ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 26

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২৬

অপূর্ব হাই তুলে আবার বারান্দায় এসে বসল। বারান্দার টেবিল জুড়ে নাস্তার বাহার। সেখান থেকেই নিজের আধখাওয়া চায়ের কাপ হাতে তুলে নিল। কয়টা বাজে কে জানে? তবে দুপুরের ঘড়ির কাটা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

রোকেয়া বসে আছে অপূর্ব সামনেই। সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুম। চোখ মুখ ফোলা, এলোমেলো চুল। এই শীতের মাঝেও খালি পা। কালো ফ্লোরে পা দুটো যেন শুভ্র পদ্মফুলের মতো ফুটে আছে। গায়ে পাতলা কালো টি-শার্ট, সেই টি-শার্টের অবস্থাও বড়ই করুন। দেখে মনে হচ্ছে ধুমড়ে মুচড়ে কোথাও পড়ে ছিল। হাতের কাছে পেয়েছে, বেরিয়ে আসার আগে বড় অনিচ্ছায় গায়ে দিয়ে এসেছে।

রোকেয়া নিজেও চায়ের কাপ হাতে তুলে নিল। নিয়ে চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ালো। এতোক্ষণ এখানে বসলেও, চুপচাপ শোনা ছাড়া তেমন কিছুই বলেনি। বলার অবশ্য প্রয়োজনও পড়েনি।

আজকাল চা থেকে শুরু করে সব খাবারই সীমিত, টাইম টু টাইম, একেবারে নিয়ম মাফিক। অবশ্য এই টাইম টু টাইমে তার সমস্যা নেই। ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্য ভালো। তাই খাওয়া দাওয়া সব সময়ই কম। তবে তার আর নাবিলার চায়ের বাজে অভ্যাস আছে। দিনে কয়েক কাপ ছাড়া মাথা ঠিক থাকে না। তবে ডাক্তার করেছে তাকে কড়া নিষেধ। তাই আপাতত দুধ ছাড়া আর নামমাত্র চিনি দেওয়া চা খেয়ে অভ্যাস ঠিক রাখছে। তাও আবার কোনো রকম এক কাপ। সেই এক কাপের জায়গায় আজ এই দুধ চিনির চা এই শেষ বিকেলে খারাপ লাগার কথা না। বরং বেশ তৃপ্তি নিয়েই ঠোঁট ছোঁয়ালো।

সম্পর্ক যতই ভালো থাক, সে ভালো করেই জানে, অপূর্ব তাদের কারও কাছ থেকে তিল পরিমাণ কষ্টও যদি পায়, বড় ভাইয়ের সাথে তাদের সম্পর্ক টালমাটাল হয়ে যাবে। তাই ইচ্ছে করেই নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে রেখেছে। ভেবেছে কিছুদিন থাকবে, তারপর চলে গেলেই বাঁচে। তবে আজ প্রথমবার মনে হলো, ছেলেটা আসলে অতটাও খারাপ না। কিছুটা খামখেয়ালি আছে। তবে সেটা উপরে, ভেতরে অন্য কোনো মানুষের বসবাস। যেই মানুষটাকে চাইলেই চট করে বোঝা যায় না, ধরা যায় না। তবে সব মানুষের মাঝে মিশে যাওয়ার বিশেষ একটা গুণ আছে। যেই গুণ অন্তত আজকাল ছেলেমেয়েদের মাঝে দেখা যায় না।

কিছুক্ষণ আগেই এলাকার মেম্বার এসে হাজির। একা না, সাথে এসেছে তার কিছু লোক। এমনি এমনি আসেনি অবশ্য। মেম্বার এসেছে বিয়ের পয়গাম নিয়ে। গ্রামগঞ্জে বিয়ের লাইকের কোনো মেয়ে ঘুরবে, ফিরবে, আনন্দ করবে আর বিয়ের দুই একটা সম্বন্ধ আসবে না, এমন নজির রোকেয়া কমই দেখেছে। এদের বিয়ের লাইকের মেয়ে দেখলেই মাথায় অজানা কোনো সিগনাল টাটিয়ে ওঠে। সেই টাটানি থেকেই খুব দায়িত্ব নিয়ে বিয়ের আয়োজনে নেমে পড়ে। সেটা নিজের মেয়ে হোক আর পরের। আরামে বাপের ঘরে থাকা এদের হয়তো সহ্য হয় না। তাই আশেপাশে বগলে যত ছেলে পেলে থাকে, ঝাড়া দিয়ে বের করে, নাক বরাবর হাঁটা ধরে।

কাল থেকে বাড়ির কাজ শুরু হবে। বাড়িটা একটু গ্রামের ভেতরের দিকে, তার মধ্যে দেয়ালঘেরা, গাছগাছালিতে ভরা। এক্সকাভেটর দিয়ে কাজ করা সম্ভব না। সম্ভব হলে রাতারাতি কাজ শেষ হয়ে যেত। তাই মাটি খনন করবে হাতে হাতে। দু’তিন দিন লাগবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই বড় ভাই আর অপূর্ব খবর বলতে পারছে না। তবে দোয়াটা হলেই তারা ফিরে যাচ্ছে।

সেই কাজে টাজে বড় ভাই ব্যস্ত হয়ে আছে। তার মধ্যে তাদের ঝামেলাও তো আছেই। তাই নাবিলকে নিয়েই বেরিয়েছে। নাবিল অবশ্য অপূর্বকে ডেকে নিতে চেয়েছিল। বড় ভাই তো বড় ভাই। আদরের ছেলে ঘুমাচ্ছে, তো ঘুমাক। ডেকে তোলার দরকার নেই। তবে রাতে বিলের টাটকা মাছ নাকি আনতে যাবে। তাও আবার একেবারে বিল থেকে। মাঝরাতে বিলের ভেসাল জাল থেকে তাজা মাছ তোলা ছেলেকে দেখাবেন। তাই শুধু ভাতিজাকে নিয়েই বেরিয়ে গেছেন।

তাই এখানের মেম্বার টেম্বার তার চেনার কথা না। তবে বড় ভাইয়ের কাজের লোকেরা চেনে। চিনেই দৌড়ে রোকেয়াকে জানালো। বাড়িতে তার দুটো মেয়ে। কে ভালো, কে মন্দ বোঝার উপায় আছে। তাছাড়া যতই সাহসী হোক, এই অচেনা মানুষগুলোর মাঝে নিশ্চয়ই রোকেয়া একা একা বসবে না।

তাই আসমানিকে বলল অপূর্ব কে ডেকে তুলতে। আসমানি হলো আরেক নাটকি। সকাল থেকে আলাদা এক ভাব নিয়ে উড়ে চলছে। এখানে তেমন কাজ টাজ নেই। তবুও যেটুকু করছে, সেইটুকু করেই এতদিন নাবিলা কম ছিল আজ দেখলো নোভার পিছু পিছুও ঘুরছে।

নাবিলার শরীর মনে হয় ঠিক নেই। সকালে খেলেও কোনো রকম। দুপুরে রুম থেকেই বেরোয়নি। সে কয়েকবার গেল। মটকা মেরে পড়ে আছে। কাউকে সেধে তো কিছু বলবেও না। তাই নিজেই কপালে হাত রাখল। শরীরের টেম্পারেচার সব ঠিকই দেখল। তবে আসমানি নিজের মতো বলল, -- শরীর ঠিকই আছে। তবে মন ঠিক নাই। যদি চান ঠিকঠাক থাকুক, তাইলে যাকে ডেকে তুলতে চাইছেন, তার থেকে দূরে রাখেন। দুনোডারেই রাখেন। মাথার ঘিলু ঘুরাইলো বলে।

-- কী ঘুরাইলো?
-- ঘিলু।
-- কিসের ঘিলু?

আসমানি উত্তর দিল না। রোকেয়া আগের মতোই বলল, -- কী বলতে চাস, খুলে বল?

তখনই নাবিলা একটু উঠল। উঠে আস্তে করে বলল, -- কিছু না, মা। তুমি তোমার কাজে যাও। আর খালা, যাও ডেকে তুলো। মানুষগুলো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন দেখায়?

আসমানি নিজের মতো চলে গেল। রোকেয়া নিশ্চুপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বেরিয়ে এলো। কিছু একটা হয়েছে। কি, সে বুঝতে পারল না। অবশ্য তেমন চিন্তাও করল না। তার মেয়েদের ক্ষতি হবে, এমন কোনো কথা আসমানি চেপে যাবে না। যেহেতু চেপে গেছে, আর যাই হোক ক্ষতির কিছু নেই। কিন্তু কাহিনি যে অপূর্বকে ঘিরে, বোঝার বাকি রইল না।

তবে যাই হোক, অপূর্বকে ডাকতেই সাথে সাথে উঠে এসেছে। তবে যেই হুলিয়ায় এসেছে, রোকেয়া নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইল। তার পেটের ছেলে হলে, চাপড়ে গাল ফাটিয়ে ফেলত। তাই সেই তাকানো হজম হতে না হতেই নিজের মতো এগিয়ে গেল। চেনা নেই, জানা নেই, এগিয়ে হাত টাত মিলিয়ে বড় আপ্যায়ন করে বারান্দায় বসালো। বসিয়ে আসমানিকে তাড়া দিয়ে চা নাস্তার আয়োজন করতে বলল।

অন্য সময় হলে রোকেয়া খুশিই হতেন। বিয়ে হোক না হোক, আগ্রহ করে জানতে চাইতেন। তবে এখন সব কিছুই ভিন্ন। নাবিলা বিয়ের জন্য মত দিয়েছে, সঙ্গে রেখেছে ছোট্ট একটা অনুরোধ। সেই অনুরোধ এদের জানালে বিয়ের কথা তো এগোবেই না, বরং পুরো এলাকা এই কান থেকে ওই কানে ছড়িয়ে দেবে।

বড় ভাই এলাকায় থাকার সুবাদে কমবেশি সবার সাথেই তার এখন মোটামুটি সম্পর্ক ভালো। ভালো বলতে বেশ ভালো। টাকা পয়সা একেবারে বেশি না হলেও কম না। সারা জীবন যা উপার্জন করেছেন, সবই জমা হয়েছে। তার মধ্যে এমন একটা বাড়ি করে খুব শৌখিনতার পরিচয় দিয়েছেন। তাছাড়া গ্রামগঞ্জে শহরের মানুষের কদর অন্য রকম হয়। তাই তারও কদর কেউ কম করেনি। সেই হিসেবে অল্পতেই সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। হয়ে গেছেন সম্মানীয়ও। আর সেই সম্মানের হাত রেখে চাইলেই ফট করে কিছু বলতে পারেন না। বললেই এদের গায়ে লাগবে। তাছাড়া ছোট হোক বড়, যে কোন ক্ষমতায় থাকা মানুষেরা সোজা না টা ঠিক হজম করতে পারে না। তাই তারা তো চলেই যাবে, তবে বড় ভাইয়ের সাথে এরা আড়াআড়ি শুরু করে দেবে।

তবুও তো আর চুপচাপ বসা যায় না। রোকেয়া কিছু বলবে, তার আগেই অপূর্ব সুন্দর করে সব সামলালো। একগাল হেসে খুবই নম্র ভদ্রভাবে বলল, -- আসলে চাচা, বাড়িতে তো কেউ নেই। সবাই ফিরে আসুক, ছোট চাচাও আসুক। আমরা কথা বলে জানাব। আপনি নিজে এসেছেন, প্রস্তাব নিয়ে। এটা সত্যিই খুব আনন্দের বিষয়। তাই আপতত এইসব থাক, আপনাদের কথা বলুন। কি সুন্দর আপনাদের গ্রাম। বাবার কাছে আপনাদের অনেক গল্প শুনেছি। অ্যান্ড ট্রাস্ট মি, আমি সত্যিই মুগ্ধ। মানুষের জন্য কাজ করা, সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।

রোকেয়ার আর কিছু করতে হয়নি। এমন সুন্দর, নম্র, ভদ্র, তাও আবার বিলেত থেকে আসা। তাদের কথা মুগ্ধ হয়ে বলছে, শুনছে। এমন শ্রোতা পেলে যে কেউই হাওয়ায় দুলবে। এই মেম্বার আর এমন কী? তার পোটলায় যত গল্প আছে, সব রেকর্ডের মতো বেশ কিছু সময় চলল। চলতে চলতে বিকট শব্দে হেসে হেসে বাড়ি ঘরে ভূমিকম্প তুললো। তারপর চোখে মুখে বড় তৃপ্তি নিয়ে ফিরে গেলেন। যাওয়ার আগে পিঠ চাপড়ে বাড়িতে একমুঠো ডাল ভাতের দাওয়াতও দিয়ে গেলেন। রোকেয়া নিশ্চিত, এখন ঝাড়া টাড়া দিয়ে দুই একটা মেয়েও বের করে ফেলবেন। এমন সোনার টুকরো ছেলে হাতছাড়া করার বোকামি করার তো কথা না।

রোকেয়া সেটা ভেবেই মনে মনে একটু হাসল। এখানে আসার পর থেকে বিগড়ানো মেজাজ চট করে কোথায় যেন গায়েব হয়ে গেল। আর এমন ফুরফুরে মেজাজের সঙ্গে এক কাপ চা মিস করাও কম বোকামি না।

তাই অপূর্বর দেখাদেখি নিজেও এক কাপ তুলে নিল। নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়াতেই অপূর্ব বলল, -- আপনার চা নিশ্চয়ই নিষেধ।

-- হুম।
-- নিষেধ গুলো ফলো করা উচিত।
-- তোমার সাথে খেতে ইচ্ছে করছে।

অপূর্ব হাসল। রোকেয়া কখনও তেমন হাসে না, আজও হাসল না। তবে স্বাভাবিক সুরেই বলল,

-- তোমার এই বাড়ির কোনো স্মৃতি মনে আছে? তোমার শৈশব তো এখানেই কেটেছে।

-- উঁহু, নেই। খুব ছোট ছিলাম।

-- বাড়ির ওই পাশটায় বড় একটা হাফ বিল্ডিং ছিল। বড় ভাই ভাবিকে কোয়ার্টারে নেয়নি। মা ও ভাবিকে ছাড়তে চায়নি। তুমি, তোমার মা তার খুব প্রিয় ছিলে। সেই বিল্ডিংয়ের একেবারে কর্নারের রুমটায় তোমরা থাকতে।

-- জানি, মা দাদির খুব গল্প বলেন।

রোকেয়া এবার মৃদু হাসল। এই দুনিয়ায় যাদের রুপ আছে তাদের জন্য সব কিছুই সহজ। আর যাদের নেই, তাদের প্রিয় হতে হয় অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে। তাই হেসে চায়ের কাপে আবার চুমুক দিল। দিয়ে বলল,-- একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

-- অবশ্যই।
-- তুমি নাবিলাকে কিছু বলেছ?

অপূর্বর হাবভাব আগের মতোই স্বাভাবিক। স্বাভাবিকভাবেই বলল,-- হ্যাঁ।

-- কী?

অপূর্ব সেই কথার উত্তর দিল না। রোকেয়া কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসল। তারপর বলল, -- ওকে ওর মতো থাকতে দাও।

-- আপনারা তো দিয়েছেন, কোনো লাভ হয়েছে?

-- লাভ লোকশানের কথা আসছে কেন?

অপূর্ব উত্তরের বিপরীতে শুধু হাসল। রোকেয়া সেই হাসির দিকে তাকিয়ে বলল, -- বাবার কাছে এসেছো, বাবা কে নিয়েই মাথা ঘামাও। বাড়তি আর কোন ঝামেলা চাই না।

-- বিয়ে বুঝি সব ঝামেলার সমাধান?
-- সেটা তুমি বলার কে?
-- আমি কেউ না। তবে প্রবলেম হলো, বিয়েকে আপনারা জাদুর কাঠির মতো মনে করেন। একবার ছোঁয়ালেই সব সমস্যার সমাধান।

-- তোমাকে মাথা ঘামাতে নিষেধ করেছি।

-- যদি ঘামাই?

রোকেয়া শান্ত চোখে তাকালো। অপূর্বও শান্ত ভাবে চায়ের কাপ রাখল। রাখতে রাখতে বলল, -- একটা সুস্থ হাত জোর করে আরেক হাতের সাথে বাঁধা হলে, সময় যেতে যেতে এক সময় ঠিক ভরসার হাত হয়ে যায়। তবে একটা ক্ষতবিক্ষত হাত জোর করে বাঁধতে যাবেন, ক্ষত বাড়বে, বাড়তেই থাকবে। সেই ক্ষত নিয়ে কলের পুতুলের মতো সে সব দায়িত্ব পালন করবে। এই যে এখন যেমন করে। মাথা নষ্টের দাঁত ব্যথা নিয়েও দিব্যি সে চুপচাপ বসে থাকে, একশো দুই ড্রিগ্রি জ্বর নিয়েও হেসে মাথা কাত করে সব কাজ স্বাভাবিক ভাবে করে। সামনেও করবে। নিজেকে নিয়ে তার আর কোন ভাবনা নেই, বরং কষ্ট পেতেই সে ভালোবাসে। তবে একবার ভাবুন, এটা কি আপনার মেয়ে?

-- তুমি কিছুই জানো না।

-- জানতে চাইও না। তবে ভুলে যাওয়া আর দমিয়ে রাখা এক জিনিস না। আপনার মেয়ে কিছুই ভুলেনি, তার পক্ষে হয়তো সম্ভবও না। আর সম্ভব না, এজন্যই সে বিয়ে গুলো ভেঙেছে। নিজেকে নিয়ে তার ভাবনা নেই, তবে অন্যের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মতো মেয়েও সে না।

তাই তাড়াহুড়ো করে সমাধান খোঁজার আগে তাকে একটু প্রাণ খুলে বাঁচতে দিন। নিজেকে ফিরে পেতে দিন। যখন পেয়ে যাবে, দেখবেন নিজেই এগিয়ে যাবে।

রোকেয়া আর কিছু বলল না। অপূর্বও না। সকাল থেকে এখনও কিছু পেটে পড়েনি। এখন এই হালকা চা নাস্তায় পেট মুড়িয়ে আসছে। সেই আসা নিয়ে যেতে যেতে নাবিলার রুমের দিকে একবার তাকাল। কিছু দেখা যায় না অবশ্য, দরজা ছাড়া জানালা টানালা সব বন্ধ। কিছু হলেই মটকা মেরে পড়ে থাকে। এই মেয়েকে দিয়ে আসলেই কিছু সম্ভব না।

........

মাথায় এক হাতা তেল পড়তেই নাবিলা চোখ খুলে তাকালো। সব সময় কখন মাথায় এই তেলে নিক্ষেপ হয়, বুঝতে না পারলেও আজ ঠিক বুঝল। গত সারা রাত নির্ঘুম। আজ সারাদিনও চোখের পাতা এক করেনি। ইচ্ছে করে করেনি, তা না। ব্যস, করতে পারেনি। কম্বল মুড়ে চুপচাপ শুয়ে ছিল। মনের মধ্যে অস্থিরতা, সেই অস্থিরতার হাল সে মেলাতে পারে না।

আসমানি সুন্দর করেই মাথায় তেল দিয়ে দিলো। শীতে জমাট বেঁধে গিয়েছিল, গরম পানিতে দিয়ে আবার ঠিক করেছে। তাই তেলটা হালকা গরম। এমন গরম তেল শীতের মধ্যে খারাপ লাগে না। বরং আরাম বোধ হয়। তাই দিতে দিতেই বলল, -- খাইবা না? বেলা কত হলো। সকালেও তো তেমন কিছু খাইলা না।

নাবিলা কিছু বলল না। সব সময় যা করে, তাই করতে গেলো। চুপচাপ আবার কম্বলের ভেতরে ঢুকে গেলো। তখনই সাইকেলের টুংটাং শব্দ তার কানে এলো। আর আসতেই আবার মাথা বের করল।

নাবিলা চোখে মুখে নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি, মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে। সেই মুখ নিয়েই উঠে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

নোভা তার সাইজের ছোট এক সাইকেল নিয়ে খুব দস্তাদস্তি করছে। একবার এই পাশে পড়ছে, তো আরেকবার ঐ পাশে। কোনোভাবেই নিজের তাল রাখতে পারছে না। তবুও খুব কসরত করতে করতে একটু প্যাডেল দেওয়ার চেষ্টায় আছে।

আসমানি নিজেও দেখল বড় বিরক্তের চোখে। সে আছে বিরাট পেরেশানিতে। সকালের ঘটনা আফার কানে দেবে কি না, সেটা নিয়েই ভেবে ভেবে আধপাকা চুল মনে হয় আজ পুরোই পেকে যাবে। তবে নাবিলার আম্মার জন্য কথাগুলো সত্য। তবে সত্য বলবে ভালো কথা, গায়ের ওপর উঠে গিয়ে কেন? নাবিলা আম্মা চুপচাপ শান্ত হতে পারে, তয় বয়ড়া তো না।

সেটাও না হয় একদিক বুঝলাম। আধা পাগল মেয়ে, ভালো করে বোঝাতে টেনে কাছে আনছে, এদিকে আবার নোভার সাথে আরেক কাণ্ড। গায়ের ওপর উঠে গিয়ে ছবি তুলছে। আরে কাহিনী ডা কি? একজনকে টেনে গায়ের ওপর তুলে আনছে, আরেকজনের ওপর নিজে উঠে যাচ্ছে। এই ছোকরাটা তো আসলেই ছেড়াবেড়া মাল। না, এই দুজনের কাজ থেকেই সমানে দূরে রাখতে হবে। নাবিলা আম্মাকে নিয়ে অবশ্য সমস্যা নাই, তবে এই ফলক ফলকনিকে নিয়ে বিরাট সমস্যা। এই ছেড়াবেড়া মাল এক কদম এগুলে, এই ছেমরি নিজে এগুবে দশ কদম।

তাছাড়া এক ছবি নিয়েই যা করছে! সাইকেল পাওয়ার আগ পর্যন্ত হাতে মোবাইল নিয়ে ঘুরেছে তো ঘুরছে। একবার টেনে বড় করে দেখছে, আরেকবার ছোট। এই কোণা, ঐ কোণা, কোন কোণাই আর বাকি নেই।

সে তো দেখেই বলল,-- ছবি নিয়ে যেই ভাবই কর। লাভের লাভ কিছুই হইতো না। খাবে দাবে, সময়মতো আকাশে ফুরুৎ করে উড়াল দেবে। পরে বসে বসে মাথা চাপড়ে চাপড়ে কান্দা ছাড়া কুল পাইতা না।

-- ভাইয়াকে তোমার এমন মনে হয়?

-- কেমন মনে হয়, সেটার কথা আর জিজ্ঞেস কইরো না। কচি পুলাপান তুমি, হজম করতে পারবা না।

-- বলেছে তোমাকে, যাও তো।

আসমানি যায়নি। সে তো ভাই আর যাই হোক, এই ছেমরিকে একা ছাড়বে না। তাই দেখেই নাবিলাকে বলল, পাশের বাড়ির পুলাপানের। গেটের সামনে দিয়ে একছুটে আসে যায়। নোভা ধরে একটাকে ভেতরে নিয়া আইছে। এক ঘণ্টার জন্য দিয়েছে দুশো। এখন দুনিয়া উল্টে যাক, টাকা উসুল করা চাই।

নাবিলা বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। সে অবশ্য নোভাকে দেখল না। সে দেখল নিজেকে, ভয়ে আধমরা হয়ে কোনো রকমে সাইকেলে বসেছে, আরেকজন খুব যত্ন করে আগলে বলছে, “ভয় নেই তো, আমি আছি না। ইজি হও, দেখি তো সামনে প্যাডেল দাও।”

নাবিলা একধ্যানে তাকিয়ে দেখল। তবে আজ কোথাও হারিয়ে গেল না। বরং কোনো কিছুই না করতে চাওয়া মন আজকে ঐ সাইকেল টানতে লাগলো। তাই এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে, গায়ে ওড়না নিয়ে এগিয়ে গেলো। যেতেই
নোভা চোখ মুখে বিস্ময় নিয়ে নাবিলার দিকে তাকালো। তাকিয়ে বলল, -- তুমি সাইকেল চালাতে পারো?

নাবিলা উত্তর দিল না। বরং এগিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,
-- এভাবে না। পুরো শরীর ছেড়ে বসে আছিস। দেখি, সোজা হয়ে বস। সামনের দিকে একটু ঝুঁকে শরীর হালকা কর।

আসমানি বারান্দা থেকে অবাক চোখে এই দৃশ্য দেখল। যেই মেয়েকে বোমা মেরে মুখ খোলা যায় না। সে নিজে থেকে এত কথা বলছে। দেখল রোকেয়াও। দেখে কী প্রতিক্রিয়া দেবে বুঝতে পারল না। তবে এগিয়ে সিঁড়িতে এসে বসল। দুই মেয়ের কাণ্ডকারখানা তার খারাপ লাগছে না। তারা অবশ্য কেউ জানে না, আরেকজনও তাকিয়ে আছে, অন্ধকার রুমের জানালার পাশে। রোকেয়া, আসমানির মতো অবশ্য চোখে মুখে বিস্ময় নেই। বরং স্বাভাবিক ভাবেই, আর স্বাভাবিক ভাবেই সদ্য গোসল করে আসা ভেজা এলোমেলো চুলগুলো, আরেক দফা এলোমেলো করল।

তখনই নোভার মোবাইলে টুংটাং করে নোটিফিকেশন আসতে লাগলো। সিঁড়িতেই রাখা মোবাইল। রোকেয়া দেখে ডেকে নোভাকে বলল। নোভা সাইকেল রেখে নেচে নেচে এগিয়ে এলো। অপূর্ব ভাইয়ার সাথে ছবি ছেড়েছে পর থেকে তার নীল ছোট্ট দুনিয়ায় হালচাল পড়ে গেছে। তবে খালিদ ভাই হা হা তো ভালোই, কোন হাবভাবই নেই। হয়ত দেখেই তব্দা খেয়েছে তব্দা। খাক, তার তব্দায় নোভার কি আসে যায়। শুধু তাদের জ্বালিয়ে না মারলেই হলো।

তবে সব বন্ধুরা কমেন্টের ওপর কমেন্ট করছে। তাই এবারো সেরকম ভেবেই এগিয়ে গেলো। গিয়ে মোবাইল ওপেন করতেই দেখল, নোটিফিকেশন তো ভালোই, সবাই মেসেজের ওপর মেসেজ দিয়েছে।

সে সাথে সাথেই একজনের টা দেখল। কোনো ভিডিওর লিংক দিয়ছে, চিন্তিত ভাবে বলেছে " এই সব কি নোভা? পুরো ভাইরাল হয়ে গেছে ইয়ার।

নোভা আগা মাথা কিছুই বুঝল না। তবে দেখার জন্য লিংকে ক্লিক করল। আর করতেই তার হাত কেঁপে উঠল। সে আর খালিদ ভাই। আর কীসের ভিডিও, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 26 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন