ফন্ট সাইজ:
থিম:
সোনালী রঙের বুনোলতা

পর্ব 12

লেখক: নূপুর ইসলাম

#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১২

সাঈদ ঐশীর দিকে তাকালো। সাবিহার হাত ধরে ধীরে ধীরে হাঁটছে। মেলার মানুষের ভিড়ে সে ওষ্টাগত। আগে অবশ্য আনিস মামা আছে। সেই বেচারা খুব কষ্টে তাদের জন্য রাস্তা ক্লিয়ার করছে। সাঈদ নিজেই যেত। তবে ঐশীর জন্য যাচ্ছে না। এই মেয়েটার সাথে তার কথা বলা দরকার। তবে পারছে না। মেয়েটা তাকে এড়িয়ে চলছে। সেই দিনের পর থেকে মেয়েটা বলতে গেলে একপ্রকার তার সামনেই আসেনি। এক বাসায় থেকে তো আর পুরোপুরি গায়েব হওয়া যায় না। তাই যাও এসেছে গোমড়া মুখ, আর লজ্জায় মাথা নিচু করে। এই লজ্জারাঙা মুখটা দেখতে সাঈদের ভালো লাগে আবার কষ্টও দেয়। তার জন্যই মেয়েটা কমফোর্টেবল হতে পারছে না । সেই দিন তার ফোন বাজতেই ঐশীর ঘোর কেটে গেছে। নিচে পিছল সিঁড়ি। ঘোর কাঁটতেই ছিটকে দূরে সরতে গিয়ে আবার উলটে পড়ে যাচ্ছিল। সাঈদ আবার আঁকড়ে ধরেছে। আঁকড়ে ধরলেও ঐশী আর তার দিকে তাকায়নি। সে থরথর করে কাঁপছিল! সাঈদের এত মায়া লাগলো। একবার বলতে ইচ্ছে করল,

--- ভয় পেয়োনা ঐশী! কিছুই হয়নি! এটা একটা এক্সিডেন্ট ছিল। তোমার কোন দোষ নেই। তবে বলা হয় নি। সে কোন রকম উপরে উঠেই দৌড়ে চলে গেছে।

সাঈদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো! মেয়েটার সাথে সত্যিই একটু কথা বলা দরকার।

-- তুই চাইলে আমি ব্যবস্থা করতে পারি।

সাঈদ ভ্রু কুঁচকে তুহিনের দিকে তাকালো।
-- কিসের ব্যবস্থা?

-- হয়েছে এতো ঢং করতে হবে না। এসেছো পর থেকে কোথায় নজর সেটা আমি ভালো করেই দেখেছি।

-- আমার নজর সব সময় যেখানে থাকে সেখানে আছে। তাই আপনিই বরং ঢং বন্ধ করেন।

তুহিন হাসলো! ঝট করে এগিয়ে গিয়ে সাঈদের চোখে হাত রাখলো।

সাঈদ বিরক্ত হলো।
-- কি করছিস?
-- এখন বলতো সাবিহা কি রঙের জামা পরেছে?
-- আমিতো বললামই! আমার নজর সব সময় যেখানে থাকে সেখানে। তাই সাবিহা কি রঙের জামা পরেছে বলতে পারবো না। আজ কেন কখনোও পারবো না।

তুহিন রহস্য ভাবে হাসলো! হেসে বলল,--
-- তাহলেতো এটাও বলতে পারবি না! আমাদের ঐশী আপা কি রঙের জামা পরেছে।

সাঈদ না বলতে গিয়েও থমকে গেল ! ঐশী আজ পার্পেল কালারের জামা পরেছে। তার সাথে ম্যাচিং করে ছোট পাথরের এয়ারিং ও পরেছে। বাসা থেকে এখানে আসা পর্যন্ত সে ঐশীর দিকে হাজার বার তাকিয়েছে।

তুহিন চোখ থেতে হাত সড়িয়ে নিজের চুলে হাত বুলিয়ে বলল,---- আমাদের সন্নাসী সাঈদের চরিত্রে দা...গ লেগেছে।

সাঈদ এমন ভাব করল সে কিছু শুনেই নি। সে এগিয়ে গেল।

তুহিনও দৌড়ে তার পাশে এসে বলল,--- যতই পালাও ব্যাটা লাভ নেই। তুহিনের নজর থেকে বাঁচা এত সোজা না।

-- বাদ দে! ভালো লাগছে না।

-- নো টেনশন ইয়ার। ভালো লাগার ব্যবস্থা আমি করছি। তবে আজ একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত হলাম।

-- কোন বিষয়ে?

তুহিন মিচকে হেসে বলল,--- আমাদের সাঈদ বাবুর সব মেশিন তাহলে একদম ঠিক।

-- শালা! তোকে তো আমি! সাঈদ বলতেই তুহিন দৌড় লাগালো। ভিড় ঠেলে ঐশীদের দিকে এগিয়ে গেল।

-- ঐশীরা ফুসকার দোকানে বসেছে। তুহিন এসে বলল, --- ঐশী আপু একটু আসোতো একটা জিনিস দেখাবো।

ঐশী ফট করে দাঁড়িয়ে চোখে মুখে আগ্রহ নিয়ে বলল,--- কি ভাইয়া?

-- আগে বলা যাবে না! সারপ্রাইজ! আসোতো।
সাবিহা ও ফট করে দাঁড়িয়ে বলল,--- তুহিন ভাই আমিও দেখবো।

তুহিন বড় একটা শ্বাস ফেলে আনিসের দিকে তাকিয়ে বলল,--- আর আপনি! আপনি দেখবেন না।

আনিস মাছি উড়ানোর মতো ভঙি করে বলল,---- দূর হও! ভূমিকম্প হয়ে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেলেও সে এখন উঠবে না। মানুষের ভিড়, গরমে তার অবস্থা খারাপ।

তুহিন মিষ্টি করে হেসে বলল,--- সাবিহা তুমি দু- মিনিট বসো। এত ভিড়ে আমি দুজনকে সামলাতে পারবো না। আগে ঐশীকে দেখিয়ে আনি। তারপর তোমাকে নিচ্ছি। অফুরন্ত সময় । পালিয়েতো যাচ্ছে না।

এত মিষ্টি কথা? সাবিহার সন্দেহ হলো। এই মানুষতো তার সাথে ধমক ছাড়া কথাই বলে না। তবে বুঝতে পারলো না গড়মিলটা কোথায়? সে ভ্রু কুঁচকে আবার বসলো।

ঐশী তুহিনের সাথে এগিয়ে গেল। ভিড় ঠেলে কোন দিকে এলো বুঝতে পারল না। পাশে তাকাতেই দেখে তুহিন নেই। সে ভয় পেয়ে গেল। আশে পাশে তাকিয়ে ঢোক গিলে পেছনে ঘুরতেই দেখলো সাঈদ দাঁড়িয়ে আছে। সে লজ্জার কথা ভুলেই গেল। এগিয়ে গিয়ে ফট করে হাত আগলে ধরে বলল,--- সাঈদ ভাই! আমি হারিয়ে গেছি। তুহিন ভাই কোথায় গেল?

সাঈদ হেসে ফেললো! সে কখনো প্রাণ খুলে হাসে না। তবে আজ হাসি আর রাখতে পারল না।

ঐশী তাকিয়ে রইল! আর তখনই ফট করে সে দিনের কথা মনে পড়ে গেল। আর পড়তেই হাত সরিয়ে নিল। অস্বস্তিতে চোখ নামিয়েও ফেললো।

সাঈদ সবই খেয়াল করল! হাসি থামিয়ে শান্ত ভাবে বলল,--- তুমি হারিয়ে যাওনি! আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাইছিলাম। তুহিন শুধু ব্যবস্থা করেছে।

ঐশীর শরীর শিরশিরিয়ে উঠল। সাঈদ ভাই তাকে তুমি করে বলছে। সাথে সাথেই তার সেদিন রাতের কথা মনে হলো। সে নিজেই তো তাকে তুমি বলতে বলেছিল। ঐশী আরো অস্বস্তিতে পড়ে গেল। তুমিতো আর আজকে কারো কাছ থেকে প্রথম শুনছে না। তবুও বুকের ভিতরে এমন লাগছে কেন?

সাঈদ স্বাভাবিক ভাবেই ঐশীর হাত ধরলো। টেনে সাইডে যেতে লাগলো। তার একটু নিরিবিলি জায়গা দরকার।

--- এখানে বস! এত কাঁপাকাঁপির কিছু নেই। আমি শুধু একটু কথা বলবো।

ঐশী ধপ করে বসে পড়লো। তার শরীর সত্যিই কাঁপছে। তারা এসেছে মেলার পেছন সাইডের একটু দূরে । মোটা একটা গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে। ঐশী সেখানেই বসলো।

সাঈদ তার পেছনে দাঁড়ানো। সে সামনে আসেনি। সেখান থেকেই বলল,--- আমার বলার মতো কোন ছেলে বেলা নেই। সংগ্রাম আর সংগ্রাম। দু- মুঠো ভাতের সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম জীবনে ছায়ার মতো পাশে একজন কেই পেয়েছি। তার সাথে আমার কোন রক্তের সম্পর্ক নেই। গ্রামের জমিজমা দেখতে এসেছে। এসে আমাকে দেখেছে। কিছু কিছু মানুষ ভালোবাসার অসীম ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। আনিস মামা হচ্ছে সেই রকম মানুষ। তিনি আমাদের এখানে আগেও এসেছে। আমার সাথে মাঠে মাঠে ঘুরতো,বন্ধুর মতো হাজার রকমের কথা বলতো। সেই হাজার রকম কথার মধ্যে একটা নামই ঘুরে ফিরে আসতো। ঐশী! আমি কখনো তোমাকে দেখেনি। তবে তোমার কথা শুনতে শুনতে আমার প্রায়ই দেখার ইচ্ছা হতো।

তবে তখন ইচ্ছা নিয়ে ভাবার মতো অবস্থা বা সময় কোনটাই আমার ছিলোনা। দিন যেতে থাকলো। আমার দিন সময় ঘুরতে লাগলো। আস্তে আস্তে সব বদলে গেল। শুধু বদলালোনা আমার ইচ্ছা। সেই ইচ্ছাকে আমি কখনো সায় দেই নি। আমি নিজের অবস্থান জানি। যদি সায় দিতাম বামুন হয়ে চাঁদ ধরার মতো দুঃসাহসিক কাজ হয়ে যেত।

যাইহোক! মামা একদিন ফোন দিলেন! ঊনিশে মে এর মধ্যে তার একটা পেঁচা চাই। ঊনিশে মে কি আমি জানি। তোমার জন্মদিন! এটা এমন কোন কাজ না। তিনি চাইলেই অনায়াসেই জোগার করতে পারেন। আমাকে কেন বললেন, --- এটা আমি একবারও চিন্তা করলাম না। তিনি বলছেন এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। জোগার করে আমি তাঁকে ফোন দিলাম। পাঠিয়ে দিচ্ছি সেটাও বললাম। সে শুনে বললেন,
--- আমি যেন কষ্ট করে ঊনিশ তারিখে নিজেই নিয়ে যাই। তখন আমার মনে একটু খটকা লাগলো। ছোট বেলা থেকে মানুষের এত রুপ দেখেছি। মানুষের হাবভাব দেখলেই বুঝে যাই কি করতে চাইছে। তবুও আমি গেলাম। খারাপ মানুষ চাল চালে সূক্ষ্ম । বোঝার উপায় থাকে না। ভালো মানুষের চাল হয় মোটা, যেটা অনায়াসেই ধরা যায়। আনিস মামারটাও সে রকম। আমি ড্রইং রুমে বসে আছি। আমার ফোন বাজচ্ছে । ড্রইং রুমের পাশেই তোমার ফুপুরা হৈ চৈ করছে। মামা চাইলেই বলতে পারতেন, ---" সাঈদ আমার রুমে যাও। সেখানে আরামছে কথা বলো। "

কিন্তু না! সে আমাকে বললেন, --- সাঈদ বাগানের সাইডে যাও,সেখানে নিরিবিলি আছে। কথা বলতে সুবিধা হবে।

আমি বেরিয়ে এলাম। এসেই থমকে গেলাম। মাত্র ছয় সাতটা সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে নামতেই তোমার নাজেহাল অবস্থা। সেই নাজেহাল অবস্থাই আমি মুগ্ধ হয়ে দেখলাম। সেই মুগ্ধ হয়ে দেখতে দেখতেই তোমার শখের গাছকে ভর্তা বানিয়ে ফেললাম। মামা আমাকে চেনেন। চেনেন বলেই তিনি তার ইচ্ছার কথা আমাকে কখনো জানায়নি। সে চাইছিলো তাঁকে ভালোবেসে না। তোমাকে যেন ভালোবাসি। তোমার প্রেমে পড়ি। তাই সে চাইছিলো অন্তত একবার আমাদের দেখা হোক।

কারণ সে জানে! তার অতি প্রিয় ভাগ্নিকে যে একবার দেখবে, ভালো না বেসে থাকতেই পারবেনা। আর আমিতো সেই হতভাগা যে তোমাকে না দেখেই ভালোবেসে বসে আছি । আমি সব সময় সোজা কথা বলতেই পছন্দ করি। তাই সোজা ভাবেই সব বললাম। আমার ভালোবাসা আমার! এখানে তোমার কোন দায় নেই। আমি আমার সব কিছুই কন্ট্রোল করতে পারি। ভালোবাসাও! এই পর্যন্ত করেও এসেছি। শুধু সেইদিন রাতে ভেঙে গিয়েছিলাম। সেখানে তোমার কোন দোষ নেই। শুরুটা আমিই করেছিলাম।

সাঈদ সামনে আসলো। এসে হাঁটু গেড়ে সামনে বসলো। তবে অনেকটা দূরত্বে।

ঐশী বুঝলো তবে চোখ তুলে তাকালো না। তার চোখে টলমলে পানি। চোখ তুলে তাকালেই টুপ করে পড়বে। সে তা চাচ্ছে না। সেই দিন মামা তাহলে সাঈদের গল্পই বলেছিল।

সাঈদ নরম সুরে বলল, --- ঐশী সেই রাতের কথা ভুলে যাও! মনে করো সেই রকম কিছু হয়ই নি। তোমাকে এই গোমড়া মুখে মানায় না। এই মুখে শুধু হাসিই মানায়। আর তুমি এমন কিছু করোনি । যে লজ্জায় লুকিয়ে থাকতে হবে। আমি নিজেকে সরিয়েই রাখবো। তবে যে দু-দুদিন আছো। আগের মতো হাসো, ঘুরো,মজা করো। এভাবে চলে গেলে আমার খুব খারাপ লাগবে।

সাঈদ উঠে দাঁড়ালো! পকেট থেকে মোবাইল বের করল। সেই দিন ঐশী সেখানেই ফেলে এসে ছিল। সে এগিয়ে দিল। এগিয়ে দিতেই ফোনের আলো জ্বেলে উঠল। ম্যাসেজ এসেছে। ম্যাসেজের সাথেই লেখা, ইমরান 125 মিসড কল।

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 12 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন