#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২৪
রোকেয়া নাবিলার গায়ে কম্বল টেনে দিলো। হাতের বইটা বন্ধ করে ব্যাগে রাখল। বই পড়তে পড়তে গাড়িতেই ঘুমিয়ে গেছে। গাড়ি তো আর চলে যাচ্ছে না। অপূর্বর নাকি কোনো পরিচিত বন্ধুর। নিজেরা ড্রাইভ করবে, তাই নিয়ে এসেছে। সেদিন রাতেও মনে হয় এই গাড়িতেই গেছে। তাই মনে মনে ঠিক করলেন। ছোট গাড়ি নাজিম হাতছাড়াও করে না। তবে ছেলে মেয়ে বড় হয়েছে, তাদের নিজেদেরও শখ আহ্লাদ হয়েছে। এখানে ওখানে ঘোরার বায়না করে। তাই সুযোগ হলেই এমন একটা গাড়ি নিয়ে নেবে।
অন্যের গাড়ি নিয়ে আসা তার ভালো লাগেনি। এক তো অন্যের গাড়ি, তার মধ্যে পুলিশ টুলিশ ধরলে আরেক ঝামেলা। অবশ্য আগ বাড়িয়ে কিছু বলেও নি। মেজাজের পারদ ঠিক নেই। তাই কী রেখে কী বলে ফেলবে, তাই যা করার করুক। কিছুদিনের মামলা, শেষ হলেই ডিসমিস।
রোকেয়া কম্বল টেনে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। সে বেরোতেই আসমানি পানের ডাবা নিয়ে গাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলো। এত জায়গা থাকতে গাড়িতে বসে পান খেতে হবে কেন, রোকেয়ার মাথায় এলো না। অবশ্য সে মাথায় নিতেও চায় না। এতো ঝামেলা ভালো লাগে না। তাই নিজের গায়ের মাখন রঙের সুতির শাড়ির ওপর খয়েরি রঙের ফুলতোলা চাদরে নিজেকে ভালো করে মুড়িয়ে নিলো। নিয়ে বাড়িটা ঘুরে দেখতে লাগল।
অবশ্য চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। দুপুরের শুরুতে তেজহীন, মিষ্টি রোদ চারপাশে বিরাজ করছে। সেই রোদ গায়ে মাখতে ততটাও খারাপ লাগার কথা না। তবে গ্রামের দিকে যে এত শীত থাকবে, তার ধারণা ছিল না। তার মধ্যে জানালা রেখেছিল খোলা। সকালের কুয়াশা মাখা ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া তখন ভালো লাগলেও এখন মাথা ভার লাগছে, নাক মুখ শুকিয়ে আসছে। ঠান্ডা যে ভালোভাবেই লাগবে, সেটা আর না বোঝার কিছু নেই।
তবে বিরক্ত হোক আর যাই হোক, এখানে এসে বলতে গেলে সে কিছুটা চমকেই গেছে। কেননা তার মনে গেঁথে ছিল শ্বশুরের সেই পুরোনো রংচটা হাফ বিল্ডিং, ওপরে টিনের চাল, বাথরুম গোসলখাল সেই উঠানের শেষ মাথায়। মাটির ইয়া বড় বড় উনুন। তবে এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই। তাছাড়া বড় ভাই খামার বাড়ির কথা বলেছে, সে ভেবেছে পুকুর, হাস-মুরগি, সবজি-টবজি গাছ দিয়ে বাড়ি তো ভালোই, হয়তো জঙ্গলের মতো করে ফেলেছে।
তবে বাড়ি দেখে রীতিমতো অবাক। একে কোনো দিকেই খামারবাড়ি বলা যায় না, বরং দেখতে অসম্ভব সুন্দর একটা বাগানবাড়ির মতো লাগছে। অবশ্য কিছুটা এলোমেলো। কাজ এখনও পুরো কমপ্লিট হয়নি। নিজের জমানো পুঁজি পাজি যে সব এখানে ঢালছে, রোকেয়ার বুঝতে আর বাকি নেই। তাছাড়া আগে এই বাড়ি এতটা বড়ও ছিল না। সে অবশ্য জানত, আশপাশের জমিজমা কিনেছে তবে এতটা তার ধারণা ছিল না। তাই আগের বাড়ির চেয়ে বাড়িটা হয়েছে প্রায় তিন ডাবল। সেই তিন ডাবলই উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, একেবারে মাঝখানে মূল বাড়িটা। সামনে সোজা রাস্তা গিয়ে ঠেকেছে বিশাল গেটটা পর্যন্ত। এক পাশে গাছগাছালি, আরেক পাশে পুকুরের কাজ হয়তো কোনরকম হয়েছিল। কাটা মাটি দিয়ে পুরো এলোমেলো হয়ে আছে। অবশ্য তাদের জন্য বাড়িটা পুরো গুছিয়ে রেখেছে।
তবে গ্রামও আর আগের মতো অজপাড়া গাঁ নেই। সব পাল্টে শহরের মতো রঙিন হয়ে গেছে। অলিগলিতে পিচঢালা রাস্তা। বেড়ার তো ভালোই, হাতে গোনা কয়েকটা টিনের ঘর দেখল। তা না হলে সব বিল্ডিং।
তবে বিল্ডিং হোক আর যাই হোক, মানুষগুলো আছে আগের মতোই। দেখতে ভোলাভালা, নিচে নিচে শয়তানের হাতা। এই হাতাদের জন্যই রোকেয়ার কখনও এই বাড়িতে আসার মন টানেনি।
এখনও টানে না। তবে ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছুই করতে হয়। তাই তারা আসতেই বড় আগ্রহ নিয়ে আশে পাশের মানুষ এগিয়ে এসেছে। এসেই চোখে মুখে বিস্ময় নিয়ে বলেছে, -- আরে আমাগো বাবুর বউ নি! যাক, শ্বশুরবাড়ির ভিটায় পা রাখলা তাহলে। দেখে তো তোমারে চিনিই নাই। আগে আরেকটু মোটা কম ছিলা। এখন তো আরও বাড়ছো। অবশ্য হইবা না কেন? শহরের বাড়িতে কি কামকাইজ আছে! খালি শোয়া বসা। আহারে, তোমার মাটির মতো শাশুড়ি। কত হাতিপেতা করছে। দুই দুইডা পোলা, একটাও ভিটায় আলো জ্বালাইবার নাই।
তবে দেরি হোক আর যাই হোক, একটার শুমতি ফিরছে। তবে তুমি তো সব ধুইয়া মুইচ্ছা নিয়া গেছো। শ্বশুরবাড়ির ভিটা বেচতে হয় না গো, অলক্ষী লাগে। তয় আসছো ভালো কথা। শাশুড়ি বাঁচা থাকতে আইলে শান্তিতে বেচারা কবরে যাইতে পারত। যাই হোক, হাবুর পোলা নাকি আইছে? তো এতদিন পর আবার কিসের লিগা আইছে? সৎ বাপে বুঝি দেখতে পারে না? আহারে! কি রাজপুত্রের লাহান পোলা। এহানে ওহানে কলার ভেলার মতো ভাসতেসে।
রোকেয়া সব কথায় শুধু হেসেছে। দুদিনের জন্য ঘুরতে এসে কাহিনি করার মানে হয় না। তবে মেজাজ কতক্ষণ ঠিক রাখতে পারবে, সেটাই বড় কথা।
তাই সেই বিরক্ত মেজাজ নিয়ে এগোতেই তার মেজাজের পারদ আরও আকাশ ছুঁলো। নাবিল কোথায় মরেছে, কে জানে! সারা রাস্তা ড্রাইভ করেছে অপূর্ব, আর ওই হাদারাম বসে বসে মোবাইল টিপেছে। টিপুক, সেটা বড় কথা না। এমনিতেও দিনরাত মোবাইলে হেদে থাকে। তবে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মুচকি হাসা। আর এই হাসি কখন হাসে, রোকেয়ার ভালো করেই জানা।
তার মধ্যে আবার এই যে এক ধামড়ি মেয়ে। হাজার বার বলে এনেছে। লাফালাফি কম করবি। তবে শুনলে তো। পেয়েছে এক ডুগডুগি । সেই ডুগডুগির পেছনে মৌমাছির মতো ঘুরছে তো ঘুরছে। কে কোন দিক দিয়ে দেখবে আবার কি রটিয়ে ফেলবে। গ্রামে তিল থেকে তাল করতে সময় লাগে না। তাই বিরক্ত কণ্ঠেই ডাকল,
-- নোভা…
নোভা চমকে পেছনে ফিরল। পেছনে ফিরল অপূর্ব। বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। বাবা, হেন কোনো গাছগাছালি নেই, রোপণ করেনি। এখনো অবশ্য ওতটা বড় হয়নি। মাত্রই নিজেদের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে ফুল। দেখতে ভালো লাগছে। তাই কয়েকটা ক্লিক নিচ্ছিল আর নোভার গল্প তো আছেই। তাই পেছনে ফিরে একবার তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিলো।
তবে নোভা মায়ের দিকে এগিয়ে গেলো। যেতেই রোকেয়া বলল, -- মাথাটা ধরেছে। দুপুরের খাবার কখন দেবে, দেখ। খেয়ে একটু কাত হবো। শরীরে এত জার্নি হজম হচ্ছে না।
নোভা আকাশ থেকে পড়ল। নিজের বাড়িতেই সে কাজটাজের খবর রাখে না। এখন নাকি ঘুরতে এসে রাখতে হবে! তাছাড়া রাখতে হবে কেন? বড় চাচা তারা আসার আগেই সব ব্যবস্থা করেছে। এমনিই দেখা শোনার লোক আগেই রাখা ছিল। বড় চাচা রান্নাবান্নার জন্য এক লোকও সবসময়ই ছিল, তবে তাদের জন্য আলাদা আরও একজন মহিলা ঠিক করা হয়েছে, তো? তার আবার কাজ কি? তাই অবাক মাখা সুরেই বলল, -- আমি!
-- তো কে?
-- আমি পারব না, মা।
-- যাবি, না গালে একটা ফেলব?
নোভা আর কথা বাড়ালো না। বাড়ালেই কোনো বিপদ আসবে, কে জানে। তাই মুখ ফুলিয়েই চলে এলো। এসে অবশ্য খাবারের ধারেকাছেও গেলো না। ভেতরে সিলিন্ডার আছে, তবে বড় চাচার হুকুমে আয়োজন হচ্ছে সব মাটির উনুনে। ছেলেকে তিনি মাটির উনুনের রান্না খাওয়াবেন। খাওয়াক, তবে ওই কালি টালি, ধোঁয়ায় নোভা যেতে পারবে না। তাই আসতে আসতে রাস্তায় অপূর্ব ভাইয়া সুন্দর করে ভিডিও তুলে দিয়েছে। তার মধ্যে থেকেই একটা মিউজিক দিয়ে আপলোড দিল। দিতে দেরি, হা হা রিঅ্যাক্ট আসতে সময় লাগল না। আর হা হা দিয়েছে তাদের এলাকার অতি সম্মানিত চুল দাঁড়িওয়ালা গলে যাওয়া ক্যাঙারো।
.....
নাবিলা একটু নড়ে চড়ে এক পাশে কাত হলো। হতে হতে মনে হলো, কিছু একটা ঠিক নেই। কী নেই, নাবিলা ঠিক বুঝতে পারল না। তবে সবকিছু অন্যরকম মনে হলো। কেননা তার খাঁট এতো শক্ত হওয়ার কথা না। সেই মনে হওয়ার মাঝেই কানে এলো অচেনা কোনো পাখির গান। আর আসতেই ফট করে চোখ খুলে ফেলল। ফেলে কিছুক্ষণ সেভাবেই থমকে রইল। কোথায় আছে, কিছুক্ষণ বুঝতেই পারল না। তবে চোখ সামনে কালো রঙের কিছু একটা আটকে গেলো।
সেই আটকে যাওয়া কিছু একটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো। কালো গাড়ির কালো আসন। আর সেই আসনের একেবারে পেছনে নরম কোমল এক কুশনে মাথায় চেপে সে শুয়ে আছে। গায়ে পাতলা কম্বল।
তারা রওনা দিয়েছে সকালে। বেশ সকালে। বড় চাচা জ্যাম ট্যামে পড়তে চায়নি। সকাল সকাল রওনা দিলে নাকি একটানে আসা যাবে। তাই সকালে কোনোরকম খেয়েই বেরিয়ে এসেছে।
বড় চাচার কথা বিফলে যায়নি। কোনো বাড়তি ঝামেলা রাস্তায় পোহাতে হয়নি। সকালে নির্মল কোমল বাতাসের গায়ে গা ভাসিয়ে এক টানেই চলে এসেছে। অবশ্য আরো আগেই আসা যেত, তবে দেশের বাহিরের রাস্তায় ড্রাইভ করা আর আমাদের দেশে করা সমান কথা না। তবে বলতেই হবে। এই বান্দার গুণের শেষ নেই।
তবে যাই থাক, নাবিলার মাথাব্যথা আগেও ছিল না, এখনও নেই। তাই বাড়ি থেকে নেমে নাবিলা সোজা বসেছে একেবারে পেছনে। ইচ্ছে করেই বসেছে। ভেবেছে নিজের মতো বই পড়তে পড়তে যাওয়া যাবে। আর যেই ভাবা, সেই কাজ। আর সেই কাজ করতে করতে কখন চোখ লেগেছে, বুঝতেই পারেনি।
কুশন গাড়িতেই ছিল। গায়ের ওড়না জড়িয়ে, বই হাতেই, মাথা সিটে রেখে কাত হয়েছিল। ছোট মোট মানুষ। তার তেমন সমস্যাও হয়নি। তবে এই পাতলা কম্বল কোথা থেকে এলো, নাবিলা জানে না। গত কয়েকদিন রাতে একদম ঘুম হচ্ছে না। কাল রাতেও হয়নি। তবে দিনে ঠিকই পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। ইনসমনিয়ার থেকে বাদুড় প্রজাতিতে ট্রান্সফার হচ্ছে কি না, কে জানে। তা না হলে এমন হওয়ার তো কথা না। আর এই কথাতেই কখন পৌঁছেছে, কোথায় আছে, কয়টা বাজে, কিছুই বুঝতে পারছে না। তাই কম্বল নিয়েই নাবিলা মাথা উঁচু করে বাইরে দেখার চেষ্টা করল।
দেয়ালঘেরা এক বাড়ির সামনে তারা। বাড়ি অবশ্য বলা যাচ্ছে না। বাংলো বাড়ি টাইপ বলা যেতে পারে। চারদিকে লম্বা টানা বারান্দা, বারান্দার সামনে কয়েক ধাপ সিঁড়ি। তার সঙ্গে লাগোয়া বসার জায়গা। উপরে ছাদ বা চাল নেই। লাল রঙের টালি। আর সবচেয়ে বড় কথা, দুনিয়াজোড়া গাছগাছালি। সেই গাছগাছালি সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদ ঝিকিমিকি করছে। পাখিরা গান গাইছে। সেই গানের মাঝেই নাবিলা অবাক হয়ে এক টিয়া পাখিও দেখল। খাঁচায় বন্দি টিয়াপাখি হাজার দেখেছে। তবে এভাবে উড়তে কখনো দেখেনি। তাই বিস্ময় চোখেই তাকিয়ে রইল।
আসমানি গাড়িতেই বসা। হাতে পানের ডাবা। কয় খিলি খাওয়া হয়ে গেছে, হিসেব নেই। হিসেব থাকুক আর না থাকুক, তার আফসোস নেই। তবে কিছু একটা ঠিক নেই। কী নেই, আসমানি ধরতে পারছে না। তবে ঐ বিদেশি ষাঁড় বিনা কারণে দুবার গাড়ির ভেতরে চক্কর কেটেছে। কাটতেই পারে। গাড়ির ভেতরে সবার মালসামানা। নাবিলা আম্মা ঘুমে, তাই এখনও তেমন কিছু নামানো হয়নি।
তবে কথা হলো, এই ষাঁড় বসেছে গাড়ি চালাতে। তো গাড়ি চালা। তোর নজর থাকবে সামনে। তা না, আয়না দিয়ে তাকিয়েছে বারবার পেছনে। অবশ্য কোন দিকে আসমানি ঠাওর করতে পারে নাই। তবে কাল রাতে নাবিল আর এই বান্দর ফিরেছে বেশ রাতে। সেটাও ফিরতেই পারে।
তবে এখানেও কথা হলো, রাতে যেই আসুক, জেগে থাকে নাবিলা আম্মা। দরজা খুলেও নাবিলা আম্মা। তবে কাল রাতে না খুলেছে, না রুম থেকে বের হয়েছে। তাই এই দুই পাগলা কলিংবেল দিতে দিতে তার আরামের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে।
অবশ্য বারোটা বাজুক আর তেরোটা, আসমানির তাতে কিছু যায় আসে না। উঠলে তো! তবে আফার ঘুম ভেঙে গেছে। বড় ভাই উঠে দরজা খুলেছে। সেটাও খুলতেই পারে। তবে কথা হইল গিয়া, নাবিলার আম্মা খুলল না কেন? যেই মানুষ উড়ে উড়ে কামকাজ করে, সেই মানুষ এগিয়েও দেখেনি। আসলে ব্যাপার টা কি?
আসমানি ভাবতে ভাবতেই আঙুলের ডগা থেকে চুন মুখে নিল। ততক্ষণে অবশ্য নাবিলা উঠে গেছে। তার ওঠা দেখে বলল --- বাড়ি আইসা সবাই পুরান হয়ে গেছে। তবে তোমার ঘুম ছোটনের খবর নাই। কইলাম ডেকে ভেতরে নিয়া শোয়াই। তবে বড় ভাই নিষেধ করল। বলল, ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক। ভাঙলে আর ঘুম আসবে না। তাই কেউ আর বিরক্ত করে নাই। তোমার আম্মা এসে কম্বল দিয়ে গেল। তবে আফসোস আম্মা, আমি তেলের বোতল পাই নাই। কোন ব্যাগে ভরছি, কে জানে? সব লন্ডভন্ড করে খুঁজতে হবে।
নাবিলা শুনে হালকা হাসল। কালকের তেলই এখনো মাথা থেকে যায়নি। আজকে দিলে ভেসে যেত। ভাগ্যিস পায়নি। নাবিলা হেসে গায়ে ওড়না চাদরের মতো জড়িয়ে বেরিয়ে এলো। সে অবশ্য বাড়ির ভেতরের দিকে গেল না। গেট পেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে আশপাশের বাড়িঘর সব দেখল। দেখতে দেখতে কয়েকটা ছোট ছোট বাচ্চা ছোট ছোট সাইকেল নিয়ে একছুটে তার সামনে দিয়ে গেল। নাবিলা প্রথমে চমকাল। চমকেই হেসে ফেলল। হেসে বাচ্চাগুলো যে দিকে গেল, সে দিকে তাকাবে তখনই মুখের সামনে এক চুটকি বাজল।
নাবিলা বড় একটা শ্বাস ফেলল। এসেছে পর থেকে বিনা কারণে তাকে জ্বালিয়ে মারছে, খোঁচাচ্ছে, আরও কী কী করছে, নাবিলার ভাবতে ইচ্ছে করল না। আবার বড় গলায় বলে, আমি কিছু করেছি? এক মুখে মানুষ কত কথা বলে, তার মাথায় আসে না।
তাই বড় শ্বাস ফেলে বলল -- আপনি কি চান বলুন তো?
-- যা চাই দেবে?
-- কোন দিনও না।
-- তাহলে বাদ দাও।
-- কেন?
-- ঢং ছাড়া তোমাকে দিয়ে কিছু সম্ভবও না।
নাবিলার রাগ হলো। মানুষের দুঃখ কষ্ট বুঝি সবই ঢং হয়। আসলে কারো দুঃখ কেউ কখনও বোঝে না। তাই রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, -- আমার কাছ থেকে দূরে থাকুন, প্লিজ। রিকোয়েস্ট করছি। তিল পরিমাণ বিশ্বাস আপনার মুখের কথায় আমার নেই। তবুও কাল যা বলেছেন, আমি তাতে বিশ্বাস রাখলাম। তাই আমি কী করি, তাতে আপনার মাথাব্যথা হওয়ার কথা না। আপনি কী করেন, তাতে আমারও কিছু যায় আসে না।
অপূর্ব হাসল। হেসে ক্যামেরা নাবিলার মুখে বরাবর রাখল। এলোমেলো চুলের সদ্য ঘুমভাঙা মুখটা দেখতে ভালো লাগছে। তাই ক্লিক নিয়েই বলল -- বন্ধু হবে, নাবিলা?
নাবিলা সাথে সাথে ফিরে তাকাল। অপূর্ব এখনো ক্যামেরা তাক করে আছে। নাবিলা দেখে মৃদু হাসল। হেসে এক অভাবনীয় কাজ করে ফেলল। অপূর্বের হাত থেকে এক ঝটকায় ক্যামেরা নিয়ে, শরীরের যত শক্তি আছে তা দিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলল। ফেলে ভেতরে যেতে যেতে বলল -- এরপর থেকে ছবি তোলার আগে অনুমতি নেবেন। অবশ্যই নেবেন। তা না হলে নাক ফাটিয়ে ফেলব।
চলবে…..