ফন্ট সাইজ:
থিম:
সোনালী রঙের বুনোলতা

পর্ব 10

লেখক: নূপুর ইসলাম

#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১০

আসমা ঐশীর দিকে তাকিয়ে হাসলো। মেয়েটা মাটির চুলার পাশে মোড়া পেতে বসেছে। মাঝে মাঝে চুলার ভিতরে লাঠি দিয়ে এটা সেটা দিচ্ছে। মেয়েটা তাঁর ভারি পছন্দ। না শুধু সুন্দরের জন্য না। ব্যবহারের জন্যও। আজকাল মেয়েদের বাবা, মার টাকা পয়সা থাকলে অহংকারে মাটিতে পা ই পড়ে না। এই মেয়ের মধ্যে তেমন কিছু নেই। সাদাসিধে ধরনের! বুদ্ধি আছে! তবে প্যাচ এখনো বুঝে না। কথাও বলবে কি মায়া করে। একেবারে মনটা গলে যায়।

ঐশী তাকালো! দেখলো আসমা আন্টি তাকিয়ে আছে। সে হেসে বলল,--- আপনারা সব সময় এই চুলায়ই রান্না করেন ?

-- নারে মা! ভিতরে সাঈদ ব্যবস্থা করে দিছে। অল্প কয়েকজন মানুষই তো। তাই কষ্ট করে আর আসা হয় না। পিঠা চিরা করলে আসি। মাটির চুলার পিঠার স্বাদই আলাদা।

-- সত্যিই আলাদা। আমি পিঠা মেলা থেকে অনেক পিঠা খেয়েছি। তবে আপনার মতো এত স্বাদ হয়নি।

-- এখনতো পিঠা বলতে গেলে করিই না। খাওনের মানুষ নাই। সাঈদ, সাবিহা কেউই পিঠা খুব একটা পছন্দ করে না।

-- সব সময় পায়তো, তাই তাদের ভালো লাগে না।

-- তা ঠিক কইছো! তা তুমি রান্না বান্না কিছু পারো?

-- না আন্টি! শুধু রান্না বান্না কেন। আমি কিছুই পারি না। আমার কোন গুণ নেই। আমি হচ্ছি লবণ ছাড়া তরকারি।

আসমা হাসলেন! হেসে বললেন, --- কি কও মা?

-- দাদু বলেছে! গুণ ছাড়া রুপবতী মেয়ে লবণ ছাড়া তরকারির মতো।

-- ওমা তাই নাকি?

-- হ্যাঁ! আপনার তো বিয়ে হয়েছে। আপনার তো জানার কথা।

আসমা আহম্মকের মতো তাকিয়ে রইল। বিয়ে, লবণ ছাড়া তরকারির কি সম্পর্ক তিনি বুঝতে পারলেন না ।

সাবিহা দরজায় দাঁড়িয়ে খিল খিল করে হেসে উঠল। হেসে বলল ,---- গুণ ছাড়া রুপবতী
মেয়ে যদি লবণ ছাড়া তরকারি হয়। তবে গুণ ছাড়া রুপহীন মেয়ে কি হবে? মসলা ছাড়া তরকারি।

-- আমি জানি না! আমার এখনো বিয়ে হয়নি।

সাবিহার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাওয়ার মতো অবস্থা। সেই অবস্থায়ই বলল, --- আমার অবস্থা তোমার চেয়েও খারাপ। রুপ ও নেই, গুণ নেই। এখন আসোতো ! এক জায়গায় যাবো।

-- কোথায়?
-- যুথিদের বাড়ি?
-- যুথিদের বাড়ি! যুথি কে?
-- আমার জান! দু'দির ধরে আসছে না। চলো আজকে তাঁকে ধরে বেঁধে নিয়ে আসি।

ঐশী হাত ঝেড়ে হেসে উঠে দাঁড়ালো। সে অবশ্যই যাবে। সাবিহার জান বলে কথা। না আসলে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসবে।

ঐশী আর সাবিহা আঁতকে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালো। অতি দ্রুত গতিতে তিন চারটা বাইক গেছে তাদের পাশ দিয়ে । ঐশী বিরক্ত হয়ে বলল,--- এরা কি পাগল! এভাবে যাচ্ছে কেন?

সাবিহা কিছু বলতে যাবে। তাঁর আগেই বাইক গুলো আবার ফিরে এলো। একটা ছাড়া বাকি সব গুলো একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো।আর সেই একটা দাঁড়ালো একদম তাদের সামনে।

সাবিহার মুখ অন্ধকার হলো। সে ঐশীর হাত ধরে কাছে নিয়ে আসলো।
নাঈম হেলমেট খুলে হেসে বলল,--- কেমন আছো সাবিহা?
সাবিহা মুখ কালো করেই বলল,--- ভালো!

-- তোমাদের বাসায় নাকি ঢাকা থেকে মেহমান এসেছে। এই মেমসাহেব নাকি ?

-- হুম!

নাঈম হাসলো! হেসে ঐশীর দিকে তাকিয়ে বলল,--- ভালো আছেন আপনি?

ঐশী স্বাভাবিক ভাবেই বলল, ---- হুম ভালো! আপনি এভাবে রাস্তা দিয়ে উড়ে পুড়ে বাইক চালাচ্ছেন কেন? আরেকটু হলেইতো আমাদের লাগতো।

সাবিহা ঐশীকে চুপ থাকার জন্য হাত চেপে ধরলো। এই মেয়ে বুঝলে তো।

নাঈম হাসলো! তাঁর চোখ মুখ অন্য কথা বলছে ।

ঐশী না বুঝলেও সাবিহা বুঝলো। তা না হলে সেধে কথা বলার লোক এই ছেলে না। রাস্তার আশে পাশের মানুষকে এরা গোনায়ই ধরে না। তাঁর নিজেরই ভুল হয়েছে এই আগুনের গোলাকে নিয়ে একা বের হওয়া।

-- আমি দুঃখিত! আমি জানতাম না আজকাল আকাশের পরীরা রাস্তা দিয়েও হাঁটাহাঁটি করে।

ঐশী আবারো কিছু বলতে যাচ্ছিল! সাবিহা একপ্রকার টেনেই নিয়ে যেতে যেতে বলল,--- আসো আপু! আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

সাবিহারা চলে গেল! নাঈম সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। দূরের বাইকগুলো কাছে এসে চক্কর কাটতে কাটতে বলল,--- ফেসে গেছো বন্ধু! একদম ফেসে গেছো।

_____

সাঈদ আড়চোখে ঐশীর দিকে তাকালো! ঐশী মনোযোগ সহকারে মাছের কাটা বাছচ্ছে। আশে পাশের দিনদুনিয়ার কোন হুঁশ নেই। সে বসেছে বারান্দার দরজার সামনে মোড়া পেতে । হাঁটুর উপরে প্লেট রাখা। নিজে খাওয়ার চেয়ে দরজার বাইরে বিড়ালকেই খাওয়াচ্ছে বেশি।

তাঁরা নিজেরাও সবাই খেতে বসেছে বারান্দায় মাদুর পেতে। ভিতরে টেবিল আছে তবে এত মানুষে এক সাথে খাওয়া সম্ভব না। সে বলেছিল তাদের আগে খেতে। আনিস মামা গো ধরে রইলেন। খেলে সবাই এক সাথেই খাবে, তাহলে নেই। তাই কি আর করা এখানেই বসা।

সে সামনের দিকে তাকালো! যুথি তাকিয়ে আছে। সে বসেছে মায়ের পাশে। ভাত নাড়াচাড়া করছে। দৃষ্টি তার দিকে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। এই মেয়ে লিমিট ক্রস করেছে। দু-দিন আগে এক নাম্বার থেকে তাকে মেসেজ দিয়েছে। সে পড়েই বুঝেছে কে হতে পারে। সে আর কিছু বলেনি। উত্তরও দেয়নি! আনিস মামারা গেলে এর বিহিত করবে। আর কত? সবাই তাঁর নীরবতা কে দূর্বলতা মনে করে কেন?

যুথি করুণ ভাবে সাঈদের দিকে তাকালো। এ জন্যই সে এ দু-দিন আসেনি। সে সাঈদ ভাইকে অন্য কারো সাথে কল্পনাও করতে পারে না। এই যে সাঈদ ভাই খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে। আর কেউ না দেখলেও সে তো ঠিকিই দেখছে। এই দেখা যাতে না দেখতে হয় সেজন্যই আসেনি।

কি যে যন্ত্রনা সাঈদ ভাই আপনি কখনোও জানবেন না। মনে মনে বলেই যুথি ঐশীর দিকে তাকালো! সাদা কামিজ তাঁর গায়ে মিশে আছে। দেখতে ফুলের মতো লাগছে। যুথি দীর্ঘশ্বাস ফেললো! সে গ্রামের সাধারণ দেখতে সাধারণ মেয়ে। একে রেখে কি তাঁকে মনে ধরবে। আজ রুপ আছে বলে তোমার ভাগ্য কতটা সুপ্রসন্ন! সাঈদ ভাইয়ের মতো মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছে।

-- কিরে মা খাছ না ক্যা?
যুথি মলিন ভাবে হেসে বলল,--- জ্বর গেছেতো চাচি! মুখে এখনও স্বাদ আসে নাই।

আসমা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, --- আমাদের সবার খেয়াল রাখোস। তোর জ্বর একটু খবরও নিতে পারলাম না মা।

--- সমস্যা নেই চাচি! আমি জানি আপনরা ব্যস্ত ছিলেন।
--- হ রে মা একটু ব্যস্ত ছিলাম! আর সাবিহা তুইও তো পারতি একটু খবর নিতে?

সাবিহ মুখ বাঁকিয়ে বলল,--- আমিতো নিলাম! দেখনা নিয়ে একেবারে বগলদাবা করে হাজির হয়েছি। এই কথা বলতে বলতেই সাবিহা মনে করার ভঙি করে সাঈদ কে বলল, --- ভাই! যুথিকে আনার সময় নাঈম ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে।

সাঈদ স্বাভাবিক ভাবেই বলল, --- তো?

সাবিহা ঢোক গিললো! সে ভাই কে কিভাবে বুঝাবে।
আসলে! আমি ঐশী আপুকেও নিয়ে গিয়েছিলাম। সে বাইক থামিয়ে। সাবিহা চুপ হয়ে গেল! কি বলবে সে।

সাঈদের হাত থেমে গেছে। সে যা বুঝার বুঝেছে। নাঈম চেয়ারম্যান চাচার ছেলে। ঢাকা থেকে লেখাপড়া করেছে। বাবার মতো খারাপ না হলেও ভালোও না। বাবার টাকা থাকলে যেমন হয়। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার খাওয়ায় মনোযোগ দিয়ে শান্ত ভাবে বলল,--- সমস্যা নেই! আমি দেখবো।

______

ঐশী রুম থেকে বের হলো। দাদু আর কুসুম আপার যন্ত্রনায় রুমে টেকা যায় না। তাঁর হাতে মোবাইল। ইমরানের সাথে শেষবার কথা বলার শেষে মোবাইল বন্ধ করেছে তো করেছেই। আর ধরেই দেখে নি। তাঁর অবশ্য সমস্যা হয় না। মামার মোবাইল আছে। আম্মুর সাথে ঐইটা দিয়েই কথা বলে। সে পুকুর ঘাটে আসলো। কিছুক্ষণ আগেই সন্ধ্যা হয়েছে। চারিদিক নীরব। সে পুকুর পারে বসার জায়গায় বসলো। এখনও চাঁদের আলো ছড়ায়নি। তবুও তাঁর মনে হলো পানি চিকচিক করছে। তাঁর একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হলো। তবে সাহস হলো না।

সে মোবাইল অন করল! অন করতেই এক গাদা মেসেজ মিসকল আসতে থাকলো। সে তাকিয়ে রইল, তবে অপেন করল না।

-- এখানে কি করছেন?

ঐশী ভয়ংকর ভাবে কেঁপে উঠল! সাথে সাথে তাঁর হাত থেকে মোবাইল ছিটকে পড়লো। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,--- আপনি! আল্লাহ! আমার তো এখন জানই বেরিয়ে যাচ্ছিল।

সাঈদ হাসলো! সে গেইট দিয়ে ঢুকেই ঐশীকে দেখেছে। এক ধ্যানে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আছে। সে একবার ভাবলো, থাক! বসে আছে থাকুক! আবার কি মনে করে যেন এগিয়ে এলো। এই মেয়ে তাঁকে চম্বুকের মতো টানে। সে নিচু হয়ে মোবাইল তুললো! স্ক্রিন ফেটে গেছে। সেই ফাটা স্কিনে এক জনের নাম জ্বলজ্বল করছে। ইমরান!

সাঈদ দেখেও না দেখার ভান করে মোবাইল এগিয়ে ধরলো।
ঐশী হাত বাড়িয়ে নিল। তবে মোবাইলের মধ্যে তাঁর তেমন কোন আগ্রহ দেখা গেল না। সাঈদ নিজে থেকেই বলল,--- আপনি চাইলে কালকে আমি স্ক্রিন ঠিক করিয়ে দেবো।

-- তার দরকার নেই! এই মোবাইল আমার এমনিতো কোন কাজের না। আচ্ছা আপনি আমার সাথে একটু নিচে যাবেন।

-- কোন নিচে?

-- ঐ যে পানির সামনে। আমি পানি গুলোকে একটু স্পর্শ করবো। সাতার জানি নাতো। তাই ভয় করে। আপনি যাবেন সেফটি হিসেবে। যদি পড়ে যাই।

সাঈদ হাসলো! আনিস মামা বলেন এই মেয়ে বায়নার ডাব্বা। কাউকে একটু আপন মনে করলেই হয়েছে কাজ । বিনা সংকোচে আবদারের পর আবদার করতে থাকে। সাঈদ মনে মনে বলল,-- আমার সৌভাগ্য, যদি আমি তা পূরণ করতে পারি।

মুখে বলল,--- আসুন!

ঐশী হেসে সাঈদের সাথে এগুলো আর বলল,--- আপনি আমাকে তুমি বলতে পারেন। আমি মাইন্ড করবো না।

সাঈদ কিছু বলল না। সে জুতা খুলে কয়েক ধাপ পানিতে নেমে গেল। শীতল, ঠান্ডা পানি। সেখানে দাঁড়িয়ে ঐশীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো।

ঐশী তাকিয়ে রইল! সে যাবে কিনা বুঝতে পারল না। এই সন্ধ্যা, এই স্নিগ্ধ বাতাস, আকাশে রুপালি চাঁদ! সব তাঁকে কেমন জানি নেশা ধরিয়ে দিলো। সামনের এই মানুষটাকে আর দূরের কেউ মনে হলো না। মনে হলো একে বিশ্বাস করা যায়। চোখ বন্ধ করে করা য়ায়।

সে এগিয়ে গেল! হাতে হাত রেখে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আস্তে করে পানিতে পা ফেললো। ঠান্ডা পানির ছোঁয়া শিরশির করে পুরো শরীরে ছড়িয়ে গেল।

হাসি ফুটলো ঐশীর ঠোঁটে। আহ্! কি শান্তি! ঐশী চোখ বন্ধ করে ফেললো। সে ভুলেই গেলো একজনের হাতে হাত রেখে সে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে।

আর সাঈদ বুকের মধ্যে ঝড় আর চোখে মুখে এক রাশ মুগ্ধতা নিয়ে ঐশীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাঁর মনে হলো ঐ আকাশের চাঁদের সৌন্দর্য তার সামনের এই চাঁদের কাছে খুবই তুচ্ছ । তাঁর ঘোর লেগে গেল। সে আশপাশ দ্বিধা, দূরত্ব এই ঘোরে সব ভুলে গেল।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 10 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন