#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২৭
ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যার সীমা পেরিয়ে গেছে। নিঝুম রজনী নিজ ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে তার পথে। চারপাশে শীত নেমেছে গভীরভাবে। কনকনে ঠান্ডা বাতাস নিঃশব্দে বড় আয়োজন করে ছুঁয়ে যায়, শরীরের প্রতিটি লোমকূপে।
সেই ছুঁয়ে যাওয়া গাছগাছালিতে ঘেরা বিশাল এলাকাজুড়ে কুয়াশায় মাখামাখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদা শুভ্র রঙের বাড়িটা, একেবারে নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ হয়ে। বেশিরভাগ সময় হয়তো এভাবেই কাটে তার। গৃহস্থ বাড়ি আর শৌখিনতার শখের বাড়ির এই তো তফাৎ। গৃহস্থ বাড়িগুলো সবসময় ঝলমল করে মানুষের সুখ, দুঃখ, আনন্দের ভেসে যাওয়া কলতানে। পিড়ির পর পিড়ি চলে যায়। ঘর বদলায়, মানুষ বদলায়, বদলায় দেয়ালের রং। কিন্তু সুখ, দুঃখ, আনন্দের রং বদলায় না, তারা চলতে থাকে নিজের মতো করে।
তবে শৌখিনতার শখের বাড়িগুলো থাকে সবসময় নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ। তাদের দেয়ালে ঝুল পড়ে না, রং ঝলসে যায় না, ফার্নিচারের বার্নিশ নষ্ট হয় না, বাগানগুলো থাকে সাজানো গোছানো। তবুও এক ভিন্ন বিষাদে বাড়িটা ঘিরে থাকে। মাঝে মাঝে এই যে তাদের মতো কেউ এসে হাসি, দুঃখ, আনন্দে ঝলমল করলেও, বাকি সময় এই যে কুয়াশা এই কুয়াশার মতোই নিস্তব্ধতা, একাকিত্ব, রহস্য মুড়িয়ে অক্লান্ত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
নাবিলার মনে হয়, সেও সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। কত শত যুগ ধরে। অক্লান্ত, নিস্তব্ধতা আর একাকিত্বের মাঝে। সেই একাকিত্বের ভেতর দুঃখগুলো কুয়াশার মতো ঘিরে আছে। এই মাথা উঁচু করা বাড়িটার যেমন তাতে কোন মাথা ব্যথা নেই, নাবিলারও নেই।
তবে মাঝে খুব অস্থির লাগে, নিশ্বাস ফেলতে গেলে মনে হয় বিরাট এক বোঝা বুকে চেপে আছে। যেটা সে ফেলতেও পারে না, আবার বুকে জড়িয়েও ধরতে পারে না।
তখন ইচ্ছে করে, সবকিছু থেকে মুক্তি নিতে। কিন্তু নাবিলা সেটাও পেরে ওঠে না। এই মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়েই তার কিছুই করা হয় না। তাই থাকে নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ। এই যে আজও তাই।
মা থেকে শুরু করে বাড়ির প্রতিটা মানুষ থমকে আছে। আর নাবিলা তো নাবিলাই, সে সবকিছু সব সময়ের মতো শান্ত মুখেই শুনল, দেখল। ছোট বোনের ঝাঁড়ি খেলো। খেয়ে টেয়ে দেখতে দেখতেই বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, নিজেও জানে না। তবে এইটুকু বুঝল, সে একা নেই। ওই যে অন্ধকারে ঘিরে থাকা বারান্দার আরেক কোণা, সেখানে আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে। কেন আছে, নাবিলার আজ বুঝতে বাকি থাকে না।
সে বলেছিল, তাকে বোঝা এত সহজ না। আসলেই না। তা না হলে তার মতো চোরাবালিতে গলা পর্যন্ত ডোবা মেয়েকে কোন লাভে টেনে তুলতে চাইবে? কোন লাভে দোয়ায় দু’হাত তুলে সুখ চাইবে? তবে চেয়েছে, তখনও এখনও। এই চাওয়ায় তখনও কোনো পাওয়ার কিছু ছিল না, এখনও নেই। সব মানুষ বিনিময়ে কিছু নেওয়ার জন্য করে না। কেউ কেউ করে, শুধু ভালো রাখার জন্য। আর এই যে মানুষটা, এই মানুষটাও চাইছে, নাবিলা নামের মেয়েটি এভাবে ধুঁকে ধুঁকে শেষ না হয়ে যাক। একটু, এই একটু নিজের মাঝে ফিরে আসুক। আর এই একটু ভালো থাকুক।
নাবিলা গায়ের চাদরটা ভালো করে টেনে ধীরে ধীরে একটু উঠানের দিকে এগিয়ে গেল। মানুষের জীবনের গল্পগুলো, ঘুরে ফিরে আসে। কখনো নিজের ওপর আসে, কখনো প্রিয় কোনো মানুষের, আবার কখনো সম্পূর্ণ অচেনা রূপ হয়ে। তবে ফিরে আসবেই। এই যে তার জীবনেও তো ফিরে এসেছে। তবে তার হয়ে না, তার প্রিয় ছোট্ট বোনের হয়ে।
এই হওয়ার মতোই, সেও একদিন শুধু হাতে হাতের মোবাইলে না, সারা পত্রিকা, সারা নিউজ চ্যানেল, সারা ইন্টারনেটের দুনিয়ায় ভেসে বেরিয়েছে। আলুথালু, পাগলের মতো দেখতে একটা মেয়ে। যে কিনা ধোঁকা সহ্য করতে না পেরে প্রেমিককে নিষ্ঠুরভাবে খুন করেছে।
নাবিলা হাসি পায়, সত্যই পায়। এই হাসি স্বাভাবিক মানুষের হাসি না, দুঃখ কষ্টে মোড়ানো রক্তাক্ত বিষাদের হাসি। সেই হাসি নিয়েই সে এসে দাঁড়ায় উল্টে পড়ে থাকা সাইকেলটার কাছে। যেই সাইকেল দুই ঘণ্টার জন্য এলেও, এত কাহিনিতে আর ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ হয়নি। কোন বাড়ি, কোন ছেলে, নোভা ছাড়া কেউ চেনেও না। তাছাড়া বিকেল থেকে যা শুরু হয়েছে, এর পরে আর অন্য কিছু বলার অপেক্ষাও রাখে না।
নোভা পড়ে আছে বালিশে মুখ গুঁজে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। তার ওপর মায়ের হাতে পড়েছে দুটো চড়। এক মেয়ের কাহিনী নিয়েই যখন জীবন অতিষ্ঠ, তার ভেতর আবার আরেক কাহিনী। বড় চাচা আর নাবিলা মিলে অনেক কষ্টে মাকে শান্ত করেছে। অতিরিক্ত টেনশন তার জন্য ভালো না। তবে শান্ত করলেই বুঝি শান্ত হয়? সন্তানের ওপর বয়ে চলা ঝড় সন্তানের আগে বাবা মায়ের ছুঁয়ে যায়। আর তার মা, যার জীবনই গেছে হাজার ঝড়ের মাঝে মাথা উঁচু করে বাঁচতে বাঁচতে।
অবশ্য তারা প্রথমে ভিডিওর ব্যাপারে কিছুই বলেনি। কিন্তু কাজীপাড়ায় পুরো হইচই পড়ে গেছে। সবার ধারণা ছিল, তার জন্যই খালিদ ভাই এত কিছু করেছে। কিন্তু এখন বেরিয়ে এসেছে আরেক কাহিনী। বড়টার সাথে না, তাই তো বলে, পাগল টাগলের জন্য কেন এত কাহিনী! তবে আসল কাহিনী তো ছোটটার সাথে। সবাই বাবাকে জেঁকে ধরেছে। কেউ কেউ বলছে, চুপিচুপি বিয়েটিয়েও হয়ে গেছে নাকি। সেই দিন নাকি রাস্তায় দেখেছে বাজার সদাই করে দিচ্ছে।
বাবা চিন্তায় চোখে মুখে দেখেনি, তখনই ফোনে মাকে জানিয়েছে। আর জানার পর কোনো মায়ের পক্ষেই ঠিক থাকা সম্ভব না।
তাই তার মাও নেই। নাবিলা কী করবে, তার বুঝে আসে না। একদিকে মা, একদিকে বোন। তাই মা একটু শান্ত হতেই বোনের পাশে বসে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে চাইল। নোভা এক ঝাঁড়ি দিয়ে হাত সরিয়ে দিল। তার ধারণা, সব করেছে ওই খালিদ। বদনাম করার কোনো ওয়ে তো ছাড়ে না, এটাও ছাড়েনি। সুযোগ পেয়েছে, হাত ছাড়া করবে কেন? সে কতবার বলেছে, কেউ তার কথায় কানেই তুলেনি। আসলে নাবিলা আপু তো ভালো, কাউকেই সে পছন্দ টছন্দ করে না। ব্যস, মায়ের সাথে আড়াআড়ি। সেটারই সুযোগ বুঝে উপরে ভালো সেজে সময় মতো ঠিক ফায়দা নিয়ে নেয়।
তবে নাবিলা জানে, এই সবে খালিদ ভাই নেই। তাদের বাড়ির বদনাম, ক্ষতি, হবে এমন কোনো কিছু সে জীবন থাকতে করবে না। শুধু যেটুকু করে, নাবিলা বলে বলেই করে। এই করার কারণে তার নিজের চরিত্রে কত দাগের আঁকিবুঁকি পড়েছে। তবু কখনও একবারের জন্য মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। আর আজ বুঝি এমন কিছু করবে!
তাই বোনের ঝাঁড়িতে সে বিন্দু মাত্রও কষ্ট পায়নি । তাই আবার বড় আদুরে মাথায় হাত রাখতে গেলো। নোভা আবারও এক ঝাঁড়িতে হাত সরিয়ে দিল। এবার অবশ্য শুধু ঝাঁড়ি মারল না। বরং চেঁচিয়ে বলল, -- ঢং করতে আসবে না আপা। সব তোমার জন্য হয়েছে। তুমিই খালিদকে এতো মাথায় তুলেছো। যদি না তুলতে, আজ আমার এমন অবস্থা হতোই না।
নাবিলা নিশ্চুপ কিছুক্ষণ বোনের রাগ, জেদের কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে করে খাট থেকে নেমে বেরিয়ে এলো।
নাবিলও তাদেরই রুমে বসা। চোখে মুখে থমথমে ভাব স্পষ্ট। ভিডিও তার কাছেও পৌঁছেছে, না পৌঁছানোর কোনো কারণ নেই। এলাকায় বন্ধুবান্ধবের অভাব নেই। এতদিন এক বোনকে নিয়ে ফিসফাস ছিল, এখন বেরিয়ে এসেছে আরেকজনের নাম। কেউ কেউ তো খারাপ ভাবেই বলেছে, একজনের সাথেই দু’বোন নাকি?
এমন অবস্থায় কোন ভাইয়ের মাথাই ঠিক থাকে না। তাই খবর পেতেই দৌড়ে বাড়িতে এসেছে। আসার পর থেকেই খালিদ ভাইকে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু মোবাইল বন্ধ। সেই বন্ধ নাম্বারের দিকে তাকিয়েই থমথমে বসে আছে। আজ বড় বোনের ঝাঁড়ি খাওয়া নিয়ে তারও মাথা ব্যাথা নেই।
সোশ্যাল মিডিয়ায় নাবিলা নেই, তাই কীভাবে কী হয়েছে, সবটা সে জানেও না। তাই ভিডিও দেখল নোভার মোবাইলে। একটা না, পরপর তিনটা। একবারে ছাড়া হয়নি। খুব কৌশল নিয়েছে।
প্রথমটা এমন যে সেটা বলার কিছুই নেই, নোংরা ভিডিও। তবে ফেক, একটু খেয়াল করে দেখলেই বোঝা যায়। এ রকম ভিডিও ইন্টারনেটে হাজার হাজার আছে। ফিল্মের নায়ক নায়িকাদের মুখ বসিয়ে কত তৈরি হয়। তাই কেউ খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু সমস্যা শুরু হয়েছে পরের দুটো ভিডিওতে। এগুলো ভিন্ন আইডি থেকে কমেন্টে এমনভাবে দেওয়া হয়েছে, যেন উপরের ভিডিও একদম সত্য। বিশ্বাস না হলে এই যে এগুলো দেখেন। এলাকার সবাই জানে, এমন আরও কত ভিডিও আছে। ক্ষমতা হাতে পেয়েছে, খেলা বুঝি একটু খেলবে না?
পরের ভিডিওতেও আহামরি কিছু নেই। খালিদ ভাই আর নোভা বাইকে। এটাও খুব বড় কিছু না। খালিদ ভাই শুধু নোভাকেই না, তাদের বাড়ির যে কাউকেই দেখলে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। এটা তারা যেমন জানে, এলাকার লোকজনও জানে। কিন্তু আসল সমস্যা হয়েছে তৃতীয় ভিডিওতে। খালিদ ভাই যে বাড়িতে থাকে, সেই বাড়ির গেট দিয়ে নোভা ঢুকছে। হাতে একটা ব্যাগ। তার ঢোকার কিছুক্ষণ পর খালিদ ভাইও ঢুকেছে। আর কেউ বের হয়নি।
ভিডিও দেখেই নোভা তব্দা খেয়ে গেছে। শহরের অলিগলিতে সিসি ক্যামেরা, ভিডিও থাকা আশ্চর্যের কিছু না। কিন্তু নিজের ভুলের জন্য মাথা কুটতে ইচ্ছে করল। সেদিন তার গেট দিয়ে ঢোকার কথা ছিল না। খালিদ ভাই তাদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিতে বলেছিল। লোকদের ফোন করে বলে দেবে, তারা তুলে রাখবে। তবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তো আর অকাজ করা যায় না। তাই গেটের ওপাশে গিয়ে ঝটপট ব্যাগ নামিয়ে সব ঢেলে মিশিয়ে সাথে সাথেই বেরিয়ে এসেছে।
তাই ঝরঝরিয়ে কাঁদতে কাঁদতে নোভা বলল,
-- খোদার কসম মা, আমি ব্যাগ রেখেই বেরিয়ে এসেছি। খালিদ ভাই কখন ঢুকেছে আমি জানিই না।
ভিডিও মাঝখান থেকে কাটা হয়েছে। এমনভাবে দেখানো হয়েছে, নোভা আর বাড়ি থেকে বের হয়নি, খালিদ ভাইও না। সেই ভিডিও এখন সত্য মিথ্যা একসাথে মিলিয়ে সুন্দর করে পেশ করা হয়েছে। আর এই কারণেই নোভার গালে পড়েছে পরপর দুটো চড়।
মা এমনিতেই খালিদ ভাইকে সহ্য করতে পারে না। তার ওপর সবসময় কড়া করে বলে এসেছে, খালিদের কাছ থেকে সবাই দূরে, দূরে মানে একদম দূরে। সেই নিষেধের পরও কীভাবে সে তার বাইকে উঠল, কীভাবে তার বাড়ির দিকে গেল। আর এই কারণেই মায়ের রাগ গিয়ে পড়ল সবার ওপরে। তাই শুধু নোভা না, নাবিলকেও কয়েকটা এলোপাতাড়ি দিল। তবে নাবিলার দিকে শুধু তাকালো কঠিন রক্তচোখে।
নাবিলা সেই রক্তচোখও সবসময়কার মতো হজম করল শান্তভাবে। অনেকেই এমন একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সুযোগ পেয়ে শেয়ারের পর শেয়ার দিয়েছে। এলাকার ছেলেরাও কম যায় না, এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে সবাই সত্য মিথ্যার জালে গুলিয়ে গেছে। তাই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিও পুরো ভাইরাল।
তবে এখানের হাবভাব এখনো বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু সকাল হতে হতে ঠিক পৌঁছে যাবে। মুরুব্বিরা না জানলেও ইয়াং জেনারেশন ঠিকই জানবে। কেউ বিশ্বাস করবে, কেউ করবে না।
আর এই সব ভাবতে গিয়েই সবাই থমকে হতবাক হয়ে আছে। তার মধ্যে শুধু আসমানি খালার মাথা চাপড়ে বিলাপ করছে। মেয়েদের গায়ের কলঙ্কের কালি চাঁদের গায়ের মতো, সৌন্দর্য যতই থাক,দূর হবে না কোনোদিনও।
আত্মীয়স্বজনেরা ফোনের ওপর ফোন করছে। নোভা যেমন সব দোষ খালিদ ভাইয়ের ঘাড়ে চাপাচ্ছে, তেমনি মা ঘোষণা দিয়েছেন, সকালেই ঢাকা ফিরে যাবেন। তারপর পুলিশের কাছে যাবেন। অনেক হয়েছে। এই খালিদকে তিনি ছাড়বেন না।
