#সোনলি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৫
সাঈদ টেনশনে হাঁসফাঁস করছে। একবার সোজা হচ্ছে তো, আরেকবার বাঁকা হয়ে কাপালে আঙুল ঘষছে। তাঁর জীবন ই গেছে টেনশনে টেনশনে। তবুও সে কখনো বিচলিত হয়নি। শান্ত ভাবে সব কিছু হেন্ডেল করেছে। তবে আজ শান্ত থাকতে পারছে না। সে আশে পাশে তাকালো। সব প্যাঁচ লাগিয়েছে তুহিন। আর এখন প্যাঁচ লাগিয়ে কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে কে জানে।
আনিস মামার সাথেও কথা বলা দরকার। তবে সে আছে ঐশীর সাথে ভিতরে। মেয়েটা খুব ভয় পেয়েছে। সেই যে মামাকে ধরেছে এখন পর্যন্ত ছাড়েনি । তারা এখন আছে এই গ্রামের এক লোকের বাসায়। তখন সব মানুষ তাঁর সাইডে আসতেই ইদরিসের লোকেরা গেঞ্জাম শুরু করে । তাদের এক কথা সব মিথ্যা নাটক। এত সহজে যেতে দেবে না। চেয়ারম্যান সাব আসবে তারপর বিচার হবে।
কিন্তু গ্রামের মানুষ একচেটিয়া। তারাও হার মানবে না। আর তুহিনের সাথে যারা এসেছে তাঁরাতো আরো এক ধাপ এগিয়ে। সাথে করে হকি স্টিক, স্ট্যাম্প নিয়ে এসেছে। পারলে তখনি ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাঈদ অতি কষ্টে এদের ঠান্ডা করেছে। তাঁর গেঞ্জাম পছন্দ না। সে যা করে চুপচাপ ঠান্ডা মাথায়। তবে যে বিষয়কে ইদরিসের লোক মিথ্যা বলে দাবি করছে। গ্রামের লোক এই বিষয়ে সন্দেহও রাখবে না। তাই তারা এই বাড়িতে নিয়ে এসেছে। এই বাড়িই ছিল সবচেয়ে কাছে। কাছের এক মসজিদের ইমাম কে আনা হয়েছে। তারা দাঁড়িয়ে থেকে তাদের সাঈদের বিয়ে দেবে। তাদেরও এক কথা যদি আগে বিয়ে হয়ে থাকে ভালো আর যদি না হয়ে থাকে তারা দেবে। সমস্যা কি? তাই বলে সাঈদের বিপক্ষে যাবে সাঈদের বিচার হবে তারা মানতে পারবে না।
এই ছেলেটা বিনা শর্তে সবার বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আজ তার বিপদে তারা কেন পিছু হাঁটবে। তারা বিশ্বাস করে সাঈদ কোন ভুল করে নি। তবে এই বিষয়ে ইদরিসের লোক যেন আর আঙ্গুলও না তুলতে পারে। তাই তুহিনের কথাটাই মনে ধরেছে। যাদের একবার বিয়ে হয়েছে তাদের হাজার বার হলেও কি?
সাঈদ উঠে দাঁড়ালো! কি করবে সে? ইমাম আর গ্রামের কিছু লোক এগিয়ে গেল। মেয়ের কবুল শোনার জন্য। সাঈদ নিঃষ্পলক সে দিকে তাকিয়ে রইল আর মনে মনে বলল, ---- মোমের গুড়িয়া পারলে এখন একটু অজ্ঞান টজ্ঞান হয়ে যাও তো ! তাহলে যদি আমি কিছু করার আরেকটু সময় পাই।
ভিতরে কি হচ্ছে সাঈদ জানে না। তার বুক টিপ টিপ করতে লাগলো। সে ঐশীকে ভালোবাসে। ভালোবাসে বলেই আজ পর্যন্ত অন্য কোন মেয়ের কথা ভাবতেই পারেনি। তবে সে কখনো ঐশীকে পাওয়ার আশা করেনি। আর এভাবে তো অবশ্যই না। ঐশী ঢাকায় আরাম, আয়েশ, বিলাসিতায় বড় হওয়া মেয়ে। তাঁর নিজস্ব স্বপ্ন আর পছন্দও আছে। সে কেন চাইবে তাঁর মতো ছেলেকে বিয়ে করে গ্রামে সাধারণ জীবন যাপন করতে। তাই তো মামার ইচ্ছার কথা জেনেও সে সায় দেয় নি। দূরে দূরে থেকেছে। যদি এই সময় গ্রামে না আসতো হয়তো তাহলে এতো চেনা জানাও হতো না । সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল। এই বিয়েকে ঐশীর গলার কাটা কখনো হতে দেবে না।
ভিতরে হৈচৈ হচ্ছে। মেয়ে কবুল বলেই অজ্ঞান হয়ে গেছে। সাঈদ দীর্ঘশ্বাস ফেললো! এই মেয়ের সব কাজই উল্টা পাল্টা। সেই অজ্ঞানতো হলেই একটু আগেই হলে কি হতো? সবাই বেরিয়ে এসেছে। তাঁর কবুল বলার পালা। সে বলল! নির্বিকার ভাবেই বলল। কি হবে আর ভেবে। তুহিন কয়েকজন কে পাঠিয়ে মিষ্টি এনেছে। সেগুলোই এখন সবাইকে দেওয়া হচ্ছে। ঐশী কি কখনো তাকে ক্ষমা করতে পারবে?
তুহিন ধপ করে সাঈদের পাশে বসলো! হেসে বলল,--- একটা ধন্যবাদ আমার প্রাপ্য! মনে রাখিস।
-- তোকে আমি খুন করবো! এটাও মনে রাখিস।
-- ওরে বাবা! যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর।
-- আমি তোকে করতে বলেছিলাম?
-- তুই তো বলবি না, আমি ভালো করেই জানি! বন্ধুর একটা দায়িত্ব আছে না।
-- তোর দায়িত্বের আমি... ভয়ংকর একটা গালি মুখে এনেও সাঈদ থেমে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, --- ঠিক হয়নি! কাজ টা একদম ঠিক হয়নি।
তুহিন সাঈদের দিকে তাকিয়ে শান্ত ভাবে বলল,--- সব সময় তো ঠিক কাজই করিস। একটা কাজ না হয় বেঠিকই করলি।
-- ঐশী মানতে পারবে না! কখনো না।
তুহিন উঠে দাঁড়ালো! তাঁরপর পিঠে চাপড় মেরে বলল --- সেটা না হয় সময়ের উপরেই ছেড়ে দে। এবার ওঠ! বারোটা বেজে চললো! বাড়িতে সবাই টেনশন করছে। আর আমার ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। তাঁর মধ্যে খেয়েছি দু-টো মিষ্টি। নাড়িভুড়ি সব উলটে আসছে।
-- ওদের অটো আনতে বলেছিস?
-- হ্যাঁ রে ভাই! মিষ্টি আনার সময়ই নিয়ে এসেছে।
তারপর তুহিন একটু হাসলো! হেসে বলল,--- তুই তো আবার ভাই সন্ন্যাসী! মেয়ে মানুষ ধরা টরা বারণ! যাই ভাই কি আর করবো! ভাবিকে তো আর ফেলে যেতে পারিনা। দেবর বলে কথা। যাই! কষ্ট করে না হয় কোলে করেই অটোতে উঠাই।
সাঈদ ভ্রু কুঁচকালো! ঘরের ভিতরের দিকে যেতে যেতে বলল,--- কল্পনাও করিস না। খুন করে ফেলবো।
তুহিন হো হো করে হেসে উঠল! তাঁর হাসিতে পুরো বাড়ি গমগম করতে লাগলো।
সাঈদ ভিতরে আসলো , ঐশীর মাথা কোলে নিয়ে আনিস মামা বসে আছে। তাঁকে খুব একটা বিচলিত মনে হলো না। তবে সাঈদ চোখ মেলাতে পারল না। নিজেকে অপরাধী অপরাধী মনে হলো। সে একটু এগিয়ে গিয়ে বলল,-- আমি দুঃখিত মামা! আমার জন্য আপনাদের এত কষ্ট করতে হচ্ছে।
আনিস হালকা হাসলো! হেসে বলল,---- তুমি ভালো করেই জানো, আমি এটাই চাইতাম তবে যেভাবে হয়েছে এভাবে না। যাই হোক! এতে তোমার দোষ নেই। সবই উপরওয়ালার ইচ্ছা। এখন চলো! যাওয়া যাক। ঐশীতে তুলতে পারবে না?
সাঈদের হাসি পেল! তবে এই পরিস্থিতিতে হাসি শোভনীয় না। তাই সে হাসি দমিয়ে এগিয়ে গেল। এই মেয়েকে নাকি সে তুলতে পারবে না।
--- আপনি উঠুন মামা! আমি দেখছি।
সাঈদ খুব যত্ন করে ঐশীকে কোলে তুলে নিল। তাঁর মনে হলো তুলোর তৈরি একটা পুতুলকে কোলে তুলে নিয়েছে । মেয়েটা খায় না নাকি? মাথাটা পড়েছে একদম তাঁর বুকে। বুকে পরতেই তাঁর অন্য রকম একটা অনূভূতি হতে লাগলো। মন বলল,--- এই মেয়েটা শুধু তোমার। তোমার, তোমার এবং তোমার।
ঐশীকে বাসায় আনতেই হৈ চৈ পড়ে গেল। গ্রামের কথা কি আর লুকিয়ে থাকে। এক কান থেকে আরেক কান হয়ে এই গ্রাম থেকে ঔ গ্রামও ছড়িয়ে গেছে। ঐশীকে সবাই আগেও দেখেছে। তবে এই দেখা নতুন দেখা। তাদের প্রিয় সাঈদের বউ দেখা। সাঈদ ঐশীকে নিয়ে বাসায় ঢুকতেই আসমা মিষ্টি নিয়ে এগিয়ে এলো। যেভাবেই হোক তাঁর ছেলে বিয়ে করেছে। বউ নিয়ে বাসায় এসেছে । মিষ্টি মুখ ছাড়া কিভাবে প্রবেশ করায়।
সাঈদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,--- জ্ঞান নেই মা। কিভাবে মিষ্টি খাবে?
আসমা হাসলো! হেসে বলল,--- তোর বউর জ্ঞান নেই। তোর তো আছে। নে হা কর।
সাঈদ আর কথা বাড়ালো না। কথা বললেই সময় নষ্ট। মেয়েটার জ্ঞান ফেরানো দরকার। এত রাতে ডাক্তারও তো পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।
সে পটাপট মিষ্টি খেলো। তাঁর মিষ্টি খাওয়া দেখে বাড়িতে হাসির রোল পড়ে গেল। এত এত হাসি আনন্দের মধ্যে সাবিহাকে দেখা গেল না।
সে তাঁর রুমে চুপচাপ বসে আছে। এমন না ঐশী তাঁর পছন্দ না। কিন্তু এখানে তাঁর প্রাণ প্রিয় বান্ধবীর কথা। সে কিভাবে তাঁর কষ্ট মাখা মুখটা দেখবে? আর তাদের সম্পর্ক! যুথি কি আর কখনো আসবে এই বাসায়? কখনো না! ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারো সাথে দেখা খুব খুব যন্ত্রনার। সেই যন্ত্রনা কেন সে যেঁচে বেঁছে নেবে। সে যুথিকে ফোন দিলো। মেয়েটার এখন কি অবস্থা কে জানে?
আনিস মাত্রই রুমে এসে বসলো । ঐশী ঠিক আছে। ডাক্তার বলেছে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে। সবাই তাঁর কাছেই আছে। এত রাতে সাঈদের বন্ধুরা ডাক্তার কে কোথা থেকে তুলে এনেছে কে জানে। বেচারা খুবই বিরক্ত। অবশ্য মুখে কিছু বলে নি। তবে চেহেরা দেখে ঠিকিই বুঝা গেছে। সে ফ্রেশ হওয়ার জন্য উঠলো। আর তখনি ফোন বেজে উঠল।
ফোন হাতে নিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেললো! খবর তাহলে পৌঁছে গেছে। সেতো ভুলেই গিয়েছিল! তাঁর বোনের স্পাই কুসুম তাদের সাথেই আছে। যে তাদের পাই টু পাই আপডেট দেয়, সে এত বড় খবর কিভাবে হজম করবে। সে ফোন স্বাভাবিক ভাবেই রিসিভ করল।
-- হ্যাঁ! বল।
আয়েশা রেগে বলল --- আমি বলবো?
-- আসলে যা হয়েছে......
-- আমি কিছু শুনতে চাচ্ছি না। গ্রাম গঞ্জে এই রকম নাটক অহরহ হয়। সেটা ধরে রাখার দায়িত্ব আমার মেয়ের না। আমার মেয়ের বিয়ে হবে তাঁর ইচ্ছাতে। মাথায় বন্দুক রেখে না।
-- কিন্তু.....
-- আমি কোন কিন্তু শুনতে চাচ্ছি না। তোমাকে আমি তিন ঘন্টা সময় দিলাম। এর মধ্যে আমার মেয়ে যেন আমার কাছে থাকে।
-- এত রাতে কিভাবে? ওর জ্ঞান ও নেই।
-- এর জন্য একমাত্র তুমি দায় ই । তাই কিভাবে আসবে সেটা আমি জানি না । তুমি আমার মেয়েকে আমার কাছে পৌঁছে দেবে। দ্যাটর্স ফাইনাল!
আনিস দীর্ঘশ্বাস ফেললো! শান্ত ভাবে বলল ---- ঐশী এখন সাঈদের ওয়াইফ। তার ডিসিশান কি তাও তো জানা দরকার।
আয়েশা চেঁচিয় বলল ---- ঐশীর জীবনের ডিসিশান শুধু ঐশী নেবে। কোন সাঈদ টাইদ না !
আর শোন আমার মেয়েকে আমার কাছে দিয়ে। তুমি আমার বাসায় থেকে বেরিয়ে যাবে। আজই যাবে। তোমাকে যেনো আমার মেয়ের আশে পাশে না দেখি।
আনিস হাসলো!
-- তাড়িয়ে দিচ্ছিস?
-- হ্যাঁ! তোমার কাছে আমি আমার মেয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলাম। যেটা তুমি সঠিক ভাবে পালন করতে পারো নি।
-- আচ্ছা , যা আসছি! তোর মেয়ে তোর কাছে সহি সালামত পৌঁছে দেব। তবে শুনে রাখ। ঐশী নিজেই একদিন দৌড়ে আসবে সাঈদের কাছে। তখন কি করবি?
আয়েশা কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, --- সাঈদকে আমি অপছন্দ করি না ভাইয়া । তবে যেটা হয়েছে সেটার বিপক্ষে আমি। আর রইল ঐশী! যদি সে চায়, তবে আমি নিজেই দিয়ে আসবো তাকে ।
#চলবে......