#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_১৮
নাবিলারা যখন হাসপাতালে পৌঁছাল, তখন প্রতিদিনের নিয়মের মতোই সন্ধ্যা নেমে এসেছে। শহরের চারদিকে সোডিয়াম লাইটের নরম হলদে আভা ছড়িয়ে আছে, তার সাথে আলো অন্ধকারের মাঝখানে দুলতে থাকা ব্যস্ত এই রঙিন দুনিয়া। সেই দুনিয়ার কৃত্রিম আলোয় শীতের হালকা কুয়াশা মিলেমিশে তৈরি করেছে ধোঁয়াটে অন্যরকম এক মায়াবী আবেশ । সেই মায়াবী আবেশের দেয়াল ভেদ করে নাবিলাদের সিএনজি এসে থামল হাসপাতালের সামনে।
তার কাছে ফোন নেই। মা নিয়ে এখনো ফেরত দেয়নি। বলতে গেলে হয়তো সুযোগও পায়নি। একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। তাই ফোন এসেছে বড় চাচার কাছে। আর ফোন আসতেই সাথে সাথে রওনা দিয়েছে। তবে রাস্তায় ছিল দুনিয়ার জ্যাম। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
নাবিলারা সিএনজি থেকে নেমে এগিয়ে গেল। নিচে হাসপাতালের রিসেপশন প্লাস ওয়েটিং এরিয়া। দুনিয়ার মানুষ আসছে, যাচ্ছে। অনেকে যার যার রোগীর জন্য বসে বসে অপেক্ষা করছে। সন্ধ্যার ঝলমলে আলোতে পুরো ঝিলমিল পরিবেশ। তবে এই পরিবেশে কারো মুখেই হাসি থাকে না, থাকে অন্যরকম এক আক্ষেপ। তার সাথে থাকে প্রিয় মানুষ, আপনজনদের ফিরে পাওয়ার অন্য রকম এক অপেক্ষা ।
সেই অপেক্ষার মাঝের এক কোণে নোভা চোখ মুখ শক্ত করে চুপচাপ বসে আছে। বসে আছে নাবিল, বাবা। এত মানুষ উপরে যেতে দেবে না। খালিদ ভাই যেহেতু আছে, নাবিলা জানে, সব খালিদ ভাই-ই দেখে নেবে।
তাই কিছুটা নিশ্চিন্তেই এগিয়ে গেল। তাদের দেখে নাবিল উঠে এগিয়ে এলো। দুপুরের ঘটনার পর থেকে বড় চাচা আর অপূর্ব দুজনেই একদম চুপচাপ। তবে বাড়তি কোনো প্রশ্ন দুজনের একজনও করেনি। বড় চাচা ধাতস্থ হতে অনেকটা সময় লেগেছে। পড়ে গিয়ে তার হাতের কনুইও ছিলেছে। অপূর্ব শান্ত মুখে বাবাকে, বাবার ভাতিজিকে স্টেশনেই বসিয়েছে। দোকান থেকে ঠান্ডা দু-বোতল পানি এনে একটা বাবার হাতে, আরেকটা নাবিলার হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। তারপর শান্তভাবেই বলছে, -- কনুইতে পানি দাও, রক্ত থেমে যাবে।
নাবিলা সব সময়ের মতো স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। একবার বলতে চেয়েছিল -- আপনার হাত কেটে গেছে। আমার ছিলে যাওয়া কনুইয়ের থেকে আপনার হাত থেকেই রক্ত বেশি পড়ছে। এই যে আমার সাদা জামা। শুধু চাদরের মতো ওড়না গায়ে আছে বলে, তা না হলে লাল রক্তে পুরো মাখামাখি হয়ে আছে।
তবে সে রকম কিছুই বলেনি। তার কিছু বলতে ভালো লাগে না। তাই ঠান্ডা পানি কনুইতে না দিলেও আস্তে আস্তে গলা ঠিকই ভিজিয়েছে। তবে সে জানে, অপূর্বের দৃষ্টি তার ওপরই ছিল, এখনো আছে। এই যে রিসেপশনে গিয়ে কথা বলার মাঝেও দুবার ঘুরে তাকিয়েছে। সে সম্ভবত সব বোঝার চেষ্টা করছে। অতি ক্ষুরধার বুদ্ধিমানেরা কখনো আগ বাড়িয়ে কারো কাছে কিছু জানতে চাইবে না। সব বোঝার চেষ্টা করবে পাজলের মতো। কি দেখেছে, কি শুনেছে একটার পর একটা সাজাবে, তারপর ঠিক মিলিয়ে নেবে। নাবিলার ধারণা, এই ছেলে অনেক কিছুই প্রথম দিন থেকেই আঁচ করেছে, তাই তাকে বোঝার জন্যই ইচ্ছে করে জ্বালিয়েছে।
এত কিছুর প্রয়োজন ছিল না। একবার জিজ্ঞেস করলেই হতো। নাবিলা ভালো সাজার জন্য অন্তত মিথ্যা বলে না। তার সব মিথ্যা বরং খারাপ হয়ে থাকার জন্যই। তবে সে তো জানে না। গত তিন চারবছরে, তার সাথে এমন আর কিছু হয়ই নি। নিজের রুম, নিজের জগতে ভালো ছিল। তবে তার চোখের দিকে তাকালেই একজনের কথা মনে উঁকি দিয়ে যায়। আর গেলেই নাবিলার পুরো দুনিয়াই এমনিই এলোমেলো।
নাবিল এগিয়ে সব বলল। মা আপাতত ভালো আছে, ঘুমোচ্ছে। হার্টে ব্লকেজ আছে, তবে সিভিয়ার না, মাইল্ড।
তাই আজকে অবজার্ভেশনে রাখবে। কাল সম্ভবত ছেড়ে দেবে। তবে নিয়মিত ওষুধ, কোলেস্টেরল, প্রেসার, সুগার সব নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইলে পরিবর্তন করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো রকম বাড়তি টেনশন তাকে দেওয়া যাবে না।
নাবিলা শুনে স্বস্তির একটা শ্বাস ফেলল। তাদের বাড়ির বাড়তি চাপই হচ্ছে নাবিলা। সে জানে, বুঝে। তবে এখন তার কী করা উচিত? সবার ইচ্ছে, নাবিলার বিয়ে। তবে বিয়ে করে সে কী দেবে? সে যে শূন্য। একজন মানুষের স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সে নিশ্চয়ই খেলতে পারে না।
নাবিলা এখানে আর দাঁড়াল না। এগিয়ে গিয়ে বসল একেবারে বাবার পাশে। এমনিতে ডাক্তারদের দেখে খুব হাকডাক করলেও আজ বড়ই শান্ত। চুপচাপ নিস্তেজ হয়ে বসে আছে। নাবিলা এসে হাতের ভাঁজে হাত রাখতেই মুখে বিরক্তির রেশ এনে বলল, -- বয়স হচ্ছে, থাকবে একটু সাবধানে। তা না, আগের মতো হাকডুম, বাকডুম! সারা রাত দুটো চোখের পাতা এক করেনি। এবার বুঝো ঠেলা। উঠতে গেলেও ওষুধ, বসতে গেলেও ওষুধ। তবে সবকিছুর একটা ভালো দিক থাকে। ডাক্তার চিল্লা পাল্লা করতে একেবারে নিষেধ করে দিছে। এবার যদি সবার একটু শান্তি হয়।
নাবিলা হালকা হাসল। এই যুগ আর সেই যুগের মানুষের মধ্যে এইটুকুরই তফাৎ। এই যুগের মানুষ যতটা না ভালোবাসে, তার চেয়ে বেশি দেখাতে পছন্দ। তাই আজ ভালোবাসা খুবই সস্তা। দুনিয়াকে দেখিয়ে বুক উজাড় করে এরা লুটিয়ে দেবে, আবার ছোট্ট কারণে অতি শীঘ্রই তা টেনেও নেবে। আর সেই যুগে ভালোবাসা যেন বড়ই দুর্লভ। কাউকে দেখানো যাবে না, দুনিয়াকে বোঝানো যাবে না। তাদের কাছে ভালোবাসা হলো সিন্দুকে তোলা মহামূল্যবান গহনার মতো। যাকে যত্ন করতে হবে, আগলে রাখতে হবে, তবে সব সময় গায়ে তোলা যাবে না, সমাজের পাঁচজনকে বুঝতেও দেওয়া যাবে না। কিন্তু নিজেরা ঠিক অনুভব করবে। আর করে বলেই তো তার মা এক ছন্নছাড়া মানুষের সব দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছে অনায়াসে। কোনো অভিযোগ নেই, রাগ নেই, দোষও নেই। আর সেই ছন্নছাড়া মানুষটা তুলে নিয়েছে কালো, মোটা, আজদাহা একটা মেয়ের রাগ, জেদ, মেজাজ আর শত আঙুল তোলা কারণকে।
ঠিক তখনই খালিদ ভাই উপর থেকে এলো। এসে নাবিলার দিকে একপলক তাকালো, তারপর তাকালো অপূর্বর দিকে। তাকাতেই চোখাচোখি হলো। অপূর্ব নিজেও খালিদের দিকেই তাকিয়ে ছিল। তাই খালিদ তাকিয়েই ভদ্রতাসূচক একটু হাসল। তবে অপূর্ব আগের মতোই পকেটে দু'হাত পুরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল।
খালিদ সেই নিশ্চুপ মুখটাও দেখলো। দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো। নাবিলের কাছে যখন শুনেছে, নাবিলা নাকি নিজে থেকেই ঘুরতে গেছে। শুনেই কিছুটা অবাকই হয়েছিল। যাক, পরিবর্তন হচ্ছে তাহলে।
তারপর সব কাগজপত্র নাবিলার বাবাকে বুঝিয়ে দিয়ে বলল,-- সব ফরমালিটিজ হয়ে গেছে। চাচি ঠিক আছে। টেনশন করার মতো কিছু নেই। ঘুম থেকে উঠলেই দেখা করতে পারবেন। আপনি, নাবিল থাকুন। বাকি সবাই বাড়ি চলে গেলেই ভালো হবে। একজনের বেশি আজ আর দেখা করতে দেবে না। কাল তো বাড়ি চলেই যাচ্ছে। অযথা এখানে কষ্ট করে বসে থাকার তো মানে নেই।
সবাই এটাই ঠিক মনে করল। তবে নাবিলা এগিয়ে আস্তে করে বলল, -- নাবিল বাড়িতে চলে যাক, আমি থাকব।
অপূর্বের হাবভাব বোঝা গেল না, তবে আসাদুজ্জামানের মনে হলো, এই মেয়েকে একা ছাড়া ঠিক না। নাজিম নিজেই তালছাড়া, তাছাড়া আজ দুপুরের ঘটনা... আরেকটু হলে তিনি কী জবাব দিতেন বাড়ির সবাইকে? সঠিক সময়ে অপূর্ব যদি না গিয়ে পৌঁছাতো, তাহলে?
এই মেয়ে ঠিক নেই, একদম ঠিক নেই। অপূর্ব দুনিয়া ভুলে নাবিলা বলে চিৎকার দিয়েছে, এই মেয়ে শুনেইনি। যেন এই জগতেই ছিল না। নিজের মতো এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই ঠিক না হওয়ার কারণ রোকেয়া নিজের মাঝে দাফন করে আছে। তাই সে আজ এখানে । রোকেয়া একটু ঠিক হোক, সে এবার নিজে কথা বলবে। মেয়েটা কি শুধু রোকেয়ার একার, তাদের না? তারা সবাই মিলে এই মেয়েটাকে আগলে ধরবে। তাই সাথে সাথেই বলল, -- সারা দিন বাইরে । এখানে বসে থেকে তো কোনো লাভ নেই। চল, বাড়ি চল।
নাবিলা সব সময়ের মতো একটু হেসে বলল, -- উঁহুম। আমি মায়ের সাথে কথা না বলে কোথাও যাব না।
-- জেদ করছিস কেন?
-- অনেকদিন তো করি না বড় চাচা, আজ না হয় একটু করলামই।
আসাদুজ্জামান আর কিছু বলার মতো পেলেন না। কখনও এই মেয়ের উপরে বলতে পারেনও না। তাছাড়া মায়ের এমন বিপদে মেয়ে থাকবে, সে ফেরানোর কে? তবুও তার মন মানল না। তবে নাজিমও এগিয়ে বলল, -- ও থাকতে চাইছে থাক। নাবিলও থাক। আর আমি তো আছিই । তোমরা বরং চলে যাও। বাড়িঘর সব খালি। আসমানি থাকা আর না থাকা এক কথা।
-- তাহলে আমিও থাকি। নাবিল বরং চলে যাক।
খালিদ হাসল! একেক জন একেক নমুনা। রোগী আছে অবজার্ভেশন রুমে। এখানে পাল ভরে বসে বসে হবে টা কি? তাই হেসেই বলল, -- এত চিন্তার কিছু তো নেই বড় চাচা। সত্যিই নেই। এই রাতটুকুই, তাছাড়া সকাল হলেই আমি আবার চলে আসব। আসুন তো, যাওয়া যাক। আর নাবিল, কেউই মনে হয় দুপুরে খায়নি। ঐ সাইডে ক্যান্টিন আছে, মনে করে সবাই খেয়ে নিও।
নাবিল মাথা নাড়ল। খালিদ চোখ ফিরিয়ে নোভার দিকে একপলক তাকালো। তাকিয়ে ঠোঁট টিপে একটু হাসল। এক ধমক খেয়ে এমন ঠান্ডা হয়েছে যে হয়েছে, আর ফিরেও তাকিয়ে দেখেনি। তখনই সকালের কথা মনে পড়ল। পড়তেই নাবিলকে বলল, -- সকালে পার্টি অফিসে গিয়েছিলে কেন?
নাবিল বড় একটা শ্বাস ফেলল। ফেলে বলল, -- আসুন, একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াই।
খালিদ ভ্রু কুঁচকে একটু তাকালো। তারপর মাথা নেড়ে বাইরে দিকে এগিয়ে গেল। তারপর নাবিল বলল, -- আজ আবার জিজ্ঞেস করছি। আশা করি এবার এড়িয়ে যাবেন না, খালিদ ভাই।
খালিদ কিছুই বুঝল না। তাই বলল, -- কি এড়িয়ে যাব না?
--- আপার বিয়েগুলো কি আপনি ভাঙছেন?
খালিদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। তারপর স্বাভাবিক ভাবেই বলল, -- যদি আজও এড়িয়ে যাই, তো?
-- আপনাকে ঘৃণা করতে কষ্ট হবে আমার।
-- কেন?
-- বড় ভাইয়ের স্থানে বসিয়েছি যে তাই।
খালিদ হাসল! হেসে নাবিলের কাঁধ জড়িয়ে বলল, -- আমি এতিম মানুষ। বাবা,মা নেই, আত্মীয় স্বজনও নেই। মায়া মহব্বতও নেই। তবে এই গলে যাওয়া খালিদকে বিশ্বাস করা ঠিক হয়নি নাবিল। আজ থেকে তুমি আমাকে ঘৃণা করতে পারো। তবে বিশ্বাস করো, এই ব্যাপারে আমার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের করব না।
-- কেন?
-- এই কেন এর উত্তরও আমি দেব না।
নাবিল আর কিছু বলল না। তবে কাঁধ জড়িয়ে রাখা হাতটা আস্তে করে সরিয়ে দিল। দিয়ে বলল, -- সকালে আর আপনার আসার প্রয়োজন নেই। আমার পরিবার আমরা সামলে নেবো।
খালিদ আবারো হাসল! হেসে বলল, -- এটা আমাকে আসতেই হবে নাবিল। বিশ্বাস করো, এই একটা কাজই আমি মন থেকে করি। আর করে অসম্ভব শান্তি পাই।
-- আমার আপার কাছ থেকে দূরে।
খালিদ এবার হাসল না। সারাদিনে দৌড়াদৌড়িতে নাবিলের মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। বড় ভাইয়ের মতোই গুছিয়ে দিতে দিতে বলল, -- আমি তোমার আপার কাছ থেকে সব সময়ই দূরে। সারা দুনিয়ার মানুষ আঙুল তুলক, তবে তুমি তুলো না নাবিল। আমার কষ্ট হবে, সত্যি হবে।
.....
মাথায় কোমল একটা হাতের পরশ পেতেই রোকেয়া চোখ খুলে তাকালো। ঘুম ভেঙেছে কিছুক্ষণ আগেই, তবে ওষুধের ঘুম, তাই হয়তো রেশ কাটছে না। কানে তো সব শুনছে, তবে চোখ খুলে রাখতে পারছে না। এখন স্পর্শ পেতেই কিছুটা টেনে চোখ খুলল। খুলতেই স্নিগ্ধ মুখের মেয়েটাকে দেখল। সারাদিনের ক্লান্তি, চুলগুলো কিছুটা এলোমেলো। সাদা জামা, পড়ে টড়ে গিয়েছিল কি না কে জানে? এক সাইডের জামা কিছুটা কালচে কালচে লাগছে। হাতটা উঁচু করে মাথায় রাখা, পিঠের সাইডে লালচে রঙের কিছুও দেখল।
দেখে সাথে সাথেই বলল, -- তোর ওড়নাটা সরা তো।
নাবিলা হাসল! হেসে বলল, -- কেন?
-- তোর গায়ে কি? রক্তের মতো লাগলো।
-- স্টেশনে পড়ে গিয়েছিলাম। খাবারের ঝোল লেগেছে।
রোকেয়া আফসোসের মাথা নাড়ল। জীবনে ঘর থেকে বের হয় না। একটু হয়েছে, তাও গোলটোল খেয়ে একাকার। কি করবে এই মেয়েকে নিয়ে।
-- এতো আফসোস করে লাভ নেই। আমি সামান্য হোঁচট খেয়েছি, তোমার ছোট মেয়েতো ডাইরেক্ট সাইকেলের সাথে সংঘর্ষ। আমার হাতের কনুই ছিলেছে, তোমার মেয়ের হাঁটু। বাড়িতে গেল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
রোকেয়া কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে রইল। তারপর হেসে ফেলল। কি কপাল তার! এক মেয়ে সাইকেল, আরেকজন হোঁচট, আর নিজে শুয়ে আছে হাসপাতালে। আর কি কি হওয়ার বাকি আছে, আল্লাহই জানে।
নাবিলা মায়ের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই হাসিটুকু একমাত্র নাবিলাই দেখে। ছোটবেলায় তাকে দূরে সরিয়ে এক ভুল করেছে, তার ভরপাই হিসেবে নাবিলাকে দিয়েছে এই মিষ্টি হাসিটুকু। সে সেই হাসির দিকে তাকিয়ে মায়ের হাতের ভাঁজে হাত রাখতে রাখতে বলল, -- তোমার সন্দেহের তীর ঠিক দিকেই উঠেছে মা। বিয়েগুলো আমিই ভেঙেছি। খালিদ ভাইকে তো জানোই। আমি যা বলব, সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। সেটা ভালো হোক বা খারাপ।
-- কালকে তো মোবাইল আমার কাছে ছিল।
-- আমি জানি না মা। তবে আমার নাম করে অচেনা নাম্বার থেকে তার কাছে এক মেসেজ গেছে। সে তো আমার নাম দেখলে ডান বাম দেখেও না, ভাবেও না। ব্যস, সোজা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
রোকেয়া বড় একটা শ্বাস ফেলল। নাবিলা সেই শ্বাসটুকু দেখে বলল -- চিন্তা করো না মা, আর বিয়ে ভাঙবে না। তোমার চিন্তার অবসান হোক।
রোকেয়ার চোখে পানি চলে এলো। সেই পানি নিয়েই বলল, -- দয়া করছিস?
নাবিলা সেই পানি যত্ন করে মুছে দিতে দিতে বলল, -- উঁহুম! এত এত ভুল করার পরও কখনো ঘৃণার একটা চড় তো গালেও ফেলোনি। মনে করো, সেই ভালোবাসার ছোট্ট একটা অংশ ফিরিয়ে দিচ্ছি।
রোকেয়া কোনোলা হাতেই মেয়ের হাত আগলে ধরল। নাবিলা সেই আগলে ধরা হাতের দিকে তাকিয়ে বলল, -- তবে আমার ছোট্ট একটা আরজি মা। কিছু লুকাবে না । তোমার মেয়ের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। শূণ্য একটা মাটির খাঁচা আমি। যে নেবে, সব জেনেই নিক।
রোকেয়া কিছুই বলল না। চোখ বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে রইল। নাবিলাও আর কিছু বলল না। মায়ের হাত ধরে বেশ কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে রইল। পাঁচ মিনিটের বেশি দাঁড়াতে দেয় না। তবে মধ্যরাত, তেমন ভিড়ভাট্টা নেই। তাই কেউ তেমন কিছু বলল না। অনেকক্ষণ হওয়ায় নার্স তাড়া দিল। রোকেয়া ঘুমিয়ে গেছে, তার হাতের ভাঁজ থেকে হাতটা আস্তে করে ছাড়িয়ে নাবিলা বেরিয়ে এলো।
আসতেই অবাক হলো, অপূর্ব দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যার কাপড় আর অবশ্য এখন আর গায়ে নেই। সিম্পল নীলরঙা একটা টি-শার্ট, ধূসর ট্রাউজার। বাড়িতে গিয়ে গোসল করেছে হয়তো। দেখতে একেবারে সতেজ লাগছে।
নাবিলা সব সময়ের মতো কিছুই বলল না। এসেছে, আসুক। ওয়েটিং এরিয়ায় বাবা, নাবিল সোফায় বসেই গা এলিয়ে দিয়েছে। তার এমনিতেই ঘুম নেই, এমন জায়গায় আর কি আসবে! তাই ক্যান্টিনের দিকে এগিয়ে গেল।
অপূর্ব আসবে, সে জানে। তাই দু’কাপ কফিই বলল। বলতেই অপূর্বও তার পাশেই চেয়ার টেনে বসল।
বসতেই নাবিলা বলল, -- একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
অপূর্ব আগের মতোই বলল, -- না।
-- কেন?
-- এমনিই।
-- তাহলে আপনি জিজ্ঞেস করুন।
-- আমার তো কিছু জিজ্ঞেস করার নেই।
-- তাহলে এখানে কি করছেন?
-- বাবা পাঠালো। তাদের নাকি এক তারছেড়া কন্যা আছে। একটু যেন দেখে টেখে রাখি।
নাবিলা আর কিছুই বলল না। কফি এসেছ, সে বরং সুন্দর করে তার স্বভাবমতো গুছিয়ে আগে অপূর্বকে দিল। দিয়ে নিজেও নিল। তার বেশি কথা বলতে ভালো লাগে না। তবে আজ বলতে ইচ্ছে করল, -- আমি খুবই সাধারণ একটা মেয়ে। আমার জন্য আপনার এত কষ্ট করতে হবে না। আমি নিজের কষ্ট নিজে আগলে রাখতে পারি। কতোটা রাখতে পারি আপনাদের ধারণাও নেই। কারণ আপনারা জানেন না, এই যে সাধারণ দেখতে মেয়েটা। এই মেয়েটা হৃদয় উজাড় করে একজনকে ভালোবেসেছে, যাকে ভালোবেসেছে। তার শরীরের প্রতিটা কোণায় কোণায় ছিল পাপের অস্তিত্ব। তবে এই সব পাপের বিসর্জন হিসেবে সে আমাকে চেয়েছিল। এতোটাই চেয়েছিল, তার কাছে তার জীবন, সত্বা, সব কিছু ছিল এই চাওয়ার কাছে তুচ্ছ।
তবে সব সময় মানুষ মানুষকে ধোঁকা দেয় না, ধোঁকা দেয় নিয়তিও। আমাদের ধোঁকা দিয়েছিল নিয়তি।
সেই ধোঁকায় আমি এতটা এলোমেলো হয়েছিলাম যে, তার দেওয়া উপহার আমি দশ মাস নিজের ভেতরে ধারণ করেছি, তবে দুনিয়ায় আলো দেখাতে পারিনি।
এই যে, যে ছোট্ট দমকা হাওয়ার জন্য আপনারা থমকে আছেন, নিশ্চিন্তে একা ছাড়তেও ভয় পাচ্ছেন, সেই দমকা হাওয়ার দুনিয়ায় আমি এক দেড় বছর এতোটাই বিভোর ছিলাম। সে কখন দুনিয়ায় এসেছে, কখন হারিয়ে গেছে। আমি মনেও করতে পারি না। পারি না তার নিষ্পাপ মুখটাও। আবছাভাবে মনে পড়ে, নানুর কোলে ছোট সাদা ধবধবে একটা ফুল।
যেই ফুল পৃথিবীর বুকে এসেছে, ঐ যে পথের ধারে নাম না জানা বুনফুল। সেই বুনফুলের মতো, যে সবার অগোচরে আমার কোলজুড়ে ফুটেছে, আবার সবার অগোচরে চুপচাপ নিজের মতো ঝরে গেছে।
চলবে…