড়া করলে কেমন হয়। সেও তো আমাদের বাসায় গিয়ে আমার ফুল গাছকে ভর্তা বানিয়েছে। তার টা কেন নয়। ঐশী হাত বাড়িয়েও গুটিয়ে নিল। আহারে এত সুন্দর ফুল! সে নষ্ট করতে পারবে না। সে ভিতরে চলে আসলো। বারান্দায় প্রবেশ করলে একেবারে সামনের রুমাটায় বসার জায়গা। সেখানে মামা আর সাঈদ বসে আছে। বাকি সবাই কোথায় ঐশী বুঝতে পারল না। সে এগিয়ে গিয়ে মামার পাশে বসলো। বসে সাঈদের উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক ভাবে বলল,--- পুকুরের সাইডে হলুদ ফুলের গাছাটার নাম কি?

সাঈদ অবাক হয়েছে! অবশ্য কাউকে বুঝতে দেয়নি। তাঁর চেহেরা স্বাভাবিক! এই মেয়েটা তাকে আরো কত চমকাবে কে জানে! সেই দিনও খাবারের টেবিলে হঠাৎ হাজির। তাঁর কল্পনারও বাহিরে ছিল। আজ আবার এখন! এমন ভাবে কথা বলছে যেন তাঁরা প্রতিনিয়তোই কথা বলে। সে মানুষ দেখেই বুঝতে পারে কে কেমন। এই মেয়েটার হাবভাব কেন বুঝে না।

-- সন্ধ্যা মালতী।
-- এগুলো আপনি ভর্তা করে খান?
আনিস ফিক করে হেসে উঠল। হাসলো সাঈদও।
-- না! আপনি চাইলে বানানোর ব্যবস্থা করতে পারি।

ঐশী হাসলো না! ঠোঁট চেপে তাঁর ভাসা ভাসা টানা চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

ঐশী বুঝতেও পারল না। ঐ কিছুক্ষণের মধ্যে একজন হাজার বার খুন হলো।

-----
সাহানা কোঁকাতে কোঁকাতে খাটে বসলো। গ্রামে এসেছে ফ্রেস শাক সবজি খাবে তা না। বাথরুমে যেতে যেতে অবস্থা খারাপ। পেট হয়ে গেছে মীরজাফর। নিজের শরীরের সাথেই বেইমানি! আহারে গ্রামের পাট শাক। গরম ভাতের সাথে অমৃত। সেই অমৃতই এখন কলকলিয়ে অন্য দিক দিয়ে বেরুচ্ছে।

কুসুম ওরস্যালাইন এগিয়ে দিতে দিতে বলল,--- এইজন্যই বলে কাউরে কটুকথা বইলো না। আল্লাহ কটু কথায় নারাজ। শাস্তি ও দেয় হাতে হাতে।

-- তোর ধারণা আমাকে আল্লাহ শাস্তি দিচ্ছে।

-- হ! তা নয়তো কি? আমার পাছারে দুম্বার মতো কইলেন। এখন নিজেরটাই নিয়ে টানাটানি।

-- কুসুম তুই সামনে আয়!

-- না!

-- তরে সামনে আসতে বলছি।

-- না! যামু না। গেলে থাপ্পড় খাওয়ার চান্স আছে। তাছাড়া থাপ্পড়ে আমার সমস্যা না। সমস্যা হলো হাতে ! পেটের জীবাণু আবার হাতে হাতে ছড়ায়।

সাহানা রাগে ফুসতে লাগলেন! এই মেয়ের মুখ চলে বেশি। তাঁর শরীর ভালো থাকলে। সে উঠে গিয়ে কয়েকটা থাপ্পড় লাগাতো।

ঐশী ব্যস্ত ভাবে রুমে আসলো! এসে বলল,--- কুসুম আপা ব্যাগ থেকে আমার ক্যাপটা খুঁজে দাও।আমি ক্ষেত দেখতে যাবো।

সাহানা ভ্রু কুঁচকে বললেন, --- ক্ষেত এমন কি তাজমহল যে এই রোদের মধ্যে গিয়ে দেখতে হবে?

-- এখনতো তিনটা বাজে! মামা বলেছে দেখতে দেখতে রোদ মরে যাবে।

-- রোদের জীবন আছে যে মরে যাবে! চক পাথরের গরম কি তুই জানিস! গেলেই মাথা ঘুরে পরে যাবি! তোর খবিস মামার আর কাজ নেই।

-- মামা কে দোষবে নাতো দাদু! আমি নিজে থেকেই যাচ্ছি। কুসুম আপা পেয়েছো?

-- হ! এই যে লন! হের পাছা জায়গা মতো থাকলে আমিও যাইতাম।
ঐশী হাসলো! হেসে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, --- তোমরা পারও।

ঐশীর গায়ে কালো জামা। মাথায় কালো টুপি। রোদের তাপে ফর্সা মুখ লাল হয়ে আছে। সাঈদের না চাইতেও বার বার তাঁর চোখ যাচ্ছে। এই মেয়েটা কি জানে তাঁর এই চেহেরা যে কোন মহাপুরুষেরও ধ্যান ভেঙে ফেলবে। আর সে তো সাধারণ মানব।

সে আনিস মামাকে নিষেধ'ই করেছিল। এই রোদের মধ্যে একে নেওয়ার দরকার নেই। এই মেয়ে শুনে কারো কথা। সে আসবেতো আসবেই। এখন হাঁটছে ঢুলে ঢুলে। মাথা ঘুরে না আবার পড়ে যায়। সাঈদ এই কথা ভাবতে না ভাবতেই ঐশী উষ্ঠা খেলো। উষ্ঠা খেয়ে উপুর হয়ে পড়ে যেতে নিল।সাঈদ পেছন থেকে ধরে ফেললো। আনিস মামা খেয়াল করেনি। সে আর তুহিন কথা বলতে বলতে সামনে হাঁটছে।

ঐশীও সাঈদের হাত আঁকড়ে ধরলো। তাঁর হাতের বড় বড় নখ সাঈদের হাতে ডেবে গেছে । সাঈদের চেহেরায় কোন ভাবান্তর হলো না । আর ঐশীও খেয়াল করল না। সে হাঁসফাঁস করতে করতে বলল,--- সাঈদ ভাই মাথা ঘুরছে! রোদের এত তাপ কেন?

সাঈদ হাসলো! মেয়েটা তাঁকে প্রথমবার কোন সম্বোধন করছে। তাও আবার ভাই। সেই হেসেই বলল,--- খোলা ক্ষেত রোদতো থাকবেই। এজন্যই নিষেধ করেছিলাম। তাহলে চলুন! বাসায় দিয়ে আসি।

-- আপনার ক্ষেত কখন শেষ হবে? ধান কাটাও তো দেখতে পারলাম না।

-- ধান আরো সামনে কাটছে। যেতে সময় লাগবে।

-- তাহলে চলুন! এতো কষ্ট করে এসেছি। ফিরে যাবো না।

সেই সময় আনিস ফিরে তাকালো। সাঈদ হাত ছাড়িয়ে নিল। ঐশী বিরক্ত হয়ে বলল,--- ইশ্! আপনার হাত মনে হয় আমি খেয়ে ফেলতাম। এমন ভাবে ছাড়িয়ে নিলেন। হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবেই তো একটু ধরেছি।

সাঈদ কিছু বলল না। হাসলো! তাঁর একবার বলতে ইচ্ছা করল, --- হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে হাত কেন পুরো আমাকেই ধরে রাখ। অনেক কষ্টে নিজেকে দমালো। এই মেয়ের হজম শক্তি কম। প্রথম দিনের ভেজাল থেকে আজকেই একটু বেরিয়েছে। আবার কিছু বললে হারিয়েই যাবে।

আনিস এগিয়ে আসল! এসে বললো কি হয়েছে?

সাঈদের কিছু বলতে হলো না। ঐশীই বলল ---

-- মাথা ঘুরছে মামা! পানি খাবো।

-- সেকি পানি এখন কোথায় পাবো। তাহলে চল বাসায় ফিরে যাই।

-- না! অন্য ব্যবস্থা করো। আমি ধান কাটা দেখবো।

-- ধান কাটা আবার কি? গাছ মুঠো করে ধরে, কেচাং করে কেটে ফেলে। এর জন্য জান প্রাণ হারিয়ে দেখার কোন মানে নেই। চল! বাসায় চল।

-- না মামা! আমি যাবো না। দেখবো।

আনিস দীর্ঘশ্বাস ফেললো! এখন দুনিয়া গায়েব হয়ে গেলেও এই মেয়ে ধান কাটা দেখবে। এই মেয়ের এই এক দোষ। মাঝে মাঝে যে কোন একটা বিষয় এই মেয়ে কামড়ে ধরবে। সেই ধরা সেই জিনিস না পাওয়া পর্যন্ত আর ছাড়বে না।

সমস্যা নেই! সামনে ডিপ কল আছে। আসুন! বলেই সাঈদ এগুতো লাগলো। ঐশীও পেছন পেছন এগুলো।

আনিস হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো! যাক সাঈদ সামলেছে। সে এক প্রকার দৌড়েই এগিয়ে তুহিনের কাছে গেল। সে যতক্ষণ থাকবে একটা পর একটা বায়না করতেই থাকবে। এই মেয়ের ধারণা তাঁর মামা সুপার হিরো। যা বলবে তাই করতে পারবে। কখন না জানি আবার বলে! মামা কোলে নাও, হাঁটতে পারছি না। এই মেয়ের ভরসা নেই।

-- ডিপ কল কি?

সাঈদ ঐশীর দিকে তাকালো! মেয়েটার সত্যিই করুণ অবস্থা। তাও ধান কাটা দেখবে। আবার আমাকে বলে ঘাড়ত্যাড়া।

-- ডিপ কল দিয়ে ক্ষেতে পানি দেয়।

-- সেই পানি খাওয়া যায়?

-- এমন অবস্থায় পড়লে অবশ্যই যায় ।

-- আচ্ছা ! আপনার আর কতগুলো ক্ষেত।

-- অনেক!

-- এজন্যই বুঝি আসতে যেতে লোক আপনাকে এত সম্মান করছে। আপনার সাথে হাঁটতে হাঁটতে তো নিজেকে আমার সেলিব্রেটি মনে হচ্ছে। যার সাথেই দেখা হচ্ছে। সালাম দিচ্ছে, কুশল জিজ্ঞেস করছে। কেউ কেউ তো হাতও মেলাচ্ছে।

সাঈদ হাসলো! হেসে বলল,--- এই দুনিয়াতে টাকার বিনিময়ে সব কিছু পাওয়া যায়। শুধু একটা জিনিস ছাড়া। সেটা হচ্ছে ভালোবাসা! এই লোকগুলো আমাকে ভালোবাসে। আমার ক্ষেতের জন্য না।

ঐশী দাঁড়িয়ে পড়লো ! দাঁড়িয়ে সাঈদের দিকে তাকালো। শান্ত ভাবে হেঁটে যাচ্ছে। এত কড়া রোদ তাও সে নির্বিকার। তাঁকে কাবু করার সাধ্য যেন কারো নেই। এই রোদ, রোদের তাপ সব কিছুই ক্ষুদ্র যেন তাঁর নিজের তেজের কাছে।

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 9 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন