ফন্ট সাইজ:
থিম:
সোনালী রঙের বুনোলতা

পর্ব 18

লেখক: নূপুর ইসলাম

#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৮

যুথি বাড়ির সিঁড়িতে পা রাখতেই সাঈদের মুখোমুখি হলো। সে অবাক হলো! এ সময় সাঈদ ভাইয়ের বাসায় থাকার কথা না। সে জানে! জানে বলেই এ সময় এসেছে। সে আর সাঈদ ভাইয়ের মুখোমুখি হতে চায় না। আর যাই হোক একটা বিবাহিত পুরুষ কে সে ভালোবেসে পেতে চাইবে, এতো নিচু মনের না। তবে কষ্ট হয়। তাই আসে না। আজকেও আসতো না। শুধু সাবিহার জন্য আসা। মেয়েটা তার সাথে অনেক বার দেখা করতে গেছে। তখন মাথা ঠিক ছিল না। হাবিজাবি বলেছে। তাড়িয়ে দিয়েছে। এখন খুব আফসোস হচ্ছে। তার আর সাবিহার সম্পর্ক তো মিথ্যা না। কেন যে সে এমন করেছে। মেয়েটার তো কোন দোষ নেই।

-- কেমন আছো যুথি?

যুথি কেঁপে উঠল! সাঈদ ভাই তার সাথে কথা বলছে। তাও আবার হেসে? তার মাথায় নিশ্চয়ই কোন সমস্যা হয়েছে। তা না হলে এমন হেলুসিনেশন হওয়ার মানে কি? এখানে না আসলেই ভালো হতো। শেষ মেষ না ছ্যাঁকা খেয়ে পাগল টাগল হয়ে যায়।

-- কি হয়েছে! তুমি ঠিক আছো?

যুথি উত্তর দিতে পারল না। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। সাঈদ ভাই তাহলে সত্যিই কথা বলছে।

সাঈদ সিঁড়ি দেখিয়ে বলল,--- একটু বসো যুথি, তোমার সাথে আমার কথা আছে।

যুথির অস্থির লাগতে শুরু করল! যদি আগে হতো তাহলে এখন সে খুশিতে বাকবাকুম করতো। কিন্তু সময় এখন ভিন্ন। সাঈদ ভাই বিবাহিত। পরীর মতো সুন্দর তার এক বউ আছে। তার হাঁসফাঁস লাগলো! কোন রকম ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,--- আমি সাবিহার কাছে এসেছিলাম। সাবিহা কোথায়?

-- সাবিহা মার সাথে একটু মার্কেটে গেছে। তুমি বস, এসে পরবে।

যুথি চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসলো! আগে জানলে আসতোই না।

সাঈদ ও বসলো! তবে অন্য পাশের সিঁড়িতে। বসে কোমল কন্ঠে বলল,--- তুমি এসেছো, আমি খুব খুশি হয়েছি। তুমি না আসলে আমিই যেতাম। তুমি আর সাবিহা ছোট বেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছো। এক সাথেই এই বাড়ির আঙিনায় খেলেছো। আমি কখনো তোমাদের আলাদা চোখে দেখিনি। সাবিহা যেমন তুমিও আমার কাছে তেমন। আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। কাকে কখন ভালো লেগে যায়। সেটা কখনো বোঝা যায় না। আমাকে তোমার ভালো লেগেছে। এখানে তোমার দোষ নেই। যাইহোক! তুমি যদি আগের মতো আসো, সাবিহা মার পাশে আগের মতোই থাকো, আমি খুব খুশি হবো। তারা তোমাকে খুবই পছন্দ করে। এ যে তুমি আসছোনা। তাদের দু-জনেই মুখ ভার । বিশেষ করে সাবিহা। সে কিন্তু আগের মতো আমার সাথে কথা বলছে না। তোমার সাথে সম্পর্ক নষ্টের কারণ আমাকেই ভাবছে। অথচ আমি এখানে নির্দোষ।

সাঈদ একটু থামলো! তারপরে আবার বলল,--- যুথি আমার আপনজনের সংখ্যা খুব কম। সেই কম মানুষদের মধ্যে থেকে যদি একজনও চলে যায়। তাহলে সেটা আমার জন্য খুব কষ্টের। তাই একটা কারণ ধরে অন্য সম্পর্কগুলোকে নষ্ট করো না। তুমি এ বাসায় এসো। আগের মতোই এসো। আমি কিছুই মনে রাখবো না। তুমিও রেখো না। জীবনের পথ অনেকটা লম্বা। সেই পথে আমার চেয়েও ভালো অন্য কাউকে পাবে। তাই তোমার কাছে আমার ছোট্ট একটা রিকোয়েস্ট। আগের মতোই সহজ হয়ে যাও। পেছনের কোন কিছুর জন্য লজ্জিত বা সংকোচ হওয়ার দরকার নেই।

হঠাৎ বাইকের শব্দে দু-জনেই গেইটের দিকে তাকালো! ইদরিস চাচা এসেছে, তার দলবল নিয়ে। যুথি ভয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সাঈদও দাঁড়ালো, তবে সে নির্বিকার।

ইদরিস পাগলের মতো দৌড়ে সাঈদের সামনে আসলো! তার চোখ মুখ শুকনো।

-- সাঈদ! নাঈম আর সাজ্জাত কোথায়?

সাঈদ নির্বিকার ভাবেই বলল,---- সেটা কি আমার জানার কথা?

ইদরিস সাঈদের হাত জাপটে ধরলো! জাপটে ধরে ধরা গলায় বলল,--- আমার এক মাত্র ছেলে সাঈদ! কাল রাত থেকে তাদের খোঁজ নেই। আমি জানি একমাত্র তুমিই জানো তারা কোথায়?

---- আমি জানি না চাচা।

ইদরিসের বুক কেঁপে উঠল! তার একমাত্র ছেলে। সে ভালো করেই জানে, সাঈদের লোকের কাজ! এত বড় ঘটনা করেছে। সাঈদ কাউকেই কিছু বলে না। তবে তাকে খোঁচালে ছেড়েও দেয় না। এর আগের দু-জনও গায়েব। কেউ কোন খোঁজ বের করতে পারেনি। তার বুক হা হা করে উঠল। তার ছেলে বেঁচে আছে তো?

-- আপনি বাসায় যান চাচা! এখানে আপনার সময় নষ্ট হবে আর কিছুই না। বরং থানায় যান, আপনার তো শত্রুর অভাব নেই।

-- ইদরিস সাঈদের হাত ধরেই পায়ের কাছে বসে পড়লো। চোখে পানি নিয়ে বলল, ---- আমি তোমার বাবার বয়সি সাঈদ। আমি একজন চেয়ারম্যান হিসিবে না, বাবা হিসেবেই অনুরোধ করছি। আমার ছেলেকে ভিক্ষা দাও। তুমি যা চাইবে তাই হবে। আমি ক্ষমতা থেকে সরে যাবো। আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করবো না। তাকে শুধু ফিরিয়ে দাও। সে সবার সামনে তোমার বউয়ের পা ধরে মাফ চাইবে। দরকার হলে নাকে খত দেবে। তবুও তাকে ফিরিয়ে দাও।

সাঈদ নিচু হয়ে ইদরিসের দু- কাঁধ ধরে উঠালো। তারপর শান্ত ভাবে বলল,--- যেই বাবা হয়ে আমাকে অনুরোধ করছেন । সেই বাবাটা আপনার আরো অনেক আগে হওয়া উঠিত ছিল। ক্ষমতা মানুষকে কিছুই দেয় না। দেয় ভালোবাসা! সন্তানকে ক্ষমতা দাপট না শিখিয়ে ভালোবাসা শেখান। তাহলে আর কারো সামনে হাত পাততে হবে না।
তারপর ইদরিসের লোকের দিকে তাকিয়ে বলল,--- ওনাকে বাসায় নিয়ে যাও।

ইদরিস আর কিছু বলল না! বলার ভাষা কি আর আছে? সত্যিই কি শিখিয়েছেন তার ছেলেকে। টাকা পয়সা খরচ করে ঢাকায় পাঠিয়ে ভালো ভালো কলেজ, ভার্সিটিতে পড়িয়েছেন। মানুষ কি বানাতে পেরেছেন? নিজে যেমন অমানুষ, ছেলেকে বানিয়েছেন তেমন।

ইদরিস চলে গেছে। যুথি এখনো হতম্ভব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কি হচ্ছে, কি হলো এখনো সে বুঝতে পারছে না।

সাঈদ যুথির দিকে তাকালো! হালকা হেসে বলল,--- আমাকে একটু বেরুতে হবে। তুমি একা থাকতে পারবে না?

যুথি হতম্ভব হয়েই মাথা নাড়ালো। এই সাঈদ ভাইকে সে চিনতে পারছে না। এ যেন অন্য এক সাঈদ ভাই।

নাঈমকে পাওয়া গেল তার পরের দিন। তাদের গ্রামের পরিত্যক্ত এক ইটের ভাটায়। নেশা টেশা করে যা তা অবস্থা। সেন্স নেই বললেই চলে। পুলিশ ইদরিসকে খবর দিলো। কাউকে সন্দেহ করে কি না। সাজ্জাতেরও খোঁজ নেই। ইদরিস শুনে কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। শুধু শান্ত ভাবে বলল,--- আমার ছেলেকে খুঁজে পেয়েছি এই অনেক। আমার কাউকে সন্দেহ নেই।

_______

ঐশী ট্রি হাউজের সামনে এসে মামাকে ডাকলো। তার হাতে ট্রে। এই ট্রে নিয়ে আর যাই হোক। এই ঢালু সিঁড়ি বেয়ে উঠা তার পক্ষে সম্ভব না।

আনিস ট্রি হাউজের ভিতর থেকে উঁকি দিলো। উঁকি দিয়ে অবাক হয়ে বলল,--- তুইতো ঘরের সব থালা বাটি তুলে নিয়ে এসেছিস! ব্যাপার কি?

-- ব্যাপার কিছুই না মামা! আজ আমি রান্না করেছি। তুমি তো কাঁথা বালিশ নিয়ে কয়েকদিন এখানেই পড়ে আছো। খাবারের জন্যও যাচ্ছো না। এখানে খাচ্ছো, এখানেই ঘুমাচ্ছো। তাইতো তুলে নিয়ে আসতে হলো। এখন ঝটপট হাত বাড়াও তো! আমি এগুলো নিয়ে আসতে পারবো না।

আনিস হাসলো!
-- আয়! বলেই এগিয়ে হাত বাড়ালো।

ঐশী ট্রে দিয়ে নিজে ধীরে ধীরে উপরে উঠে বলল,--- আর কয়দিন এখানে থাকবে মামা? ঘর খালি খালি লাগে।

-- যাবো গিট্টু ছুটে গেলেই যাবো।

-- কিসের গিট্টু? কালকে এসে দেখলাম হা করে নাক ডেকে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছো।

-- সেটাই তো! ঘুম কে তুই তুচ্ছ করছিস কেন? আমি ঘুমালে ব্রেইনের রেষ্ট। আর ব্রেইনের রেষ্ট মানে ব্রেইন শক্তিশালী হওয়া। আর শক্তিশালী হলেই গিট্টু আপনা আপনিই খুলে যাবে।

-- হুম হয়েছে, এখন খাও, খেয়ে বলো কেমন হয়েছে।

আনিস খাবাবের ঢাকনা খুললো! ভাত, আলুর ভর্তা, ইলিশ মাছ ভাজা, বেগুন ভাজা।

ঐশী গাল ফুলিয়ে বলল,--- এখনো মসলা পাতির হিসাব বুঝি না মামা। কতটুকু তারকারিতে কতটুকু দিতে হবে, কখন দিতে হবে, কতক্ষণ রান্না করতে হবে। কিছুই বুঝিনা! তাই সিম্পল ভাজাভাজি। এগুলোতে ঝামেলা কম। তবুও অবশ্য খালা হেল্প করেছে । প্রথম বার তো।

আনিস ভাত এগিয়ে নিতে নিতে বলল, --- এগুলোকে তুই সিম্পল বলছিল! এগুলোতো অমৃত। আমাদের দেশের অমৃত। এর কাছে পোলাও, মাংস ছাতার মাথা । এ খাবার হাজার বার খেলেও মন ভরবে না।

-- হুম, তোমাকে বলেছে।

-- বলেছেই তো, বলেই আনিস হাসলো। হেসে ঐশীর দিকে একবার তাকিয়ে ভাত খেতে খেতে বলল,--- ঐশী।

-- হুম।

-- তুই কি আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাস?

ঐশী উপর নিচে মাথা নাড়ালো। মাথা নাড়িয়ে বলল,--- তুমি কিভাবে বুঝলে?

-- গত দু-দিন তুই এই ট্রি হাউজের আশে পাশে ঘুরঘুর করছিস ।সেটা দেখে অনুমান করলাম। আর অনুমান করেই আমি কষ্ট পেয়েছি।

ঐশী মুখ কালো করে বলল, --- কেন?

-- এই যে আমার কাছে তুই কিছু বলতে চাইছিস। তার জন্য ভাবতে হচ্ছে। অথচ আমি ভাবতাম আমার ঐশী আমার কাছে সব বলতে পারে।

ঐশী মুখ নিচু করে লাজুক মুখে বলল, ---- আমি ভাবছিলাম না মামা। লজ্জা পাচ্ছিলাম।

আনিস ভাত খাওয়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর হো হো করে হেসে উঠল, হেসে বলল,---- যাক আমাদের ঐশী রানী লজ্জাও পায়। ভালো! তা এখন লজ্জাকে একটু সাইডে রেখে কি জিজ্ঞেস করতে চান পটাপট জিজ্ঞেস করে ফেলেন তো । আমি ঘুমাবো, এই অমৃত খেয়ে লম্বা একটা ঘুম না দিলেও নয়। আর আমি শিওর, এই ঘুমেই একেবারে আমার সব গিট্টু শেষ।

চলবে.........

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 18 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন