ফন্ট সাইজ:
থিম:
সোনালী রঙের বুনোলতা

পর্ব 11

লেখক: নূপুর ইসলাম

#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১১

আনিস আজকে তাঁর খাতা কলম নিয়ে বসেছে। নতুন একটা প্লট মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এখানে এসেছে পর থেকে সময় পাচ্ছে না। সাঈদের সাথে ঘুরতে ঘুরতেই সময় কোন দিক দিয়ে যাচ্ছে টেরই পাচ্ছে না। আজকে যদি একটু নামানো যায়। গল্প মাথায় ঘুরপাক খওয়া বড়ই যন্ত্রনাদায়ক। কোথায়ও ঠিক ঠাক ভাবে মন লাগানো যায় না।
ঐশী মামার পাশে এসে বসলো। তাঁর মুখটা ভার। আনিস ঐশীর দিকে না তাকিয়েও বুঝলো। সে কলম খাতা রেখে দিলো। তারপর ঐশীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,--- আমার মায়ের মন খারাপ?

-- মামা! আমরা ঢাকায় যাব কবে?
আনিস ভ্রু কুঁচকালো! তাঁর ধারণা ছিল। ঐশীর এখানে ভালো লাগছে! মজা করছে, হাসি খুশি আছে। তাহলে হঠাৎ কি হলো?

-- তুমি যেদিন বলবে সেইদিনই যাব।

-- তাহলে চলো আজকেই যাই।

-- তুমি বললে অবশ্যই যাব! তবে আমি কি জানতে পারি হঠাৎ এই ডিসিশানের কারণ কি ? কোন সমস্যা হয়েছে?

ঐশী মুখ আরো অন্ধকার করে ফেললো! আসলে বলতে গেলে কোন সমস্যা নেই, আবার আছেও। সে সাঈদ ভাইয়ের সামনে পড়তে চাইছে না। তাঁর ধারণা সাঈদ ভাই তাঁকে পছন্দ করে। কালকে যখন পানিতে নামলো। সে হুশ, জ্ঞান, সব হারিয়ে ফেললো। ওভাবে হাত ধরে অতটা কাছাকাছি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল ঐশী জানে না। তবে যখন চোখ খুললো। সে থমকে গেল। সাঈদ ভাই তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁর চোখে মুখে মুগ্ধতার নেশা। এই নেশা যে কোন মেয়েকে কাবু করে ফেলার জন্য যথেষ্ট । আর তাঁকেও করে ফেললো! সেই নেশায় ই সে একটা লজ্জাজনক কাজ করে ফেলেছে। সে আরো এগিয়ে গেছে! একদম কাছাকাছি। নিজের অজান্তেই হাতে রাখা হাত ধীরে ধীরে উঠে গেছে খোঁচা খোঁচা ঐ দাঁড়ির গালে। অন্য রকম একটা ঘোর। দিন দুনিয়ার কোন হুশ নেই। শুধু দুজনের নিশ্বাসের উষ্ণতায় দুজনে মাখামাখি। আরেকটু হলেই! ঐশী কেঁদে ফেললো। সেই সময় যদি সাঈদ ভাইয়ের ফোন না বাঁজতো।

ঐশী আর ভাবতে পারল না। সে কিভাবে করল। সে এই নেশা ইমরানের চোখে দেখতে চেয়েছিল। ইমরানের সাথে তাঁর সম্পর্ক শেষ হলো মাত্র দু-দিন। এর মধ্যেই সে এরকমন একটা কাজ কিভাবে করল? আর সাঈদ ভাই! সেই আমাকে এখন কি ভাববে? লাজলজ্জাহীন মেয়ে ছিঃ।

-- আরে আরে কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে?

-- আমি তোমাকে বলতে পারবো না মামা। কিছুতেই বলতে পারবো না। আমি আবারো ভুল করেছি। বিরাট রকমের ভুল।

আনিস অবাক হলো! এইখানে বিরাট রকমের ভুল কি করতে পারে, সে বুঝতেই পারল না।

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঐশীর হাত নিজের হাতের মধ্যে নিলো। নিয়ে বলল,--- আচ্ছা বলতে হবে না। আমারা মানুষ! রোবটতো না! আমাদের ভুল ভ্রান্তি হবেই।

-- আমি একটু বেশিই করি মামা!

আনিস হালকা হাসলো! ---- এখনো কখন কি করতে হবে বুঝে উঠতে পারো নাতো। এজন্যই করো। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। আসলে কি জানো? এই ভুলে ভরা এই বয়সটাই সবচেয়ে সুন্দর। তুমি যখন আরো সামনে এগিয়ে যাবে। সব কিছু চিন্তা ভাবনা করে করবে। তখন মনে হবে, আরে ঐ সময়টাইতো ভালো ছিলাম। হাসি ছিল , কান্না ছিলো, ভুল, ভ্রান্তিও ছিল। এখন তো জীবন পানসে হয়ে গেছে।

-- সত্যিই?

-- মামা কখনো ভুল বলে?

ঐশী ফুঁপাতে ফুঁপাতে দু- পাশে মাথা দুলালো যার অর্থ ,-- না।

-- এখনো পালাতে চাও।

ঐশী এবারো মাথা নাড়লো! তবে এবার বললো হ্যাঁ।

-- পালিয়ে যাওয়া টা কি ঠিক হবে! ভুল যতই বড় হোক সামনা সামনি হওয়া উচিত। তা না হলে সারাজীবন বহন করতে হয়। আমি একশ পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। তুমি ঢাকায় গিয়েও শান্তি পাবেনা।

-- তাহলে আমি কি করবো?
-- কিছুই করার দরকার নেই! তুমি তোমার মতো থাকো।
-- কতদিন?
আনিস হাসলো! হেসে বলল,--- এটাতো আমাদের বাড়ি না যে সারা জীবন থাকবো। একদিন আগে হোক পরে হোক যেতে তো হবেই। সেই যাওয়াটাই দু-দিন পরে যাই। পাশের গ্রামে মেলা। আবার কবে না কবে আসি। মেলাটা একটু দেখে যাই।

ঐশীর কান্না থেমে গেছে। সে অস্থির হয়ে বলল,--- মামা! আমিও যাবো।

-- হ্যাঁ! অবশ্যই! তোমাকে ছাড়া আমি মেলায় যাব নাকি?

ঐশী হাসলো! তখনই কাদের এসে দরজায় টোকা দিলো।
আনিস দেখে বলল,--- কি ব্যাপার কাদের?

-- চেয়ারম্যান চাচা আইছেন! আপনের সাথে কতা কইবার চায়।

আনিস ভ্রু কুঁচকালো!
-- আমার সাথে?

-- জ্বে মামা!

-- সাঈদ কোথায়?

-- ভাইজান বাসায় নাই! তয় ফোন করা হইছে। আসতেছে।

আনিস কতক্ষণ বসে রইল! চেয়ারম্যানের সাথে তাঁর কি কাজ। বুঝতে পারল না। সে উঠে দাঁড়ালো! দেখা যাক! সে ঐশীর মাথায় হাত বুলিয়ে বেরিয়ে গেল।

সাঈদ বসার রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো! রুমের এক পাশে মিষ্ট, ফলমূলের বাহার। তাঁর হাসি পেল। চেয়ারম্যান চাচা কেন এসেছে। তাঁর বুঝতে আর বাকি রইল না। সে আনিস মামা,আর মার দিকে তাকালো! তাঁরা কাঠের মতো চুপচাপ বসে আছে। যেন তাদের মাথায় বন্দুক রাখা হয়েছে। অবশ্য এই লোকের কথা বার্তাই এমন। এই লোকের সাথে কথা বলার চেয়ে মানুষ হেসে হেসে গুলি খাওয়া বেশি পছন্দ করবে।

সাঈদ সালাম দিয়ে ভিতরে আসলো।

-- ওয়ালাইকুমুস সালাম! তা কি খবর তোমার?

-- ভালো চাচা! আপনি কেমন আছেন?

-- ভালো।

-- হঠাৎ আমার বাসায়! কোন দরকার চাচা?

-- হ্যাঁ! দরকার তো অবশ্যই আছে। তা না হলে এমনি এমনি কি আমি আসার লোক।

সাঈদ আবারো হাসলো! হেসে বলল,--- কি দরকার চাচা?

--- আমি আমার নাঈমের জন্য ওনার ভাগ্নিকে চাই। ছেলে আমার গো ধরেছে। সে বিয়ে করবে। আরে বিয়ে করবি কর। মেয়ের কি অভাব আছে। এই ইদরিসের নাম শুনেই মেয়ের বাবা হেসে হেসে মেয়ে দিয়ে দেবে। তা না! সে এই ঢাকার মেয়েকেই বিয়ে করবে। আরে ঢাকার মেয়েরা কি সংসারী হয়? তাঁরা হয় উড়নচন্ডী। এই ছেলেকে কে বোঝাবে?

সাঈদ নির্বিকার ভাবে বলল,--- আপনি?

ইদরিস বুঝতে পারল না! সে ভ্রু কুঁচকে বলল,--- কি বললা ?

-- ঐ যে বললেন না! কে বুঝাবে! সেটাই বললাম। আপনি বুঝাবেন।

-- মানে কি বলতে চাও তুমি!

-- আপনার যোগ্য ছেলের জন্য মেয়ের অভাব হবে না। এই ঢাকার মেয়ে না হয় বাদই থাক।

ইদরিস রাগে ফুঁসলেন।
-- তুমি আমাকে না করছো!

সাঈদ শান্ত ভাবে বলল, --- হ্যাঁ।

-- তুমি না করার কে? এখানে মেয়ের গার্ডিয়ান আছে।

সাঈদ হাসলো! তবে আর কিছু বলল না।

ইদরিস আনিসের দিকে তাকালো! বলল,--- আপনার কি মত? আমার ঘরের বউ হলে আপনার ভাগ্নি রাজরানীর মতো থাকবো।

আনিস বড় একটা শ্বাস ফেলল। তারপর বলল,--- আমার মেয়ে এমনিতেই রাজরানী। তাঁকে বিয়ে দিয়ে রাজরানী বানানোর প্রয়োজন নেই। ওর বাবা এই গ্রামেরই ছেলে। নাম ডাক তো আপনার শোনারই কথা। যাইহোক! আপনাকে আমি অসম্মান করছি না। মেয়ে থাকলে মেয়ের সম্বন্ধতো আসবেই। তবে আমি আপনার কথা রাখতে পারছি না। আমি দুঃখিত!

ইদরিস উঠে দাঁড়ালো! রাগে তাঁর শরীর কাঁপছে। তাঁকে না করা। মেয়ে নিয়ে এতো দেমাগ! সব এই সাঈদের জন্য। এর ফল সে দেখাবে। সাঈদকেও আর এই মেয়েকেও। সেও দেখবে সসম্মানে এই মেয়ে কিভাবে এই গ্রাম থেকে বের হয়। সে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল! কাদের তাঁর চেলাবেলার হাতে ফলটল ধরিয়ে দিলো। এসব তাঁদের দরকার নেই।

--------

ঐশী সারাদিন আর রুম থেকে বেরোয়নি। বালিশে মুখ গুজে পড়ে আছে। সে কি করবে? চোখ খুললেই সাঈদের সেই চেহেরা মুখের সামনে ভাসছে।

-- কিরে এমনিতে তো রাত ছাড়া রুমেই আসিস না। আজ বালিশে মুখ ডুবিয়ে বসে আছিস! ব্যাপার কি? বালিশের সাথে আবার প্রেম ট্রেম হলো নাকি।

-- হ্যাঁ! প্রেম হয়ে গেছে! এখন পারলে বিয়েও দিয়ে দাও।

-- তা না হয় দিলাম! বাকি সব করবি কিভাবে?

ঐশী তরিৎ করে উঠে বসলো! কি বলে এই বুড়ি?

সাহানা অবশ্য সেই দিকে তাকালেন না। সে মাথায় মেহেদি দিয়েছে। সোজা হয়ে বসে থাকতে থাকতে পিঠ ধরে গেছে। সে নড়েচড়ে বসে বলল,--- কি জানি বাপু! আজকাল অবশ্য সবই সম্ভব। কত কিছুই তো শুনি।

-- দাদু! ঐশী চোখ কান বন্ধ করে চিৎকার দিলো।

হঠাৎ চিৎকারে সাহানা কেঁপে উঠেছে। আবাক হয়ে বলল, --- আরে ষাঁড়ের মতো চেচাচ্ছিস কেন?

-- তুমি কি বলছো?

-- আমি আবার কি বললাম?

ঐশী ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ধপ করে আবার শুয়ে পড়লো। একে কিছু বলে লাভ নেই। পড়ে দেখা যাবে সত্যিই বালিশের সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে।

সাহানা হাসলো! কাল রাতে কিছু যে একটা হয়েছে সে জানে। কাল সন্ধ্যার পরে এই মেয়ে উদভ্রান্তের মতো দৌড়ে এসেছে। পায়জামা নিচের দিকে অনেকটাই ভেজা। পুরো শরীর কাঁপচ্ছে। সে ভাবলো ভয় টয় পেল কিনা। সে জিজ্ঞেস করল! এই মেয়ে আমতা আমতা করেছে। সে ঐশীকে চেনে! এই হাতের মধ্যেইতো বড় হলো। তাঁর চেহেরা দেখেই আন্দাজ লাগাতে পারে কি হতে পারে। সেই আন্দাজে অবশ্য ঘি ঢেলেছে ঐশীই। সাঈদ যতক্ষণ বাড়িতে ছিল এই মেয়ে বেরোয়নি। নাস্তা খেতেও না। চলে যাওয়ার পরে বের হয়ে খেয়েছে। বুদ্ধিমতিদের জন্য একটা ইশারাই যথেষ্ট। আর সাহানা সেতো বুদ্ধিমতিদের নানি, দাদি। সে আফসোসের সুরে সুর তুলে বলল,--- আহারে সময়,রঙিন সময়,যদি পারতাম, সোনায় দিয়ে বাঁধিয়ে রাখতাম।

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 11 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন