ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 23

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২৩

নাবিলের বাইক এসে থামল পার্টি অফিসের সামনে। নিজেদের এলাকা, হেলমেট পরার প্রয়োজন পড়ে না। অবশ্য এমনিতেও খুব একটা যে পরে তেমন না। তবে ছোট ছোট গোছানো চুল, উঁচা লম্বা গড়নে কালো লেদারের জ্যাকেটটায়, গায়ের রং শ্যামলা হলেও দেখতে খারাপ লাগে না। বরং ভার্সিটিতে, এলাকায় আসতে যেতে অনেক রমনীর নজরেই কালো কাজল হয়ে চোখে সাজে। তবে এই মায়ের ছেলের নজর পড়ে আছে অচেনা এক রমণীর ওপরে। চেনাজানা তো ভালোই, সামান্য মুখের আদলও এখনও দেখা হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ার পরিচিতি। সেই পরিচিতি অবশ্য সেই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। সামনে কী হবে, আপাতত সেই চিন্তা নেই। বরং বাইক, ভার্সিটি, এলাকা আর খালিদ ভাইয়ের দল নিয়ে তার দিনকাল যাচ্ছিল রঙিল পালতোলা নৌকার মতো হেলে দুলে ভেসে ভেসে।

তবে সেই দিনের পর না খালিদ ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে, না পার্টি অফিসের ধারের কাছেও এসেছে। এমনকি কারও ফোন পর্যন্ত ধরেনি। আজও ধরত না। ঘুম থেকে ওঠার পর আপা এসে হাজির। নতুন না, এই বাড়ির প্রতিটা রুমে আপার বিনা দ্বিধায় আসা যাওয়ার অনুমতি আছে। আর তার রুমে সব সময়ই আছে। তাই সব সময়ের মতো এসে কোনো কাজ টাজ খুঁজে ফিরেনি, বরং পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে কোমল সুরে বলছে, -- খালিদ ভাইয়ের ফোন ধরিস না কেন?

নাবিল শুনেই একটু চমকাল। সে ফোন ধরুক বা না ধরুক।আপার জানার কথা না। তাহলে? খালিদ ভাইয়ের সাথে আপার যোগাযোগ আছে। বেশ ভালোই আছে। আর এটা ভেবেই তার মুখে অন্ধকার নেমে এলো। বিয়ে তাহলে খালিদ ভাই একা ভাঙছে না। বরং দু’জনেই মিলেমিশে ভাঙছে।

আপা সেই অন্ধকার মুখ দেখে হাসল। মাথার চুলগুলো এলোমেলো করতে করতে বলল, -- খালিদ ভাই এতিম মানুষ। এতিম হলেও মানুষ তার জন্মপরিচয় জানে, বাবা মায়ের নাম জানে, বংশের পরিচয় জানে, ধর্ম জানে। কিন্তু খালিদ ভাই এসবের কিছুই জানে না। আমাদের যে কাউন্সিল, তার বড় ভাই তাকে পেয়েছিল, রাস্তার পাশে। কালো পলিথিনে মোড়ানো। সারা গায়ে পিঁপড়ে মাখানো। এক কুকুর পলিথিন ধরে টানাটানি করছে। প্রথমে ভেবেছিল মরা বাচ্চ টাচ্চা। কেউ ডাস্টবিনে ফেলেছে। কুকুর টেনে রাস্তায় নিয়ে এসেছে। পরে খেয়াল করতেই দেখে, কোন রকম তিরতির করে গলার নিচটা নড়ছে।

সে মুখ ফিরিয়ে যেতে পারেনি। বেশ কয়েক বছর তার কাছেই ছিল। সেই নাম রেখেছিল খালিদ। তবে তার হঠাৎ মৃত্যুর পর রাখার মতো আর কেউ ছিল না। তারপর ভেসে ভেসে এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে ভাগ্যের এক পালাক্রমে এতিমখানায়। সে হাজার অন্যায় করুক, হাজার অপরাধ করুক তবে আমাদের সাথে কখনও কোনো অন্যায় করেনি। বরং সব বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এটাই সত্য।

-- তাহলে এইসব কি?

নাবিলা আবার হাসল। হেসে বলল, -- আপাকে তাড়িয়ে দেওয়ার খুব তাড়া না? চিন্তা করিস না, আর কোনো ঝামেলা হবে না। এখন যা, পার্টি অফিসে তোদের ভাই ব্রাদাররা মিলে রাতে খিচুরির আয়োজন করেছে। খালিদ ভাইয়ের প্রিয় ‘চামচ’ ছাড়া হয়?

নাবিল হাসল না। আপার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তবে আজ আর কোনো জড়তা সংকোচ করল না। বরং শান্ত কণ্ঠে বলল, -- তোমার আর খালিদ ভাইয়ের মাঝে কিছু আছে আপা?

নাবিলা আগের মতোই মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, -- আছে তো। ভাই - বোনের সম্পর্ক। সে তোকে যেই নজরে দেখে, আমাকেও সেই নজরেই দেখে। বরং তোকে যেভাবে দেখে, আমাকে তার থেকেও বেশি দেখে। তোকে ছোট ভাইয়ের মতো মনে করে, আর আমি কোনো মনে করা টরা না। বরং বোনই। রক্তের সম্পর্ক না থাক। তবুও আমি তার ছোট বোন। আর ছোট বোনের মুখের কথায় সে দুনিয়া উল্টে ফেলতে পারে।

নাবিল এবার হেসে ফেলল। তার কিছুই আর বুঝতে বাকি রইল না।

নাবিলা অবশ্য এবার হাসল না। সে কিছুক্ষণ শূন্যদৃষ্টিতে ভাইয়ের হাসি মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল নিজের প্রতিচ্ছবি। গায়ে মোটা রুপালি পাড়ের লাল সুতির কাপড়, গলায় গাঁদা ফুলের মালা, তার সাথে চোখে ঝিলমিল আনন্দ। সেই আনন্দ নিয়ে নাবিলা পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে গেল। খালিদ ভাই হাসল। হেসে মাথায় হাত রেখে বলল,--
“আমার এই দুষ্ট রাখাল ছাড়া পৃথিবীতে কেউ নেই নাবিলা। আজ থেকে আরেকজন হলো, তুমি। তুমি শুধু আমার রাখালের রাখালিন না, আমার ছোট বোন। আর আমার ছোট বোনের কাছে একটা আবদার রইল। হাত যখন ধরেছ, যদি কখনও ছাড়ার মতো কোনো কারণ হয়, তবুও ছেড়ে যেও না নাবিলা। তুমি তার কাছে কী, তুমি নিজেও জানো না। তুমি মুখ ফেরালে সে হেসে হেসে দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।”

নাবিলা বড় একটা শ্বাস ফেলল। ফেলে চোখ সরিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, -- খালিদ ভাই তোর অপেক্ষা করবে। যা, ঘুরে আয়। চাইলে অপূর্ব ভাইয়াকেও নিয়ে যা। সে ঘরে একা একা বসে করবে কী?

হঠাৎ অপূর্ব ভাইকে নিয়ে চিন্তার কারণ নাবিলের মাথায় এলো না। বরং মনের ক্লেশ দূর হয়ে গেছে, সে সেটাতেই খুশি। সে খুশিতে খুশি মনেই বেরিয়ে এসেছে।

নভেম্বর মাস। আসরের আজান পড়তে না পড়তেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। ঘড়ির কাঁটা চারটার আশেপাশে। তবুও মনে হয় অন্ধকার একেবারে ঘিরে ধরছে। সেই অন্ধকারের মায়া ঝেড়ে নাবিল বাইক রেখে ঝটপট এগিয়ে গেল।

খালিদ নিজেও দেখে এগিয়ে এলো। এসে জড়িয়ে ধরল। তার চোখে মুখে আগের মতোই গলে যাওয়া ভাব। সেই গলে যাওয়া ভাব নিয়েই অপূর্বর দিকে তাকাল। নাবিলকে এক হাতে জড়িয়ে আরেক হাত বাড়িয়ে দিল অপূর্বর দিকে।

আজ অবশ্য অপূর্ব শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল না। বরং সেই প্রথম দিনের মতো এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল। করতেই খালিদ দু’জনকেই টেনে ভেতরে নিয়ে বসাল। একজনকে দ্রুত চা আনতে পাঠালো।

তার মধ্যেই অপূর্ব নাবিল দুজনেই অবাক হয়ে আরেক পাশে তাকাল। খিচুড়ি রাঁধতে চাল ডাল মেশাতে হয় ঠিক আছে, কিন্তু চাল বাদে ডাল, এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা আরো কী কি দেখল কে জানে। তার মধ্যে টুকরো টুকরো কুচিকুচি কাগজ! ছেলে পেলেরা সব বাদে কাগজটাই আলাদা করার চেষ্টা করছে।

খালিদ দেখে নির্বিকার চিত্তে বলল, -- একজনকে একটু উপকার করতে বলেছিলাম। উপকার করেছে নিষ্ঠার সাথে। তবে তার সাথে এই অবকাজও করে গেছে! ভাগ্যিস চালের বস্তা ছিল না। তাহলে খবর ছিল।

নাবিল হেসে ফেলল। তাদের পার্টি অফিসটা বলতে গেলে বেশ বড়সড়। একটা মোটামুটি ফ্ল্যাটের সমান। তাদের কাউন্সিলরের জায়গা। পাশে বিল্ডিং করে এইটুকু তাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। অবশ্য লাভ তো তারই। তাই সে হেসেই এগিয়ে গেল। এখানে সবাই তার পরিচিত।

সে যেতেই খালিদ অপূর্বর দিকে তাকাল। সেইদিন ভালো করে খেয়াল করা হয়নি। তবে আজ তাকিয়ে স্বীকার করতেই হলো, এত সুন্দর পুরুষ সে জীবনে দেখেনি। ফর্সা গায়ের রং অনেকরই হয় ঠিকই, তবে সকলের চেহারায় সেই সৌন্দর্য থাকে না। এই ছেলের মাঝে অন্য রকম দুত্যি আছে।

তাই তাকিয়েই আগের মতো গলে বলল, -- আপনি এসেছেন, আমি খুব খুশি হয়েছি। রাত হলে ছেলেরা আনন্দ উল্লাস করবে। রিকুয়েস্ট করছি, আপনিও থাকবেন।

অপূর্বরও তার মতো হাসল, হেসে বলল, -- অবশ্যই। আমার সমস্যা নেই। বরং আমার নিজেরই খুব ভালো লাগবে।

-- আমেরিকা কোথায় ?

-- ক্যালিফোর্নিয়া

-- আঙ্কেল আন্টি সবাই ভালো আছেন?
-- হুম।
-- কী করেন আপনি?
-- বলার মতো কিছু না। তবে করার মতো অনেক ড্রিমস আছে।
-- ভালো।
-- কতদিন আছেন?
-- ইচ্ছে উপর ডিপেন্ড।

-- ভালো! তবে বলতেই হবে আসাদুজ্জামান চাচার এমন ছেলে আছে, আমাদের ধারণাই ছিল না। অবশ্য তাদের বাড়ি সম্পর্কে কারোরই তেমন ধারণা নেই। আপনারও তো থাকার কথা না। হাজার ভাই হোন। থাক সে সব কথা। নাবিলার খবর কি? আহারে মেয়েটা! ওহহো আপনি তো আবার জানেন না কাহিনী কি? আসলে....

অপূর্ব ঝট করে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে মুখে কৌতূহল। তবে খালিদের দিকে না। ছেলেরা গান বাজাবে, স্পিকার সেট করার চেষ্টা করছে। অপূর্বর সেই দিকে এগোতে এগোতে বলল, --- সবার সব জানার তেষ্টা থাকে না, মিস্টার খালিদ। ভাই বলে সম্বোধন করলাম না। আমরা সেম এইজেরই হব।

খালিদ হাসল। হেসে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দুলতে দুলতে অপূর্বর দিকে তাকিয়ে রইল। যে আপাতত ছেলেদের সাথে লেগে গেছে। তাই হেসে কাগজ কলম টেনে নিতে নিতে মনে মনে বলল, -- আপনার জানার তেষ্টা না থাক, আমার বলার আছে, মিস্টার অপূর্ব। তাই খালিদের ডেরায় এসেছেন, না জানিয়ে তো আমি ছাড়ব না।

বলেই খসখস করে নিজের মতো কিছুক্ষণ লিখল। লিখে ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে অপূর্বর পাশে গিয়ে আস্তে করে পকেটে পুরে বলল, -- মজার একটা জোকস। এখন না। খাওয়া দাওয়া হোক, আড্ডা, মজা হোক। তারপর আরামছে পড়বেন। সেম এইজের যখন, ভদ্রতার খোলস দেখিয়ে লাভ কি?

বলেই হাক ছেড়ে বলল, -- এই স্পেশাল গেস্ট আমার। স্পেশাল আয়োজন কর।

অপূর্বর আগের মতোই হাসল। হেসে কাঁধ থেকে আস্তে করে হাত নামিয়ে দিল। দিয়ে সাউন্ড বক্সের দিকে মন দিল। বাম হাতের কাজ তার। চোখের পলকে সব সেটও করে ফেলল।

.......

নাবিলাদের বাড়িতে কিছুটা উৎসব উৎসব আমেজ বিরাজ করছে। অবশ্য সেই বিরাজে তার মা তো ভালোই, সে নিজেও নেই। যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে, তবে নাবিলার উপর যে পুরো বিরক্ত হাবভাবেই বুঝিয়ে দিচ্ছে। সেই বোঝানাও বড় নাটুকে। আজ সারাদিন তাকে কোনো কাজের ধারের কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। নাবিলা যখনই কিছু করতে গেছে, তখনই তার মা চোখ মুখ কুঁচকে বলেছে,
“দু’দিনের মেহমান। আর সুযোগ পাও না পাও, আরাম আয়েশ করো। দাদির বাড়ি, আরো কোনো জায়গা থাকলে ঘুরো। কাজ টাজের দরকার নেই। যাও, ঠিকঠাক করে সব গোছগাছ করো।”

নাবিলার এত হাসি পেল! তার মা তাও আবার ‘তুমি’। ছেলে মেয়েদের কখনো তিনি ‘তুমি’ বলেন না। আদরের সময়ও না। তার রাগ থাক, আদর থাক, সব সময় তেজ একই রঙের, একই ঢংয়ের। তাই প্রথমবার মার মুখ থেকে ‘তুমি’ শুনে নাবিলার কেন জানি খুব মজাই লাগল। তাই সেই রাগকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে সে স্বাভাবিক ভাবেই মায়ের আশ পাশ দিয়ে ঘুর ঘুর করল। এটা সেটা করার চেষ্টা করল।

নাবিলার নিজেরও যাওয়ার খুব একটা তো ভালোই… কোনো ইচ্ছেই নেই। তবে নিজের জন্য কিছু তার বলতে করতে ভালো লাগে না। যা হওয়ার হোক। এই হওয়ার ভেতর যদি এই মানুষগুলো কিছুটা ভালো থাকে, তো থাকুক।

তাই উৎসবের আমেজে কারো তরফ থেকেই কোনো বাড়তি ঝামেলা নেই। বরং একসাথে এভাবে কোথাও কখনো যাওয়া হয়নি। এবারেই প্রথম। তাও আবার নিজের পৈতৃক ভিটায়। একই জেলা হলেও সেটা পড়েছে উপজেলা শহরের একেবারে ভিন্ন সাইডে। নাবিলার জ্ঞান হওয়ার পর কখনো যাওয়া হয়নি। এই বাড়িতেই আসেনি, আর ওখানে যাওয়ার কথা তো আসারই কথা না। তাছাড়া তার মায়ের আবার সেই বাড়ি পছন্দ না। তিনি নিজেই গেছেন হাতে গোনা কয়েকবার। তাও বাধ্য হয়ে, অতি দরকারে। তাই সে তো দূরের কথাই। নাবিল, নোভা কারোই তেমন যাওয়া হয়নি।

গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেবে কাল সকালে। যাওয়া আসার সব ঝামেলা বড় চাচার ঘাড়ে। বাবা আপাতত যাচ্ছে না, তবে বলেছে দোয়ায় ঠিক থাকবে। বাবার খাবার টাবারের তো ভালোই, কোনো কিছুতেই কোনো সমস্যা নেই। এলাকায় হেন কোনো দোকান নেই যার সাথে তার খাতির নেই। তাছাড়া বাইরে ঘুরে ফিরে খেয়ে দেয়ে সে অভ্যস্ত। তাই এবারের আয়োজনে আসমানি খালাও বাদ নেই। বরং তিনি বড় আয়োজন করে নিজের সব গোছগাছ করছেন।

সেই গোছগাছের ফাঁকে একবার নাবিলার রুমে এলো। এসে প্রায় ফিসফিস করে বলল, -- নোভা মাতারি কি কয়? তোমার নাকি নায়িকা হওয়ার কথা আইছে? খবরদার আস্মা, এই সবের ধারের কাছেও যাইবা না। এই সব খারাপ জিনিস। রূপ গুণ এই সবের কিছুই নাই। সব শুধু উপর নিচের কারবার।

নাবিলা শুনেই হেসে ফেলল। তার হাসি দেখে খালা নির্বিকার চিত্তে বলল, -- হাসো আর যাই করো। আসমানি ফাও কথা কয় না। আর ওদিকে আরেক নায়িকা হওয়ার জন্য উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। তার বেড়ানি আমি গেরাম থেকে আসি। তারপর ঘুড়ির নামটায়ের মতো টেনে আফার হাতে দেব। এখনই দিতে পারতাম, তয় কোথাও যাওয়ার আগে কুফা টুফা লাগাইতে নাই। গাড়ি ঘোরার যাত্রা, অমঙ্গল হইব। তাই আপাতত উড়তে থাকুক। ভালো কথা, এই মাতারি করছে কি, সেইটা জানো নি?

নাবিলা দু’পাশে মাথা নাড়ল। মানে সে জানে না।
আসমানি বড় বিরক্ত মুখে বলল, -- ভ্যাদাইমা খালিদের বাজার সদাই বিনা আগুন আর চালে খিচুড়ি রেঁধে রেখে আসছে। ওই ভ্যাদাইমাও কম ফাজিল না। প্যাকিং করে কতগুলো পাঠাইয়া দিছে। তাও ভালো আফার নজরে পড়ে নাই। পড়লে আজ গাল আর গাল থাকত না।

নাবিলা আবারো হাসল। সব পাগল একখানে।
সেই হাসি, কথা টথা সেরে নাবিলা দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমাল। ঘুম ভাবতেই আবিষ্কার করল তার মাথায় এক হাতা তেল। পুরো মাথা জবজব করছে। দুপুরে ঘুম মানেই তার কোনো কিছু ঠিক নেই। নেই মানেই আসমানি খালার প্রাথমিক চিকিৎসা এক হাতা তেল। কোন ফাঁকে দিয়ে যায় বুঝতেই পারে না।

তাই সেই তেল নিয়ে নাবিলা ফ্রেশ হলো। নিজের টুকটাক গোছগাছ করল। তার গোছগাছের প্রধান সারিতে পড়ল এক গাদা বই। সেই বই টই গোছাতে গোছাতেই রোকেয়া দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ মুখ অন্ধকার করে বলল, -- নোভা ঘুমে। আমি আসমানিকে নিয়ে একটু মার্কেটে যাব। শহরে তো শীত নেই। গ্রামের অবস্থা কি কে জানে। কয়েকটা গরম কাপড় কিনব। আসমানিরও নাকি লাগবে। বাড়ি ঘর সব খালি। ভালো করে দরজা লাগিয়ে বসো। আর, তোমার কি কিছু লাগবে?

'তুমি ' শুনেই নাবিলা হাসল। হেসে মাথা নাড়ল।
রোকেয়ার কালো মুখ আরো কালো করে বলল, -- হাসছো কেন?

-- কিছু না, তোমরা যাও। তাড়াতাড়ি এসো।

রোকেয়া আসমানিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
যেতেই নাবিলা নিজের মতো টুকটুক করে পুরো ঘর গোছালো। মাগরিবের আজানের আগেই চাচা বেরিয়ে যায়,আজও গেছে। তার রুমও গোছালো, এলোমেলো কাপড় গুছিয়ে ড্রয়ারে রাখল, নোংরা কাপড় ঝুড়িতে রাখল। ব্যাগ ট্যাগ বড় চাচা এখনও গোছায়নি, সে ব্যাগসহ নেওয়ার মতো সব কিছু খাটের সাইডে গুছিয়ে রাখল। যেন এসেই যা যা নেবে দেখে গুছিয়ে নিতে পারে।

সব কিছু গোছগাছ করলেও অপূর্বর রুমের দিকে ফিরেও তাকালো না। বরং নোভার রুমে গিয়ে জানালা লাগালো, পর্দা টানল, সন্ধ্যার সময় মৃদু আলো জ্বালিয়ে দিল। রাতে ঘুমায়নি, আবার সকালে উঠেই দৌড়ে ভার্সিটিতে গেছে। এখন দিন দুনিয়া ভুলে ঘুমাচ্ছে। সারা রাত এবার বসে থাকো! অবশ্য এই মেয়ে বসে থাকবে না। তার রুমে গিয়ে ঘাপটি মারবে। কি করবে না করবে বলে বলে তার মাথা ঘুরিয়ে ফেলবে।

ঠিক তখনই কলিং বেল বাজল।
নাবিলা সব সময় যা করে তাই করল। মনিটরের সামনে দাঁড়ালো। যা ভেবেছে তাই। অপূর্ব দাঁড়িয়ে আছে। দু’হাত পকেটে পুরে। সোজা বুকটা টানটান করে। চোখ মুখ শান্ত।
নাবিলা একটু হাসল! অবশ্য খুবই ক্ষীণ। হেসে স্বাভাবিকভাবেই দরজা খুলল। খুলে সাইড হয়ে দাঁড়ালো।

অপূর্ব ভেতরে এলো স্বাভাবিকভাবেই। তবে প্রতিদিনের মতো জুতো জায়গামতো রাখল না। দরজার সামনেই খুলল। খুলে ভেতরে যেতে যেতে বলল, -- আমি এখনই বেরিয়ে যাব, ক্যামেরা নিতে এসেছি। নাবিল আমার ফিরতে ফিরতে একটু রাত হবে।

নাবিলা কিছু বলল না। বরং দরজা আস্তে করে চাপিয়ে নিজের রুমের দিকে গেল। সে অবশ্য পেছনে ফিরে দেখেনি। নিজের মতো রুমে এসে মোবাইলটা হাতে নেবে। তখনই লাইট অফ হয়ে গেল।

নাবিলা চমকে পেছনে ফিরল। ড্রয়িংরুমের বাতি জ্বালানো। সে আলো তার রুমের দরজা পর্যন্ত এসেছে। সেই দরজার আলো আড়াল করে অপূর্ব দাঁড়িয়ে আছে। আগের মতোই দু’হাত পকেটে পুরে। সেই হাত পকেটে পুরেই ধীরে ধীরে এগোল।

নাবিলা নড়লও না, পেছনেও হাঁটল না। আগের মতো আগের জায়গায়ই সোজা দাঁড়িয়ে রইল।

অপূর্ব থামল একেবারে নাবিলার সামনে। নোভা নাবিলের মতো নাবিলা ওতো লম্বা হয়নি। সে হয়েছে দাদির মতো। তাই নাবিলের কাছে আপা যেমন ছোট্ট পাখির ছানার মতো। অপূর্বর সামনেও ঠিক সেইরকমই মনে হলো। আর এই মনে হওয়া নিয়ে নাবিলার মনে একসময় বড়ই আফসোস ছিল। তার মামাতো বোনরা প্রায় সময় দুষ্টুমি করে বলত, তোকে টুকিয়ে এনেছে। দেখিস না, নোভা নাবিল, ফুপু ফুপা সবাই কত লম্বা। আর তুই লিলিপুট। তখন এত্ত রাগ হতো। এখন অবশ্য তেমন কিছুই নেই। তবুও কেন জানি আজ বড়ই বিরক্তই লাগল।

সেই বিরক্তি নিয়ে বলল, --- আশা করি চাচার নাম বদনাম করবেন না?

-- সবাইকে নিজের মতো ভাবার কারণ কি?
-- কোনো কারণ নেই।
-- থ্যাঙ্ক ইউ।

বলে এক পকেট থেকে হাত বের করে নাবিলার মাথার উপর রাখল। হাতে টুকরো টুকরো কাগজ মুঠো করা।
সেই কাগজ নাবিলার উপর ছড়িয়ে দিতে দিতে বলল,

-- অপূর্বকে বোঝার মতো বুদ্ধি তোমার নেই মেয়ে। তাই যেইটুকু ব্রেইন সহি সালামত আছে, সেইটুকু যত্ন করে তুলে রাখো। এইটুকুও গেলে এত কাহিনী করবে কি করে?

বলেই আরেকটু ঝুঁকে নিচু হলো। তারপর বলল, -- অপূর্বর এতো খারাপ দিনও আসেনি জ্বলে যাওয়া কয়লার পেছনে পড়বে। তাই নিশ্চিন্তে থাকো দ্য কোল গার্ল।

বলেই অপূর্ব বেরিয়ে গেল। নাবিলা এতক্ষণ খিঁচে থাকা শ্বাস ফেলল। ফেলার দেরি, অপূর্বর আবার ফিরে আসতে দেরি হলো না। কেননা, এবার সে ধীরে ধীরে আসেনি, এক ঝটকায় এসেছে। এমন ভাবে এসেছে নাবিলা আঁতকে দেয়ালে ঠেকে গেল। অপূর্ব সেই ঠেকে যাওয়া শরীরের এক সাইডে এক থাবায় হাত রেখে বলল, -- আমি কোনো ভালো ছেলে না নাবিলা। কোনো ন্যায় নীতিও নেই । আমার একটাই নীতি। আমার ইচ্ছে। তাই সোজাই বলছি। আমি আবার দৌড়ে এসেছিলাম অন্য একটা কারণে। তবে যে ভাবে আঁতকে উঠলে। তাই বাদ দিলাম। তাই নেক্সট টাইম আমাকে খোঁচাতে আসবে না। আমি কিছু বলছি তোমাকে? নিজের মতো থাকো, নিজের বিয়ে হাজার বার ভাঙো, ভাঙতে ভাঙতে মন ভরলে টুপ করে বিয়ের পিঁড়িতে বসো। বিশ্বাস করো, এর চেয়ে বেশি তোমার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না। অবলা নারী হয়ে ঢং করতে ভালো লাগে, করো। তবে আমার কাছ থেকে সাবধান। তা না হলে এমন গিরিংগি লাগাব, তোমার পেয়ারের খালিদও কি রেখে কি করবে, ভেবে কুল পাবে না।

বলেই অপূর্ব বড় একটা শ্বাস ফেলল। ফেলে কৌতুকের স্বরে বলল, -- স্যরি, এক্সট্রিমলি সরি। সরি ফর এভরিথিং।

নাবিলা টুশব্দও করল না। অপূর্ব ঐ নিশ্চুপ মুখের দিকে একধ্যানে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এলোমেলো চুলগুলো বাম হাতে পেছনে স্লাইড করতে করতে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলো। যেতে যেতে বলল, -- গল্প শোনাতে ইচ্ছে হলো, নিজে এসো নাবিলা। ডানে বামে কাউকে টানাটানি করবে না। আর একবার এসে দেখো, তাহলেই বুঝতে পারবে আমি কতোটা গুড লিসেনার।

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 23 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন