#সোনালি_রঙের_বুনোলতা
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৯
আনিস ঐশীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। সে মাথা নিচু করে ওড়না আঙুলে গোলগোল পেচাচ্ছে। সম্ভবতো কিভাবে জিজ্ঞেস করবে সেটাই ভাবছে। আনিস হাসলো! ঐশী কার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবে সে জানে। না জানারও অবশ্য কিছু নেই! গ্রাম থেকে শুধু ঐশীর শরীর এসেছে। মনতো রেখে দিয়েছে অন্যএকজন । সেই অন্য একজনের জন্য অস্থিরতা সবাই বুঝছে পারছে, তবে শুধু ঐশী ছাড়া। সে এখনো ধরতেই পারেনি, যে নিজের অজান্তেই সে আরেকজনের হয়ে গেছে।
ঐশী আস্তে করে বলল,---- সাঈদ ভাই কি আমার ব্যাপারে সব জানে ?
আনিস স্বাভাবিক ভাবেই বলল ,---- হ্যাঁ!
ঐশী বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে বলল,--- কবে, কখন থেকে?
-- যখন তুমিও জানতে না, তখন থেকে।
-- আর আন্টি?
-- তাঁরা তোমার বাবাদের প্রতিবেশী ছিল ঐশী! তোমার দাদুর সাথে সাঈদের দাদুর সম্পর্ক ছিল অটুট। ঢাকায় এসেও সেটা শেষ হয় নি। বরং আরো গভীরতা বাড়িয়েছিল। তোমার দাদু যেমন ও বাড়ির সব জানে, তেমনি সাঈদের দাদুও। তাই আসমা আপা জানবে না তা কি করে হয়। আর তাছাড়া আমরা তো কখনো কারো কাছে কিছু লুকাইনি। কেন লুকাবো? তুমি কিংবা আমরা অন্যায়তো কিছু কিরিনি। তোমার জন্মে তোমার কোন হাত নেই। আমাদের সন্তান হয়নি এতেও আমাদের হাত নেই। এখন যদি আমরা একে অপরে কে ভালোবেসে ভালো থাকতে পারি এটাই বড় কথা। কে কি বললো, কে কি ভাবলো এটা আমাদের দেখার বিষয় না। ভালো থাকাই মূখ্য বিষয়। আর যারা আমাদের আপন করে নেবে। সব জেনেই নেবে। মিথ্যা বলে কারো কাছে ভালো হওয়ার তো কোন দরকার নেই।
ঐশীর চোখে পানি আসলো! সব জেনেও এই মানুষগুলো তাঁকে কত আপন করে নিয়েছিল।
আনিসের ভাত খাওয়া শেষ! সে হাত ধুয়ে বলল, ---- একটা গল্প শুনবি ?
ঐশী চোখে টলমলো পানি নিয়েই স্মিথ হাসলো! হেসে বলল,---- তুমি গল্প বলেছো! আর আমি শুনিনি, এমন কখনো হয়েছে?
-- না! তা হয়নি?
-- তাহলে?
আনিস খাবারে ট্রে সাইড করে দেয়ালে হেলান দিয়ে বলল। ---- ঠাকুরমার গল্পের ঝুলিতে যেমন সব গল্পের শেষে "আমার গল্পটি ফুরোলো নটে গাছটা মুড়ালো " এমনি এমনি বলে। আমারটাও সে রকম। এমনি এমনিই জিজ্ঞেস করি। তাঁরটায় গল্প শেষ হয় আর আমার টায় শুরু।
ঐশী মামার পাশে এসে কাঁধে মাথা রেখে কোমল সুরে বলল, --- এত আয়োজন করছো কেন? স্পেশাল কারো গল্প বুঝি? আর তুমি না বললে ঘুমাবে?
-- হ্যাঁ! ঘুমাবো! তবে গল্পটা শেষ করে।
-- এখন শেষ করাটা কি খুব জুরুরী?
-- হ্যাঁ জুরুরী! এখনি সঠিক সময়।
-- কেন?
-- তা তো জানি না। তবে এই গল্পের পরে আমি আর তোমাকে কোন গল্প শুনাবো না। এটাই শেষ!
ঐশী অবাক হয়ে বলল --- কেন?
-- সেই দায়িত্বটা অন্য একজন কে দেব।
ঐশী মুচকি হাসলো! হেসে বলল, --- তাই! তো কে সে?
-- উঁহু! এখন বলছি না।
-- আচ্ছা.....
-- হ্যাঁ! আচ্ছা।
-- গল্পটা কার সেটা তো বলবে! নাকি সেটাও বলবে না।
-- সেটা বলা যায়!
-- তাহলে বলো, কে সে স্পেশাল মানুষ ?
আনিস হালকা হাসলো! হেসে বলল,--- তোমার অতি অতি প্রিয় আনিস মামা।
ঐশী অবাক হলো! অবাক হয়ে সে মাথা উঁচু করে তাঁর মামার দিকে তাকালো। তাঁর মামা সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ এখন না! সেই ছোট বেলা থেকে। কেন মামা একা? রাবেয়া আন্টি কেন তাঁর প্রাক্তন। কেন সে ছন্নছাড়া। তবে সে কখনো জিজ্ঞেস করেনি। যদি মামা কষ্ট পায়।
আনিস হাসলো! হেসে ঐশীর হাত হাতে নিয়ে বলল,--- আমি তখন অনার্স থার্ড ইয়ারে। তখন আমি তাকে প্রথম দেখি। ফাস্ট ইয়ারের ছাত্রী। সিধেসাদা সাধারণ দেখতে। মাথায় ছিলো ইয়া লম্বা চুল। প্রতিদিন ইয়া লম্বা চুল সাপের মতো বেনি করে আসতো। কি কারণে আমার নজর তার উপরে পড়লো আমি জানি না। আসতো যেত দেখতাম। তার দুই বান্ধুবী ছিল। তারা প্রচুর বকবক করতো। সে শুধু মাথা নিচু করে চুপচাপ শুনতো। কখনো চোখ তুলে কারো সাথে কথা বলতে দেখিনি।
ফাস্ট ইয়ারে কম বেশি সবাইকেই র্যাগিং এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তাকে ও ধরা হলো। তাঁর দুই বান্ধুবীসহ। তাদেরকে বলা হলো আই লাভ ইউ বলো। তার দুই ফ্রেন্ড ভয়ে ফটাফট বলেও ফেললো। কিন্তু সে মুখ খুললো না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়ে রইল তো, দাঁড়িয়েই রইল। কোন ভয় ভিতি তাঁর মাথা উঁচু আর মুখ খুলতে পারল না । সেই দিন আমি একটু লেইট ছিলাম । এসে দেখি এই কান্ড। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে বললাম, -- তুমি যাও! আমি দেখছি।
তখনি সে মাথা উঁচু করল। চোখ ভর্তি টলমলে পানি।
আমি থমকে গেলাম! বুকের কোন একটা জায়গায় চিনচিন করে উঠল। আমি বুঝতেও পারলাম না! আমার অজান্তেই আমি ঠিক তখনই আমার এই জীবন তাঁর নামে লিখে দিলাম।
সেই দিন শুধু আমি না। সেও আমাকে খেয়াল করেছিল। এই পর্যন্ত তো সে কারো দিকে চোখ তুলেই তাকায়ইনি। এখন আসতে যেতে দুজনের চোখাচোখি হতে লাগলো। চোখে চোখ পড়লেই সে ফট করে মাথা নিচু করে ফেলতো আর আমি মুচকি হাসতাম। সে আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতো।আমিও দেখতাম। এভাবেই কেটে গেল একটা বছর। আমার তখন লাস্ট ইয়ার। বন্ধুরা চেপে ধরলো। এভাবে আর কতদিন। পরেতো পাখি উড়াল দেবে।
আমারো তাই মনে হলো। আমি তাঁকে খবর পাঠালাম। অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করলাম। কিন্তু তাঁর খবর নেই। সে আসেনি! খুব কষ্ট পেলাম। কারণ! আমি ভেবেছিলাম সেও হয়তো আমাকে পছন্দ করে। আমি ভেঙে পড়লাম! আমার ভেঙে পড়া দেখে আমার বন্ধুরা এক কাজ করে ফেললো! আমাদের ডিপার্টমেন্ট দুই মেয়েকে পাঠিয়ে তাঁকে ধরে নিয়ে আসলো। আমি অবাক! আমার চেয়ে সে আরো বেশি অবাক। আমি এমনটা করবো সে হয়তো ভাবেই নি। আমাদের দুজন কে সামনাসামনি রেখে তারা চলে গেল। চলে যাওয়ার আগে বন্ধুরা ফিসফিস করে বলে গেল, ---- দরকার পরলে পায়ে পড়ে যাবি। কিসের আবার সরম, লজ্জা। ভালোবাসার সামনে কিচ্ছু রাখতে নেই।
আমি হাসলাম! হেসে তার দিকে তাকাতেই সে ভয় পেল। আমি শান্ত ভাবে বললাম ---- ভয় নেই! শুধু একটু কথা বলবো।
সে মাথা নিচু করে রাখলো! আমি একটু এগিয়ে গিয়ে কিছু বলতে যাবো। তার আগেই সে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলল,---- আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। এই বছরের শেষের দিকে বিয়ে।
আমার নিশ্বাস নেওয়া বন্ধ হয়ে গেল। কিছু বলতে পারলাম না। তখন সে চোখ তুলে তাকালো। আজও তার চোখ ভর্তি টলমলে পানি। আমার মনে হলো তার মুখ এই কথা বললেও, চোখ দু-টো অন্য কথা বলছে।
আমি আর কিছু বলিনি! সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে চলে গেছে। যেই যাওয়ার পর থেকেই আমি এলোমেলো হয়ে গেলাম। সব কিছু পানসে মনে হতে লাগলো। বন্ধুরা বিভিন্ন ভাবে বোঝাতে লাগলো। এই মেয়ের সাথে তোর তেমন কিছুই ছিল না। শুধু একটু চোখাচোখি। এই আর কি? কত মেয়েতো একদুই বছর প্রেম করেও ধোকা দিয়ে যায়। তুই চিল কর ভাই। ঐ মেয়েকে ভুলে যা। মেয়ের অভাব আছে?
আমি ভুলতে পারলাম না। চোখ বন্ধ করলেই তার চোখ দুটো সামনে ভাসতো। আর আমি পাগল হয়ে যেতাম। একটা বছর আমি নিজের সাথে যুদ্ধ করলাম। তার সামনে আর যাইনি। লেখাপড়া শেষ হলো। আর শুরু হলো আমার ছন্নছাড়া জীবন। তখন থেকেই লেখালেখি শুরু করলাম। হঠাৎ একদিন আমার এক বন্ধু ফোন দিলো। তাঁর বাড়ি ভার্সিটির কাছেই। সে ফোন দিয়েই হরবর করে বলল,---- আনিস তুই আমার বাসায় আয়। এক্ষুণি! এই মূহুর্তে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, --- কি হয়েছে! সব ঠিক আছে।
সে বড় একটা শ্বাস ফেলে বলল,--- রাবেয়া এসেছে! সে তোর ঠিকানা জানে না। তাই আমার এখানে এসেছে।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এতদিন পরে সে! কেন?
আমি সাথে সাথেই বেরুলাম। আর নিজের প্রতি নিজেই অবাক হলাম। এতদিন পরেও এই মেয়েটার কথা ভাবলে আমার বুকের কোন একটা জায়গায় চিনচিন করে উঠে।
সেই বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে আমি থমকে গেলাম। রাবেয়া জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। তাঁর গায়ে হলুদ শাড়ি। হাতে, কানে, গলায় কাঁচা ফুলের গয়না। মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে আছে। তবুও আমার কাছে মনে হলো। আসমানের এক পরী আমার সামনে বসে আছে।
সে আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল। কিছু বলল না। মাথা নিচু করে রাখলো। আমি এগিয়ে তার সামনে দাঁড়ালাম! দাঁড়িয়ে বললাম, --- তুমি কি করেছো, সেটা কি তুমি জানো?
সে উপর নিচে মাথা দোলালো।
-- যদি আমাকে না পেতে?
এই প্রশ্নের উত্তরে সে বলেছিল! সে তাকে পাওয়ার আশা করে ঘর থেকে বেরুয়নি। সে বের হয়েছে একজন কে ভালোবেসে সে আরেকজনকে বিয়ে করতে পারবে না। যদি আমাকে না পেত। তাহলে সে হয়তো আর বেঁচে থাকতো না।
আমি তার কথায় চমকে উঠেছিলাম! আমি ভাবতাম আমি তাকে ভালোবাসি। আমার মতো ভালোবাসা হয়তো আর কেউ বাসতে পারবে না। কিন্তু সেও আমাকে ভালোবেসেছে। তার ভালোবাসার কাছে আমার ভালোবাসা তুচ্ছ। আমি তাঁকে ভালোবেসেছি। তার ভালোবাসায় পাগল হয়েছি, ছন্নছাড়া হয়েছি কিন্তু কখনো তার জন্য মরতে চাইনি।
সেই দিনই সেই বন্ধুর বাসায় আমাদের বিয়ে হলো। বিয়ে করে রাবেয়াকে বাসায় নিয়ে আসলাম। আয়েশা খুশিতে দিশেহারা। আমাদের মা ছিল না। বাবা, আয়েশা আর আমাকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। সেই ছোট্ট সংসারে আলো হয়ে এলো রাবেয়া। এই আলো অবশ্যই বেশিদিন আমাদের বাড়ি আলোকিত করতে পারল না।
রাবেয়ার বাবা ছিলেন পুলিশের বড় এক কর্মকর্তা। তার সম্মান ডুবিয়ে সুখে সংসার করা । সেটা সে মানতে পারল না। সে প্রতিশোধের নেশায় অন্ধ হয়ে গেল।
একজন নির্দোষ মানুষকে দোষী বানানো পুলিশের বা হাতের কাজ। তাই আমাকেও বানালো! একদল পুলিশ হঠাৎ বাসায় এসে হাজির। তাদের কাছে নাকি খবর আছে। এই বাসায় থেকে মাদক বিক্রি করা হয়। আমাদের কোন কথা কানে নেওয়া হলো না। পুরো বাড়ি লন্ডভন্ড করে, আমাকে ধরে আনা হলো। নিউজ করা হলো, বাড়ি সার্চ করে নাকি অস্ত্র আর বিপুল পরিমান মাদক পাওয়া গেছে। এক রাতেই আমাদের জীবন এলোমেলো হয়ে গেল। আমি থানায়, বাবা স্ট্রোক করলেন। তাকে নিয়ে হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি। রাবেয়া, আয়েশা পাগলের মতো দৌড়াতে লাগলো। কখনো হসপিটালে, কখনো থানায়। একে ধরে, ওকে ধরে। কোন কাজ হয় না। আর এদিকে আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হলো।
বাবা মারা গেলেন! আমি থানায় বসে খবর পেলাম। একটুকুও কাঁদতে পারলাম না। পাথর হয়ে বসে রইলাম। রাবেয়া আসলো আমাকে দেখতে। পরপর কয়েকদিন রিমান্ডে তখন আমার নাজেহাল অবস্থা। আমাকে দেখে সে কোন কথা বলতে পারল না। হাত দুটো ধরে শুধু অস্ফুটভাবে বলল ,---- পারলে মাফ করে দিয়ো। বলেই চলে গেল। সেই যে গেল । আমি আর তাকে দেখেনি। তাঁর ঠিক দু-দিন পরেই হঠাৎ করে আমার জামিন হয়ে গেল।
শুধু আয়েশা আসলো নিতে। আমি অবাক হলাম না। রাবেয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেসও করলাম না। কারণ আমি জানতাম! আমার এই জামিন এমনিই এমনিই হয়নিই। হয়েছে আমার রাবেয়ার ভালোবাসার বলির বিনিময়ে।
থানায় থেকে বেরিয়ে আয়েশাকে দাদু বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। আর আমি পাগলের মতো এখানে ওখানে পড়ে থাকি। হঠাৎ একদিন সেই বন্ধু এসে হাজির। যার বাসায় আমাদের বিয়ে হয়েছিল। সে এসে তাঁর মোবাইল আমার কানে ধরলো। আমি অনেক দিন পরে সেই কন্ঠ আবার শুনলাম। শুধু শুনলাম! সে বলল ,---- আনিস সব ভালোবাসা ভালো বয়ে আনে না। খারাপও আনে! যেমন আমি এনে ছিলাম। আমাকে এই দায় থেকে মুক্তি দেবে আনিস? আমি প্রতিনিয়তই ধুকে ধুকে মরছি। প্রতিমূহুর্ত বিষ পান করছি। আমাকে একটু শান্তি দাও আনিস। তুমি ভালো থেকে আমাকে একটু শান্তি দাও। যদি সত্যিই কখনো আমাকে ভালোবেসে থাকো! তাহলে ভালো থাকো।
চলবে.......