ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 22

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২২

আসাদুজ্জামানের ঘুম ভাঙল ফোনের শব্দে। না, নিজের না। এত সকালে ফোন করার মতো কেউ আপাতত তার জীবনে নেই। যেটুকু কাছের মানুষ, সব তার আশেপাশেই। তাই চোখ খুলে শব্দের উৎসের দিকে তাকালেন। শব্দের উৎস চোখে পড়ার আগেই চোখে পড়ল ছেলের অসম্ভব সুন্দর মুখখানি। আজও তার গা ঘেঁষে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। তবে ঘুমোচ্ছে, নাকি জেগে তিনি ঠিক বুঝতে পারলেন না।

অবশ্য ঘুম না হওয়ারই চান্স বেশি। তার চোখও লেগেছে খুব একটা বেশি সময় হয়নি। নিয়ম মাফিক প্রতিদিন সময়মতো ঘুমালেও আজ চোখের পাতায় ঘুমের ছিটেফোঁটাও নামেনি। ভেতরে বিষাদের এক বিশাল অস্থিরতা। এই অস্থিরতার হাল তার জানা নেই। রোকেয়া, নাজিম সব জেনেও এই অস্থিরতার হাল কিভাবে ধরেছে সেটাও তার জানা নেই। অথচ এই ভাইটাকে সারা দুনিয়া ছন্নছাড়া, দিনদুনিয়ার খোঁজ না রাখার মানুষ হিসেবে চেনে। অথচ এটা কেউ জানে না। দিনদুনিয়ার খবর তার না থাকলেও, দূর দূর করার হাজার কারণ থাকা সত্ত্বেও দু’মেরুর দুটো মানুষ পাখির পলকের মতো নিজ সন্তানের হাজার দোষ ভুল মাটি দিয়ে কী সুন্দর সন্তানকে আগলে ধরে আছে। সবাই এমন করতে পারে না। বরং দুনিয়ার সাথে সাথে সন্তানের হাতটাও অনেকে ছেড়ে দেয়।

ছটফট করতে করতে প্রায় অর্ধেক রাত এমনিই চলে গেছে। ঘুম চোখের পাতায় ধরা দেয় না। সে ভেবেছে, নাবিলার চিকিৎসার প্রয়োজন। রোকেয়া হয়তো সমাজের আঙুলের ভয়ে বিয়ে দিয়ে দায় সারতে চাইছে। তবে সে তো আর জানে না। যেটুকু আজ নাবিলা স্বাভাবিক, সেইটুকু সব চিকিৎসার অবদানেই। এখন শুধু মেয়েটার একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দরকার। যেই ভবিষ্যতে ভালোবাসা হোক, দায়িত্ব হোক, যাই হোক। শুধু মেয়েটা ভালো থাকুক। সকল অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসুক।

তাই অনেকক্ষণ চুপচাপ এমনিই বসে ছিল। ছেলে মেয়ে সব বাইরে। পৃথিবীর কোনো বাবা মায়ের পক্ষেই দু’চোখ এক করা সম্ভব না। রোকেয়াও ছিল জেগে। সে নিজে থেকেই কয়েকবার বলল, “তুমি শুয়ে পড় গিয়ে, আমি আছি।” রোকেয়া তো রোকেয়াই। শুনে কার কথা? সে চলে নিজের মতো। রাগে বম হয়ে আছে। ফিরলেই গালে দুটো ফেলে কি না, কে জানে।

তাই নিজের মতো এসে নামাজে দাঁড়িয়েছে। মনটা এমন বিক্ষিপ্ত। নামাজের চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে? নামাজ পড়ে এই কিছুক্ষণ আগে কাত হয়েছে। হয়তো তখনই চোখ লেগে গেছে।

আসাদুজ্জামান নিজের কম্বলটা টেনে অপূর্বর গায়ে তুলে দিলেন। নভেম্বর মাসের শুরু। খুব বেশি না হলেও শেষ রাতে বেশ শীত পড়ে। তবে অপূর্বর গা খালি। মনে হয় রুমে যায়নি। এখানেই কোনো রকম ফ্রেশ হয়ে ধপাস করে শুয়ে পড়েছে। গায়ের শার্টটা সোফার এক কোণায় বড় অবহেলায় পড়ে আছে। আধো আলো-আধো অন্ধকারে ফর্সা শরীরটা মেঘে ঢাকা চাঁদের মতো ঝিলিক দিচ্ছে।

তার একবার পিঠটার উপর আদুরে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করল। তবে ছেলে তো আর সেই ছোট্ট ছেলে না। তাই নিজের বিশাল জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারলেন না। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে অপূর্ব তার হাতটা ধরল। ধরে টেনে পিঠে তুলে না দিলেও মাথায় তুলে দিল।

আসাদুজ্জামান হাসলেন। ছেলেটার সবকিছুতেই অবজারভেশনের ক্ষমতা ভালো। সবকিছু খুব নিখুঁতভাবে দেখে, ভাবে, চিন্তা করে। তাই খুব সহজেই অনেক কিছু বুঝতে পারে। তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-- ফোন বাজছে অপূর্ব।

অপূর্ব বালিশে মুখ গুঁজেই বলল,
-- জানি।
-- তো, ধরছো না কেন?

অপূর্বর উত্তর দিল না। আসাদুজ্জামান হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা হাতে তুলে নিলেন। আফসানার কল। এই নাম্বারে বাহিরের বলতে অপূর্বর খুব কাছের কয়েকজন বন্ধু আর একমাত্র তার মায়ের কলই আসে। এক-দু’জনের সাথে তো তার কথাও হয়ে গেছে। তারা নাকি এক টিমের মতো।কি সব ভিডিও বানায়, একসঙ্গে কাজ করে। বাকি সবার সাথে আপাতত যোগাযোগ বন্ধ।

এই ছেলের সব ঠিক। লেখাপড়ার হিস্ট্রিও ভালো। তবে কমপ্লিট হওয়ার পরে কোনো ভালো জবের চেষ্টা করেনি। কেন করেনি, তিনি জানেন না। নিজের মতো গল্প করে, সে মুগ্ধ হয়ে শোনে। আগ বাড়িয়ে কিছুই জিজ্ঞেস করার মতো সাহস তার হয় না। বাবা হিসেবে তো কিছুই করেনি। এখন আর ভালো মন্দ বলার অধিকারটুকু তার নেই। বরং ভাগ্য তাকে যেইটুকু দিচ্ছে, সেইটুকুতেই খুশি। তবে আফসানা যোগাযোগ বন্ধ করে ভালোই করেছে। ভরনপোষণ ছাড়া সে কিছু করত বলে মনেও হয় না। বড় হতে হতে এখন যেই তিক্ততা নেই, এই যে বাবার পাশে বিনা সংকোচে ঘেঁষা, হয়তো সেটা থাকত না, আর কখনও এমন কিছু হওয়ার সম্ভবও হতো না।

আসলে চিৎকার-চেঁচামেচি, ঝগড়া এইসবের তিক্ততা সবার নজরে পড়ে। কিন্তু নীরবে গুমড়ে মারা কারো চোখে পড়ে না। আফসানা নীরবে গুমড়ে মরেছে, সেও মরতে দিয়েছে। তো বাঁচার চেষ্টা করলে দোষের ভাগীদার হবে কেন? সব সময় অধিকাংশ দোষই মেয়েদের দিকে তাক হয়। আফসানার দিকেও হয়েছিল। সবাই আঙুল তুলে বলত, এমন সোনার সংসার ফেলে কেউ আসে? অন্য কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে। দেখো গিয়ে নতুন কাউকে হয়তো মনে ধরেছে।

আফসানার মনের অবস্থা কেমন গিয়েছিল সে জানে না। জানার চেষ্টাও করেনি। নিজের অহম আর কাজে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু আজ কোনো মেয়ের বাবার জায়গায় বসে অনুমান করতে পারছে। অবশ্য বলতে গেলে দুটোই ভিন্ন জগতের গল্প। তবে ঐ যে বলে, নিজের বোঝার ওজন মাপতে পারলে দুনিয়ার সবার ওজন অনুমান করা যায়। তাই হয়তো আজ ঠিক অনুমান করতে পারছে।

ফোন কেটে গেছে। আসাদুজ্জামান ফোন আবার পাশে রেখে দিলেন। দিতে দিতে বললেন, -- মায়ের সাথে অভিমান চলছে নাকি?

অপূর্ব চিত হয়ে শুতে শুতে বলল, -- মায়ের সাথে কখনো আমার অভিমান হয় না।
-- তো?
-- মিথ্যা বলতে পারব না, তাই ধরছি না।
-- কেন?
-- কণ্ঠ শুনেই বুঝে যাবে আমার মন ভালো নেই।
-- তোমার মন ভালো নেই?
-- না।
-- কেন?

অপূর্ব সেই কথার উত্তর দিল না। বরং বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, -- তোমার মন ভালো নেই কেন বাবা?
-- তুমি বলো?

অপূর্ব হাসল। হেসে এবারো সেই কথায় গেল না। নিজের মতো বলল,-- একটা গল্প শুনবে?

-- অবশ্যই। আমি তোমার সব গল্প শুনতে চাই।

অপূর্ব আগের মতোই হাসল। হেসে ঝট করে উঠে বসল। এলোমেলো চুলগুলো খুব সুন্দর করে হাত দিয়ে স্লাইড করে পেছনে ঠেলে দিল।

আসাদুজ্জামান দেখে হাসলেন। ছেলেটা যে কোনো গল্প খুব সুন্দর করে বলে। সবকিছু চোখের সামনে ভাসতে থাকে।

অপূর্ব আরাম করে বসে বলল, -- তখন আমার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয়নি। বছর খানেক এখনও বাকি। নানুর মৃত্যুর সময় আমরা কেউই আসতে পারিনি। হঠাৎ মৃত্যু। তাছাড়া দূরদেশ থেকে চাইলেই ঝট করে আসা যায় না। তবে প্রথম মৃত্যুর বার্ষিকীতে মা ঠিক করলেন দেশে আসবেন। মায়ের জন্য দোয়া, কবর জিয়ারত করবেন।

সবাই সেই হিসেবেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। সেটা ছিল বাইরে সেটল হওয়ার পর আমার দ্বিতীয় সফর। এসে সবার যেমন সময় কাটে আমাদেরও কাটছিল। সেই কাটার মাঝে আমার বন্ধু জাকির তাদের ভার্সিটির এক প্রোগ্রামে আমাকে যাওয়ার কথা বলল। তার অবশ্য ততদিনে অনার্স শেষ। আমি বাহিয়ে যাওয়ার পিছিয়ে গেছি। তাই নিজের ভার্সিটিতে শেষ বার সবাই অনেক অনেক মজা করবে। তার জন্যই ইনভাইট করল। কাজ নেই, তার উপর ঘোরাঘুরিতে আমার কোনো নিষেধ নেই। এটা আমি খুব ইনজয় করি। তাই বলতেই ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে গেলাম।

ভার্সিটির প্রোগ্রাম যেমন হয়, তেমনই। আলাদা কিছু নেই। নাচ, গান, নাটক, বড় বড় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাবর্গের বক্তৃতা, খাওয়া-দাওয়া এই তো। সেই আড্ডার মাঝে এক পিচ্চি মেয়ের উপর আমার নজর পড়ল। স্টেজে। একেবারেই পিচ্চি। মে বি ফার্স্ট ইয়ার। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাটকের থিমটা গ্রামীণ। গ্রামের মেয়েদের মতো গায়ে কাপড়, মাথায় জোড়া বেনি, চোখে মোটা কাজল, হাতভর্তি রেশমি চুড়ি।

ভার্সিটির প্রোগ্রামের নাটকগুলোতে শুধু অভিনয় থাকে না।থাকে পারফরমিং আর্টসের পুরো প্যাকেজ। নাচ, গান, অভিনয় কি নেই তাতে! আর মেয়েটা সেই সব করেছিল খুব দক্ষতার সাথে। একসময় অভিনয় করতে করতে তার সাথে থাকা এক ছেলের হাতটা আলতো করে জড়িয়ে ধরল। সাথে চোখে পানি। নাটকের অংশ। সেই অংশটুকু আমি মুগ্ধ হয়ে দেখলাম।

এতটাই মুগ্ধ হলাম যে বিশাল এক লাল গোলাপের বুকেট তার জন্য পাঠালাম। ইচ্ছে ছিল নিজের হাতেই অভিনন্দন জানাবো। কিন্তু মেয়েটা কারো সাথে দেখা করবে না। তারপর তাদেরই একজনের হাতে পাঠালাম। নিজের হাতে দিতে না পারলেও দূর থেকে মেয়েটাকে দেখলাম।

সে ফুলগুলো নেয়নি। একবার ফিরেও দেখেনি। বরং বড় অবহেলায় সাইডে রেখে দিল। চারিদিকে তখন অনুষ্ঠানের আমেজ। সবাই ব্যস্ত। পরের পারফরম্যান্স যাদের, তারা দৌড়াদৌড়ি করছে। সেই বড় আমেজের মাঝে মেয়েটা সবার চোখের আড়ালে চুপচাপ বেরিয়ে এলো। আমি মেয়েটাকে দেখলাম। যতক্ষণ দেখা যায়, তাকিয়েই রইলাম।

তাকিয়ে দেখলাম তার চোখের পানি। দেখলাম, এগোতে এগোতে হাতভর্তি চুড়িগুলো একটার পর একটা রাস্তায় বৃষ্টির পানির মতো টুপটাপ করে লুটিয়ে পড়া।

তখন আমার মনে হলো, স্টেজে যেই চোখের পানি দেখে সবাই মুগ্ধ হয়েছে, সেই চোখের পানি কোনো অভিনয় ছিল না। ছিল পুরো বাস্তব। আর বাস্তব বলেই উপস্থিত প্রতিটা মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। অভিনয় হলে ছুঁতে পারত না। কেননা ভেতর থেকে যেই চোখের পানি আসে,সেই পানির জাদুর উপর আর কোনো কালোজাদু নেই।

সেই জাদু হয়তো কিছুটা আমার উপরে খাটল। কোনো কারণ ছাড়া বারবার মনে উঁকি দিল। সেই উঁকি দেওয়া থেকে জাকিরের মাধ্যমে কিছুটা খোঁজ করার চেষ্টা করলাম। ফার্স্ট ইয়ার, এখনও তেমনভাবে কেউ চেনে না। এমন অচেনা হয়ে কিভাবে এমন প্রোগ্রামে ঢুকল, সেটাও কেউ জানে না। জাকির কথা দিল নজর রাখবে। তবে সেই মেয়ে গায়েব। একদিন, দুদিন, সপ্তাহ কেটে গেল। সেই মেয়ের খবরই নেই। পরে হাল ছাড়লাম। সত্য বলতে তখন মনে কিছুই ছিল না। তবে জানতে ইচ্ছে হয়েছিল। কিসের কষ্ট তার।

সেই কষ্ট থেকেই, আজব এক কাজ করলাম। নানুর জন্য দোয়ায় আমি হাত তুলে, ওই মেয়ের জন্য দোয়া চাইলাম। কেন চাইলাম নিজেও জানি না। ব্যস, পুরো মোনাজাতে একটা বাক্যই বললাম। তার প্রতিটি অশ্রুবিন্দু যেন সুখে পরিণত হয়।

আসাদুজ্জামান চুপচাপ শুনলেন। কিন্তু শুনে কি বলবেন বুঝতে পারলেন না। এই সব ব্যাপার স্যাপারে তিনি সত্যিই আনাড়ি। তবুও বোকার মতো জিজ্ঞেস করলেন,
-- মেয়েটা এখন কোথায়?

অপূর্ব আগের মতোই হাসল। হেসে বলল,-- সেটা তো বড় কথা না। বড় কথা, মেয়েটা ছিল তোমার ছেলের জীবনের প্রথম মুগ্ধতা। যাকে বলে ক্রাশ।

আসাদুজ্জামান মাথা নাড়লেন। তিনি কাঠখোট্টা টাইপ মানুষ। প্রেম ভালোবাসা ধারের কাছে জীবনেও যায়নি। কলেজে থাকাকালীন এক মেয়ে লাভলেটার দিয়েছিল। তিনি সেই মেয়েকে দিয়েছিলেন এমন এক ধমক। মেয়ের অবস্থা তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। তারপর একেবারে মায়ের পছন্দে সোজা বিয়ে। অসম্ভব সুন্দরী এক রমণীর সাথে। যার প্রতিটি কদমেই মুগ্ধ হওয়ার মতো ছিল। কিন্তু তিনি অতি সহজে পেয়ে তার কদর করতে পারেনি।

তাই মাথা নেড়েই বললেন, -- তারপর?

অপূর্ব খাট থেকে নামল। ফজরের আজান পড়ছে। সোফার কোণা থেকে শার্টটা তুলে নিতে নিতে বলল, -- তারপর আবার কি? কিছুই নেই। আমাকে কি এক মুগ্ধতায় আটকে থাকা টাইপ ছেলে মনে হয় নাকি? তুমি জানো, এক ভ্যালেন্টাইন ডেতে পুরো কলেজে হাইইস্ট প্রোপোজাল পেয়েছিলাম আমি।

আসাদুজ্জামান হাসলেন। হেসে বললেন,
-- বাবারে! তো প্রেম করেছো কয়টা?
-- হিসেব নেই।
-- সিরিয়াস ছিলে কয়টায়?
-- একটাও না।
-- কেন?
-- এমনিই।
-- এমনিই?
-- হুম।
-- এই দুনিয়ায় ‘এমনিই’ বলে কখনো কিছু হয় না। সব হওয়ার পেছনে ছোট হোক বড়, কারণ অবশ্যই থাকে।

অপূর্ব আগের মতোই হাসল। তবে আর কিছু বলল না। নিজের মতো বাবার রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে দরজা পার হওয়ার সময় আস্তে করে বলল, -- লুকিয়ে লুকিয়ে কারো কথা শোনা ইট্‌স ব্যাড ম্যানার্স, ফেইরি টেইল গার্ল।

নাবিলা কোনো টু শব্দ করল না। আগের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। রোজকার রুটিন মতো শেষ রাতে ঘুমানোর আগে তার এক কাপ কফি প্রয়োজন হয়। সেটা নেবার জন্য বেরুতেই মোবাইলের রিংটোনের শব্দ পেল। নিশ্চুপ রাত, চাচার রুমের দরজা হাট করে খোলা। বুঝতে বাকি রইল না শব্দ কোথা থেকে আসছে। তাই এগিয়ে এসেছিল।

অপূর্ব যেতে যেতেও ঘুরে উল্টো কদম ফেলল। নাবিলা সাথে সাথেই মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার চোখ মুখ সব সময়ের মতোই শান্ত। তখনই আসাদুজ্জামান দরজার সামনে ছায়া দেখে বলল, -- কে?

নাবিলা বড় একটা শ্বাস ফেলল। ফেলে একটু এগিয়ে আস্তে করে বলল, -- আমি বড় চাচা।

আসাদুজ্জামান বড় মায়া নিয়ে নাবিলার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে কোমল সুরে বললেন, -- এখনো ঘুমাসনি?

নাবিলা দু’পাশে মাথা নাড়ল।

-- ভেতরে আয়।

নাবিলা এগিয়ে গেল।

-- ঘুরতে কেমন লাগলো?
-- ভালো।
-- এভাবে ঘুরবি ফিরবি। দেখবি, কত ভালো লাগে।

নাবিলা মৃদু হাসল।

-- বড় চাচার সাথে ঘুরতে গ্রামের বাড়ি যাবি?

নাবিলা আগের মতোই ঠোঁট টিপে হাসল। হেসে বলল,
-- এখন আবার বলবে না, মাকে বলতে।

আসাদুজ্জামানও হাসলেন। পা গুটিয়ে বসতে বসতে বললেন, -- তো কাকে বলব?
--- তোমরা সবাই সব আমার ঘাড়ে ফেলো।
-- আমাদের নাবিলা মা যে একটাই, তাই। আরো কতগুলো থাকলে তাদের ঘাড়েও ফেলতাম।

নাবিলা হেসে ফেলল। হাসলেন আসাদুজ্জামান ও। হেসে অপূর্বর মতো দোয়ায় না বললেও, মনে মনে বলল, -- এই হাসি দীর্ঘ হোক।

........

নোভা বাসা থেকে বেরোল খুব ফুরফুরে মেজাজে। শেষ রাতে ঘুমিয়ে আজ ভোরেই উঠে গেছে। যা তার জীবনে বলতে গেলে একেবারেই বিরল। বরং তার জীবনের আজীবন রেকর্ড হলো একেবারে সবার শেষে ঘুম থেকে ওঠা।

কিন্তু আজকাল তার সময় যাচ্ছে স্বপ্নের মতো। কী রেখে কী করবে, সে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তাই একদিকে ঘুমিয়েছে, আরেকদিকে লাফিয়ে উঠেছে। উঠার অবশ্য কারণ আছে। এত এত আনন্দের সময় যাচ্ছে। গল্প বুঝি বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করবে না? তার মধ্যে তার আপা নাকি অভিনয় করেছিল! তারা তো ভাই জানেই না। জাকির ভাইয়া কাল বলল, তার স্যার ওয়েব সিরিজের জন্য নতুন মুখ খুঁজছে। নাবিলা চাইলে অডিশন দিতে পারে। আপা তো ভাই জীবনেও দেবে না। সে দিলে কেমন হয়?

এই আনন্দের ঢেউয়ে উড়ে উড়ে খেয়ে দেয়ে, পুরো উৎসাহ নিয়ে, জীবনে প্রথমবার সময়ের আগেই সময় মতো ভার্সিটিতে উদ্দেশ্য রওনা দিল।

তা না হলে আজ ভার্সিটিতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে তার হতোই না। নাবিল তো এখনো ঘুম থেকেই উঠেইনি। অপূর্ব ভাইয়াও না। তবে আপা ভূতের মতো জেগে আছে। অবশ্য জেগে থেকেই লাভ হয়েছে। তারা সবাই গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে। বড় চাচা সকালে খাবারের টেবিলে বলল। বাবা শুনেই আফসোসের সাথে বলল, তার আর এখন কোথাও যাওয়ার সুযোগ হবে না। কয়েকটা বড় বড় অর্ডার পেয়েছে। তারা যেতে চাইলে আগে যাক, সুযোগ পেলে সে পরে আসবে।

মাও শুনে সাথে সাথে নিষেধ করতে যাচ্ছিল, তবে তার প্রিয় আপা বলল, --- অনেক দিন গ্রাম দেখি না মা। চলো সবাই মিলে যাই।

মা তো অবাকের উপর অবাক। যেই মেয়েকে ঠেলে কোথাও নেওয়া যায় না, সেই মেয়ে নিজে থেকে একেক জায়গায় ঘোরার বায়না করছে! হচ্ছে কী? তবে যাই হোক, কাল এত রাত করে ফেরায় মার মেজাজ চটে আছে। অপূর্ব ভাইয়ার সামনে অবশ্য মুখ খুলেনি। তবে আজ ছেড়ে দেবে এমন ভাবার কিছু নেই। তাই সোজা বলল, --- আপনার যেতে ইচ্ছে হলে যান। আমাদের ব্যাপারটা এখন থাক। আমার শরীরের অবস্থাতো দেখছেনই। আরাম দরকার, আরাম। আপনি বরং আপনার ছেলেকে নিয়ে যান। দাদার বাড়ি তো মনে হয় মনেও নেই। দাদার বাড়ির মাটি পাড়িয়ে আসুক, দাদার কবর জিয়ারত করুক। এবার ফিরে গেলে আবার আর কখনও আসবে বলে তো মনে হয় না। তাই তাকেই নিয়ে যান। আমাদের পরে গেলেও চলবে। এমনিতেই এদের ভার্সিটি যাচ্ছে দুনিয়ার বন্ধ! লেখাপড়া তো উঠে গেছে চালে। গেলে তো আর সপ্তাহের নিচে আসা যাবে না। তাই আমাদের বাদই রাখেন বড় ভাই।

বড় চাচার মুখটা মলিন হয়েছে, অবশ্য তেমন ভাবে বুঝতে দেয়নি। দাদি কবর এখানেই, যখন ইচ্ছে গিয়ে দেখে আসেন। তবে দাদা থেকে বাবা, বড় চাচা তাদের যত আত্মীয়, মুরব্বিরা সবাই শুয়ে আছেন গ্রামে। তাই চেয়েছিলেন একসাথে সবাই গেলে আয়োজনটা একটু বড় করে করবেন। সবার জন্য দোয়া টোয়া করবেন। কিন্তু মা তো মা'ই। তবে মায়ের উপরে সমসের হলো বড় আপা। সে তার মতোই বলল, -- চলো না মা। আর কখনও সুযোগ হয় কি না তাও বলা যায় না। শেষবার না হয় একবার সবাই মিলে ঘুরে আসি। আমারও তো বলতে গেলে কিছু মনে নেই। বড় হয়েছি নানির বাড়ি। নানির বাড়ি ছাড়া তো কিছুই চিনি না।

ব্যস! মায়ের কোথায় গিয়ে লেগেছে, সেটা বাড়ির প্রতিটা মানুষই জানে। তাই দ্বিমতের আর সুযোগই আসেনি।

আর এত এত খুশিতে ডগমগ করতে করতে নোভা এগিয়ে গেলো। তার সেই ডগমগ ভরা আনন্দে পুরো চার চাঁদ লাগিয়ে আজকে মোড়ে আসতে না আসতেই রিকশাও পেয়ে গেলো । ইশ! আজকে দিনটা তো তার জন্য লাকি। সেই লাকি দিনের বরবাদ শুরু হিসেবে নোভা পড়ল কঠিন এক জ্যামে।

জ্যামে বসতে না বসতেই ক্যাঙারুর সাথে দেখা। না, আজকে মহাশয় বাইকে নেই। বরং এক হাতে বাজারের বিশাল এক ব্যাগ। সেই ব্যাগ নিয়ে রাস্তার সাইডে দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ না, ধুমসে মোবাইলে কথা বলছে। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। নোভা দেখেই মনে মনে বলল, -- তাকা ক্যাঙারু, তাকা। একবার তাকা।

নোভার দোয়া সাথে সাথেই কবুল হলো। খালিদ তাকালো। তাকাতেই নোভা সুন্দর করে মুখের এপাশ থেকে ওপাশে ভেংচি কাটল। নোভাকে ধমকাধমকি। বাকি জীবন সে আর কিছু করুক আর না করুক। এই এক ডিউটি সে মন প্রাণ লাগিয়ে একেবারে ঠিকভাবে পালন করবে।

আজকে অবশ্য খালিদ হাসল না। না, গলে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল । বরং মোবাইল রেখে ব্যাগ নিয়ে সোজা এগিয়ে এলো। এসে ধপাস করে ব্যাগটা নোভার পায়ের কাছে রাখল। রেখে বলল, -- উপকার তো কম করলাম না। এবার আমার একটু উপকার করো। ফোনে বলে দিচ্ছি। যাবার সময় আমার বাড়ির সামনে ব্যাগটা রেখে যাবে।

নোভার আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা। সেই অবস্থায় বলল,
-- কে বলেছে আপনাকে উপকার করতে? উপকার তো করেননি। জাল বিছিয়েছেন জাল! আমার আপা থেকে বাড়ির সবাইকে ফাঁদে ফেলার জাল। তাই ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে ভাগেন। তা না হলে আমি লাথি দিয়ে ফেলে দেবো।

-- আচ্ছা! তাহলে চেপে বস। রিকশা পাচ্ছি না আমি। বরং আমিই নিয়ে যাই। বেশি দূর তো না। এই সামনের গলি। তাছাড়া ফায়ে ফায়ে আমার বাইকে তো আর কম চড়লে না। এখন আমার পালা।

জ্যাম ছুটছে। নোভা সাথে সাথে ঝট করে মাঝামাঝি এসে বসে বলল,-- কোনো দিনও না! এই মামা, চলেন তো।

খালিদও আর দেরি করল না। নিজের মতো ঘুরে যেতে যেতে বলল, -- সেটাই, যাও। ব্যাগটা নিয়ে তাড়াতাড়ি যাও।

নোভা অবাক। অবাক হয়েই বলল, -- আপনার এই বস্তা নিয়ে যান বলছি।

খালিদ আর কিছুই বলল না। তার ইমার্জেন্সি কাজ আছে। ফোন করতে করতে চলে গেল। নোভা হা করে কিছুক্ষণ বসে রইল। তারপর ব্যাগের দিকে একবার উঁকি দিল। কাগজ টাগজ, সাথে বাজার সদাইও দেখল। তার ইচ্ছে হলো এক লাথি দিয়ে ছক্কা হাঁকায়। তবে খাবারের জিনিস বলে মন সায় দিল না। ধুর, বলেই বিরক্ত মুখে সোজা হয়ে বসল।

চলবে......

আমার গ্রুপের লিংক আর ইবুক লিংক কমেন্ট বক্সে
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 22 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন