#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_১৭
নাবিল বসে আছে চুপচাপ। ভার্সিটিতে ছিল, নোভা ফোন দিতেই দৌড়ে এসেছে। ভালো মন্দ অবশ্য এই মেয়ে কিছুই বলেনি। ঝড়ের গতিতে তাকে ফোন দিয়েছে। দিয়ে আর ডানে বামে কথা নেই। ফোন ধরতেই রাগে চিরমির করে বলছে, -- আমি খালিদ ভাইয়ের পার্টি অফিসে যাচ্ছি। তুই আসবি, পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসবি।
সে কিছু বলবে, তার আগেই লাইন কাট। এত সকালে পার্টি অফিসে কেউ থাকে না, নাবিল ভালো করেই জানে। একজন লোক আছে। সে প্রতিদিন এসে দরজা খুলে, ঝাড়ু দেয়, পত্রিকা গুছিয়ে রাখে, আর কেউ কাজ নিয়ে আসলে নাম ঠিকানা ফোন নাম্বার রেখে, সময় মত আসতে বলবে জানিয়ে বিদায় করে। সারা দিন এমন থাকলেও, বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ টাজ তো ভালোই, এলাকার, দলের ছেলে পেলে দিয়ে পুরো গরমা গরম হয়ে থাকে।
তাই এমন হঠাৎ সাত সকালে পার্টি অফিসে যাওয়ার কারণ তার মাথায় এলো না। তবে নোভার এমন তাড়া দেখে তার মনে কিছুটা দুশ্চিন্তাই হলো। আসলে, ব্যাপার টা কি? আবার কি কিছু হয়েছে? তাই ডানে বামে না দেখে, বাইক ছুটে কীভাবে যে এসেছে, একমাত্র সেই জানে। আর আসতেই নোভা বলতে গেলে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। চামচা, চাটুকার, তেলচাটা আরো কি কি বলল, নাবিল আগা মাথা কিছুই বুঝল না। দুনিয়ায় পয়দা হওয়ার আগ থেকে তার হার হাড্ডি জ্বালিয়ে খাচ্ছে। আরো কত খাবে কে জানে। তাই শান্ত করেই বলল, -- হয়েছে কি?
নোভা সব বলল। শুনে নাবিলের তেমন ভাবান্তর হলো না। এই সন্দেহ তার আরো অনেক আগেই হয়েছে। এলাকায় চলাফেরা করে, গল্পগুজব সবই কানে আসে। কিন্তু কখনো প্রমাণসাপেক্ষ কিছু পায়নি, দেখেওনি। আর খালিদ ভাই, তার কাছে খুব সম্মান আর প্রিয় মানুষের একজন। আপার সাথেও কখনো তেমন কিছু চোখে পড়েনি। তাই যা শুনেছে সবকিছুকেই এড়িয়ে চলেছে। তবে আজও কি না শোনার ভান করা যায়?
পার্টি অফিসের লোক তাকে চেনে। তাই দেখেই ভেতরে নিয়ে বসাল। শুধু পার্টি অফিসেই না, তাদের সাত নং ওয়ার্ডে প্রায় সবাই জানে, খালিদের বিশেষ মানুষ তারা। তবে কেন, সেটা কেউ জানে না। যার যেটা মন চায় বানিয়ে নেয়। তবে তাদের বানিয়ে নেওয়া ডালপালা আরো ছড়ায় আপার বিয়ে ভাঙাতে। তবে এটাই মাথায় আসে না, যদি পছন্দ করেই থাকে, তাহলে কিসের এত লুকোচুরি?
তখনই নোভা বিরক্ত মুখে পাশে রাখা চেয়ারটায় একটা লাথি বসাল। বসিয়ে নিজেই কুঁকিয়ে উঠল। হাঁটুতে লেগেছে, তখন ব্যথাকে পাত্তা না দিলেও এখন ঠিক জানান দিচ্ছে।
নাবিল নোভাকে দেখল। এ সব সময়ই এমন। কথা যেমন পেটে রাখতে পারে না, তেমনি রাগ জেদও চেপে রাখতে পারে না। এই অল্প সময়ের মাঝেই তার বারোটা বাজিয়ে ফেলেছে। কার হাতে যে পড়বে, আল্লাহই জানে। তবে যার হাতেই পরুক জীবন বেচারার একদম তেজপাতা।
তাই শান্ত ভাবেই বলল,-- তুই বাড়ি চলে যা, আমি দেখছি।
নোভা রাগে হাতের ব্যাগ দিয়ে আরও দুটো দিল। দিতে দিতে বলল, -- কি করবি তুই? তোর না দয়াল বাবা। এবার করব তো আমি। আগে এই গলা পার্টির মুখ থেকে শুনি। তারপর দেখ মাকে কেমন জানাই। তাই তো বলি, এত ভক্তি কেন? অতি ভক্তি যে চোরের লক্ষণ, ঠিক মিলে গেল তো! আবার বলে, দুনিয়ায় আঙুল তোলা সম্পর্কের বাইরেও অনেক সুন্দর সুন্দর সম্পর্ক আছে। তোর সুন্দর সম্পর্কের খেতা পুড়ি।
নাবিল আর কিছুই বলল না। খালিদ ভাই আসতে কতক্ষণ লাগে কে জানে? কাজ ছাড়া বুঝি নেতা, ভাই ব্রাদাররা সকালের সূর্যের মুখ দেখে। সে অবশ্য খালিদ ভাইকে ফোন দিয়েছে। সব সময়ের মতো দেওয়ার সাথে সাথেই ধরেছে। ধরে ঘুমঘুম কণ্ঠে বলেছে, -- কোন সমস্যা, নাবিল?
-- আমি পার্টি অফিসে… একটু আসবেন?
খালিদ ভাই একটাও বাড়তি প্রশ্ন করেনি। শুধু বলছে,-- পাঁচ মিনিট বসো। আসছি।
পাঁচ মিনিটে কারো আসা সম্ভব না। তবে পাঁচ মিনিটে না এলেও খুব একটা সময় খালিদের লাগল না। তার ফ্ল্যাট পার্টি অফিস থেকে খুব একটা দূরে না। এই এলাকার সাইডেই আবাসিক এলাকা আছে। সেই এলাকাতেই তার চাচার বাড়ি দুটো। কেউ অবশ্য জানে না। কাউন্সিলর হয়ে দুই তিনটা এমন বাড়ি করা চোখে লাগার মতো। তাই সবাই জানে, তার এক লন্ডন প্রবাসী আত্মীয়ের বাড়ি। তারা দেখা শোনা করে। আর সেখানেই তার জন্য আলাদা ফ্ল্যাট আছে। নামের না, বরং একেবারে নিজের। চাচার এত কাজ করে। এমন একটা ফ্ল্যাটই যদি না দিতে পারে, তো দিলটা কি?
তাই বাইক নিয়ে টান দিয়ে আসতে লাগল বড়জোর দশ মিনিট। আর এসেই রীতিমতো একটু ঝটকা খেল। নাবিল একা না, নোভাও বসা। কোন কারণে রাগে ফুসফুস করছে। সমস্যা কি? তবে সমস্যা যাই থাক, এই দুনিয়ায় সমাধান ছাড়া সমস্যা নেই।
তাই সাথে সাথেই ফিরে আবার বাইকে গিয়ে বসল। সে ভেবেছে শুধু নাবিল এসেছে। তাই যেভাবে ছিল সেভাবেই চলে এসেছে। গায়ে ঘরের গেঞ্জি, সাদা লুঙ্গি। গেঞ্জি সমস্যা না যদিও, তবে সাদা লুঙ্গি পরে এই মেয়ের সামনে যাওয়ার ইচ্ছে তার হলো না। যে মেয়ে ফট করে না বলে বসে, -- চুল দাড়ি আর সাদা লুঙ্গিতে আপনাকে শিম্পাঞ্জির মতো লাগছে খালিদ ভাই।
তাই আবার একটানে ফ্ল্যাটে গেল। গিয়ে কাপড় বদলে এসে দেখল, পার্টি অফিস খালি। সে ভ্রু কুঁচকে নাবিলকে কল দিল। দিতেই নাবিল ধরে হন্তদন্ত হয়ে বলল, -- খালিদ ভাই, অ্যাম্বুলেন্স লাগবে। এক্ষুণি লাগবে। মা কেমন জানি করছে।
খালিদ দেরি করল না। অ্যাম্বুলেন্স কল করে সোজা নাবিলদের বাড়িতে গেল। দরজা খুলল আসমানি। তাকে দেখেই হরবর করে বলল,-- বাড়িতে তো কেউ নাই। আমারে ডাইকা কইল, বুক নাকি আটকা আসে। একটু শরবত করে দিতে। আমি করে নিয়ে আসতে আসতেই দেখি নিস্তেজ। গলা দিয়ে গলা কাটা গরগর শব্দ করছে। এতো কষ্ট সহ্য করবার পারে নাই গো। মনে হয় দিলে দৌড়া পড়ছে।
খালিদ উত্তর দিল না। রুমের দিকে এগিয়ে গেল। নাবিলের মা নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে। নিশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। নোভা নাবিল তাকে ঘিরে বসে আছে। দুজনের চিন্তায় চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। সে এগিয়ে কোমল করে বলল, -- নাবিল, উঠো। চিন্তার কিছু নেই। অ্যাম্বুলেন্স এসে পড়বে। আন্টিকে বরং সোজা করে শুইয়ে দাও। আর বাড়ির সবাইকে ইনফর্ম করো।
নোভার এত কোমল ঢং দেখে ভেতর ফুঁসে উঠল। উঠেই বলল, -- কেন এসেছেন আপনি? ঢং করতে? আপনার জন্য এই সব। আমার মার যদি কিছু হয়, আপনাকে আমি খুন করে ফেলব।
খালিদ ভ্রু কুঁচকে নোভার দিকে তাকাল। আগা মাথা সে কিছুই বুঝল না। এখন অবশ্য বোঝার চেষ্টাও করল না, বরং নাবিলের সাথে ধরার জন্য এগোল।
নোভা এক ধাক্কা দিয়ে সরাল। সে অঝোরে কাঁদছে, কাঁদতে কাঁদতেই চেঁচিয়ে বলল, -- ছোঁবেন না আমার মাকে, একদম ছোঁবেন না! আমাদের জীবনটা একদম হেল করে রেখেছেন আপনি! বদমাইশ, খারাপ লোক! এখন এসেছে আবার ভালো সাজতে। লাগবে না আমাদের আপনাকে। বের হন, এক্ষুনি বের আমাদের বাড়ি থেকে।
নাবিল নোভাকে থামাতে চাইল। তার আগেই সবসময় গলে যাওয়া খালিদ, এমন এক ধমক দিল! নোভা তো ভালোই, নাবিল নিজেও কেঁপে উঠল। আসমানি পায়ে মালিশ করার জন্য সরিষার তেল গরম করে আনছিল। সেটাও হাত ছিটকে পড়ল।
খালিদ অবশ্য কোন দিকেই তাকাল না। বরং নিজেই রোকেয়াকে সোজা করে দিল। পিঠের উঁচু বালিশটা সরিয়ে দিল। হাসপাতাল এখান থেকে খুব একটা দূরে না। তাই অ্যাম্বুলেন্স আসতে সময় লাগল না। আর আসতেই বারান্দায় গিয়ে চেঁচিয়ে ইস্ট্রেচার নিয়ে দ্রুত তিন তলায় আসতে বলল।
.......
নাবিলা বসে আছে রেলস্টেশনের এক কোণে। নরম কোমল আলোয় ভরা ক্লান্ত দুপুর। এমন দুপুর সচরাচর দেখা মেলে না। দুপুর মানেই আগুনঝরা রোদ গরমের মাখামাখি। তবে আজ দুপুরটা ভালো, পুরো দিনটাই ছিল ভিন্ন। সাধারণত এই সময়টা রোদে আগুন ঝরে প্ল্যাটফর্মের মানুষ গরমে হাঁসফাঁস করে মরে।
আজ তেমন কিছু নেই। গরমটা সহনীয়, সব কিছু সব সময়ের মতো ধুলোমাখা হলেও অস্বস্তিকর না। বরং হাজার ব্যস্ততার ভিড়েও কোথাও যেন অন্যরকম এক শান্তি মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে।
আজ দিনটাই এমন, না কাজ ছাড়া অনেকদিন পর ঘর থেকে বেরিয়েছে বলে এমন মনে হচ্ছে সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না।
তাই নিজের মতো, পা ঝুলিয়ে চুপচাপ বসে আছে। গায়ে শুভ্র সাদা রঙের জামা। ওড়না গুছিয়ে মাথায় দেওয়া। দৃষ্টি সেই সামনে ক্ষুধার্ত পথশিশু আর ভিক্ষুকদের দিকে। যারা আপাতত খুব তৃপ্তি নিয়ে তাদের খাবারগুলো খাচ্ছে।
স্টেশনে আসার আইডিয়া বড় চাচার। এখানে ওখানে না ঘুরে, একসাথে অনেক পথশিশু আর ভিক্ষুক নাকি স্টেশন, পার্ক, লঞ্চটার্মিনালে বেশি দেখা যায়। এই ব্যাপারে অপূর্বর কোনো ধারণা নেই, নাবিলার নিজেরও নেই। তাই বড় চাচা যেদিকে নিয়ে এসেছে, সেখানেই চলে এসেছে। তবে বড় চাচার কথা ভুল হয়নি। প্রথমে দুই একজনকে দিতেই যেন ঝাঁপিয়ে কোথা থেকে এত মানুষ এলো! চোখের পলকে খাবার শেষ। কারাকারি লাগে এমন অবস্থা। তবে কয়েক বাচ্চা সবার ঠেলাঠেলিতে কিছু নিতেই পারেনি।
নাবিলা মন খারাপ করে বড় চাচার দিকে তাকালো। বড় চাচা হেসে বলল, -- চুপচাপ তোরা এখানে বস। এখানে খাবার হোটেলের অভাব নেই। আমি বরং আরও কয়েক প্যাকেট কিনে নিয়ে আসি।
নাবিলা খুশি হয়েই মাথা নাড়ল। তারপর বড় চাচা চলে গেল। অপূর্বর হাতে ক্যামেরা। এসেছে পর থেকে ছবি ভিডিও করছে তো করছে। কোনো ক্লান্তি নেই, চিন্তা নেই। যখন যেই কাজ করে, সেটাতেই ডুবে যায় ধ্যান জ্ঞান লাগিয়ে। তবে ছবিটা তোলে খুব যত্ন করে।
তাই নাবিলা চুপচাপ বসল। গলা ব্যথা থাকলেও তার গায়ে এখন আর জ্বর নেই। বের হওয়ার সময় টেবিলের ওপর ওষুধের পাতা দেখল, সাথে এক গ্লাস পানি। সুন্দর করে গুছিয়ে এমন করে রাখা, এখানে এসে দাঁড়ালেই যেন চোখে পড়ে।
বড় চাচার কাজ, না অপূর্বর নাবিলা বুঝতে পারল না। তবে পরপর দুটো ওষুধ ঠিকই খেয়ে নিল। খাবারের প্যাকেট হাতে নেবে, তখনই ফট করে এই ছেলে এসে হাজির। খাবারের প্যাকেট হাতে তুলে নিতে নিতে বলল, -- বাবাকে আসতে বলো তো। সিএনজি নাকি রিজার্ভ করেছে। সেটাই নিচে দাঁড়িয়ে হাঁকডাক দিচ্ছে।
সিএনজি এসেছে নাবিলা জানে। আসমানি খালা এসে বলে গেছে। তাই সে এগিয়ে বড় চাচার রুমের দিকে গেল। রেডি হয়ে দুজনে বেরিয়ে দেখল, সব প্যাকেট নিচে নামানো শেষ। নাবিলার তেমন ভাবান্তর হলো না, তবে বড় চাচা স্নেহের কোমল হাসি হাসলেন। ছেলের সব কাজে তিনি মুগ্ধ হোন, এবারো হলেন। হয়ে আসমানি খালার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারা আরামছেই এখানে এসে পড়েছে।
-- চা।
নাবিলা একটু চমকে পাশে তাকালো। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। কখন অপূর্ব এসে পাশে বসেছে খেয়াল করেনি। তার হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের ওয়ান টাইম কাপ।
নাবিলা দেখে আস্তে করে দু’পাশে মাথা নাড়ল। মানুষ দু’জন, কাপ নিয়েছে একটা। এই এক কাপ কে খেতে চাইবে?
অপূর্ব হয়তো বুঝল। বুঝে হেসে কাপটা নাবিলার পাশে রেখে আস্তে করে ঠেলে এগিয়ে দিল। দিতে দিতে বলল, -- তোমার জন্যই এনেছি। নাও। কাল তোমার কফি নিয়ে খেলাম। তাই আজ শোধবোধ।
নাবিলা এবার আর কিছু বলল না। ওড়নায় পেঁচিয়ে গরম কাপটা তুলে নিল। গলা ব্যথা এখন খুব না থাকলেও, খেতে ভালো লাগবে। নিয়ে আলতো করে ফুঁ দিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল।
অপূর্ব এক পলকে সেই ঠোঁট ছোঁয়ানো কাপের দিকে তাকিয়ে রইল। নাবিলা খেয়াল করেনি। তাই নিজের মতোই বলল, -- কফি এঁটো ছিল।
অপূর্ব বিস্ময়ের ভান করে বলল, -- বলো কি? তাই তো বলি, কফি হবে কফির মতো। এমন ম্যানম্যানা ডালের পানি লাগল কেন?
নাবিলা নিজেও বিস্ময় নিয়ে বলল, -- কিসের মতো?
-- সেটা বাদ দাও। স্যরি হ্যাঁ! আমি ভেবেছিলাম তখনিই কিচেন থেকে বানিয়ে দরজা খুলেছো।
-- এমন মনে হওয়ার কারণ কি? আমি কি কফির জন্য দিনরাত কিচেনেই থাকি নাকি ?
-- তা থাকো না, তবে বের হলে কফির জন্যই হও।
-- জিজ্ঞেস করে নেওয়া উচিত ছিল।
-- আমি খুবই দুঃখিত। এরপর থেকে নিলে অবশ্যই অনুমতি নেব।
-- একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
-- না।
নাবিলা সাথে সাথেই চোখ তুলে তাকালো। "না" সে আশাই করেনি। তবে অপূর্ব সাথে সাথেই চোখ ঘুরিয়ে নাবিলার পাশ দিয়ে ট্রেনের দিকে দৃষ্টি নিয়ে নিলো। এমন ভাব তার নজর এতোক্ষণ ট্রেনের দিকেই ছিল। খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখছে।
নাবিলা চোখ ফিরিয়ে নিল। তবে আর কিছু বলল না। অপূর্ব আবার তাকালো। তাকিয়ে বলল, -- জিজ্ঞেস করবে না কেন?
নাবিলাও অপূর্বর মতো এক শব্দেই বলল, -- না।
অপূর্ব হাসল। হেসে বলল, -- আদা চেনো?
নাবিলা উত্তর দিল না। অপূর্বর নিজের মতোই বলল,
-- আদা হাজার শুকিয়ে গেলেও আদা। তার ঝাঁজ হয়তো কিছুটা কমে, তবে একেবারে কখনও যায় না।
নাবিলা এবারো কিছু বলল না। অপূর্ব উঠে দাঁড়ালো। বাবা এখনও আসছে না কেন, কে জানে? তাই উঠতেই বলল, -- দু’মিনিট একা থাকতে পারবে না?
নাবিলা মাথা নাড়ল। নাড়তেই আসাদুজ্জামান যেদিকে গেছে এগোতে গিয়েও আবার ফিরে এসে বলল, -- বাই দ্য ওয়ে, শোধবোধ সবসময় সমানে সমানে করতে হয়। চায়ের স্বাদ ভালো ছিল তো?
নাবিলা বুঝেনিই। সে ভাবল, সমানে সমান বলতে হয়ত চা, কফি বুঝিয়েছে। তাই হালকা হেসে মাথা নাড়ল। মানে চায়ের স্বাদ খুব ভালো।
অপূর্ব সেই হাসিটুকু দেখে ঠোঁট টিপে হাসল। হেসে এগিয়ে গেল। নাবিলা সেই হাসিটুকুও খেয়াল করল না। বরং এখনও কিছুটা চা অবশিষ্ট আছে। সেটুকুও সুন্দর করে চুমুক দিল।
দিয়ে ধুলোবালিতে মাখা মলিন ছেঁড়া কাপড়ের বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে রইল। খাবার পেয়ে খুশিতে তাদের চোখ মুখ ঝিলমিল করছে। সেই ঝিলমিল মুখটার দিকে একধ্যানে তাকিয়ে রইল।
শহরের ব্যস্ত স্টেশন। কত মানুষের আনাগোনা। সেই আনাগোনার মাঝে কেউ ধুলোবালির মাঝেই পা ছড়িয়ে বসে, কেউ কাগজ কুড়াচ্ছে, আবার কিছু বাচ্চারা খেলনার মতো করে ভাঙা বোতল দিয়ে ঠোকাঠুকি খেলছে।
নাবিলা সেই খেলার দিকে তাকিয়েই রইল। ততক্ষণে তার মাথা থেকে সব বেরিয়ে গেছে। বড় চাচা, অপূর্ব, আর ব্যস্ত স্টেশন, সব। বরং তার ধ্যান জ্ঞান সব, ঐ যে বাচ্চা আর খেলা সেখানে।
বাচ্চাগুলো খেলতে খেলতে এগিয়ে যাচ্ছে। নাবিলা তাদের দেখাদেখি নিজেও উঠে গেল। এগিয়ে গেল ধীরে ধীরে। এখানে ভিড় কিছুটা কম বললেই চলে। সে দাঁড়াতেই ঠিক সামনে দিয়ে এক ট্রেন ছুটে গেল। যেতেই নাবিলা থমকাল। থমকে আশপাশে তাকালো। তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল।
সে স্টেশনে নেই। বরং দাঁড়িয়ে আছে তার নানুবাড়ির এলাকার বাসস্টপে। যেখান থেকে প্রতিদিন বাসে চেপে ভার্সিটিতে যেত, আর্ট ক্লাসে যেত, বই কিনতে নীলক্ষেত যেত। আরও কত জায়গায়। আর এই রাস্তায়ই তো, বলেই নাবিলা ঝট করে রাস্তার ওপাশে তাকালো।
দু’পকেটে হাত পুরে সোজা একজন দাঁড়িয়ে আছে। কী সুন্দর নিষ্পাপ একটা মুখ। যে মুখটার মুগ্ধতায় সে আটকে গিয়েছিল। হারিয়ে গিয়েছিল দুজনের অন্য জগতে। তবে আজ সেই মানুষটার চোখে একরাশ বিষাদ। নাবিলা সেই বিষাদের গভীরতা বুঝতে পারে না। তার নিজের চোখ ভরা টইটুম্বুর পানি। সেই পানি নিয়ে ধীরে ধীরে সেই মানুষটার দিকে এগিয়ে গেল। অল্প কিছু দূর বাকি, ঠিক তখনই এক ধাক্কায় নাবিলা সিটকে পড়ল। একা পড়েনি, কেউ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে তাকে নিয়ে পড়েছে। আর তখনই আরেকটা ট্রেন সামনে দিয়ে ছুটে গেল।
নাবিলার ধ্যান ছুটে গেল। ছুটতেই নিজেকে সেই স্টেশনের কিছুটা দূরে আবিষ্কার করল। আর আবিষ্কার করল, ঝাপটে ধরা মানুষটা অপূর্ব। তার লম্বা চওড়া দেহের মাঝে, তার ছোট্ট শরীরটা বন্ধি হয়ে আছে। আর অপূর্বর দৃষ্টি পুরো তার দিকে। সেই দৃষ্টিতে ভয়, বিস্ময় তার সাথে সমানে হাঁপিয়ে যাচ্ছে। জান প্রাণ ছেড়ে যে দৌড়ে এসে, বুঝতে নাবিলার অসুবিধা হলো না। অসুবিধা হলো না, এতো মানুষের ভিরে বড় চাচাকে খুঁজে পেতে।
তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, রাস্তার ওপারে। থমকে, রক্তশূণ্য মুখে। হাতের খাবার সব পড়ে নিচে মাখামাখি হয়ে আছে।
চলবে.....