#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_১৯
ভেজা চুলগুলো কাঁধে ছড়িয়ে নাবিলা বারান্দায় এসে বসল। গায়ে নীল রঙা থ্রিপিস, সব সময়ের মতো আজ ওড়নাটা চাদরের মতো জড়ানো নেই। বরং গুছিয়ে গায়ের ওপর রাখা, হাতে চিরুনি। গোসলের পর চুলগুলো গুছিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। তাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিরুনিটা হাতে তুলে নিতেই টুংটুং করে উইন্ড চাইমটা বেজে উঠল।
শীতের আগমনী দুপুরের শেষ সময়। রোদ আছে, তবে তেজ নেই। বাতাসতো প্রায় নেই বললেই চলে। তাই প্রায় সময়ই উইন্ড চাইমটা থাকে একেবারে নিশ্চুপ। সেই নীরবতা হঠাৎ ভেঙে যাওয়াতেই নাবিলা কৌতূহল নিয়ে বারান্দায় উঁকি দিল।
ছোট্ট একটা দোয়েল পাখি উইন্ড চাইমের ওপর বসে আছে। তার নড়াচড়ায় চাইমটা টুংটাং করে বাজছে। আর বাজতেই নাবিলার মনটা ভালো হয়ে গেলো। গত দিন রাত, আজকের সব দৌড়ঝাঁপ, গলা ব্যথা, ক্লান্তি সব যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
মাকে নিয়ে তারা ফিরেছে সকালের দিকে। অবশ্য সকালও বলা যায় না। সব কিছু গুছিয়ে আসতে আসতে এগারোটার ওপর বেজে গেছে।
মা ভালো আছে। তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন। বরং আগের চেয়ে আরো বহাল তবিয়ত দেখা যাচ্ছে। মুখে হাসি না থাকলেও অন্যরকম এক স্বস্তি ঠিক নজরে পড়ছে। আর কেন, কেউ না জানলেও, নাবিলা জানে। আর জানে বলেই মায়ের এই স্বস্তিটুকু দেখতে তার ভালো লাগছে। তবে মা তো জানে না, যেই সুখটুকু তিনি মেয়েকে জোর করে দিতে চাইছেন। সেই সুখটুকু তার মেয়ের কাছে সুখ না, বরং জ্বলন্ত চিতার মতো। যেই চিতায় তার মেয়ে জ্বলবে জীবন্ত লাশের মতো।
নাবিলা বড় একটা শ্বাস টেনে চোখ ফিরিয়ে নিলো। পাখিটা যেমন হঠাৎ এসেছে, তেমনি হঠাৎ উঠে গেছে। সে চোখ ফিরিয়ে রাস্তার দিকে নিলো।
মায়ের অসুস্থতার খবর ছড়িয়েছে রাতে। তাই সকালের আলো ফোটার আগেই মামা-মামিরা সবাই খবর পেয়ে ছুটে এসেছে। এতোদিন একসাথে একই এলাকায় থাকা। ভালো থাক বা খারাপ থাক, শুনেই পরিচিত মুখগুলোও একে একে এসে মাকে দেখছে, খোঁজ খবর নিচ্ছে। তাদের সাথে আসছে ভাড়াটিয়ারাও। বাড়ির এতগুলো মানুষের রান্না, তার মধ্যে আবার এদেরকেও তো খালি মুখে বসিয়ে রাখা যায় না। তাই আসমানি খালা আছে প্রেসারের ওপর প্রেসারে। এই প্রেসার দেখে নাবিলা বুঝি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে? তাই হাসপাতাল থেকে ফিরে যে যার মতো নিজের রুমে চলে গেলেও, সে লেগে গেছে হাতে হাতে কাজে।
সেই কাজের মাঝেই একবার বাবা এলো। এসে প্রায় ফিসফিস করে বলল,-- কেমন ডাকাইতা ডাক্তার দেখেছিস? এক রাত, তবুও লাখ ছুঁইয়ে ফেলেছে। তোরা তো কিছুই বুঝতে চাস না। একটু হয়তো টেনশনে উনিশ-বিশ হয়েছে, তাই বলে এত কিছু করতে হয়? দেখ, দিব্যি তোর মা ভালো আছে। শুধু তোদের মুখের দিকে তাকিয়ে শয়তান ডাক্তারদের টুটি চেপে ধরলাম না। সুস্থ সবল মানুষকে রোগী বানানো! সব বদমায়েশের দল।
নাবিলা সব সময়ের মতো কিছুই বলেনি। চুপচাপ শুনে শুধু একটু হাসলো।
তারপর এলো তার বড় মামা। তাকে দেখে ধমকে বলল,-- তুই রান্নাঘরে করছিসটা কী? রাতভর হাসপাতালে ছিলি। সবাই রোগী দেখতে এসেছে, না পিকনিক করতে এসেছে? বসে বসে খাচ্ছে আর গল্প করছে।
বলেই তিনি হাকডাক করতে করতে মামিদের দিকে গেলেন। যেতেই বড় মামির সাথে অকারণে লেগে গেলেন।
আর এই লাগার মাঝেই বড় চাচাকে দেখা গেলো, বেশ কয়েকবার বিনা কারণে রান্নাঘরের দরজার আশেপাশ দিয়ে ঘুরছে। নাবিলা দেখে মনে মনে হাসলো। তার একবার ডেকে বলতে ইচ্ছে করল, -- ভয় নেই চাচা, নিশ্চিন্তে একটু ঘরে গিয়ে বসো তো। মা গেছে, আবার দেখা গেলো তুমিও গেলে। এক আমার জন্য সবাই কত কষ্ট করবে বলো তো?
তবে বলা হয় না। তাই নাবিলা নিজের মতো কাজ গুছিয়ে একেবারে গোসলে গিয়েছে। এই বাড়িতে সে গোসলে গিয়েছে আর দরজায় কেউ টুকটাক করেনি, এমন নজির খুব কম সময়ই হয়। তাই আজ এতো কাহিনীর মাঝে হবে না, এটা ভাবা যে বড়ই বোকামি।
তাই সব সময়ের মতো শব্দ শুনেই কল বন্ধ করে চুপচাপ দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই আসমানি খালা ওপাশ থেকে নিজের মতো বলল, -- আফার খানা পিনা শেষ। কম তেল মশলার সবজি, সাদা ভাত করছ, সেগুলোই দিছি। নাবিল, দেখে ঔষুধও দিয়া দিছে। এদিকে আবার তোমার বড় মামা মামি ফাটাফাটি করে যে যার মতো চলে গেছে। বাকিজন আছে তাদের খানা পিনা দিয়ে দেই।
নাবিলা কিছু বলেনি। তার বলা, না বলাতে কিছু আসে যাবেও না। আসমানি খালা নিজের মতো বলে, নিজের মতোই করবে। তাই আজও বলেই নিজের মতো চলে গেছে।
সে যেতেই নাবিলা আরাম করে গোসল শেষ করল। আর করতেই। এই যে মন ভালো করার দোয়েল পাখিটা, ঠিক চলে এলো।
নাবিলা রাস্তার দিকে দৃষ্টি রেখে সেভাবেই বেশ কিছুক্ষণ বসে রইল। সেই বসার মাঝেই নোভা এসে হাজির। বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে আছে। থাকার অবশ্য যথাযথ কারণও আছে। তাকে হাঁটতে হচ্ছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। হাঁটু বরাবর ব্যথা পেয়ছে। কাল হাসপাতাল থেকে ওষুধ মলম আনলেও, সকালে হাঁটু মুড়ে কী যেন করতে গিয়ে আবার ছিলে যাওয়া জায়গাটা কাঁচা হয়ে গেছে। সেই কাঁচা জায়গা নিয়ে সে বড়ই বেকায়দায় আছে।
সেই বেকায়দা নিয়েই বলল, -- ওই খালিদ বেটা যে কত ধুরন্ধর মাল, তুমি জানো? পিঠপিছে বিয়ে ভাঙছে, সামনে ভালো সাজার নাটক করছে। আবার আমাদের বাড়িতে দাঁড়িয়ে আমাকে দেয় একশো কেজির একটা ধমক। কত বড় সাহস! মা একটু সুস্থ হোক। এর বিহিত তো আমি করবই করব।
তবে একটা কথা শুনে রাখো। এগুলো সব তোমাকে পটানোর ধান্দা, বুঝছো? তাই আবার ঐ ভালো মানুষের গলা দেখে পটে যেও না। তুমি তো আবার দয়ার দরিয়া। তাই আগেই বললাম। কোনো উনিশ বিশ করবে না। টাকা পয়সা থাকুক, ক্ষমতা যাই থাকুক। এই দাড়ি গোঁফের বিশাল সাইজের কালা পাঠাকে কোনো দিক দিয়েই আমি দুলাভাই হিসেবে গ্রহণ করব না।
নাবিলা হেসে ফেললো। হেসে নোভার দিকে তাকালো। এত তাড়াছেড়া এই মেয়ে। তাই হেসেই বলল, -- তাকে কালো পাঠা বলছিস কেন? আমরা কোন রাজ্যের সুন্দরী রাজকুমারী?
নোভা তখন হতবাক হয়ে বলল,-- তুমি তার সাইড নিয়ে কথা বলছ কেন?
-- সব মানুষ আল্লাহ সৃষ্টি। কাউকে হেয় করে কিছু বলা ঠিক না।
-- আর সে যা করছে, সেগুলো যেন খুব ঠিক?
নাবিলা তখনও হাসল। নোভা হতবম্ভ হয়ে সেই হাসি দেখল। দেখেই তার মাথা এক চক্কর দিল । আপা তো সর্বনাশ করে ফেলেছে! নির্ঘাত ঐ গলা পার্টির গলা দেখে নিজেও গলে গেছে।
নাবিলা আর কিছু বলল না। তার নিজেরও খিদে পেয়েছে। তাই বেরিয়ে এলো। আর আসতেই অপূর্বর মুখোমুখি হয়ে গেল। সেও মাত্রই রুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। ঘুম থেকে হয়তো উঠেছে, গোসলও করেছে। আর তাদের দুজনের একই অবস্থা। না ভেজা মাথা মুছেছে, না চিরুনি লাগিয়েছে।
অপূর্ব অবশ্য কোনো হেলদোল দেখালো না। সবার দুপুরের খাবার শেষ। শুধু অপূর্ব বাকি ছিল। বাবা অবশ্য ডেকেছে কয়েকবার। ঘুম ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করেনি। তাই এলোমেলো চুল আরও একটু বাম হাতে এলোমেলো করতে করতে নিজের মতো চেয়ার টেনে বসল।
আসমানি খালা আশেপাশে নেই। কথার শব্দ ভেসে আসছে মায়ের রুম থেকে। তাই নাবিলা নিজেই এগিয়ে গেলো। নিজের জন্য না নিলেও, সুন্দর করে গুছিয়ে সবকিছু এগিয়ে দিল। অপূর্ব অবশ্য কিছুই নিল না। শুধু ভাত, ডাল, সালাদ নিয়ে খুব বেকায়দা দেখিয়ে বাম হাতে চামচ দিয়ে খাওয়া শুরু করল। তবুও কোনো রকম… যেন মুখে তুলতেই বড় কষ্ট হচ্ছে। নাবিলা কি বলবে ভেবে পেল না। তাই পাশে দাঁড়িয়ে নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল।
এত এত কাহিনীতে হাতের কথা তার আর মনে ছিল না। থাকলে হাসপাতালেই কিছু একটা করতে বলত। এই লোকও আজব। কাটা হাত নিয়েই দিব্যি ঘুরছে ফিরছে! তখন রাতে দুজনে কফি শেষ করেছে নিশ্চুপ। শেষ করে নাবিলা আর সেখানে বসেনি। বাবার পাশে চলে গেছে। বাকি রাতটুকু অপূর্ব নাবিলের সাথেই ছিল। তারপর আর কথাই হয়নি।
অপূর্ব খাবার শেষ করল না। কোনো রকম খেয়ে উঠে চলে গেলো। নাবিলা কিছুক্ষণ সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর এগিয়ে কিচেনে গিয়ে ঝটপট একটা স্যান্ডউইচ আর জুস করে ফেলল। করে অপূর্বর রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
তবে দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো। দরজাটা আধখোলা। সেই আধখোলা দরজার ফাঁক দিয়ে রুমের ভেতরটা খানিকটা দেখা যাচ্ছে। বাতি নেভানো। জানালা, বারান্দার সব দরজা বন্ধ। তার ওপর আবার পর্দা টানানো। পুরো রুমজুড়ে আধো আলো, আধো অন্ধকারের থমথমে ভাব। এই অল্প সময়ের মাঝে কি হলো, কিছুই সে বুঝতে পারল না। ফিরে যাবে, না এগিয়ে যাবে সেটাও বুঝতে পারছে না। তাই সে ভাবেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ট্রেটা এক হাতে ধরে দরজায় হালকা করে দুটো টোকা দিল।
দরজায় টোকার আগেই অপূর্ব নাবিলাকে দেখেছে। নাবিলা যখন থেকে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন থেকেই তার দৃষ্টি দরজার দিকেই। আধখোলা দরজা, বাহির থেকে দেখা না গেলেও ভেতর থেকে ঠিক বোঝা যায়। তার মধ্যে আধো আলো-আধো অন্ধকার রুম। কেউ এসে দাঁড়ালেই তার ছায়াটা রুম বরাবর ঠিক পড়বে। আর পড়তেই অপূর্ব বুঝেছে কে এসে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য জানতো, ঠিক আসবে।
তাই ঠোঁট টিপে একটু হাসল। যেই হাতে তখন খাবার তো ভালো চামচও তুলতে পারেনি, সেই হাতেই দিব্যি এখন মোবাইল নিয়ে বসে আছে। মোবাইল সাইডে রেখে আরেকটু আরাম করে শুলো। শুতে শুতে বলল, -- কে?
-- আমি।
-- আমি কে?
-- নাবিলা।
-- ওহ… দ্য ফেয়ারি টেইল গার্ল! তো হঠাৎ এই মানবের দুনিয়ায় কেন?
নাবিলা ঠিক বুঝল, দুষ্টামি করছে। তবে আজ খারাপ লাগল না। কালকের কাহিনির পর যেমন চাচা থমকে গিয়েছিল, তেমনি গিয়েছিল এই মানুষটা। অবশ্য বুঝতে দেয়নি। তবে নাবিলা জানে। তাই আবার আগের মতো হওয়ায় ভালো লাগলো। তাই আর দাঁড়িয়ে রইল না। দরজা ঠেলে ভেতরে এলো। আর আসতেই সবার প্রথম যেটা চোখে পড়ল তা হলো, আসমানি খালার কথাই ঠিক। পুরো ঘর লণ্ডভণ্ড। সেই লণ্ডভণ্ডের মাঝেই কম্বল টেনে অপূর্ব শুয়ে আছে। নাবিলা চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিয়ে আস্তে করে ট্রেটা বেড টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল,-- খেয়ে নিন। তখন তো কিছুই খেতে পারলেন না।
-- থ্যাঙ্ক ইউ।
নাবিলা হালকা হাসলো। হেসে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ফিরতেই অপূর্ব বলল, -- এসেছো যখন, কষ্ট করে একটু জানালা, দরজাটা খুলে দিতে পারবে, নাবিলা? তখন আলো চোখে লাগল। তাই সব আটকে দিয়েছিলাম।
নাবিলা সাথে সাথেই পর্দা টেনে খুলল। জানালা খুলল। বারান্দার দরজা খুলে দিল।
-- থ্যাঙ্ক ইউ। কিছু যদি মনে না করো। এসি-টা একটু অফ করে দিতে পারবে? জ্বর আসবে কি না কে জানে। শীত শীত করছে।
নাবিলা এগিয়ে এসি অফ করে দিলো। দিতেই অপূর্ব আবার বলল, -- ঐ কালো ব্যাগে সাইডে আমার কতগুলো বই আছে। সেখান থেকে একটা বই দিতে পারবে, প্লিজ? আসলে ভেতরটা কেমন অশান্ত লাগছে… সব অশান্তির এক ঔষধ, বই। তোমার তো বোঝার কথা। এইসব করেই তো টাইম পাস কর তুমি, তাই না?
নাবিলা এবার এগোল না। এতক্ষণ না বুঝলেও, তাকে জ্বালাতে খোঁচাতে এসব করছে, এখন ঠিক বুঝলো। আর বুঝেই শান্ত চোখে তাকালো।
অপূর্ব অবশ্য সেই শান্ত চোখের দিকে তাকালো না। সে উঠে বসল। হাত বাড়িয়ে স্বাভাবিকভাবে ট্রেটা নিলো। আর স্বাভাবিকভাবেই ডান হাতে স্যান্ডউইচ তুলে মুখে পুরতে পুরতে বলল, -- বসো, নাবিলা।
নাবিলা বসবে দূরের কথা। সে তাকিয়ে আছে আগুন চোখে। অপূর্ব সেই আগুনে ঘি ঢালার মতো বলল, -- আরে বস তো। এই বাড়িতে সবার সাথেই আমার গল্প হয়েছে৷ শুধু তুমি ছাড়া। অবশ্য তোমার সাথে যা যা হচ্ছে, বাকি আর কারো সাথেই হয়নি।
নাবিলা দাঁতে দাঁত চাপল। চেপে বলল, -- একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?
অপূর্ব তার মতোই বলল, -- না।
নাবিলা বড় একটা শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিলো। রাগ, জেদ কোন কিছু তার এখন ভালো লাগে না। তবে কেন জানি মনে হচ্ছে, অপূর্ব তাকে আগে কোথাও দেখেছে। অবশ্য এমন হওয়ার চান্স নেই বললেই চলে। তবুও! তাই এই কথাটাই কয়েকদিন ধরে জিজ্ঞেস করতে চাইছে। তবে এই বান্দা সেই সুযোগ দিলে তো। প্রথম থেকে সে সবকিছুতে করেছে না, না। এখন সে করছে না, না। করুক তার আর প্রয়োজনই নেই জানার। তাই বেরুনোর জন্য এগোবে তখনই অপূর্ব আবার বলল, -- এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ কাজটা কি জানো, নাবিলা? নিজেকেই শাস্তি দেওয়া। এর চেয়ে সহজ কাজ আর কিছুই নেই। সত্যিই নেই।
মানুষ চাইলেই খুব সহজে নিজের ওপর কত অন্যায় করতে পারে জানো? এক দু’দিন অনায়াসেই না খেয়ে শাস্তি দিতে পারে, ঝরনার নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে শরীর মাথার ঘন্টা বাজিয়ে দিতে পারে, বা সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে একরকম মানসিক জেলখানায় বন্দি করে ফেলতেও পারে। এসব করতে কোনো বিশেষ সাহস লাগে না। কোনো আলাদা শক্তিও লাগে না। বরং খুব সহজেই করা যায়। এজন্যই দেখবে, মানুষ যখন খুব কষ্টে থাকে… সবার আগে মাথায় আসে নিজেরে শেষ করার কথা। কারণ, এটা খুব সহজ।
তবে সবচেয়ে কঠিন কি জানো? সব দুঃখ কষ্টকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ভালো থাকা। কিন্তু এটা মানুষ চাইলেই পারে না। নিজের মনকে ধরে রাখতে, সামলাতে, একটু একটু করে টেনে তুলতে। এটার জন্য যুদ্ধ করতে হয়। কষ্টকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে হার মানাতে হয়। নিজের ভেতরের ভাঙা জিনিসগুলোকে আবার জোড়া লাগাতে হয়। এটা এত সহজ না।
নাবিলা একটু তাচ্ছিল্যর হাসি হাসল! হেসে বলল-- বড় বড় কথা বলাও খুব সহজ।
-- ট্রু। তবে আফসোস, এটাও সবাই পারে না। অনেকের তো কথা পেট থেকে বের করতেই বিরাট কষ্ট লাগে।
-- আপনি কি আমাকে আগে… মানে, এই বাড়িতে আসার আগে কোথাও দেখেছেন?
অপূর্ব হাসল! হেসে নিজের মতোই বলল, -- নিজেকে মঞ্চের নায়িকা মনে হয়? কেউ দূর থেকে দেখবে… মুগ্ধ হবে… তারপর সেই মুগ্ধতা থেকে একগুচ্ছ লাল গোলাপ পাঠাবে?
নাবিলার এত রাগ হলো! সেই আগের মতো। নিজে সুন্দর বলে, কাউকে গোনায় লাগে না, না। তাই এগিয়ে জুসের গ্লাসটা তুলে পুরো অপূর্ব মাথায় ঢেলে দিলো। দিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে এলো। আর বেরুতেই থমকে দাঁড়ালো, মঞ্চ, মুগ্ধ, একগুচ্ছ লাল গোলাপ!
........
স্নিগ্ধ, কোমল, হালকা কুয়াশার চাদরে মোড়ানো সকালে, কালো পিচঢালা রাস্তায় সাইকেলটা যাচ্ছিল বড় আয়েশ করে। নদীর মতো আকাবাকা বাক তুলে। গন্তব্য গার্লস হাই স্কুলের সামনে। কিছুক্ষণ পরেই মেয়েরা আসতে শুরু করবে। আটশাট থ্রিপিসের ক্রস বেল বাঁধা মেয়েদের দেখতে বড়ই ভালো লাগে। সাথে মাঝেমাঝে দুই একটা শিস তো আছেই।
তখন কোন কোন মেয়ে ফিরে তাকিয়ে মুচকি হাসে, আবার কেউ খুব বিরক্ত মুখে মুখ ভেংচি কাটে। আবার কেউ লাজুক মুখে মাথা নিচু করে সোজা হেঁটে যায়। তবে যাই করুক, দেখতে তাদের বড়ই ভালো লাগে। ভালো লাগলে মাঝে মাঝে দু-তিন লাইন গানও ছুড়ে মারে।
তাই আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। খুশি মনেই প্রতিদিনের মতো স্কুলগেটের সামনে একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ালো। স্যার ম্যাডামও আসা যাওয়া করে। তাই দেখলে কেলানি দিতে সময় লাগবে না। নিজেদের সেইভ জোনে রেখেই কিছুক্ষণ তাকঝাক করল। করতে করতে দেখলো অতি সুন্দরী দুজন মেয়ে হাসাহাসি করে যাচ্ছে। সেই হাসাহাসি মাঝে আড়চোখে তাদের দিকেও তাকালো। তাকিয়ে লাজুক মুখে হাসল।
এই হাসি দেখেই দুজনে ফিদা হয়ে গেল। গিয়ে একজন গাইল, -- চুমকি চলে একা পথে, সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে।
মেয়ে দুটো সাথে সাথেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তাদের দাঁড়াতে দেরি, পেছন থেকে হাট্টা-কাট্টা দু’লোক দুজনের ঘাড় চেপে ধরতে দেরি হলো না। ধরেই ডানে বামে কিছু নেই। ইচ্ছে মতো কয়েকটা লাগাতে শুরু করল। হঠাৎ আক্রমণে তারা কিছুই করতে পারল না। তবে আস্তে আস্তে আশপাশ থেকে লোক জড়ো হয়ে গেল। কাহিনী কি কেউ’ই বুঝতে পারছে না। তবুও এগিয়ে থামাতে চাইল।
তাদের দেখে বলল, -- আমার বোনকে দেখে গান গায়, চোখ মারে , মিস বাজায়। আপনার বোনকে দেখে বাজালে কি করতেন? বলেই মেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল, -- তোমাদের দেখে গান গাইছে না?
মেয়ে দুটো সাথে সাথেই মাথা নাড়ল। নেড়ে বলল, -- শুধু আজ না। প্রায় দিনই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েদের বিরক্ত করে। বিশ্বাস না হলে আরো কাউকে জিজ্ঞেস করেন।
-- জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। যাও স্কুলে যাও।
মেয়ে দুটো চলে গেল। কেউ আর কিছুই বলল না। তারা তো দিল, তাদের সাথে আরো এক দুজনও এগিয়ে আরো দু-একটা দিল। দিয়ে টিয়ে আরামসে চলে গেল। তবে অন্য কোনো দিকে গেল না। গেল একটু দূরের খাবার হোটেলের সামনে।
ততক্ষণে দু’জনই চিটপাটাং হয়ে শুয়ে আছে। গেঞ্জি প্যান্ট ছেঁড়া, চোখে জখম, ঠোঁট কাটা। সেই অবস্থায় দেখল, হোটেল থেকে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে খালিদ বেরিয়ে এলো। তাদের দিকে একবার তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। হেসে লোকদুটোর একজনের কাঁধ চাপড়ে বড় হাবভাব নিয়ে বাইকে উঠে বসল।
তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না, কোন ওষুধের ডোজ ছিল এগুলো। তার পেয়ারের মানুষদের কাছে তার নামে কান ভরেছে, এমনিই ছেড়ে দেবে। তাই দু’জনই দাঁতে দাঁত চাপল। চেপে বলল, এই খালিদকে তো শিক্ষা এবার দেবেই দেবে। বাকি সব জাহান্নামে যাক।
খালিদ সেখান থেকে এক টানে নাবিলাদের গলির সামনে চায়ের দোকানের এসে বসল। এমন দোকানে বসার অভ্যাস টভ্যাস তার নেই। সেই দিন এক কাজে দাঁড়িয়ে, আজকে দাঁড়ালো এমনিই। সেই এমনির মাঝেই হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো। তাকিয়ে চোখ তুলতেই দেখল, নাবিল বাইক নিয়ে আসছে। তার পেছনে নোভা, চোখ-মুখ কুঁচকে বসে আছে।
অন্য সময় হলে নাবিল সাথে সাথে বাইক থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ত। তবে আজ না দাঁড়ালো, না খালিদের দিকে ফিরে তাকালো। অবশ্য কাল হাসপাতালেও এগিয়ে কথা বলেনি। খালিদ সব করেছে নিজের মতো। করে নাজিম চাচাকে বুঝিয়ে চলে এসেছে। তাই আজ অবাক হলো না। তবে নোভা ঠিক তাকালো। তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে ভেঙচি কাটল। খালিদ দেখেই হেসে ফেলল।
চলবে.....
আমার গ্রুপের লিংক আর ইবুক লিংক কমেন্ট বক্সে।
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT