#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৩
সাঈদ বাইক বের করছিল। ঐশী এসে হাজির। সাঈদ দেখলো তবে কিছু বলল না। মেয়েটা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। সেইদিন মেলায় থেকে তাঁর সাথে এসেছে একদম চুপচাপ। কোন কথা বলেনি। চোখ তুলে তাকাওনি। তবে সাঈদ জানে তাঁর চোখ ভর্তি ছিল পানি । সাঈদ এমন ভাব করেছে সে দেখেইনি। বাসায় এসেও চুপচাপ। তবে তারপরের দিন থেকে তাঁর সাথে কথা না বললেও ব্যবহার স্বাভাবিক। অন্তত লুকিয়ে থাকিনি। ঐশীরা কাল চলে যাবে। যাক! চলে গেলেই ভালো। যত চোখের সামনে থাকবে ততই নানা রকম ইচ্ছা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। কি দরকার! সে ভালোবেসেই ভালো আছে। পাওয়ার আশা কখনো করেনি। সাঈদ বাইকে চড়ে বসলো। স্টার্ট দেবে এমন সময় ঐশী বলল,--- আমি বাইকে উঠব!
সাঈদ অবাক হলো। ঐশী স্বাভাবিক আচরণ করলেও তাঁর সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলবে এটা আশা করে নি।
সাঈদ শিওর হওয়ার জন্য আবার জিজ্ঞেস করল,--- কোথায় উঠবে?
ঐশী স্বাভাবিক ভাবেই বলল,--- বাইকে।
সাঈদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,--- আমার একটু কাজ আছে। আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তুমি না হয় অন্য কোন সময় উঠো।
-- আমি কালকে চলে যাব।
সাঈদ হালকা হাসলো!
-- বাংলাদেশে আমি নিশ্চয়ই একা বাইক চালাই না। তুমি ঢাকায় গিয়েও ঘুরতে পারবে। আনিস মামাকে বললেই হবে।
-- কিন্তু আমি গ্রামের এই পথে ঘুরতে চেয়েছি। সেই প্রথম দিন! যখন আপনি আমাদের রিসিভ করতে গেলেন। আমার খুব ইচ্ছে করছিল উঠতে। তখন আপনাকে দেখতে পারতাম না তো। তাই বলিনি।
সাঈদের খুব বলতে ইচ্ছে করল, -- এখন কি দেখতে পারো। তবে নিজেকে দমালো। সে চাচ্ছে না আর এমন কোন কথা হোক। যাতে ঐশী অস্বস্তিতে পড়ে। সাঈদ একটু চিন্তা করল! সে যাবে এখন পাশের গ্রামে। সেখানে তাঁর কয়েকটা ক্ষেত আছে। ক্ষেতে পানি দরকার। তাঁর এক লোক ফোন করে বলল! ডিপকল নাকি বন্ধ। কেন বন্ধ সেটাই জানতে যাওয়া। তারপর আরেক জায়গায়! কি নাকি ঝামেলা হয়েছে। সেখানে অবশ্য তুহিন আছে। সেটা বাদ দিলে সন্ধ্যার আগে আগেই আসা যাবে। তাই সে বলল,-- আচ্ছা! আসো।
ঐশী খুশি হলো! এগিয়ে গিয়ে বলল,--- কিভাবে বসবো?
--- তুমি এর আগে কখনো বাইকে ওঠোনি?
--- না!
সাঈদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো! সন্ধ্যার আগে ফিরতে পারবে বলে মনে হয় না। সে যে ভাবে বাইক চালায়। সে ভাবে গেলে আসা যেত। অথচো যে মেয়ে আজ পর্যন্ত বাইকেই উঠেনি। তাঁকে নিয়ে আর যাই হোক তাঁর নিজের মতো বাইক চালানো সম্ভব না।
--- এভাবে বসে এখানে পা রাখ। পেছনের ই গুলো শক্ত ভাবে ধরো।
ঐশী ধীরে ধীরে উঠে বসলো। তাঁর শরীর কাঁপছে। সে পেছনে না ধরে সাঈদের পিঠের শার্ট খামচে ধরলো।
সাঈদ থমকে গেল! ঐশীর নখ সাঈদের পিঠে লেগেছে। ভালো করেই লেগেছে । অবশ্য মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। তাঁর হাতের দাগ এখনো যায়নি। এখন আবার পিঠে। এই মেয়ে চাইছে কি? যাওয়ার আগে এতটা পাগল না বনালেই নয় কি?
সে ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো , --- বসেছো?
ঐশী হাঁফ ছেড়ে বলল,--- হ্যাঁ!
সাঈদ একবার পেছনে তাকালো। এই মেয়ে তালে বেতাল। জামা ঠিক গুয়েছিয়ে বসেছে কিনা তা সে চেক করল। করে বাইক স্টার্ট দিল। দিয়ে টান দিতেই ঐশী সাঈদের পিঠ ধাক্কা খেলো। ধাক্কা খেয়ে কাঁধ আরো শক্ত করে ধরলো।
সাঈদের হাত কাঁপছে। সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। যে ছেলে উড়াধূড়া বাইক চালাতেও বুক কাঁপেনি। আজ নরমাল স্পিডে চালিয়ে নিতেও ঘাম ঝরে যাচ্ছে। সে কোন রকম বলল,---
--- ঠিক আছো?
--- হুম! তবে একটু ভয় করছে।
--- কারো কথা তো শুনো না। পরে টরে গেলে, মামা আমাকে এই বাইক দিয়েই ভর্তা বানিয়ে ফেলবে।
ঐশী চোখ মুখ কুঁচকে বলল ---- কে বলেছে? আমি সবার কথা শুনি।
সাঈদ লুকিং গ্লাসে ঐশীর মুখ দেখে হাসলো --- হুম! তা তো দেখতেই পাচ্ছি ! এক নাম্বারের ঘ্যাড়ত্যাড়া তুমি !
--- মোটেও না! আমি খুব ভালো মেয়ে। ঘ্যাড়ত্যাড়া তো আপনি। দেখেন না কথায় কথায় ভর্তা বানান।
সাঈদ আবারো হাসলো! তাঁর জীবনে শ্রেষ্ট সময়গুলো কেমন জানি হঠাৎ করেই আসে । এই যে ঐশী তাঁর পেছনে বসা। এটা কি কখনো কল্পনা করেছে।
দাঁড়ান! দাঁড়ান! প্লিজ একটু দাঁড়ান ।
সাঈদ ব্রেক মারলো। চিন্তিত ভাবে বলল,--- কি হয়েছে?
ঐশী মুগ্ধভড়া চোখে বলল,--- কি সুন্দর দেখেন।
--- কি?
ঐশী হাত উঁচিয়ে দেখালো।
--- ঐ যে সোনালি রঙের বুনোলতাগুলো।
সাঈদ বড় একটা শ্বাস ফেললো! সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
--- ওগুলোর নাম স্বর্ণলতা।
--- কি সুন্দর তাই না। অলঙ্কারের মতো গাছটাকে সাজিয়ে রেখেছে।
--- হুম!
--- আমাকে কতগুলো এনেদিন। আমি নেবো।
সাঈদ বাইক স্টার্ট দিতে দিতে বলল,--- আসার সময় নিতে পারবে। এখান দিয়েই তো যাব। এখন চলো। তা না হলে আসতে দেরি হয়ে যাবে।
সন্ধ্যা নামো নামো করছে। যে কোন সময় আযান দিয়ে দেবে। সাঈদ মামুনকে বারবার ফোন দিচ্ছে। ধরার খবর নেই। মানুমই এই ডিপকলের দায়িত্বে আছে। ডিপ কলের ঘর খোলা রেখে কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে।
সাঈদ ঐশীর দিকে তাকালো। সে ঘুরে ঘুরে দেখছে। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এই খোলা ধানের খেতে একটা ছেলের সাথে সে একা আছে। এই বিষয়ে তাঁর মধ্যে কোন টেনশন দেখা গেল না। সে ঘুরে ঘুরে ধানের খেতের আইল থেকে জংলী ফুল তুলে হাত ভরে ফেলেছে। সাঈদ তাকিয়ে রইল! এই মেয়েকে সারাদিন চোখের সামনে বসিয়ে রাখলেও হয়তো তাঁর কখনো মন ভরবে না।
ঐশী হঠাৎ করে সাঈদের দিকে তাকালো! ঐশী তাকাতেই সাঈদ চোখ ফিরিয়ে নিল। ঐশী ঠোঁট টিপে হাসলো। কি আশ্চর্য! এই লোকটাকে তার জ্বালাতে ইচ্ছে করছে। অবশ্য জ্বালাচ্ছেও! এই যে জেদ করে ঘাড়ে চেপে আসলো। সে ইচ্ছে করেই এসেছে। কেন এসেছে নিজেও জানেনা। যখন দেখলো সাঈদ বাইক নিয়ে বেরুচ্ছে। তার আসতে ইচ্ছে করলো। প্রথমে অবশ্য একটু সংকোচ হচ্ছিল। গত কয়েকদিন কথা বলেনিতো তাই!
ঐশী আবার সাঈদের দিকে তাকালো! বিরক্ত হয়ে কাউকে ফোন দিচ্ছে! এত ব্যস্ত হওয়ার কি আছে? ধীরে সুস্থে আসুক! মাত্রই তো সন্ধ্যা। কি সুন্দর জায়গা! ফুরফুরে বাতাস! সে সাঈদের উদ্দেশ্যে বলল,
--- আমার মোবাইল আপনার কাছে দু-দিন ছিল। মোবাইলে কে কে ফোন, মেসেজ দিয়েছে আপনি সবই দেখেছেন। ইমরার কে আপনার জানতে ইচ্ছে হয়নি?
সাঈদ শান্ত ভাবে বলল,-- না।
--- কেন?
--- তোমার জীবন, তোমার মোবাইল। তোমার জীবনে কে থাকবে আর তোমার মোবাইলে কে ফোন দেবে। সেটা জানার অধিকার আমার নেই।
ঐশী মুখ ফুলিয়ে তাকিয়ে রইল। কেন ফোলালো সে নিজেই জানেনা। সাঈদ শান্ত ভাবে কথাগুলো বললেও তাঁর মনে হলো কথাগুলোর মধ্যে রুক্ষতা ছিল।
সাঈদ আর সেদিকে তাকলো না। সে মামুন কে আবার ফোন দিলো। এবার রিং হতেই ধরেছে।
সাঈদের ইচ্ছে হলো। মোবাইলের মধ্যেই থাপড়ে দাঁত ফেলে দিতে।
--- কোথায় তুই!
মামুন তুতলে বলল,--- এই যে ভাই এদিকেই। কেন?
সাঈদের কাছে মামুনের কন্ঠ ঠিক মনে হলো না। ভ্রু কুঁচকে বলল,--- আমি ডিপকলের সামনে আছি! দু- মিনিটের মধ্যে হাজির হবি।
--- আসছি ভাই।
সাঈদ ফোন রাখলো! সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বিলের সাইডে খেত। এলাকার একেবারে শেষ মাথায়। আশে পাশে বাড়ি ঘর খুব একটা নেই বললেই চলে। সন্ধ্যাকেও নিশিরাতের মতো মনে হয়।
সে ঐশীর দিকে তাকিয়ে বলল,--- ঐশী! সন্ধ্যা হয়ে গেছে! আমাদের আরেকটু থাকতে হবে। তুমি ঘরের ভিতরে গিয়ে বস।
ঐশী নিজেও ক্লান্ত! পা ব্যথা করছে। সে বিনাবাক্যে এগিয়ে গেল। ঘর বলতে বেড়া দিয়ে চারপাশ আটকানো একটা জায়গা। এক সাইড দিয়ে ডিপকলের মাথা বেরিয়ে আছে। আরেক সাইডে শুধু ছোট একটা কাঠের চৌকি। তাঁর মধ্যে শুধু একটা পাটি বিছানো। ঐশী সেখানে গিয়েই বসলো।
সাঈদ বিরক্ত নিয়ে আবারো ফোন লাগালো। প্রায় আধা ঘন্টা হয়ে গেছে। এর খবর নেই। ফোন বন্ধ! সে বিরক্ত নিয়ে ঐশীর দিকে এগুলো। আর বসে থাকার মানে হয় না। সে ভিতরে এলো। ঐশী পা গুটিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। সে কিছু বলতে যাবে এমন সময় ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকার।
ঐশী চিৎকার দিয়ে এক লাফে সাঈদের পাশে এসে দাঁড়ালো। বলতে গেলে জাপটে ধরেছে। সাঈদ পকেট থেকে মোবাইর বের করে আলো জ্বালালো। ঐশীকে নিয়েই দরজার সামনে গিয়ে কয়েকবার ধাক্কা মারলো। বাইরে থেকে আটকানো। সাদঈ ভ্রু কুঁচকালো। দরজার সামনে কেউ আছে। একজন না! কয়েকজন! সে প্রথম থেকে সব চিন্তা করল। শিট! সে কেন আগে খেয়াল করেনি?
ঐশী ভয়ে ভয়ে বলল,--- কি হয়েছে , দরজা খুলছে না কেন?
সাঈদ কোন উত্তর দিলো না। সে নিজের চুল নিজে টেনে ধরলো। এরা ভালো করেই জানে আমি একা থাকি আর দোকা। আমাকে কিছু করা সম্ভব না। আরো আগেও দু-বার ফেল হয়েছে। তাই প্ল্যান করেছে অন্য। যেন লাঠিও না ভাঙে, আর সাপও মরে। আর সেই অন্য প্ল্যানে ঘি ঢেলেছে ঐশী। আজকেই এই মেয়ের বাইকে উঠতে হলো।
সাঈদ মোবাইল দেখলো! কাউকে ফোন করে কোন লাভ নেই। তারা যা চেয়েছে অলরেডি হয়ে গেছে। শুনশান জয়গা! খালি একটা ঘরে শুধু একটা ছেলে আর মেয়ে এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কি হতে পারে। এখন শুধু নাটক শুরু হওয়ার পালা। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তুহিনকে মেসেজ করল। নাটক দেখে হাত তালি দেওয়ার জন্যও তো কাউকে দরকার।
চলবে.......