তবে অপূর্ব সব সুন্দর করে সামলাল। বড় চাচাতে টেনশন নিতে নিষেধ করল। মাকে শান্ত করল। করে সুন্দর করে বলল, -- আপনি একটু শান্ত হয়ে বসুন, চাচি। মাথা ঠান্ডা করুন। ভিডিও নিয়ে ভাবার দরকার নেই। আমার পরিচিত মানুষ আছে, আমি দেখছি। কাল আমি আর নাবিল ঢাকায় যাচ্ছি। আপনি নোভাকে আগলে রাখবেন। সব ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত সেখানে যাওয়ার দরকারই নেই। কিছু কিছু সময় এমন আসে, দুনিয়া না, শুধু সন্তানের কথা ভাবতে হয়।
আসলেই ভাবতে হয়। তবে আফসোস, সেই সুযোগটুকু নাবিলা পায়নি। পায়নি বলেই আজ তার এই অবস্থায়। এই আফসোস কি কখনো নাবিলার মিটবে? না, মিটবে না। গর্ভে সন্তান আসা সহজ, খুবই সহজ। তবে বাবা মা হওয়া এত সহজ না।
নাবিলা সাইকেলে হাত বুলিয়ে খালিদ ভাইকে ফোন দিল। এই নম্বরটা নাবিলা ছাড়া কেউ জানে না। জানার কথাও না। এটা শুধু নাবিলার। তাই ফোন দিতে দেরি, রিসিভ হতে দেরি হলো না। আর হতেই গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
-- খালিদ ভাই।
-- হুম।
-- নোভা বলছে, এই সব আপনি করেছেন ।
-- তোমার কী মনে হয়?
-- আমার পরিবারের ক্ষতি হবে, এমন কোনো কাজ আমার খালিদ ভাই করবে না।
খালিদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। তারপর বলল,
-- আমি এই সব কোনোটাতেই নেই।
-- আমি জানি।
-- একটু সময় দাও, আমি সব ঠিক করে দেব।
--কোনো কিছুই কখনো ঠিক হয় না।
-- আমি আছি তো।
-- আপনি নোভার সব ছবিতে হা-হা রিঅ্যাক্ট দিচ্ছিলেন কেন?
-- পাগল বোন তোমার। দেখতে পারেনা, তাই একটু রাগাতে চেয়েছিলাম।
-- এটা সত্য?
খালিদ হেসে বলল,
-- আমার পুরো জীবনটাই মিথ্যা, নাবিলা। সত্য বলে কিছু নেই।
নাবিলা আর কিছু বলল না। তবে খালিদ আস্তে করে বলল,
-- নোভা ঠিক আছে?
নাবিলা এবারও উত্তর দিল না। আস্তে করে ফোন কেটে দিল। দিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে সাইকেলটা আঁকড়ে ধরল। ধরে অনেক সাহস করে উঠে বসল। বসে তাল রাখতে পারল না। তার চোখে পানি, শরীর কাঁপছে। নোভার মতো সেও পড়ে যেতে নিল। কিন্তু তার আগেই শক্ত একটা হাত পেছন থেকে সাইকেলটা আগলে সোজা ধরল। নাবিলা অবাক হলো না। সে জানত, আসবে। তাই কাঁপা কাঁপা পায়ে প্যাডেল দিতে দিতে বলল,
-- গল্প শুনবেন, অপূর্ব?
-- না।
-- শুনলে গিফট দেওয়া হবে।
-- কী গিফট?
-- আমি আবার ভার্সিটিতে ভর্তি হব, আপনার বন্ধুর ওয়েব সিরিজের অডিশনটাও দেব।
-- কেন?
--বাঁচতে ইচ্ছে করছে।
-- ভালো।
-- খালিদ ভাইয়ের কোনো দোষ নেই।
-- জানি।
-- কীভাবে?
-- কেউ যখন কাউকে মন থেকে পছন্দ করে, সে কখনোই চাইবে না তার কোন ক্ষতি হোক, এমন কলঙ্ক গায়ে লাগুক।
নাবিলা থমকে দাঁড়িয়ে গেলো। ভেজা চোখে বিস্ময় নিয়ে অপূর্বর দিকে তাকাল। অপূর্ব আর কিছু বলল না। সাইকেলটা টেনে দাঁড় করাল। তারপর বাড়ির ভেতরের দিকে যেতে যেতে বলল, -- বারান্দায় গিয়ে বসো, নাবিলা। গল্প শুনতে হয় আসর জমিয়ে। আমিও আসর জমিয়েই শুনব।
.......
খালিদ বসে আছে তার নিজ ফ্ল্যাটে। ব্যাচেলর মানুষ, থাকে পুরো একা। তবুও বেশ বড়সড়। সেই বড়সড় ফ্ল্যাটের নিজ রুমের খাটে কিছুটা ঝুঁকে বসে আছে। একদম নিশ্চুপ, চুপচাপ হয়ে। হাতে মোবাইল। নাবিলা অনেক আগেই ফোন কেটে দিয়েছে, তবু তার চোখ এখনো স্থির হয়ে আছে মোবাইলের স্ক্রিনে। ডান পাটা অনবরত নাচিয়ে যাচ্ছে। অথচ মুখে একেবারে শান্ত। কোনো ভাবান্তর নেই।
এই শান্ত মুখ সানাউল্লাহর পরিচিত। বেশ পরিচিত। যখন সবকিছু মিলিয়ে দুইয়ে দুইয়ে চার করে, তখন খালিদ এমন হয়ে যায়। একেবারে শান্ত। এই যে এখনের মতো। চেনে তো আর নতুন না। একসাথে চলতে চলতে হাড়ে গোড়ে চিনে গেছে।
তবে সে বসে আছে বড়ই বিরক্ত মুখে। সে মাত্রই এসেছে। ফোনের ওপর ফোন , পরিচিত থেকে শুরু করে এলাকার অনেকেই মাথা খেয়ে ফেলছে। রক্তের সম্পর্ক নেই তা কেউ খুব একটা জানে না। অনেক আগের কাহিনি, মনে থাকে কার? তাই সবাই জানে আপন ভাতিজাই। বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর ভাবি তার ছোট ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিল। সবাই ভাবে, সেই ভাইয়ের ছেলে। নানাবাড়িতে বড় হয়েছে, সেখানেই লেখা পড়া শেষ করেছে। তার ছেলে নেই, তিনটা মেয়ে। লাঠি হিসেবে ভাইয়ের স্মৃতিকে নিয়েই এসেছে।
আসলে সত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার এমন একজন বিশ্বাসী নিষ্ঠ লোকের প্রয়োজন ছিল, ছিল এমন একজনের যার বুক কোনো কিছুতেই কাঁপে না। খালিদ সেই রকম। তার সাহসের অভাব নেই। তাই যখন আবার নতুন করে খোঁজ পেয়েছিল, তখনি নিয়ে এসেছিল।
তার আনা বিফলে যায়নি৷ খালিদ ভালোর সাথে ভালো, খারাপের সাথে খারাপ। তবে যে বদনাম ছড়িয়েছে, এমন কিছু এই ছেলের নেই। চেনে তো নতুন না। এই ফ্ল্যাটে আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে প্রবেশ করেনি। আর না সে গিয়েছে কোনো মেয়ের কাছে। রক্তের পরিচয়টা ঠিকঠাক থাকলে, নিজের মেয়ে দিয়েই আটকে রেখে দিত।
রক্তের সম্পর্কে না থাকলেও, এতদিনে কিছুটা সম্পর্ক হয়েই গেছে। তাই ধরে বেঁধেই একবার তার চাচি বিয়ের কথা বলল। সে বিয়ের জন্য রাজি হয়নিই। এলাকার সব কাহিনীই তার কানে আসে । নাজিমের বড় মেয়ের আসবে না, তা হয় নাকি? তাই নিজে থেকেই বলল, -- বিয়ে করলে বল। প্রস্তাব পাঠাই। যে জল্লাদইদা মা, রাজি হবে বলে মনে হয় না। তবে অন্য ব্যবস্থাও করতে পারি। কাহিনীর তো শেষ নাই। আরেকটা লাগিয়ে বিচার শালিস বসিয়ে এমন গিরগিটি লাগাবো সেধে মেয়ে দিয়ে যাবে।
তখন জানতে পারল, এই মেয়ে নাকি তার বোনের মতো। দেখ কাণ্ড! অথচ এলাকায় কান পাতলেই সবাই সোজা বলে, নাবিলার সাথেই নাকি যত দুর্ঘট।
তারপর হাল ছেড়ে দিয়েছিল। এত সময় কই, পরের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়ে বসে থাকবে? তার সব কাজ ঠিকঠাক হচ্ছে এই'ই অনেক। তবে তার মনে হয় নিজের জন্মের কারণেই বিয়ে টিয়ের ধারের কাছে সে ঘেষতে চায় না। মেয়ে টেয়ে আবার ঘৃণা করে নাকি কে জানে?
তবে যেই বদনাম উঠল, এখন ঢাকবে কী দিয়ে সেটাই বুঝতে পারছে না। সময়মতো সামাল দিতে না পারলে ইমেজে লাগবে। আর ইমেজ নষ্ট মানে নির্বাচনে ভোগান্তি। তাই বিরক্ত সুরেই বলল, -- ফোন বন্ধ কেন তোর? কল দিতে দিতে হয়রান।
খালিদ উত্তর দিল না। তবে সানাউল্লাহর নিজের মতোই বলল, -- ওই জল্লাদইদা মহিলা আসলে ঝামেলা লেগে যাবে। নাজিম সিধেসাদা আছে। ওকে নিয়ে থানায় যা। মানহানির একটা মামলা কর। এমন চুপচাপ বসে থাকলে তো চলবে না।
খালিদ এবারও উত্তর দিল না। কেউ এক ঢিলে দুই তিন পাখি মারতে চেয়েছে। তার শত্রুর অভাব কোনো দিনই ছিল না। নাবিলাকে নিয়ে বদনামের চেষ্টা আগেও হয়েছে, কিন্তু তখন প্রমাণের অভাবে কেউই খুব দূর পর্যন্ত যেতে পারেনি। তাই তারা হয় পিছিয়ে গেছে, নয়তো ভেবেছে অন্য কোনো পথে শাস্তি দেবে।
কিন্তু এবার ব্যাপারটা আলাদা। এবার যেটা করেছে, সেটায় শুধু খালিদকে না, অন্য কাউকেও শাস্তি দিতে চাইছে। নাবিলা সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই। তার ছবি খুঁজে বের করা সহজ কাজ না। অকারণে বাইরে বের হয় না, দরকার ছাড়া কারও সাথে কথাও বলে না। তাই তাকে ব্যবহার করার সুযোগ কখনো হয়েও ওঠেনি। তবে যেহেতু শাস্তি তার একার না, তাই ভিন্ন রাস্তায় গেছে। আর পেয়েও গেছে। হাতের নাগালেই ছিল, তাই ব্যবহারও করা হয়েছে সুন্দর মতোই করে।
তাছাড়া এখানে নোভা বা নাবিলা কেউই আসল টার্গেট না। ফ্যাক্ট হচ্ছে খালিদ, ফ্যাক্ট হচ্ছে নোভার আম্মাজান। আগেরগুলো তো ভালোই, থানা, চড়, কেস, তার মধ্যে নাবিল তো আছেই। সব মিলিয়ে গিট্টু ভালো করেই দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, গিট্টু গুলো দিয়েছে কে?
খালিদ চোখ বন্ধ করে একটু ভাবল। ভাবতেই ঠোঁটের কোণে হালকা একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। হেসে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল, -- আমার বাড়ির সামনের দোকানদারকে একটু আপ্যায়ন করার ব্যবস্থা করো, চাচা। দেখি তো, সিসি ক্যামেরার ভিডিও কোথায় কোথায় পাচার করে। আর নাবিলের সাথে যাদের মারামারি হয়েছিল, যেই কয়টার নামে কেস উঠেছিল, একটাও বাদ দেবে না। সবাইকে আমার ফ্ল্যাটে ডাল ভাতের জন্য আনো।
সানাউল্লাহর ভ্রু কুঁচকে বলল,-- অযথা ঝামেলা করবি না খালিদ। থানায় চল, বাকি যা করার তারা করবে।
খালিদ হাসলো। দাঁড়ি গোঁফের জঙ্গলে হাত বুলিয়ে বলল, -- এবার কলিজায় হাত দিয়েছে, চাচা। কার পাছায় কত তেল, না দেখলে বড় অন্যায় হয়ে যাবে। আর তুমি ভালো করেই জানো, নিজের বেলা আমি কোন আপোস করি না।
চলবে…..
আমার গ্রুপের লিংক আর আর ইবুক লিংক কমেন্ট বক্সে।
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT