#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_১৬
নোভা সকালে বেরুলো প্রতিদিনের মতোই পুরো রেডি হয়ে। বেরিয়েই নাবিলের রুমটায় একবার উঁকি দিল। এই বান্দাটাকে আজ সাথে পেলে খুব সুবিধা হতো। হেঁটে হেঁটে গলির মাথা পর্যন্ত যেতে ইচ্ছে করছে না। হাঁটা তো যেমন তেমন, না হয় গেল টেনে হিঁচড়ে। তবে, তারপর কি? কতক্ষণ আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাছি মারো। রিকশা যে পাবে না, ভালো করেই জানে।
শহরভরা দুনিয়ায় রিকশা। কারণে অকারণে কিলবিল করছে। কিন্তু যখন দরকার, তখন আর রিকশা তো ভালোই রিকশার রিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। যাও যাবে, প্লেনের পাইলটরাও এতো দেমাগ দেখাবে না, যতোটা তারা দেখাবে। ভাড়া চাইবে ডাবল, তার মধ্যে এমন ভাব, গেলে যাও, না গেলে দাঁড়ায় দাঁড়ায় রাস্তা মাপো।
আর এদিকে তার বাবা কিনেছে ছায়ের এক গাড়ি। যেই গাড়ি ছাড়া তিনি এক পা ও হাঁটতে পাারেন না, এদিকে ছেলে, মেয়ে যাক গঙ্গায় যমুনায় ভেসে। তাই আজকের শেষ ভরসা হলো নাবিল। এমনিতে যাই থাক, বোনদের আবদারে এই বান্দার জুড়ি নেই। যাই বলবে, কোন নিষেধ নেই। তাই একটু পেলেই আরামে বাইকে চড়ে ফুড়ুৎ করে চলে যাওয়া যাবে।
কিন্তু উঁকি দিতেই মুখটা ভোঁতা হয়ে গেল। নাবিল আগেই বেরিয়ে গেছে। যেদিন সে যাবে, আগেই যাবে। আর নোভা যে লেট লতিফ, সেটা তো বাড়ির সবাই জানে। তাই তার জন্য বসে থাকার কোনো কারণই নেই।
নোভা ভোঁতা মুখেই টেবিলে বসল। আসমানি খালার মুখেরও সেম অবস্থা। কাল কত রকম রান্না, কত আয়োজন করল, কিন্তু কেউ খাবে তো ভালো, ছুঁয়েও দেখেনি। যেমন খাবার সব তেমনি আছে। সব ফ্রিজে গুছিয়ে রেখেছে, রেখেও লাভ নেই। এই খাবার কেউ খাবে বলেও মনে হয় না। এক, দু’দিন ফ্রিজে গড়াগড়ি করবে, তারপর সব ডাস্টবিনে।
একদিকে বিয়ে ভাঙা, আরেকদিকে এত খাবারের অপচয় খালার মুখে তাই পুরো হতাশার ছাপ। সেই ছাপ নিয়েই নোভার পাশে পানের ডাবা নিয়ে বসল। সব দুঃখ একদিকে, পান খাওয়া আরেক দিকে। সেই পানের খিলি সাজাতে সাজাতে বলল, -- যা হয়, ভালোর জন্যই হয়। নাবিলা আম্মার কপালে রাজপুত্তুর আছে। মিলাই নিও আসমানির কথা।
নোভা মাথা নাড়ল। সাথে ভোঁতা মুখে বিরক্তি ছেড়ে গেল। কালকে ছেলে তার একটুও পছন্দ হয়নি। মার্বেল সাইজ। তবে ব্যবহার দেখে মনে হয়েছিল, আপা ভালো থাকবে। তবে আসল চেহারা দেখো, কেউ কিছু বলতেই দৌড়।
"আরে বাবা, খোলামেলা কথা বল, সমস্যা কি সেটা বল। তা না! মেয়েদের নামে কিছু শুনলেই হলো কাজ। এই পথে আর মাড়ানো যাবে না। কেন রে ভাই, মেয়েরা মানুষ না? তাদের দ্বারা ভুল হবে না? তোমাদের জন্য সাত খুন মাফ, আর মেয়ে বলে ভুল তো ভুল না, হলো গিয়ে সিলমোহর। একবার পড়েছে তো আর কোনো উপরে নিচ নেই। হুহ!"
বলেই চামচে করে ওটস মুখে দিল। সাথে সাথেই মুখ বাংলার পাঁচ করল। আল্লাহ দিয়ে রেখেছে যে সাইজ! শান্তিতে কিছু খাবে সেই জোগাড়ও নেই। একটু উনিশ বিশ হলেই হাতির সাইজ হতে সময় লাগবে না। এদিকে অপূর্ব ভাই পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরো ফিট। একটা মানুষ সব দিকে এমন সুন্দর হয় কি করে, নোভার মাথায় আসে না। তাকে একটু কম দিয়ে আমাদের একটু বাড়িয়ে দিলে হতোটা কি?। তা না, যাকে দেবে কপাল ফুঁড়ে দেবে, আর যাকে দেবে না, তিল পরিমাণও দেবে না। এইটা কোন কথা?
এক রাশ আফসোস করতে করতে নোভা অপূর্বর রুমের দিকে তাকালো। রুমের দরজা পুরো হাট করে খোলা। শূন্য ঘর। বড় চাচার সাথে হয়তো বেরিয়েছে। বাবা ছেলে আছে বিন্দাস হয়ে। আর তাদের জীবন দেখো, কেমন গ্রহন লেগে আছে।
নোভা মুখ ফিরিয়ে বিরস মুখে খেতে শুরু করল। তাদের বাড়িটা আবার সেই পিনপতন নীরবতায় ডুবে আছে। বড় মামা, মামি বাকি সবাই কাল রাতেই চলে গেছে। চেষ্টা তো কম করেনি, কপালে না জুড়লে করবে টা কি? তারা যেতেই মা রুমে গেছে যে গেছে, আর বেরই হয়নি। তাও ভাগ্য ভালো, এবার দরজায় খিল দেয়নি। তবে বাবা রাতটা বিষণ্ন মুখে কোনো রকম ছিল, তারপর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই বেরিয়ে গেছে।
আপা আছে তার নিজের জগতে। বড় চাচা আছে বড় চাচার জগতে। তাছাড়া সব কিছু তিনি খুব সহজভাবে হজম করতে পারেন। তার এক কথা, " যা ঘটার, ঘটবেই। আর নসিবে যা আছে, হবেই। তাই এত মাথা ঘামিয়ে লাভ তো নেই। যার ভাগ্যে আমাদের মা আছে, সে এলে হাজার ঝামেলার মাঝেও ঠিক তার সাথে জুড়ে যাবে।"
কথা খারাপ বলেনি চাচা। এত দুঃখ টুঃখ বিলাস করে হবে টা কি? এমন তো না, দুঃখ বিলাস করলে সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। তাই যা হবে চুপচাপ হজম করাই ভালো। তাছাড়া সমস্যা টা কোথায় সে বুঝতেই পারছে না। সব তো ঠিকই ছিল, তো গিট্টুটা লাগল কোথায় গিয়ে?
তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। নোভা নড়ল না। নড়ার ইচ্ছে তার একদমই নেই। কাল সে জীবনের হাইয়েস্ট কাজ করে ফেলেছে। আর কমপক্ষে দুই তিন মাস কোনো কাজের ধারে কাছেও সে নেই।
তবে মাথায় একটা কথাই ঘুরছে, এমন খাটুনি তার মা তাকে কেন খাটালো? মায়ের মেজাজের পারদ সবসময়ই আকাশ ছুঁয়ে থাকে, মাঝেমধ্যে দুএকটা চড় থাপ্পড় গালে ফেলে। তবে মেয়েদের সংসারিক কাজ নিয়ে তিনি কখনোই জোর করেন না, মাথা ঘামান না, না ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। আপা যা করে নিজের ইচ্ছায়, আর সে তো কোন কিছুতেই নেই। তো, কাল কোন ভূত যে তার মায়ের ঘাড়ে চড়েছিল, কে জানে! নোভার জানের দফারফা হয়ে গেছো গো, তার সাথে হাতও দফারফা। তাও যদি বিয়েটা হতো, সব মেহনত জলে গেলো।
আর এই সব ঠিক করার জন্য পার্লারে যাওয়া দরকার, কিন্তু বাড়ির যে অবস্থা, কতদিন এই রকম ঝিম ধরা পরিবেশ চলবে, আল্লাহই জানে।
আসমানি খালা মুখে পান পুরে উঠে দরজা খুলে দিল। ময়লাওয়ালা এসেছে। সব গুছিয়ে দিয়ে সে নিজের রুমের দিকে গেল। আজকে হচ্ছে ঝিম মারা দিন। সারাদিন বসে বসে সবাইকে ঝিম মারতে হবে। আর এমন ঝিম মারা দিনে আসমানি খালা তার প্রিয় ঘুমের সাথে সাক্ষাৎ করবে না, তা হয়?
নাস্তা শেষ করে নোভা বেরিয়ে এলো। মোড় পর্যন্ত এলো খুব হেলেদুলে। দৃষ্টি তার রাস্তায় কম, আশপাশ, আকাশের দিকে বেশি।
আজ আবহাওয়াটা সুন্দর। কাঠফাটা রোদ নেই, আকাশে মেঘও নেই, গরমও নেই, শীতও নেই। তবে শীতকাল আসার যে একটা আমেজ, সেটা ঠিক টের পাওয়া যাচ্ছে। তাই সে, সেই আমেজে গা ভাসিয়ে হাঁটতে গিয়ে এক অঘটন ঘটে গেল।
মোড়ের পাশ থেকে একটা সাইকেল খুব দ্রুত এসেছে। নোভা খেয়ালই করেনি। চোখ ফেরাতে না ফেরাতেই এক ধাক্কা খেল। ধাক্কায় যেমন সাইকেলের দু’জন উল্টো পড়ল, তেমনি পড়ল নোভা।
মোড়ের দোকানদার দৌড়ে বেরিয়ে এলো। এসে নোভাকে দাঁড় করাল। করিয়ে বলল -- ঝাড়া দাও মা, পা সোজা ঝাড়া দাও।
নোভা ঝাড়া দিলো। পায়ে বেশ ব্যথা পেয়েছে । ব্যথা পেয়েছে সাইকেলের দু’জনও। তাই দাঁড়িয়ে খাস বাংলায় সুন্দর করে এক গালি দিল। বেল বাজিয়েছে তারা। মোড়ের এপাশে কে আছে, তারা তো আর দেখবে না। বেল শুনে চেপে যায়নি কেন?
দোষ তারই, নোভা জানে। আকাশের দিকে চোখ রেখে আনমনে হেঁটেছে। সাইকেলের বেলটা কানেই যায়নি। তবুও এই বকা তার হজম হলো না। না হওয়ার কারণও আছে। এই দু’জনের পেছনের জন আবার সেই দলের একজন, যে আপাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে বাজে কথা শুনিয়েছিল।
তাই গলায় রাগ নিয়েই বলল, -- পুলিশের ছেঁচা খেয়ে মন ভরেনি? আবার এখানে নাচতে এসেছিস?
পুলিশের কথা শুনেই দু’জনের রাগ চড়ল। খালিদ, খালিদের এই ‘পেয়ারের’ মানুষদের প্রতি ক্ষোভ অনেক দিনের। তবে কাউন্সিলরের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তাদের ভাই কথা দিয়েছে “সময় হলে ঠিক ব্যবস্থা নেবে।” তাই আপাতত চুপ। এলাকায় কোনো ঝামেলা পাকাতে নিষেধ করেছে। তবুও বিনা দোষে কথা শোনাবে, আর তারা চুপচাপ শুনবে, এত ভদ্র মানুষ তো তারা না।
তাই দাঁত চেপে বলল, -- নাচার কারণ হলে তো নাচবোই। ভালো কথা, ভাবির নাকি বিয়ে আবার ভেঙেছে?
নোভা সাথে সাথে ফুঁসে বলল,-- তোর কোন কালের ভাবি?
-- আরে আমাদের এলাকার ভাবি। তবে এটাই মাথায় আসে না। এলাকার ভাবি সবার জানা। তাও তোর মা দু'দিন পর পর এমন বিয়ের নাটক করে কেন?
নোভা খুঁড়িয়ে একেবারে সামনে এলো। এসে সোজা তাকিয়ে বলল, -- আমাকে নাবিলা মনে হয়? যা মন চায় বলবি, আমি শুনে চুপচাপ চলে যাবো?
-- আরে রেগে যাচ্ছিস কেন?
-- বাপের বেটা হলে আরেকবার বল ‘ভাবি’। তোর চাপা আমি যদি টেনে না ছিঁড়ি, আমার নাম নোভা না।
-- আরে ধুর, নাবিল আর তুই দেখি একই ক্যাটাগরির। কথায় কথায় আগুনের মতো ফুঁপে উঠিছ।
-- রাগ তো তোরা দেখিসইনি। এই পা নিয়ে আমি বাড়িতে যাই। তারপর দেখবি রাগ কাকে বলে! আমার মায়ের থাপ্পড়টা জানি কার গালে পড়েছিল?
ওরা হেসে আগের মতোই বলল, -- তোর মা পারেই তো আমাদের সাথে! অথচ আমরা যা দেখি তাই তো বলি। আর যে করে তল কেটে ফালাফালা করছে, তাকে দিব্য জামাই আদর করছিস।
নোভার মাথা গরম হয়ে গেল। গরম কণ্ঠে বলল, -- একদম বাজে বকবি না।
-- কোথায় বাজে বকলাম? বিশ্বাস না হলে তোদের প্রিয় খালিদ ভাইকেই জিজ্ঞেস কর। সে আমাদের মতো এলাকার পাতি নেতাদের মতো মোড়ের চায়ের দোকানে বসে বসে আড্ডা দেয়? তো কাল, তাও আবার তোদের গলির মোড়ের দোকানে কেন সন্ধ্যার পর থেকে দাঁড়িয়ে ছিল? ঠিক আছে কাউন্সিলরের ডান হাত, হয়তো কাজ ছিল। তবে ডেকে তোদের বাড়ির মেহমানদের সাথে আবার কথাও বলবে? বোকা তোরা হতে পারিস, আমরা তো না। এখন ‘ভাবি’ বলে ডাকলেই যত দোষ নন্দঘোষ।
-- চুপ! একদম চুপ।
-- আমরা চুনোপুঁটি। চুপ বললে তো চুপ হবোই। তবে বাকি সবাই? বলেই পাশের দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বলল, -- কি চাচা, খালিদ ভাই কাল সন্ধ্যার পর থেকে এই গলির ভেতরেই ছিল না?
দোকানদার হ্যাঁ না কিছুই বলল না। অযথা, মুখ খুলে বিপদ বাড়ানোর মানে আছে? তাই নিজের দোকানের দিকে ফিরে গেলো।
তবে নোভা কিছু মুহূর্ত চুপচাপ সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হনহনিয়ে সোজা হাঁটা ধরল। পা ছিলেছে, বেশ ছিলেছে। সে রাগে পাত্তাই দিল না। বরং ফোন বের করে নাবিলকে ফোন দিল, মনে মনে বলল, -- খালিদের বাচ্চা, এদের কথা যদি সত্যি হয়। তোর চুল দাড়ি কেটে নেড়া না করেছি, আমিও রোকেয়ার মেয়ে না।
........
নাবিলা কিছুটা বিরক্ত মুখে বেরিয়ে এলো। গায়ে তার একদম টাটকা ঝটকা একশো দুই ডিগ্রি জ্বর, মাথা ভার, গলা ব্যথা। যেগুলো সকালেই সুন্দর মতো এসে হাজির হয়েছে। এদের অবশ্য দোষ দিয়ে লাভ নেই। রাতে ঝর্নার পানিতে ইচ্ছে মতো ভিজে থাকার ফল। শরীর যে এখনো ঠিক গতিতে আছে, এই তো কতো! তাই কম্বল টেনে আরামেই শুয়ে ছিল। বাড়ির আবহাওয়া কেমন যাবে, সেটা তো ভালো করেই জানে। তাই বেরোনোর কোনো তাড়া টাড়াও দেখা যায় নি।
কিন্তু খালা এসে গলায় বিরক্তি মাখা জরুরি সুরে ডেকে তুলল। তুলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার গতিতে বলল,
-- বাপ পুতে মিলে কি করছে, দেইখা আসো একবার।
নাবিলা চোখ কুঁচকে খালার দিকে তাকাল।
বাপ পুতে যা করার করুক, সে গিয়ে দেখে করবে টা কি? তার নিজের শরীরেরই বারোটা বেজে আছে। তাই আবার কম্বল টেনে শুয়ে পড়তে যাচ্ছিল, আসমানি খালা আবার বলল, -- চোখটা বুইজা হারি নাই। দুনিয়া আনধার করে ফেলছে। কইলাম আমি কইরা দিতাছি। তাও দিবনা। কেন, আসমানি বুঝি কাম জানে না?
নাবিলা কোন উত্তর দিল না। আপাতত দুনিয়া আনধার হলে তার জন্যই ভালো। খালা এসেই বারান্দার দরজা, জানালা সব খুলে দিয়েছে। আলো চোখো বিধছে।
আসমানিও তার মতো বলে গেল , -- পাকঘরের বারোটা বাজাই ফেলছে দুইজনে! বলি, পরিষ্কার করবটা কেরা? তাই আগেই কইলাম। কাজে নেই নাই, এখন পরিষ্কারও আমি নাই।
নাবিলা তাও কিছু বলল না। না থাকলে নাই। তার শরীর ভালো হলে নিজেই সব করে ফেলবে। এখন যা খুশি করুক।
আসমানি বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে বলল,-- কাল সারাদিন কাটালাম দৌড়ের ওপর, আজকেও যদি তার ঘষা মাজা করতে করতে দিন শেষ হয়, এই বেতনে আমার আর পোষাবে না। বেতন বাড়াইলে বাড়াও, তা না হলে নতুন মুখ খুঁজো। রান্দুম বারুম কাজ করুম। এর মাঝে করে একেকজন বারো মাতব্বরি। আরে খাবার নিবি নে, এত নকশার দরকার কি? প্যাকেট ট্যাকেট করে এত ভাবেরই বা দরকার কি?
নাবিলা আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারল না। তবে বড় এক দীর্ঘশ্বাস টানল। যেদিন শরীর খারাপ থাকে, সেদিনই এত আজব আজব ঘটনা কেন ঘটে, তার মাথায় আসে না।
তাই এবার আর শুয়ে থাকতে পারল না। উঠে বসল। গায়ের ওড়না চাদরের মতো জড়িয়ে কিচেনের দিকে পা বাড়াল। গিয়েই বিস্ময় চোখে তাকালো।
পুরো কিচেন রুমে কালকের খাবার। এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, ছড়িয়ে আছে স্টাইরোফোম বক্স। একজন চুলায়, একজন ওভেনে সমানে খাবার গরম করে ঢেলে ঢেলে রাখছে।
নাবিলা দেখেই বিস্ময় নিয়ে বলল, -- কি করছো, বড় চাচা?
অপূর্ব ফিরেও তাকালো না। অতি ঢংগিদের ফিরে তাকিয়ে দেখার কিছু নেই। তবে আসাদুজ্জামান হাসলেন। তিনি নিজে কিছুই করছেন না। সবই অপূর্বর আইডিয়া। সকালে হাঁটতে বেরুতেই একগাদা বক্স কিনল। কিনে বলল,-- খাবারগুলো সব অপচয় হবে, তার চেয়ে চলো, খাবারগুলোর একটা ব্যবস্থা করে ফেলি।
-- কি ব্যবস্থা?
-- সেটা তুমি বলো, দেশের এক্স সৈনিক তুমি। আমি তো সামান্য ইউটিউবার, ব্লগার। আমার রিচ দরকার, তোমার কি দরকার সেটা বের করো।
আসাদুজ্জামান ছেলের কথা শুনেই হাসলেন। এমন ভাবে কখনো ভাবেননি। খাবারের কষ্ট যে কী তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। কত মানুষ আছে এখনো, এক বেলা খেয়ে দিন পার করেন। অথচ তারা কত অনায়াসেই খাবারের অপচয় করে ফেলে।
তাই বাসায় ফিরে সেই আয়োজনই লেগে গেছে। ফ্রিজের ঠান্ডা খাবার তো আর দেওয়া যাবে না, তাই গরম করছে। করে একটু ঠান্ডা হলে প্যাকিং করবে।
রান্নাবান্না আয়োজনের হাত তার আছে, অপূর্বও আনাড়ী না। তাই আসমানিকে বলল সব নিজেরাই করবে। আর করতে গিয়ে পুরো মাখামাখি করে ফেলেছে। আসলে রান্নাবান্না কোনো বড় ব্যাপার না, বড় ব্যাপার গুছিয়ে সব করা। বয়স হয়েছে, আগের মতো সেই পরিপক্কতা তার নেই। তবুও কোনো রকম গোছালেও, মাশাল্লাহ এক ছেলে সে পেয়েছে, যার কোনো গোছগাছের ধারে কাছেও নেই।
তাই হেসেই বলল,-- খাবারগুলো যাদের প্রয়োজন তাদের মাঝে বিলিয়ে দেব। যেমন ভিক্ষুক, পথশিশু। তাই একটু বিরক্ত করছি মা। চিন্তা করো না, সব গুছিয়েই রেখে যাব।
আসাদুজ্জামান এমন ভাবে বললেন, নাবিলা শুনেই হেসে ফেলল। তার হাসির শব্দে অপূর্ব ফিরে তাকালো। নাবিলা অবশ্য অপূর্বের দিকে তাকালো না। তবে এগিয়ে বড় চাচার হাত থেকে চামচ নিতে নিতে বলল,-- এটা তোমারও বাড়ি চাচা। তোমার যা ইচ্ছে করতে পারো। তবে মেয়েরা থাকতে বাবাদের কাজ করতে হয় না। যাও তো, আমি করে দিচ্ছি।
-- একদম না। আজ আমি করব।
-- সেটা তো আমি থাকতে হতে দেব না। এখন বলো, নেবে আমার হাত থেকে কেড়ে চামচ?
-- তোকে দেখে অসুস্থ লাগছে।
-- সেটা নতুন কিছু না। এখন যাও তো। তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি সব গুছিয়ে দিচ্ছি।
আসাদুজ্জামান আর কথা বাড়ালেন না। এই মেয়েটার উপরে কথা বলার ক্ষমতা তার নেইও। দ্বিতীয় মা তার।
আসাদুজ্জামান যেতেই নাবিলা অপূর্বর দিকে তাকালো। গায়ের ট্রাউজার, ধূসর গেঞ্জি কাজের চেয়ে নেয়ে ঘেমে একাকার বেশি। তাই তাকিয়ে বলল,-- আপনিও যান, আমি দেখছি।
-- তুমি আমার হেল্প নাও?
নাবিলা উত্তর দিল না। অপূর্ব উত্তরের আশাও করল না। আগের মতোই কাজ করতে করতে বলল, -- তাছাড়া আমি নিশ্চয়ই তোমার বাবা না?
নাবিলা কিছুটা আঁতকে বলল, -- মানে?
-- মানে আবার কি? তুমিই না বললে, মেয়েরা থাকতে বাবারা কাজ করে না। এখন এখান থেকে গিয়ে, এই বয়সে এমন ধামরি মেয়ের বাবা হতে পারব না।
নাবিলা হেসে ফেলল! হেসে বলতে গেলো, -- বাবা না হোন ভাই…
তবে নাবিলা কথা শেষ করতে পারল না। অপূর্ব ঝট করে ঘুরে হাতের চামচ তলোয়ারের মতো এপাশ ওপাশে হু হা করে নেড়ে নেড়ে বলল, -- বেশি কথা বললে জবান কেটে ফেলব মেয়ে! কাজ করতে এসেছো চুপচাপ কাজ করো। তাছাড়া আমি যাচ্ছি না, একজনের ঘাড়ে কাজ চাপিয়ে দেওয়া মেন্টালি আমার না। আমার মেন্টালিটি হাতে হাতে কাজ।
-- আচ্ছা?
-- অবশ্যই।
-- তাহলে এই কয়দিন এগুলো কি ছিল?
-- কি ছিল?
নাবিলা আর কথা বাড়ালো না। সে ঘুরে চুপচাপ কাজে লাগল। কথা বললেই সময় নষ্ট। অপূর্ব নিজেও কাজে লেগে গেল। এই মেয়ে মেপে মেপে কথা বলে। আজকের কোটা মনে হয় শেষ। তাই নিজের মতো করতে লাগল। তবে নাবিলার কাজের ধারের কাছেও ঘেষতে পারল না। সে এক হাতেই, কিছু সময়ের মাঝেই সব গরম করে গুছিয়ে একপাশে করে ফেলল। কিচেন রুম গুছিয়েও ফেললো।
একটু ঠান্ডা হতেই, বক্স নিয়ে সুন্দর করে প্যাকিং করতে লেগে গেল। অপূর্ব কাজের চেয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়েই দেখলোই বেশি। এই যে, চোখ দুটো লাল, দেখেই বোঝা যাচ্ছে গায়ে জ্বর। যতবার ঢোক গিলছে, ততবার চোখমুখ কুঁচকে ফেলছে। মাথায় রাতের এলোমেলো খোঁপা। চুলগুলো মাঝে মাঝে গুছিয়ে কানের পাশে নিচ্ছে। আর বোনাস হিসেবে অন্য একটা জিনিসও দেখল। ছোট্ট একটা লাল তিল, কোথায় সেটা বড় কথা না। বড় কথা, তার নিজের গালে কষে দুটো থাপ্পড় মারা উচিত। মেয়েদের এমন খুঁটিয়ে দেখতে নেই। এটা ব্যাড মেনার্স! তাই এই মেয়ের সামনে তো আর নিজের গালে নিজে মারা সম্ভব না, বাকি রইল। পরে ঠিক দুটো দিয়ে দেবে।
আর তার ভাবনায় ছেদ করে, অবাক করে প্রথমবার নাবিলা নিজে থেকেই বলল, -- আমি যদি আপনাদের সাথে যেতে চাই, নেবেন?
অপূর্ব ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে বলল, -- কালকের কথা এখনো ভুলিনি আমি।
নাবিলাও হালকা হাসল। হেসে বলল, -- না, ভোলারই কথা। আমার তো ধারণা, আমিই প্রথম মেয়ে, যে আপনার প্রশংসা না করে উল্টো কথা শুনিয়েছি।
-- হান্ড্রেড পার্সেন্ট ট্রু।
-- সেই ট্রিট হিসেবেই নিয়ে যান।
-- নিলে কি দেবে?
নাবিলা শান্ত চোখে তাকালো। অপূর্ব আগের মতোই বলল,
-- ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমাদের সাথে নিচ্ছি, কোনো একদিন তোমার সাথে নিয়ে শোধবোধ করে দিও।
নাবিলা আর কিছু বলল না। সবকিছু গুছিয়ে দু’জনে হাতে হাতে বক্সগুলো বড় ব্যাগে ভরল। ব্যাগে ভরেই টেবিলে রেখে ফ্রেশ হতে গেল। যেতে যেতে নাবিলা খেয়াল করল, অনেক দিন পর কোথাও যাওয়ার প্রতি তার ভীষণ আগ্রহ হচ্ছে।
চলছে........
আমার গ্রুপের লিংক আর প্রথম ইবুক লিংক কমেন্ট বক্সে
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT