#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২০
নোভাদের বাড়ির স্বাভাবিক ছন্দ পুরোপুরি না হলেও কিছুটা ফিরে এলো খুব অল্প সময়ের মাঝেই। যে যার জায়গায় আগের মতোই ঠিকঠাক বসে যাওয়ার চেষ্টায় লেগে গেল। মা কোনো কাজ না করলেও নিজের সংসারের তদারকিতে আবার নেমে গেলেন। বাবা তার অভ্যাসমতো কাজ কম আড্ডায় বেশি জুড়ে গেলেন। আসমানি খালাও ফিরে গেলেন তার ঘুম আর পানের ডাবায়। বড়চাচা আর বড়চাচার ছেলে আছে নিজেদের মতো। আর আপা ঢুকে গেছেন তার নিজের গর্তে। আগে অতি দরকার ছাড়া রুম থেকে বের হতো না, এখন কোনো দরকারেই খুব একটা বের হচ্ছে না। কাজ তো ভালোই, খাবারও খাচ্ছে একেবারে রুমে।
তার কোনো কাজ নিয়েই কারো কখনো দ্বিমত হয়নি, এবারেও নেই। তার যেভাবে ভালো লাগে, সেভাবেই থাকে। তবে সেই থাকা থেকেই টেনে বের করার জন্য নোভা এগিয়ে গেল। না গিয়ে উপায় নেই। কারণ সবাই যে যার জায়গায় ফিরে গেলেও কিঞ্চিৎ তফাৎ এসেছে নাবিলের জীবনে। ভার্সিটির বন্ধু ছাড়া এলাকায় আড্ডা নেই বললেই চলে। কেন নেই, নোভা জানে। পাতানো ভাই যতই মহব্বতের হোক, রক্তের সম্পর্কের আগে তিল পরিমাণ জায়গা আর কারোই হয় না। বরং এই সম্পর্কে টান ধরলে তখন বাকি সবকিছুই তুচ্ছ। তাই তার দয়াল বাবার দরদও তুচ্ছ হয়ে গেছে।
তবে তুচ্ছ হোক আর যাই হোক। নোভার দ্বারা ভাই হজম হবে না। এই কয়দিন মায়ের কথা ভেবে চুপ যে ছিল, এই তো কত! তাই সেই হজমের গুরু দায়িত্ব নিয়েই নোভা মায়ের রুমে উঁকি দিল।
আসমানি খালা মায়ের মাথায় তেল ঘষে দিচ্ছে। এটা নতুন না। সপ্তাহে একদিন এই ঘষাঘষি চলে। তবে আপার ক্ষেত্রে ভিন্ন। সময় অসময় আসমানি খালা এক হাতা তেল নিয়ে ধপাস করে আপার চাঁদিতে নিক্ষেপ করেন।
তাতে অবশ্য আপার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি সেই এক হাতা বাওয়া ছাওয়া তেল নিয়ে দিব্যি আরামে ঘুরে বেড়ান। তাই শতভাগ গ্যারান্টি, মায়ের মাথায় তেল মাখা শেষ হলেই খালা হেলে দুলে এই তেল ঘষাঘষির সমাপ্তি টানবেন আপার চাঁদিতে পুরো এক বোতল ঢেলে।
সেই ঢালা ঢালির মাঝেই আসমানি খালা দেখে বললেন, -- আইবার মন চাইলে আও। চোরের লাহান উঁকি ঝুঁকি মারো ক্যা?
নোভা একটু হাসল। যাকে বলা হয় ভদ্র ভাষায় ভদ্রতাসূচক হাসি। আর সেই হাসি হেসেই ভেতরে এলো। মায়ের মেজাজ আজকাল ভালো। তবে যতই ভালো থাক, আপার ব্যাপার স্যাপার আলাদা। কথা তুললেই দু’একটা গালে পড়ার চান্স আছে। অতীতে পড়েছে, বর্তমান খুব সাবধান। তাই কথা বলতে হবে একটু দূরত্ব রেখে। সেই হিসেবেই সে দাঁড়াল হাতের নাগালের বাইরে। দাঁড়িয়ে বলল, -- আমার কিছু বলার আছে মা। খুবই সিরিয়াস।
রোকেয়া এতক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন। নোভার কথা শুনে তাকালেন। তাকাতেই নোভা আর দেরি করল না। তাছাড়া আজ তার কাজ আছে। বান্ধবী পার্লারে যাবে। সন্ধ্যার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে। শুধু নিজের জন্য না, তার জন্যও। যাওয়ার সময় তাকে পিক করবে। তাই যত তাড়াতাড়ি নম্ভব সুন্দর করে সব ঘটনা বিস্তারিত বলল। এ ও বলল, তার মেয়ে ঐ দাড়ি গোঁফের সর্বনাশের বন্যায় ভেসে গেছে।
নোভাকে অবাক করে রোকেয়া আজ কিছুই বললেন না। বরং আবার চোখ বন্ধ করে ফেললেন। নোভা অবাক হয়ে বলল, -- তোমার কিছু বলার নেই?
-- না, নেই।
-- ঐ খাম্বাকেও কিছু বলবে না?
রোকেয়া বলবে। নেচে নেচে বিয়ে ভাঙা! নাবিলা বললেই ভাঙতে হবে? তুই নাবিলার অবস্থা জানিস না। যার যেমন তাল, সেই তালে নেচে নেচে আমার ঘুম হারাম করে বেরাম বানিয়ে ফেলেছে। আবার সাহায্যের ঢং। এতদিন তো আর জানতো না, এখন সব ক্লিয়ার। তবে সে আর আপতত বাড়তি কোনো ঝামেলায় যাবে না। নাবিলা রাজি হয়েছে, এই অনেক। এখন একমাত্র কাজ ভালো একটা ছেলে খোঁজা। বড় ভাই ভাবির সাথেও তার কথা হয়ে গেছে। তারা খোঁজ করবে। সব জানিয়েই করবে। সব ঠিকঠাক করে বিয়েটা হোক। তারপর এই খালিদের খালিদকে যদি এই এলাকা না ছাড়া করেছি , তার নামও রোকেয়া না। তাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,-- তোর আর কিছু বলার আছে?
-- তা আছে। তবে আমি তো ভেবেছিলাম তুমি যুদ্ধ ঘোষণা করবে। হাজার হলেও তোমার বড় মেয়ের ব্যাপার স্যাপার।
-- তোর এত ভাবতে হবে না। নিজের চর্কায় তেল দে।
-- আমার নিজের চর্কায় আমি নিজেই তেল দেই । তোমাদের মতো আরেকজন লাগে না।
রোকেয়া বিরক্ত চোখে তাকালেন। নোভা হাল ছেড়ে বলল,
-- বাদ দাও। পার্লারে যাব। টাকা দাও।
রোকেয়া চোখ খুলে ঘড়ির দিকে তাকালেন। সন্ধ্যা হবে হবে করছে। ভ্রু কুঁচকে বললেন, -- এই সময় কি ?
-- তাসনিম অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছে। যাওয়ার সময় আমাকে নিয়ে যাবে।
-- কোনো দরকার নেই।
-- এই কথা তো বললে হবে না মা। তোমার কাজ করতে গিয়েই আমার হাতের বারোটা বেজে গেছে। তাছাড়া আমার ফেসিয়ালও করতে হবে। তোমাদের ঝামেলায় আমাদের ঘোরারও বারোটা বেজে আছে।
-- যা খুশি কর, তবে আমি টাকা দিচ্ছি না।
-- এটা কেমন কথা ?
-- যেমন শুনেছিস।
নোভা মুখ গোঁজ করল। আসমানি হাসল। হেসে বলল,
-- রাত বিরাতে কিসের পার্লার? দিনে করোডা কি?
-- তুমি চুপ থাকো তো খালা।
-- আমি চুপ থাকলেই তো দুনিয়া থামবো না।
-- হুম, দুনিয়ার চিন্তা তোমরা তো কতো করে বসে আছো! একজন মহা দায়িত্ব নিয়ে বিয়ে ভাঙছে, আরেকজন সেই দায়িত্বে মুগ্ধ হয়ে মহাসর্বনাশের বানে ভেসে যাচ্ছে। তখন তো কিছু না, শুধু আমার বেলায় যত ঢং!
রোকেয়া বড় একটা শ্বাস ফেললেন। বললেন,
-- ঐ ড্রয়ারে টাকা আছে, নিয়ে যা। একা যাবি না। নাবিলাকে নিয়ে যা। আর এদিকে আয়।
নোভা খুশিতে তার সাময়িক দূরত্বের কথা ভুলে গেল। ভুলে ডগমগ করে এগিয়ে গেল। আর যেতেই ঠাস করে এক চড় তার গালে পড়ল।
আসমানি ফিক করে হেসে ফেলল। রোকেয়া আবার চোখ বন্ধ করতে করতে বললেন, -- দ্বিতীয়বার যেন মুখে মুখে তর্ক করতে দেখি না। আর নাবিলকে বলে যা। সময়মতো সে গিয়ে যেন নিয়ে আসে।
নোভা ভোঁতা মুখেই ড্রয়ার থেকে টাকা নিল। নিয়ে কানে ধরল। আপার ব্যাপরে সে আর মাথায়ই ঘামাবে না। যা খুশি করুক, ঐ জঙ্গলের সাথে মঙ্গল করুক। সে ভাই আর কোন আগে পিছে নেই।
নাবিলা বড় আয়োজন করে বারান্দায় এসে বসল। সামনে সাদা শুভ্র কাগজ, রং, তুলি আর পেন্সিল। কাল যে দোয়েলটাকে দেখেছিল। সেই পাখিটাকেই আজ রঙের ছোঁয়ায়, তুলির টানে নতুন করে সাজানোর ইচ্ছে। সেই ইচ্ছে নিয়েই বারান্দার নরম আলোয় চোখ বন্ধ করল। তবে চোখের কোণে দোয়েল পাখি ধরা দিল না। সে দেখল একগুচ্ছ লাল গোলাপ। তার বড় মামার বড় ছেলে আদনান ভাই, দৌড়ে এসে হাতে ধরিয়ে দিল। নাবিলা অবাক চোখে তাকালো। আদনান ভাই হেসে বলল, -- তোর নামে এসেছে। এক নাটকেই তুই নায়িকা হয়ে গেছিস। দেখ, ফুলের বিশাল বুকেট টুকেট এসে হাজির।
নাবিলার তখন অন্য কারো বুকে টুকের দিকে ফিরে তাকানোর সময় আছে নাকি। তার মনে তখন বিশাল অভিমান। বাবা মায়ের প্রতি অভিমান, নিজের প্রতি অভিমান, সেই মানুষটার প্রতি অভিমান। এতোটাই অভিমান সে তখন ঠিক করেছিল। আর ভার্সিটিতেই আসবে না। সেই অভিমান থেকেই ফুলের দিকে সে ফিরে তাকায়নি। বরং আস্তে করে পাশে রেখে ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে চলে এসেছিল।
সেই ফুলের বুকেটটা কি অপূর্বর ছিল? কিন্তু কীভাবে? নাকি এমনিই বলেছে? নাকি সেদিন যে বন্ধুর কথা বলল ভার্সিটিতে দেখেছে, তার ছিল? নাবিলার মাথায় কিছুই আসে না। তবে ঠিক করেছে, আর কিছু জানতে যাবে না, সামনেও যাবে না। কয়েক দিনের জন্য এসেছে। সে তার মতো থাকুক, নাবিলা নাবিলার মতো থাকুক।
-- ধ্যান লাগিয়ে লাভ নেই। এখন তুমি আমার সাথে যাচ্ছো।
নাবিলা চমকে চোখ খুলল। খুলে নোভার দিকে তাকাল। কখন এসে দাঁড়িয়েছে, টেরই পায়নি। বরং নোভা এসেছে একেবারে রেডি হয়ে। গায়ে লং টপস, জিন্স, গলায় স্কার্ফ।
নোভা অবশ্য এত দেখার সুযোগও দিল না। তার বান্ধবী নিচে গাড়িতে বসে আছে। আগে বললে আপা যেতে চাইবে না। তাই টেনে তুলেই গায়ে চাদর জড়িয়ে দিল। গাড়ি থেকে পার্লার, পার্লার থেকে আবার বাড়ি। কোনো সমস্যা হবে না। তাছাড়া জামা চেঞ্জ করা ছাড়া এই বান্দা এমনিতেও কিছু করবে না।
তাই নোভা নাবিলাকে টেনে বের করে আনল। বেরুতেই সামনে পড়ল আসাদুজ্জামানের। তিনি মাগরিবের নামাজ পড়তে যাচ্ছিলেন। না, এখনো আজান হয়নি। আগে গিয়ে একটু বসেন, জিকির করেন, তসবিহ পড়েন। তাই তাদের দেখেই বললেন, -- ব্যাপার কী?
-- কিছু না বড়চাচা, পার্লারে যাচ্ছি।
আসাদুজ্জামান চমকালেন। চমকে নাবিলার দিকে তাকালেন। নাবিলার কিছু বলার সুযোগ আছে? তবে আসাদুজ্জামান সাথেসাথেই বললেন, -- এই ভর সন্ধ্যায়?
নোভা তার মতো বলল,-- তো কী হইছে?
-- আচ্ছা, সমস্যা নেই। চল, আমিও যাই।
-- পাগল হইছো তোমরা! যাও তো। নাবিলকে মেসেজ করে দিয়েছি। সময়মতো গিয়ে নিয়ে আসবে।
বলেই নোভা নাবিলাকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
আসাদুজ্জামানের গলা শুকিয়ে এলো। নাবিল বাসায় নেই। অপূর্বও নেই। সেই রাতের বারবিকিউ পার্টির বন্ধুর দাওয়াতে গেছে। নাবিলকেও নিয়ে গেছে। আনতে যাবে মানে? এর মধ্যে যদি কিছু হয়ে যায়?
তিনি সোজা রোকেয়ার রুমের দিকে গেলেন। তার সাথে কথা বলা দরকার। তবে শুরুটা কীভাবে করবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এর মধ্যে গ্রামের খামারবাড়ির কাজ অর্ধেক রেখে এসেছেন। ভেবেছিলেন অপূর্ব যতদিন আছে, কাজে টাজে আর হাত দেবেন না। কিন্তু যাকে দেখা শোনার জন্য রেখে এসেছেন, সে ফোন করে বলল, " বাকি কাজ পরে করলেও চলবে। তবে পুকুর যে অর্ধেক খনন করে রেখে দিয়েছেন, সেটার কাজ এখন শেষ না করলে শীত গেলেই মেঘ বৃষ্টির দিন, তারপর বর্ষা। পুরো কাজটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
তবুও তিনি নিষেধ করেছেন। খামারবাড়ির কাজ ছিল নিজেকে ব্যস্ত রাখা, ভালো রাখা। সেই ভালো থাকার থেকেও হাজার গুণ ভালো আছে ছেলের সাথে থেকে। তাছাড়া তিনি ভালো করেই জানেন, এই থাকা ক্ষণিকের। যে কোন সময় অপূর্ব ফিরে যাবে। তাই দুনিয়ার সবকিছুই এখন তার কাছে তুচ্ছ।
অপূর্ব অবশ্য শুনেই বলেছে, -- আমাদের প্ল্যান তো ছিলই গ্রামের বাড়িতে যাওয়া। তো এই ফাঁকেই যাওয়া যাক। কিছুদিন বেড়ানোও হবে, আবার তোমার কাজগুলিও হয়ে যাবে।
আসাদুজ্জামানের কাছে বুদ্ধিটা খারাপ লাগেনি। তাছাড়া বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। সবসময় শহরেই করা হয়। ছেলে যেহেতু আছে, ঠিক করেছেন এবার গ্রামে করবে। তাই ভেবেছিলেন রোকেয়াকে বলবে। যাবে কি না। গেলে সেখানেই এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করা হবে।
তবে এখন আর তিনি ওতো ভাবলেন না। ছোট ভাইয়ের রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে চিন্তিতভাবে ডাকলেন, -- রোকেয়া?
রোকেয়া সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে গেল। অনেকদিন একই ছাদের নিচে থেকেও কখনো বড়ভাই রুমের দরজায় আসেননি। আসা তো দূরের কথা, কোনো ব্যাপারে আগ বাড়িয়ে মাতব্বরিও করেননি। সে থেকেছে তার মতো, তারা তাদের মতো। তবে আজ তার ডাকে রোকেয়া একটু অবাকই হলো। তাই,সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, -- ভেতরে আসেন ভাইজান।
আসাদুজ্জামান ভেতরে এসে বললেন,-- আমার একটু কথা ছিল।
রোকেয়া মাথা নেড়ে আসমানিকে বলল,-- যা তো আসমানি। নাবিলার দরজা জানালা আটকে দে। নোভা টেনে নিয়ে গেছে। কিছু করার তো মনে হয় সুযোগই পায়নি।
আসমানি বোকা না। তাই সাথে সাথেই বেরিয়ে গেল। যেতেই রোকেয়া বলল, -- বসেন ভাইজান।
আসাদুজ্জামান বসলেন। বসে আজ আর সময় নষ্ট করলেন না। বরং সাথে সাথে বললেন, -- আমি কখনো তোমাদের কোনো বিষয়ে মাথা ঘামায়নি। জানি, এক ছাদের নিচে থাকলেও কিছুটা দূরত্ব আমাদের মাঝে আছে। তাই অনেক কিছু বুঝেও কখনো জিজ্ঞেস করিনি। তবে আজ ভাসুর হিসেবে না, মনে করো বড়ভাই হিসেবে জিজ্ঞেস করছি… নাবিলা ঠিক আছে?
রোকেয়া কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। আসলে কী বলতে চাইছে সে ওতো বুঝতে পারল না । তবুও বলল, -- হ্যাঁ, ভালোই তো।
-- আমি যদি বলি, নেই?
রোকেয়া এবারো বুঝতে পারল না। তবুও বলল,-- এমন অবস্থায় কোনো মেয়েই ভালো থাকে না। বারবার বিয়ে ভাঙছে, সবার কটু কথা শুনছে। এমন অবস্থায় আমিও একসময় গিয়েছি। তাই আলাদা করে বলার কিছু নেই। একটা গতি হয়ে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
-- না রোকেয়া, তুমি আমার কথা বুঝোনি।
রোকেয়া আগের মতোই ভ্রু কুঁচকে বলল, -- কী বুঝিনি?
আসাদুজ্জামান বড় একটা শ্বাস ফেললেন। ফেলে সেদিনের ঘটনা খুলে বললেন। বলে শেষে বললেন,
-- রোকেয়া… নাবিলা আমাদের মেয়ে। আমাদের উচিত সবাই মিলে তার ভালো চিন্তা করা। এতটুকু তো এতোদিনে ঠিকই চিনেছো, আমরা কেউ তার খারাপ চাই না।
রোকেয়ার এবার বুঝতে সমস্যা হলো না। তবে তেমন ভাবান্তরও হলো না। বরং নিঃশব্দে খাটের এক কোণে এসে আস্তে করে বসল। বসে ভনিতা ছাড়া সব নির্বিকার ভাবেই বলল। সব বলল, নাবিলা যা জানে না তাও বলল। অথচ তার মা মাথা ছুঁয়ে কসম দিয়েছিল। এই খবর যেন আর তৃতীয় ব্যক্তি কখনোও না জানে।
রোকেয়া নির্বিকার ভাবে বললেও, আসাদুজ্জামান শুনলেন পাথরের মূর্তির মতো। শুনে বড় করুণ চোখে সামনে বসা মানুষটার দিকে তাকালেন। আজ আর সেই রাগী, রগচটা, ঝাঁঝালো মানুষটাকে দেখা গেল না। বরং তার সামনে ধরা দিল এক ক্লান্ত, নিঃশেষ হওয়া এক মা। যে দুনিয়ার বড় বড় তাক করা আঙুল, কঠিন কথা আর অবহেলা থেকে নিজের সন্তানকে আগলে, অল্প এতটুকু সুখ বিছিয়ে দিতে একা একাই যুদ্ধ করে যাচ্ছে ।
....
নোভা পার্লার থেকে বেরিয়ে খুশির এক ঝিলিক দিল। নাবিল একা আসেনি, অপূর্ব ভাইয়াও এসেছে। নানান কাহিনীতে ঠিকঠাক কথা বলা হচ্ছে না। তা না হলে আজ তাদের সাথে ঠিক ঝুলে যেত। তাই সেই খুশির ঝিলিক নিয়েই এগিয়ে গেল। গিয়েই বলল, -- আমি এখন বাসায় যাব না। দু’দুটো ভাই সাথে। একজন তো মিলিয়নিয়ার। তাই কোথায় খাওয়াতে নেবেন, সেটা এখন আপনারাই ঠিক করেন।
নাবিলা অবশ্য এগুলো ধীরে ধীরে। তার হাবভাব সেই প্রথম দিনের মতোই শান্ত। সে অপূর্বর দিকে একবারও তাকালো না। বরং নাবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে এমনভাবে দাঁড়াল, যেন তাকে কেউ না দেখে, আর সেও কাউকে দেখতে না পারে।
নাবিল শুনেই মাথায় হালকা চাটি মারল। তাদের পেট গলা পর্যন্ত ভরা, এখন আবার কোথায় যাবে! তবে অপূর্ব হাসল। তার হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ। রাস্তায় ছোট ছোট বাচ্চারা বিক্রি করছিল, সে সবগুলোই নিয়ে নিয়েছে। গোলাপগুলো ঘোরাতে ঘোরাতে একটু পেছনে কাত হয়ে নাবিলার দিকে তাকাল। মিষ্টি রঙের ঘরের জামার উপরে কালো চাদরে পুরো প্যাকেট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি নিচের দিকে। সেই নত মুখের দিকে তাকিয়ে অপূর্ব বলল,-- আই’ম লাকি টু হ্যাভ ইউ, নোভা। থ্যাঙ্ক ইউ। চলো। আমিও দেখি দুটো চাঁদের সাথে এই কুয়াশা মাখা রাতে ঘুরতে কেমন লাগে।
চলবে......