#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২৫
নাবিলা বাথরুমে ঢুকে চোখে মুখে পানির দিল। হিমশীতল স্বচ্ছ পানি। অবশ্য মোটরের তোলা সব পানিই স্বচ্ছ, তবে মাটি ভেদে পানি ভিন্ন হয়। নাবিলার কাছে এই পানিও কিছুটা অন্যরকম মনে হলো। খেতে গিয়েও স্বাদ অন্যরকম লাগল। অবশ্য খাবার পানি ডিরেক্ট টিউবওয়েলের ছিল। তবুও খুব একটা তফাত তার কাছে লাগেনি।
ফজরের আজান পড়বে পড়বে করছে। আলো ফুটবে দূরের কথা, এখনও মধ্য রাতের মতো ঘন অন্ধকার। সারা রাত জেগে এই সময়টা মাথা খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তাই সকাল সকাল এমন হীমশীতল পানি যে কেউ ধরতে খুব অনিহা প্রকাশ করলেও, নাবিলা খুব সাবলীলভাবে মুখ তো ভালোই, মাথা, হাত সব ধুয়ে প্রায় আধগোসল করে ফেলল।
করে তোয়ালে মুখে চেপে বেশ কিছু সময় সেভাবেই বসে রইল। তার পাশেই নোভা। কম্বল মুড়ে মাথা টাথা ঢেকে পুরো গোল হয়ে শুয়ে আছে।
মা আর আসমানি খালার শোয়ার ব্যবস্থা হয়েছে এক রুমে, নোভা আর সে এক রুমে। না, এই বাড়িতে থাকার জায়গার অভাব নেই। বড় চাচা বাড়িটা করেছে খুব সুন্দর করে। তার চেয়েও সুন্দর বিষয় হলো, তিনি শুধু নিজের জন্য ভাবেননি। তাদের সবার কথা মাথায় রেখেই বাড়িটা করেছেন। অথচ তারা আসবে, না আসবে সেই খবরেরও কোন ঠিক ঠিকানা নেই। তার মধ্যে কাজও পুরো কমপ্লিট হয়নি। অপূর্ব এসেছে হঠাৎ, তাদের আসার প্ল্যানও হয়েছে হঠাৎ। বাড়ি হলেও অন্য কিছু করার সুযোগ মেলেনি। আর কিছু না হলেও টুকটাক দরকারি ফার্নিচারগুলো সম্ভবত আর্জেন্ট কেনা হয়েছে। তাই সবই নতুন। অবশ্য নাবিলা যেটায় আছে, সেটা পুরোনো। এটা তার দাদির খাট। চাচা পাট্টি পোট্টি দিয়ে মেরামত করে নতুন করে ফেলেছেন।
নাবিলা তো দেখে নিজেই এই রুম নিল। তবে নিজেদের বাড়িতে যেমন খুশি তেমন থাকলেও, এমন জায়গায় এসে তার থাকার সমস্যা না হলেও, নোভার পক্ষে একা থাকা সম্ভব না। তাই জোড়ায় জোড়ায় একেক জন বেঁধে গেছে। অবশ্য মায়ের বা আসমানি খালারও কোনো সমস্যা নেই। তবে অচেনা জায়গা, মায়ের শরীরটাও নাবিলার ঠিক লাগল না। রাতে যদি জ্বর টর আসে, তাই আসমানি খালাকে নিজেই বেঁধে দিয়েছে।
নাবিলা ভেজা চুলগুলো ছেড়ে দিল। দিয়ে ওড়নাটা মাথায় পুরো পেঁচিয়ে নিলো। নীল রঙা এক সোয়েটার গায়ে জড়িয়ে আস্তে করে বেরিয়ে এলো। আর আসতেই কুয়াশা মাখা অন্ধকারে চোখ পড়ল, অপূর্ব বারান্দায় বসা। অবশ্য এটাকে বসা বলা যায় না। এক চেয়ারে বসে আরেক চেয়ারে পা তুলে দিয়েছে। ঘাড়টা কাত করে কিছুটা হেলে আছে। হাতদুটো বুকে গোটানো। শীতে ফর্সা মুখটা নীলচে গোলাপি হয়ে আছে।
বাপের এত বড় বাড়ি রেখে এর থাকার জায়গার অভাব কেন পড়ল কে জানে? অবশ্য নাবিলা এটাই বুঝতে পারল না, এই বান্দা বারান্দায় কখন এসেছে?
সন্ধ্যা হতে হতে কারেন্ট গায়েব। পুরো বাড়ি অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। অবশ্য গায়ের হওয়াতে কারো তেমন সমস্যা হয়নি। বরং সবাই বাইরে এসে বসেছে। উঠানের মাঝ বরাবর কাঠ বসিয়ে ক্যাম্পিংয়ের মতো আগুন জ্বালানো হয়েছে। সেই আগুনের পাশে গোল করে সবাই বসে গেছে। হাতে চায়ের কাপ, গরম গরম পেয়াজু। আর তার সঙ্গে বিখ্যাত বক্তা অপূর্ব মহাশয় তো ছিলই। সবাইকে ঠিক মাতিয়ে নিয়েছে।
নাবিলা অবশ্য বেরোয়নি। তার সারা দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা, এমনকি এই যে নিস্তব্ধ রাত ধীরে ধীরে শেষ হয়ে সকাল হয়েছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে ধীরে ধীরে বেড়েছে তার ছটফটানি, অস্বস্তি, অপরাধবোধ। যেই নাবিলার কোনো কিছুতেই কিছু আসে যায় না, নিজের মতো থাকে, খায়, ঘুমায়। সেই নাবিলাই আজ না নিজের মতো থাকতে পেরেছে, না ঠিকমতো খাবার গলা দিয়ে নামাতে পেরেছে, না তার প্রিয় বইয়ে মন দিতে পেরেছে। বরং যখনই কিছু করতে গেছে, তখনই মনের বিশাল এক অপরাধবোধের পাহাড় বুকে চেপে ধরেছে।
কি করে করল সে! কিছু কিছু জিনিস মানুষের খুব শখের হয়, যত্নের হয়। আর ক্যামেরা, ফটোগ্রাফি, দুটোই এই মানুষটার যে খুব প্রিয়, সেটা আর কারোই বোঝার বাকি নেই। আর কারো শখের জিনিস সে নষ্ট করে ফেলেছে।
সব এই রাগ জেদের কারণে। এই রাগ জেদের কারণেই আজ তার এই দশা। না ছোটবেলায় এত জেদ করত, না নানুবাড়িতে থাকত, না সেই ভার্সিটিতে যেত, না তার সাথে দেখা হতো, না তার জন্য সবাই এত কষ্টের মধ্যে পড়ত। তাই সবার আগে ভাগ্য মাটি চাপা দিয়েছে তার এই রাগ জেদ। আর সেই রাগ জেদ কোনো কারণে আজকাল ঠিক রাখতে পারছে না। তা না হলে, এত বড় কাজটা সে কি করে করল?
বড় চাচা তো দেখেই স্তব্ধ। নাবিল হতবাক, মা নিজেও খুব আফসোস করলেন। যেই আসমানি খালা দেখতে পারে না, সেও দেখেই মাথায় হাত। এক দেড় লাখের ক্যামেরা। কেমনে এমন ছাতু হলো।
নোভার তো কান্না করে দেওয়ার জোগাড়। কত ছবি তোলা এখনও বাঁকি। সকালেই প্ল্যান করল গাছের ডালে দোলনা বাঁধবে, শাড়ি পড়ে আঁচল ছড়িয়ে ছবি তুলবে। এখন দেখো, সব জলাঞ্জলি। সেই জলাঞ্জলির দুঃখ নিয়েই নাবিলাকে দেখে বলল, -- পুরো ক্যামেরা শেষ রে, আপা। তবে আমার তো মাথায়ই আসছে না, এমন ভাঙাভাঙি হলো কী করে? ভাইয়া নিজের যত্ন না নিক, তবে তার ক্যামেরা খুব যত্নে আগলে রাখে। সেই ক্যামেরা নাকি হাত থেকে পড়ে শেষ। আর হাত থেকে পড়লে এমন ভাঙা ভাঙে? দেখে তো মনে হচ্ছে কেউ শটপুট থ্রো খেলার মতো ছুঁড়ে মেরেছে।
নাবিলা শুনে কিছু বলেনি। সবসময় মতো চুপচাপ শুনেছে। তবে সবসময় মতো হজম করতে পারেনি। বরং অপরাধবোধের পাহাড় আরও কয়েক কেজি বেড়েছে।
অবশ্য যার কারণে বেড়েছে, সে দিব্যি ঘুরছে ফিরছে, গল্পে মেতে আছে। এত প্রিয় জিনিসের দুঃখে সবাই কাতর হলেও, সে বেশ আরামছেই সব করছে। এই যে কাঠ টাঠ দিয়ে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে অর্ধেক কাজ সে নিজেই করে ফেলেছে। কালকে কি কি করবে সেটারও প্ল্যান করে ফেলেছে।
নাবিলার কি সরি বলা উচিত? নাবিলা বুঝতে পারছে না। অবশ্য সরি বললে তো আর ক্যামেরা ফিরে আসবে না। তো, করবে টা কী?
তবুও নিজের ছটফট দমিয়ে সে বেরিয়েছে আড্ডার একেবারে শেষে। শেষে বেরিয়ে অনেক জড়তা কাটিয়ে নিজে থেকে সবার উদ্দেশ্যে বলল, -- চলো, একটু হেঁটে আসি।
নাবিলা তো কখনো নিজে থেকে কিছু বলে না। তাই বলতেই সাথে সাথে সবাই রাজি। তবে অপূর্ব আড়মোড়া ভেঙে বড় আয়েশ করে জানালো, তার ঘুম পাচ্ছে। তারা যাক, সে কিছুক্ষণ এখানে বসেই ঘুমোতে চলে যাবে।
সারাদিনের ক্লান্তি, তার মধ্যে তারা আরাম করে এলেও সে এসেছে ড্রাইভ করে। তার মধ্যে এই আগুন টাগুনের ঝামেলাও। কেউ আর দ্বিমত করল না। তবে নোভা একচোট জোরাজুরি করল। কিন্তু আজকের অপূর্ব না, কিছুতেই হ্যাঁ হলো না। অথচ এই মানুষটাই ঘোরার কথা শুনে সবার আগে এগিয়ে হাঁটে।
নাবিলার খারাপ লাগা আরো কয়েকগুণ বাড়ল। তাই সবাই বেরুলো নিজেদের মতো। সেই নিজেদের মতো যেতে যেতে নাবিলা বেশ কয়েকবার ফিরে অপূর্বর দিকে তাকালো। তখন তার নিজেরও একবার নোভার মতো জোর করতে ইচ্ছে হলো। তবে সেটা কি আর তার দ্বারা হওয়া সম্ভব?
তাছাড়া, অপূর্ব তাকে আগেই দেখেছে। মঞ্চের সেই অচেনা মেয়েটা নাবিলা নিজেই। এই দুনিয়ায় একসঙ্গে আসলেই হরেক রকম গল্প জড়িয়ে থাকে। আমরা ভাবি, আমার গল্প আমার মতোই এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই পৃথিবীতে গল্প কখনও একা একা সোজা এগিয়ে যায় না। বরং একটা মানুষের সাথে এগিয়ে যায় আরো হাজারটা গল্প। তাইতো তখন শুধু নাবিলার গল্পই চলছিল না। তার সাথে ছদ্মছায়ার মতো চলছিল অপূর্ব নামের মানুষটারও গল্প। তা না হলে চেনা নেই, জানা নেই, কেন এত এত মানুষের মাঝে অপূর্বর নজর তার উপরেই পড়বে, কেন মুগ্ধ হবে। কেনই বা এতদিন পরে বাবার সাথে দেখা করার জন্য ব্যাকুল হবে। কেনই বা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুজন মানুষ হয়েও, তাদের চোখ, দৃষ্টি ভঙ্গি একই রকম হবে। কেনই বা, যেই নাবিলা সব ভুলে ধুয়ে মুছে নিজের কারবন্দি জীবনে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, তখন আবার সেই চিরচেনা দৃষ্টি অন্যের মাঝে দেখে কেঁপে উঠবে।
সেই দিন রাতে অপূর্ব গল্প শুনেই তার মনে ভয় ঢুকে গিয়েছিল। তাইতো চেয়েছিল সব বিয়ে যেভাবে ভাঙে, অপূর্বও মুগ্ধতাও সেভাবে ভেঙে যাক। গিয়ে নাবিলাকে ঘৃণা করুক। অন্য সবাই যেমন মুখ ফিরিয়ে নেয়, সেও নিক। তার মুগ্ধতা যেন কোনো ভাবেই আর না এগোয়।
তবে এই বান্দা খালিদ ভাইয়ের কোনো কথা শোনেইনি। সে আগেই ধরে ফেলেছে, খালিদ ভাই কী বলবে। তাই সুন্দর করে পাশ কাটিয়েছে। এমনকি চিঠিটাও পড়েনি। বরং সবার মতো এক কাতারে ফেলায় খুব গায়ে লেগেছে। তবে গায়ে লাগার মতো কিছু আছে বলেও নাবিলার তো মনে হয় না। সে শুধু চায়, আর কোনো ঝামেলা না হোক। বাবা-মা চাচ্ছে বিয়ে দিতে, দিক। ছোটবেলা থেকে তো জ্বালিয়েই মারল। এখন এই সুখটুকু দিক। এর বাইরে সে আর কোনো কিছুতেই নেই। কিন্তু এই ছেলে মনে হয় না তাকে শান্তি দেবে। অবশ্য নাবিলা বুঝতেও পারছে না, আসলে চাচ্ছে তা কী।
তাই সবাই রাতে ঘুরে ফিরে যখন ফিরল, তখন কারেন্ট চলে এসেছে। চারদিকে নিস্তব্ধ। বারান্দার এক কোণে কুয়াশার চাদরে মোড়ানো সাদা বাতিটা বড় ক্লান্তি নিয়ে জ্বলছে। অসংখ্য গাছগাছালির কারণে চারদিকে ভূতুরে ভাব। তার সঙ্গে চারদিকে বাতাসে মিষ্টি বিভিন্ন ফুলের সুবাস। সেই সুবাসে উঠান পুরোপুরি ফাঁকা। আগুন নিভে শুধু কয়লাগুলো পড়ে আছে।
তারপর আর কেউ দাঁড়ায়নি। রাত তো কম নয়। যে যার মতো চলে গেছে। সেই যাওয়া কখন আবার অপূর্ব এখানে এসে বসেছে, কেউ হয়ত খেয়ালও করেনি। অথচ সে নিজেই সারা রাত নির্ঘুম। দরজা না খুললেও জানালা খুলেছে বেশ কয়েকবার। জানালার পাশে বসেও থেকেছে অনেকক্ষণ। তবে এই দিকটাই খেয়ালই করেনি। করলে অন্তত সরি বলা হতো।
নাবিলা আবার রুমে ফিরে এলো। সকালে যেই পাতলা কম্বলটা তার গায়ে ছিল, সেটাই নিয়ে আবার বেরিয়ে এলো। এসে খুব আলতো করে অপূর্বর গায়ে কম্বলটা মুড়িয়ে দিল। অবশ্য বেশ দূরত্ব রেখে। আর দিতেই অপূর্ব ফট করে চোখ খুলে তাকালো।
নাবিলা কিছুটা হকচকলো। তবে অপূর্ব স্বাভাবিকভাবেই আবার চোখ বন্ধ করল। করে গায়ের কম্বলটা আরো টেনে নিতে নিতে বলল, -- এই ঢং ছাড়া আর কিছু পারো?
নাবিলার আজ রাগ হলো না। বেশ কয়েকটা বেতের চেয়ার, নিজে থেকে আরেকটায় বসল। বসে বলল, -- না, পারি না।
-- গুড।
-- তবে এই পারাটাও সবাই পারে না।
-- ট্রু। আর কিছু?
-- এখানে ঘুমাচ্ছেন কেন?
-- সত্য বলব?
-- হ্যাঁ।
-- আমি রাতে তোমার সামনে দিয়ে এসেছি। তুমি দেখেছো?
নাবিলা উত্তর দিল না। সে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল। সে দেখেনি। আর এই কারণেই অপূর্ব এখানে। তারপর চোখ দুটো নিচের দিকে নিয়ে আস্তে করে বলল, -- সরি।
অপূর্ব চোখ খুলে তাকালো। তারপর কম্বল মুড়েই উঠে বসল। বসে ঐ যে তাদের প্রথম ইন্সিডেন্ট ঘটার পর অপূর্ব যেমন সরি বলেছিল, তখন নাবিলার উত্তরের মতোই পুরো না জানার ভান করে বলল, -- ফর হোয়াট?
-- আপনি জানেন।
-- সেটা তো তুমিও সেইদিন জানতে। তবে আমি কি দ্বিতীয়বার আর কিছু জিজ্ঞেস করেছিলাম?
-- না।
-- তাহলে মনে করো শোধবোধ।
-- আপনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব শোধবোধ করছেন কেন?
-- তুমিও করে দাও। সব চুকে যাক। আসলে আমি কোনো ঋণ রাখি না।
-- ঠিক আছে। আমি আপনার ক্যামেরার ব্যবস্থা করছি।
অপূর্ব হাসল। বড় তাচ্ছিল্যের হাসি। হেসে নাবিলাকে পুরো হতভম্ব করে একটানে চেয়ারসহ টেনে কাছে আনল। নাবিলা পুরো জড়সড় হয়ে গেল। অপূর্ব দুপায়ের মাঝে সে। অবশ্য কোনো রকম স্পর্শ কারো সাথে লাগেনি। তবুও নাবিলা নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেল।
অপূর্ব আগের মতোই স্বাভাবিক। স্বাভাবিকভাবেই বলল,
-- নাবিলা, শোন। এই শোধবোধের ঢং আমার সাথে করতে আসবে না। সেই ক্ষমতা তোমার নেই। এই ক্যামেরা আমার প্রথম নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে কেনা। আমি চাইলে এই ক্যামেরা আবারও কিনতে পারব। তবে তোমার ভিক্ষের টাকার ক্যামেরা আমার প্রয়োজন নেই। ক্ষমতা থাকলে নিজের টাকা দিয়ে শোধবোধ করতে এসো।
কিন্তু আফসোস, সেই ক্ষমতা তোমার কোনোদিনও হবে না। তোমার ক্ষমতা কতদূর জানো? বসে বসে রাত জাগা, বাবার টাকায় শুয়ে শুয়ে বই পড়া, মায়ের ঘুম হারাম করা। আর ভবিষ্যৎও বলে দিচ্ছি। শুনতে খারাপ লাগবে, তবুও বলছি। কিছুদিন পর তুমি হবে সেই পুতুল, যেই পুতুল একজন পুরুষের সব চাহিদা একেবারে তার মন মতো পূরণ করবে। কেননা আজকার সব পাওয়া গেলেও, কথায় কথায় ঘাড় কাত করা টাইপ মেয়ে পাওয়া যায় না। সো বেস্ট অফ লাক, ফেইরি টেল গার্ল।
বলেই অপূর্ব ঝট করে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে কম্বল নিয়ে হাই তুলতে তুলতে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে বলল,
-- খালা, দুপুর পর্যন্ত ঘুমাব আমি। প্লিজ! বাবাকে জানিয়ে দেবেন, আর নাস্তার জন্য অকারণে ডাকাডাকি করবেন না।
আসমানি উঠেছে কিছুক্ষণ আগে। উঠে বেরিয়েই তব্দা খেয়েছে। খেয়ে চুপচাপ এক সাইডে দাঁড়িয়েছিল। ঘটনা কি জানা তো দরকার।
তাই সেই তব্দা খাওয়ার মাঝেই হাতের আঙুল থেকে চুন মুখে পুরল। এখন কথা হলো, আফাকে জানাবে, না জানাবে না। অবশ্য সিনারি খারাপ হলেও কথা তো মিছা না।
......
নোভার সারা সকাল কাটল খুব বোরিংভাবে। আপা কোন দুঃখে মূর্তি হয়েছে কে জানে। ঘুম থেকে উঠেই দেখল একেবারে চুপচাপ বসে। নোভা কপাল টপাল সব নিজে থেকেই চেক করল। দু-তিনটা ঝাকি দিয়ে কাহিনী কি জিজ্ঞেস করল। তবে এই বান্দা মুখ খুললে তো। নিজের মতো মুখে তালা মেরে বসে আছে। সকালের খাবারও খেলো খুব ঠেলেঠেলে। এখন কম্বলমুরে মরার মতো পড়ে আছে।
মা আছে নিজের মতো। আসমানি খালা রান্না না করে তদারকি করছে। নাবিল গেছে বড় চাচার সঙ্গে। কাল থেকে পুকুরের বাকি কাজ শুরু হবে, তার মধ্যে তারা তো আর বেশিদিন থাকবে না। তাই দোয়া তাও দুই একদিনের মাঝেই রাখবে। তাই বড় চাচা সব মহাব্যস্ত হয়ে কাজ করছে। আর এত এত মহাব্যস্ত মানুষের মাঝে নোভা আছে, বড়ই বিরক্ত হয়ে। সেই বিরক্তি নিয়েই অপূর্ব ভাইয়ার রুমের আশপাশ দিয়ে নোভা বেশ কয়েকবার উঁকিঝুঁকি মারল। অপূর্ব ভাইয়া দিন দুনিয়ায় ভুলে ঘুমাচ্ছে। দরজা খোলা। তবে তার গায়ে মোটা কম্বল নেই। সেটা সমস্যা না। সমস্যা হলো, তার গায়ে পাতলা একটা কম্বল। আর এই কম্বলটা ছিল তাদের রুমে। যদি শীত না মানে, তাই মা এক্সট্রা হিসেবে দিয়ে রেখেছিল। সেটাই এখানে কীভাবে এলো, তার মাথায় এলো না।
সেই মাথার ব্যথা নিয়েই নোভা সিঁড়িতে এসে বসল। শীতের রোদ, বসতে অবশ্য খারাপ লাগছে না। তবে মোবাইল হাতে নিতেই বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে গেলো। এই গলা পার্টি আপার পিছনে পড়েছে তো পড়েছেই, আবার তাকেও জ্বালিয়ে মারছে। যেই ভিডিও দিচ্ছে, ছবি দিচ্ছে, সব কিছুতে হা-হা, এর বন্যা বইয়ে দিচ্ছে।
কাল রাতে ছাড়ল সুন্দর একটা ভিডিও। দুপাশে সুপারি গাছের সারি। রাতের অন্ধকার। সেই অন্ধারে সে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। কাল রাতে যে ঘুরতে গেলো, তখন নাবিল সুন্দর করে ভিডিওটা করে দিল। এই ভিডিওটা সুন্দর করে এডিটিং করে ছাড়ল। ছাড়তে দেরি? হাহা, আসতে দেরি নেই। নোভার তো আগুন ছাড়াই জ্বরে পুড়ে যাওয়ার জোগাড়। এই যে সকালে কি সুন্দর একটা ছবি ছাড়ল, সেটাতেও। একবার শুধু ফিরে যাই। তার পর তোকে দেখাচ্ছিরে ক্যাঙ্গারু।
তবে আপাতত সে ঠিক করল ব্লক করে দিবে। তাই ব্লক অপশনে যাবে। তখনই তার পাশে অপূর্ব এসে বসল। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল, -- হোয়াট হ্যাপেন্ড, প্রিটি গার্ল? গাল ফোলানো কেন?
নোভার বোরিং দিন ফট করে সতেজ হয়ে গেল। ইশ! এলোমেলো চুল, ঘুমঘুম চোখ মুখ। আর নেশা মাখানো কণ্ঠ। সেই কণ্ঠে বিভোর হয়ে মোবাইলে বাড়িয়ে দিলো। দিয়ে দেখালো।
অপূর্ব সব দেখল নির্বিকারভাবে। দেখতে দেখতে নোভার আরেকটু পাশ ঘেষে বসল। বসে একটু চেপে ক্যামেরা অন করে বলল, -- হেই নোভা, স্মাইল।
নোভা হাসতে পারল না। সে বরং অবাক চোখে অপূর্বের দিকে তাকালো। আর তাকাতেই অপূর্ব ক্লিকটা নিল। দুজনেরই এত সুন্দর একটা ছবি এলো। সেই ছবিই অপূর্ব নিজের মুখের উপরে স্মাইলি ইমোজি দিয়ে আপলোড করে ক্যাপশন দিলো " সো, হু ইজ দিস মিস্ট্রি ম্যান?”
এবার আর সাথে সাথে হাহা ইমোজি এলো না। নোভার এতোকিছু খেয়াল করার সময় আছে নাকি? সে থমকে আছে। অপূর্ব পাশে এভাবে বসাতে। তবে অপূর্ব ছবির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসল। হেসে নোভার হাতে মোবাইল ধরিয়ে দিতে দিতে বলল, -- নোভা, তোমার আপা এলাকায় যেই হিসেবে ফেমাস হয়েছে, তুমিও হওয়ার জন্য প্রস্তত হও।
-- মানে?
-- বিয়ে তোমারও কয়টা ভাঙে, কে জানে?
-- আমার ভাঙবে কেন?
অপূর্ব উত্তর দিল না। তবে হো হো করে হাসল। তার গায়ে এখনও সেই কম্বল। সেই কম্বল টেনে টুনে আবার রুমের দিকে গেল। সে মনে মনে ঠিক করল, আজ সে সারাদিন ঘুমাবে।
চলবে……