ফন্ট সাইজ:
থিম:
সোনালী রঙের বুনোলতা

পর্ব 16

লেখক: নূপুর ইসলাম

#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৬

সাঈদ সব কিছু গুছিয়ে গাড়িতে রাখলো। রেখে ঐশীকে আনতে গেল। সে নির্বিকার! আনিস যখন সব বললো শুনে সাঈদ কোন রিয়েকশন দেয়নি! যেন সে জানতো এমন কিছুই হবে। শুধু শান্ত ভাবে বলেছে, -- এটাই ভালো হবে মামা! জ্ঞান ফিরে এ সব ফেস করতে গেলে সে আরো ঘাবড়ে যাবে। এদিকটা নিয়ে আপনার ভাবতে হবে না। আমি সামলে নেবো।

আনিস দীর্ঘশ্বাস ফেললো! এই ছেলেটার জীবনে সহজ ভাবে কিছুই ধরা দেবে না। সব পাবে! তবে তার আগে হাজারটা কষ্টের সাগর পাড়ি দিতে হবে।

ঐশীকে সাঈদ কোলে করে গাড়িতে বসালো। বসিয়ে একবার ঐশীর মুখের দিকে তাকালো! তাঁর বুকের ভিতর কিছু একটা হচ্ছে। মনে হচ্ছে! কিছু টেনে হিঁচড়ে কেউ ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। এরকম তো হওয়ার কথা না। সে ভালো করেই জানে! ঐশী তাঁর কখনো হবে না। তাহলে! সামান্য তিনটা কবুল। এর এত ক্ষমতা? তাঁর মতো মানুষকেও এলোমেলো করে দিচ্ছে। সে বেরিয়ে এলো!

আসমা বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কি হচ্ছে! সে বুঝতে পারছে না। আনিস তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিল। নিয়ে গাড়ির সামনে এসে সাঈদকে জড়িয়ে ধরলো। জড়িয়ে ধরে বলল,--- একটা কথা মনে রেখ। কষ্টের পরেই কিন্তু স্বস্থি। আর যা হয় ভালোর জন্যই হয়।

সাঈদ হালকা হেসে মাথা দোলালো!
-- আসি! ভালো থেকো। আর একটা রিকোয়েস্ট। সবার কাছে বলো, মেয়ে লেখাপড়া করছে। লেখা পড়া শেষ হলেই..... । আনিস থামলো, সে আর কিছু বলতে পারল না।

-- আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন! ঐশীর অসম্মান হবে এমন কথা আর একবারও এই গ্রামে কেউ উচ্চারন করবে না।

আনিস বড় একটা নিশ্বাস ফেললো! ,
--- আসি! বলেই আনিস গাড়িতে বসলো। সে বসলো ঐশীর এক সাইডে আর অন্য সাইডে সাহানা। সে ঐশীকে ধরে রেখেছে। এবার কুসুম বসেছে সামনে।

গাড়ি বেরিয়ে গেল! সাঈদ দাঁড়িয়ে রইল! আধো অন্ধকারে যতক্ষণ দেখা যায়, সে তাকিয়ে রইল। আসমা এগিয়ে এসে বলল,--- তুই যেতে দিলি কেন?

সাঈদ হেসে মাকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ঘরের ভিতরে যেতে যেতে বলল,---- ধরে রাখার অধিকার কি আমার আছে মা?

-- তোর বউ! তোর অধিকার নাতো কার অধিকার?

-- বিয়ে করলেই অধিকার হয় না মা! অধিকার পেতে হয়!

-- আমি এত কিছু জানি না! আমার একটা মাত্র ছেলে। তাঁর একটা মাত্র বউ। আমার বাড়ির বউ আমি বাড়িতে চাই। আমি কালকেই আয়েশা আপার সাথে কথা বলবো। মানছি বিয়েটা স্বাভাবিক না। তবে মিথ্যা তো না।

-- এত অস্থির হলে চলবে মা! শান্ত হও! সময় সব ঠিক করে দেবে।

আসমার চোখে পানি আসলো! সে বড়ই হতোভাগা! ছেলে মেয়েদের জন্য কখনো কিছু করতে পারলেন না। আসমা আঁচল উঠিয়ে ছেলের মুখটা মুছে দিলেন। মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে আছে। আহারে, তাঁর ছেলেটা! ভিতরে কি চলে কখনো কাউকে বুঝতে দেবে না। তাঁদের জীবনটা এত এলোমেলো কেন? যদি সাঈদের আব্বা বেঁচে থাকতো তাহলেও কি এত এলোমেলো হতো?

--------

ঐশীর জ্ঞান ফিরেছে! সে নড়েচড়ে আনিসের কাঁধে মাথা রাখলো। তবে এখনো চোখ খুলেনি।

ঐশী ঘুরতেই সাহানাও নড়েচড়ে বসলেন! সে খুব বিরক্ত! বিরক্ত মাখা কন্ঠেই বলল,--- তোমার বোন যে একটা খাড়া দজ্জাল, এবার দেখলে তো।

আনিস হালকা হাসলো! তবে কিছু বলল না।

--- এমনিতেই সন্ধ্যা থেকে টেনশনে শেষ। মাত্রই চোখ দুটো শান্তিতে একটু বন্ধ করেছিলাম। তা না! মহারাণীর অর্ডার! এখনি বাসায় আসো। আরে আমার বুড়ো হাড্ডির কথাও তো একটু কেউ চিন্তা করো।

কুসুম মুখ বাঁকিয়ে বলল,--- আপনার আবার বুড়ো হাড্ডি। আপনার হাড্ডি তো তোলোয়ারেও ফেল ফালায় দেবো । কাউরে ধাক্কা মারেন! আপনের হাড্ডির বাড়িতে সাথে সাথেই পটল তুলবো।

সাহানা রেগে বললেন, --- তুই তো তোর মুখ বন্ধই রাখ, কুটনির কুটনি! একবার শুধু বাসায় পৌঁছে নেই। তোর মুখ যদি আমি না ভাঙছি। পাদ দেওয়ার আগেই পাদের খবর ওই দজ্জালের কাছে পাঠানো। তোর সব কুটনামি আমি বের করবো।

কুসুম মুখ বাঁকিয়ে জানালার দিকে তাকালো। সাহানার হুমকিতে তাঁকে কোন বিচলিত মনে হলো না।
সাহানা তাও দেখলো! দেখে রাগে মনে মনে ছেলের বউ আর কুসুমের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করল। তারপর ঐশীর দিকে তাকালো। মাথাটায় হাত বুলিয়ে আফসোসের সুরে বললেন,--- আহারে আমার নাতনীটা! বিয়েও এমন হওয়া হইলো! স্বামী সোহাগতো দূর! চেহেরাও টা দেখবো না। কি চায় তোমার বোন বলতো আনিস? সাঈদের চেয়ে ভালো ছেলে আর হইবো?

আনিস খুক খুক করে কাশলো! কেশে হাসলো! এই হাসির অর্থ কি? আনিস নিজেও জানে না। রাবেয়া কে ফোন দেওয়া দরকার! এদের সামনে তো তাও সম্ভব না।

বাড়ির কাছাকাছি আসতেই ঐশীর পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে এলো। সে সোজা হয়ে বসলো! তবে কোন কথা বললো না। এতো রাতে কেন ফিরে এলো সে বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস ও করল না। ভোর হচ্ছে! চারিদিক থেকে আযানের শব্দ ভেসে আসছে। তাদের গাড়ি বাড়ির ভিতরে গিয়ে থামতেই সে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো। আয়েশা দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। তাঁকে দেখেই গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। তাঁর বুকে মাথা রেখে চুপ করে রইল।

আনিস গাড়ি সামনে থেকেই দাঁড়িয়ে দেখলো! তবে এগিয়ে গেল না। সবাই নেমে গেলে মালপত্র নামিয়ে। সে আবার গাড়িতে বসলো। আর ড্রাইভারকে ব্যাক করতে বলল,--- ড্রাইভার একটু অবাক হলো তবে কিছু বলল না। সে আবার গাড়ি নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

_____

ঐশী রান্না ঘরে উঁকি দিলো। তাঁর মা আজ রান্না করছে। সে তখন এসে হালকা খাওয়া দাওয়া করেই আবার ঘুমিয়ে গিয়েছিল। এই মাত্রই উঠল! শরীর ঝরঝরা লাগছে। তবে ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। তাই নিচে আসা। এসে সারপ্রাইজ পাবে ভাবেনি। মা আজ অফিসে যায়নি। বাবা বেঁচে থাকতে মা হাজার কাজের মাঝেও রান্না করত। বাবা মায়ের হাতের রান্না খুব পছন্দ করতো তাই। বাবা চলে যাওয়া পরে রান্না তো ভালোই বাসায়ই থাকে না। নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। বলতে গেলে ভুলিয়ে রাখে। একটা মানুষকে যখন একটা মানুষ ভালোবাসে তখন তাঁকে পুরো দুনিয়া বানিয়ে ফেলে। আর যখন সে চলে যায়। সে তাঁর পুরো দুনিয়াই নিয়ে যায়। তখন ঐ মানুষ হয়ে যায় নিঃস্ব। আর সে নিঃস্বঙ্গতা কাটাতেই সে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। তাঁর মাও হয়তো তাই করছে।

ঐশী দীর্ঘশ্বাস ফেললো! আর সে! সে কি করবে? তাঁর এক ব্যথা ভোলার জন্য মামা গ্রামে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল। ফিরে এসেছি হাজার ঝামেলা মাথায় নিয়ে।
সে ঠিক করেছে গ্রামের এ কয় দিনের কথা ভুলে যাবে। হ্যাঁ, এটাই ঠিক। ঐ দিনের মেলায় সাঈদ ভাইয়ের কথায় তাঁর কিছু তো একটা হয়েছিল। তা না হলে সে আবার কেন সাঈদের সাথে কথা বলতে গেল। কেন সে যাওয়ার জন্য জেদ করল। যদি জেদ না করত তাহলে এত কিছু হতোই না। সাঈদ ভাইতো বার বার নিষেধ করেছিল। সে শুনলে তো! তার এখন মনে হচ্ছে সে সত্যিই ঘ্যাড়ত্যাড়া। সে যদি ত্যাড়ামো না করতো তাহলে এত কিছু হতো না। সাঈদ ভাইয়েরও এত অসম্মান হতোই না। সে নিশ্চয়ই তাঁর উপর খুব রেগে আছে। তা না হলে! তাঁরা এভাবে চলে এলো, সে কেন কিছু বলে নি?

-- এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে আয়।

ঐশী এগিয়ে এলো!

-- এখন ভালো লাগছে?

ঐশী মাথা দোলালো! আর বলল,--- মামা কোথায় আম্মু?
আয়েশা একবার মেয়ের দিকে তাকালো! তাঁরপর আবার নিজের কাজে মন দিয়ে বলল,--- আমি জানি না।

-- তুমি কি তাঁকে চলে যেতে বলেছো?

-- হ্যাঁ!
হ্যাঁ শোনার সাথে সাথেই ঐশীর চোখে পানি এসে গেল। তাঁর জন্যই সবাই এত শাস্তি পাচ্ছে কেন? সে কান্না চেপে বলল,-- কেন আম্মু?

আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, -- রাগের মাথায় বলেছিলাম! চিন্তা করো না। সে ফিরে আসবে! তুমি যেমন তোমার মামাকে ছাড়া থাকতে পারো না। সেও পারে না।

-- কথা সেটা না আম্মু! কথা হলো এটা কি মামার বাড়ি না? রাগ হলেই তুমি তাঁকে চলে যেতে বলবে কেন?এই বাড়িতে আমিও তো মামার মতোই! তাহলে কি এটা ধরে নিবো। আমিও যদি বড় কোন ভুল করি। রেগে আমাকেও বেরিয়ে যেতে বলবে?

-- ঐশী! আয়েশা চেঁচিয়ে উঠল। উঠে নিজেই চমকে গেলো। তিনি কখনো ঐশীর সাথে উঁচু গলায় কথা বলে নি।

ঐশী কিছু বলল না। চোখে টলমলে পানি নিয়ে তাকিয়ে রইল!

এমন সময় সাহানা তেড়ে এলেন। তাঁর চোখে মুখে রাগ! রাগ নিয়েই বললেন,--- কোন সাহসে তুমি আনিসকে চলে যেতে বলেছো? আমি এখনো বেঁচে আছি। আর এটা আমার স্বামীর বাড়ি। এই বাড়িতে কে থাকবে না থাকবে সেটা আমি ঠিক করবো। আবার আমার নাতনীকে ধমকাও। সাহসতো তোমার কম না। এই অর্ডারগিড়ি তোমার কোর্টে গিয়ে দেখাও। আমার বাড়িতে এসব চলবে না।

আর আমি বলে গেলাম। দুপুরের খবারের আগে যেন আনিস বাসায় থাকে। তা না হলে আমি, ঐশী কেউই তোমার ঐ রান্না খাচ্ছি না। আয়! বলেই সাহানা ঐশীর হাত ধরে টেনে নিয়ে আসলেন। পথে কুসুম কে দেখলেন। সে নাচতে নাচতে এদিকেই আসছে। তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ঠাস করে বা হাত দিয়ে একটা থাপ্পড় মারলেন। এই কুটনির জন্য সব! এই কুটনি যদি কথা না লাগাতো। তাহলে সব কিছু গুছিয়ে উঠা যেত। তার নাতনী থাকতো নাতজামাই এর কাছে আর আনিস থাকতো বাড়িতে।

আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নায় মনোযোগ দিলো। তাঁর ভিতর টাকে কেউ কি বুঝতে চাইছে। তাঁর একমাত্র ভাই। আর এই ভাইটা ছাড়া কি এই দুনিয়ায় তার কেউ আছে। রেগে একটু কি বললাম! ওমনিই চলে যেতে হবে। আজব এই দুনিয়া! ভালোবাসতে পারবে, রাগ করতে পারবে না। রাগ করলেই ভালোবাসায় আঙুল উঠে। এই যে তাঁর মেয়ে উঠিয়ে গেল।

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 16 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন